হাজার টাকার বাজার

0
2

বাবা যখন বাসায় থাকে না, পরিবারের প্রয়োজনে অনেক সময় তোমাদের বাজারে যেতে হয়, তাই না? কিংবা কখনো তেল, লবণ, চাল, ডাল ফুরিয়ে গেলে তাৎক্ষণিক তা আনার জন্য মা তোমাদের দোকানে পাঠান। এই কেনাকাটা করতে বা বাজার করতে অনেকের খুব মজা লাগে, আবার অনেকের কাছে এটা খুব বিরক্তিকর কাজ। বাজারের ব্যাগ বয়ে নিয়ে আসাটাকে অনেক কষ্টকর কাজ মনে হতে পারে। তবে মনে রেখো, এই কাজটা তোমাকে করতেই হবে। হয়তো এখন বাবা, চাচা বা মা করে দিচ্ছে। বড় হলে তোমাকে এই দায়িত্ব নিতে হবে। তাই বাবার সাথে বা মায়ের সাথে বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করতে শেখো। এটা একটা প্রয়োজনীয় শিক্ষা। স্কুল-কলেজে এই বিষয়ে ক্লাস বা প্রশিক্ষণ পাওয়া যায় না। পরিবার থেকেই শিখতে হয়।
চলো, আজকে আমরা বাজার করা বা কেনাকাটা করা নিয়ে কিছু আলাপ করি। প্রথম ধাপ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো-

বাজারে যাওয়ার পূর্ব প্রস্তুতি :
১. তালিকা তৈরি :
বাজারে যাবার আগে অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে হবে। কোন জিনিস কিনবে, কত পরিমাণে কিনবে, কোন ব্রান্ডের কিনবে, সেটার জন্য কত খরচ লাগতে পারে বিস্তারিত লিখে নিবে।
যেমন-
চাল(নাজিরশাইল) ——- ৫ কেজি—-৫*——— = ——- টাকা
সয়াবিন তেল (রূপচাঁদা) – ১ লিটার —————- = ——- টাকা
মুরগি (সোনালি) ——– ২ কেজি —————- = ——- টাকা
কই মাছ ————– ১ কেজি —————- = ——- টাকা
গোল আলু ————- ৩ কেজি —–৩*——— = ——- টাকা
কাঁচামরিচ ———— ২০০ গ্রাম —————- = ——- টাকা ….ইত্যাদি।

এভাবে আইটেমগুলো বিস্তারিত লিখে নিবে। তাহলে ভুলে যাবার সম্ভাবনা থাকবে না।
আবার কোনো কোনো পরিবারের নির্ধারিত দোকান থাকে যেখান থেকে তারা নির্দিষ্ট কিছু পণ্য সামগ্রী নিয়মিত কিনে থাকেন। বাজারে যাবার আগে সেটাও জিজ্ঞেস করে জেনে নিবে যে কোন দোকান থেকে কিনলে ভালো পণ্য পাওয়া যাবে বা সাশ্রয়ী মূল্যে কেনা যাবে।

২. বাজেট নির্ধারণ :
বাজার করার ক্ষেত্রে কিছু জিনিস দুই সপ্তাহে একবার বা মাসে একবার কিনে নিলে হয়। যেমন- চাল, ডাল, তেল, লবণ ইত্যাদি। আবার কিছু জিনিস আছে যেগুলো সপ্তাহে এক বা একাধিক বার কিনতে হয়। যেমন- কাঁচাবাজারের আইটেম- মাছ, মাংস, সবজি ইত্যাদি। তাই মাসের হিসাব করে নিয়ে বাজার ভাগ করে নিয়ে বাজেট নির্ধারণ করে ফেলতে পারলে ভালো, যে সাপ্তাহিক বাজারের বাজেট কত হবে আর মাসিক বাজারের বাজেট কত হবে।
বাজারের তালিকা করে সে অনুযায়ী টাকা নিয়ে বাজারে যেতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু টাকা বেশি নিয়ে নিতে হয় কারণ অনেক সময় বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। আবার বাজারে গিয়ে কখনো নতুন দুয়েকটা আইটেম কেনার কথা মনে পড়ে।

৩. বাজারের পণ্য সম্পর্কে ধারণা নিয়ে যাওয়া :
বাবা মায়ের কাছে জেনে যাবে যে কোন আইটেমটি কীভাবে দেখে কিনলে ভালোটা কেনা যাবে। কিংবা কী কী বিষয় দেখলে তুমি বুঝতে পারবে এটা অরিজিনাল বা টাটকা পণ্য। যেমন- মাছ, মুরগি, গরুর মাংস, সবজি কেনার ক্ষেত্রে কী কী দেখলে তুমি ভালোটা চিনতে পারবে তা জেনে নিবে। তাহলে ঠকার সম্ভাবনা কম হবে। দাম সম্পর্কেও ধারণা নিয়ে যাবে, যেন তোমার কাছ থেকে দোকানদার বেশি দাম নিতে না পারে।
৪. বাজারের ব্যাগ নিয়ে যাবে। তাতে করে বাজারে গিয়ে ব্যাগ খুঁজতে দোকানে দোকানে ঘুরতে হবে না।
৫. বাজারে ঢোকার আগে দোয়া পড়বে, যেন আল্লাহ তোমাকে বাজারের অকল্যাণ থেকে রক্ষা করেন, কল্যাণ দান করেন।
৬. বাজারে যাবার আগে বা কেনাকাটা করতে যাবার আগে খেয়ে যাবে। ক্ষুধার্ত অবস্থায় কেনাকাটা করলে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হয়।

