নুসরাতের মাইলস্টোন

0
1

১.
নুসরাতদের স্কুলের চারপাশ দিয়ে প্রতিদিনই প্লেন উড়ে যায়। নুসরাত বন্ধুদের সাথে স্কুলের বারান্দায় এসে আকাশের দিকে তাকায়। মনে মনে ভাবে সে প্লেনে চড়ে একদিন অনেক দূরের দেশে চলে যাবে।
একদিন স্কুল ছুটির পর সে মা’কে বলে, ‘মা, আমি প্লেনে চড়ব। প্লেনে চড়ে দূরের আকাশে মেঘের দেশে চলে যাব। আমাদের স্কুলের চারপাশ দিয়ে প্রতিদিন কত প্লেন চলাচল করে। এসব দেখে আমার মন খারাপ হয়। মা, আমায় প্লেনে চড়াবে না?’
মা বলেন, ‘হ্যাঁ মামণি, ভালো করে লেখাপড়া করো, ক্লাসে ফার্স্ট হও, তাহলে নিশ্চয়ই তুমি প্লেনে চড়ে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াতে পারবে।’
নুসরাত বলে, ‘ঠিক আছে মা, আমি যদি এবার ফার্স্ট হই তাহলে আমাকে প্লেনে চড়াবে তো?’
মা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মামণি, আমরা এবারই কক্সবাজার যাব। আর প্লেনে করেই যাব।’
‘মা, তুমি সত্যি বলছো?’
‘হ্যাঁ মামণি।’
‘কী মজা হবে! মা তুমি তোমার ফোনটা দাও তো, আমি এখনই আপুকে ফোন করে জানিয়ে দিই যে এবার পরীক্ষার পর আমরা কক্সবাজার বেড়াতে যাব এবং প্লেনে করে যাব।’
মা বলেন, ‘এখনই ফোন করতে হবে না, বাড়িতে গিয়েই তো আপুকে বলতে পারবে।’

২.
নুসরাত প্রথম যেদিন স্কুলে গিয়েছিল, সেদিন ওর মা ওকে ক্লাসের একেবারে শেষ বেঞ্চে বসিয়ে দিয়েছিলেন। নুসরাত বারবার সেদিন মাকে বলেছিলো মা, আমি প্রথম বেঞ্চে বসব। মা বলেছিলেন, ‘মামণি, আমি তোমাকে শেষ বেঞ্চে এজন্যই বসালাম যে, তোমার সামনের বেঞ্চগুলোতে অনেক ছেলেমেয়ে বসে আছে। তুমি পিছন থেকে একটু একটু করে সামনে এগিয়ে যাবে। এর মানে এটাই যে, তোমার সামনে লক্ষ্য আছে, সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে তোমাকে সামনে তাকাতে হবে। আর সামনে বসলে তোমাকে পিছনে তাকাতে হতো। তুমি প্রতিদিন ক্লাসরুমের নিয়ম মেনে চলবে, শিক্ষকের কথামতো চলবে, বন্ধুদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে আর পড়াশোনোয় সবাইকে ছাড়িয়ে একদিন সামনের বেঞ্চে বসবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তুমি সবসময় সামনে তাকাতে শিখবে। পিছনে ফেরার নাম জীবন নয়।’
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাবার হাত ধরে কলকাতায় পৌঁছানোর সময় মাইলস্টোন দেখে দেখে সংখ্যা শিখেছিলেন। আর নুসরাত শিক্ষাজীবনের প্রথম দিনই তার সামনে কতোটা বেঞ্চ রয়েছে কতগুলো ছেলেমেয়ে তার সামনে বসে আছে তা দেখে জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছানোর পাঠ গ্রহণ করলো।

৩.
বড় বোন সুমাইয়ার সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমাত মাইলস্টোন স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী নুসরাত জাহান। ঘরের দেয়ালে টাঙানো ছোটবেলার মুচকি হাসির ছবিটি দেখে হু হু করে কাঁদছে বড় বোন সুমাইয়া। দুই বোন ছিল একে অপরের খেলার সঙ্গী।
সুমাইয়া পরীক্ষা শেষে স্কুল থেকে বের হতে পারলেও বের হতে পারেনি তার আদরের ছোট্ট বোন নুসরাত। ছোট বোনের দুষ্টুমিষ্টি স্মৃতি তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাকে।
নুসরাত আর সুমাইয়া একই খাটে ঘুমাতো। খেলাধূলা করত। স্কুলে যেত আর বিকেলে ঘুরতে যেত। কিছু দরকার হলেই সে আপুর কাছে বায়না করত। হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমাতো তার আদরের ছোটবোন। সেই খাটে একা একা সে আর কোনোদিন ঘুমাতে পারবে না।
খাটের পাশের ছোট্ট টেবিলে পড়ে আছে কিছু বই খাতা। ঘরের সোফায় পড়ে রয়েছে পুরোনো স্কুলব্যাগ। পুরোনো খাতায় লেখা নাম, রোল নম্বর নির্বাক হয়ে খুঁজে ফিরছে নুসরাতকে। সুমাইয়া এসব দেখে আর ভাবে, তার বোন আশেপাশেই কোথাও আছে, এখনই চলে আসবে!
কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে নুসরাতের মায়ের। নিজ চোখেই নিজের মেয়েকে আগুনে পুড়ে মরতে দেখেছেন তিনি।
স্কুল ছুটির কিছু আগে জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে মায়ের হাত থেকে টিফিন বক্সটি নেওয়ার সময় মায়ের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল নুসরাত। মৃত্যুর আগে যেন শেষবার প্রিয়মুখ মন ভরে দেখে নিয়েছে সে।
মা টিফিন বক্স হাতে দিয়ে মূল গেটের দিকে আসামাত্রই স্কুলের উপর বিকট শব্দে আছড়ে পড়ে প্লেন।
প্লেন পড়ার শব্দ শুনেই নুসরাতের মা দৌড় দেয় স্কুলের মাঠে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ধোঁয়া আর আগুনে নুসরাতের ক্লাসরুমের কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। দৌড়ে ক্লাসরুমের দিকে যেতে চাইলেও লোকজন তাঁকে আটকে দেয়।
মায়ের চোখের সামনেই পুড়ছে প্রিয় সন্তান নুসরাত। কিচ্ছু করতে পারছেন না তিনি। সোনাপাখিটা টিফিন বক্সের খাবারও মুখে দেওয়ার সময় পায়নি।
ডুকরে কাঁদেন নুসরাতের মা।
নুসরাতের বাবা সকাল আটটায় নুসরাতকে স্কুলে দিয়ে এসেছিলেন। কী নিয়ে বাঁচবেন তিনি। কলিজার টুকরোকে তিনি নিজে স্কুলে দিয়ে এসেছিলেন। ওর ঝলসানো মুখটা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। নুসরাত যেন তার অসহায় পিতার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগেই আদরের সোনামণিকে তিনি আল্লাহর কাছে সঁপে এসেছেন।

৪.
ঘরের জানালা দিয়ে এক সময় প্লেন উড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আনন্দ পেত নুসরাত। তার ইচ্ছে হতো সেও একদিন প্লেনে উড়ে দূর আকাশে চলে যাবে। সেই প্লেনই কেড়ে নিল তার জীবন প্রদীপ!
নুসরাতের প্লেনে চড়ে দূরের আকাশে মেঘের দেশে চলে যাওয়ার সে ইচ্ছে আজ পূরণ হয়েছে। বাবা-মা আর বোন সুমাইয়ার প্রিয় আদরের সোনামণি আজ সত্যিই দূর আকাশে সাদা মেঘের সাথে মিশে গিয়েছে। মহান সৃষ্টিকর্তা তাকে পরম মমতায় কাছে ডেকে নিয়েছেন। মাইলস্টোন স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী নুসরাত তার প্রিয় মাইলস্টোন খুঁজে পেয়েছে!

প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৫