বাজার করার সময় করণীয়-
১.তাজা পণ্য নির্বাচন :
– সবজি কেনার সময় রঙ ও শক্তভাব দেখে নিবে। প্রতিটি সবজির আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে সেগুলো জেনে নিবে।
– মাছ কিনলে চোখ স্বচ্ছ ও আঁশ চকচকে কি না তা দেখবে। কানকো উঠিয়ে দেখে নিবে তাজা কি না। মাছে যেন দুর্গন্ধ না থাকে।
– মাংস কিনলে তা লালচে ও দুর্গন্ধহীন হওয়া জরুরি। গরুর মাংসে যেন হাড়-চর্বি বেশি ধরিয়ে না দেয় সেটা খেয়াল করবে।
– প্যাকেটজাত খাবার, যেমন- পাউরুটি, আইসক্রিম, সস, ইত্যাদির ক্ষেত্রে উৎপাদন তারিখ ও মেয়াদ অবশ্যই দেখে নিবে।

২. দরদাম শেখা :
এক দোকান থেকে না কিনে অন্তত দুই তিনটি দোকানে দাম জিজ্ঞেস করবে। যেমন- একটি দোকান যদি ডিম ডজনপ্রতি ১৫০ টাকা বলে, আরেক দোকান যদি ১৪০ টাকা বলে, তবে সহজেই ১০ টাকা সাশ্রয় করা যায়। দোকানদারের সাথে ভালো ব্যবহার করে দরদাম করবে। তোমার ভালো ব্যবহারের কারণে দোকানদার খুশি হয়ে সুলভ মূল্যে এবং ভালো পণ্য দিতে পারে। তবে খেয়াল রাখবে তোমাকে যেন বোকা ভেবে ঠকিয়ে না দেয়।

৩. ওজন দেখে নেয়া :
দোকানদার অনেক ক্ষেত্রে দুষ্ট প্রকৃতির হতে পারে। ওজনে কম দিয়ে লোক ঠকানো তাদের অভ্যাস। তাই খেয়াল করবে তোমাকে যা দেয়ার সেটা দিচ্ছে কি না, ওজনের মেশিনে কোনো কারসাজি করছে কি না।

৪. লোভে না পড়া/প্রভাবিত না হওয়া :
দোকানদার অনেক সময় চেষ্টা করবে তোমার তালিকার চেয়ে বেশি পরিমাণে জিনিস তোমার কাছে বিক্রি করতে। কখনো পণ্যের খুব সুনাম করবে, কখনো বলবে- এই দামে আর পাবেন না, কখনো বলবে এই জিনিস বাজারে আর উঠবে না, ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে লোভ সম্বরণ করতে হবে। ঠান্ডা মাথায় কেবল প্রয়োজনীয় পরিমাণ জিনিস কিনে আনতে হবে। মনে রাখবে- লোভে পড়েই মানুষ প্রতারিত হয়।

৫. পণ্যগুলো আলাদা রাখা :
মাছ, মুরগি বা মাংস এগুলোর প্যাকেট থেকে পানি বের হয়। তাই যেসব পণ্য কাগজের প্যাকেটে করে দোকানদার তোমাকে দেয় সেগুলোর সাথে রাখলে প্যাকেট ভিজে ছিঁড়ে যেতে পারে। সেজন্য মাছ-মুরগি এগুলো আলাদা ব্যাগে রাখবে।

৬. টাকা গুনে নেয়া/গুনে রাখা :
বাসা থেকে টাকা নেয়ার সময় গুনে নিবে। টাকা সাবধানে রাখবে। দোকানদারকে দেয়ার সময় গুনে দিবে আবার নেয়ার সময়ও গুনে নিবে। নোটগুলো ভালোভাবে দেখে নিবে, ছেঁড়া /ফাটা/পোড়া আছে কি না।

বাজার শেষে করণীয় :
১. বাড়িতে ঠিকভাবে বাজারগুলো পৌঁছাবে। ব্যাগে কোনো সমস্যা আছে কি না খেয়াল রাখবে। ব্যাগ ছিঁড়ে যাবার আশঙ্কা থাকলে আগেই আরেকটা ব্যাগ কিনে নিবে, যাতে রাস্তায় ব্যাগ ছিঁড়ে সব ছড়িয়ে না পড়ে। বাড়িতে নিয়ে পণ্যগুলো বের করে জায়গামতো রাখবে।
২. তালিকা ধরে কত খরচ হলো তা হিসেব করে বাকি টাকা বাবা-মাকে বুঝিয়ে দিবে। কখনো যদি বাজারে কিছু খেতে মনে চায়, যদি বাজারের টাকা বাঁচে, সেখান থেকে যদি একান্তই কিছু কিনে খেয়ে ফেলো, বাবা-মাকে সেটা জানাবে। কিন্তু বাজারের মিথ্যা হিসেব দিবে না।
৩. বাজারের কোনো আইটেম কেনার ক্ষেত্রে তোমার ভুল হতে পারে। হয়তো তাজা জিনিস কিনতে পারোনি, কিংবা সবচেয়ে ভালোটা চিনতে পারোনি। এক্ষেত্রে বাবা-মা বকতে পারে। তাতে খুব মন খারাপ না করে জিজ্ঞেস করবে- পরেরবার কীভাবে কিনলে তুমি সেরাটা কিনতে পারবে।

মনে রাখবে, বাজার করায় কেউ একদিনে দক্ষ হয়ে ওঠে না। বহু বছর ধরে বাজার করতে করতে, শিখতে শিখতে মানুষ দক্ষ হয়। অনেক ঠকতে ঠকতে মানুষ বোঝে কীভাবে জিততে হয়। তাই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তুমিও একটা সময় বাজার করায় দক্ষ হয়ে উঠতে পারবে।

প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৫