রাজধানীর এক চিলতে ফ্লাটে জারাদের বাস। বাড়ির ছাদে আছে সুন্দর বাগান, ছাদ বাগান। সেই বাগানে এক বিকেলে দেখা গেল সাদা সাদা কাশফুল ফুটে আছে। জারা তো অবাক। তাহলে ছাদের টবেও কাশফুল ফোটে?
হ্যাঁ বন্ধুরা, আজ শরতের কথাই বলব। শরৎ এলে বাংলার প্রকৃতিতে মনভোলানো রূপের শোভা দেখা যায়। চমৎকার এক ঋতু শরৎকাল। যেন রূপের রানি। কাশফুলের অবারিত স্বাধীনতা, সুনীল আকাশে পেঁজা তুলার মতো ভেসে বেড়ানো মেঘ, পথ হারানো সাদা বকের সারি, মনমাতানো সুখে প্রজাপতি-ফড়িংয়ের ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ নাচানাচি, বাতাসে শিউলির তাজা ঘ্রাণ, ধানখেতে নুয়ে থাকা সোনাঝরা শিষ, নদীর পানিতে ভরা জোছনার ছায়া, এসবই বলে দেয় শরৎ ঋতু এসেছে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম শিউলি ফুলের কথা বলেছেন। তবে শরৎ ঋতুতে বসে হরেক ফুলের মেলা। শরৎকালের আনন্দ বাড়িয়ে দিতে আরও ফোটে বেলি, দোলনচাঁপা, বকুল, শালুক, পদ্ম, জুঁই, কেয়া, কাশফুল, মল্লিকা, মালতি।
ভাদ্র ও আশ্বিন শরতের দুই মাস। ঋতু বৈচিত্র্যের বাংলাদেশে যথা নিয়মে আসে শরৎকাল। ষড়ঋতুর তৃতীয় ঋতু শরৎ। কাশফুল ও শিউলি হলো শরতের ফুল। এর বাইরেও আরও কিছু ফুল আছে যেগুলো শরতে ফোটে।
কখনো ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, কখনো অসহনীয় গরম নিয়ে আসে ভাদ্র। এই ভাদ্র মাস ‘তালপাকা ভাদ্র’ নামে পরিচিত। পাকা তাল অবশ্য বাজারে উঠে গেছে। শুরু হয়ে যাবে তালের পিঠা বানানোর আয়োজন। শরতের দ্বিতীয় মাস আশ্বিনে রাত আসে তাড়াতাড়ি। শীতল হতে থাকে আবহাওয়া। শোনা যায় হেমন্তের পদধ্বনি। শরতে শিউলির মিষ্টি সুবাস সবার প্রাণ হরণ করে থাকে।
শরতের পরিবেশ মনোমুগ্ধকর। পরিষ্কার নীল আকাশে ভেসে চলে সাদা মেঘের ভেলা। দিনের বেলায় খানিকটা গরম থাকলেও রাতের দিকে তাপমাত্রা পড়ে যায়। একটা ঠান্ডা অনুভূতি পাওয়া যায়। শরৎ মানেই সবুজ ধান ক্ষেতের বুকে সোনালি আভার ছোঁয়া।
শরৎকালের নাম শুনলেই সবার প্রথমে মনে আসে কাশফুলের কথা। নদীর ধারে কাশবনের যে অপরূপ সৌন্দর্য তা কেবল শরৎকালেই দেখা যায়। যেন মনে হয় আকাশের সাদা সাদা মেঘগুলো নেমে এসেছে মাটির বুকে। তুলোর মতো নরম কাশফুলের মধ্যে খেলে বেড়ায় দুষ্টু ঘাসফড়িঙের দল। কাশফুল মূলত ঘাসজাতীয় জলজ উদ্ভিদ। নদীর ধারের বালু মিশ্রিত মাটিতে কাশবন সৃষ্টি হয়। গ্রামে রাস্তার পাশে অযত্নে ফুটে থাকে কাশফুল। এমনকি ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরেও দেখতে পাওয়া যায় কাশফুল। ফুলটির বৈজ্ঞানিক নাম সাচারুন স্পন্টানিয়াম (Saccharun spontaneum)। পরিবার গ্রামিনিই (Gramineae)। কাশফুলের গাছ ঘাসজাতীয়। লম্বায় ১০-১৫ মিটার। লম্বা সরু ডাঁটায় নরম সাদা ফুল।
শরৎকাল মানেই শিউলির ঘ্রাণ আর ভোরবেলা শিউলিতলায় ফুল কুড়ানোর ধুম। শরতের ভোর মিষ্টি হয়ে ওঠে মিষ্টিমধুর সুগন্ধময় শিউলি ফুলের মধ্য দিয়ে। শেফালি শিউলির আরেকটি নাম। মাটিতে বিছিয়ে থাকে ছোট্ট ছোট্ট তারার মতো কমলা বৃন্তযুক্ত সাদা ফুলগুলো। শিউলি ফুলের যে কী অপরূপ সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। নিক্টান্থেস প্রজাতির এই ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম নিকটান্থিস এবরস্ট্রিসটিস (Nyctanthes arbortristis)। পরিবার ওলিয়াসি (Oleaceae)। ইংরেজি নাম নাইট ফ্লাওয়ারিং জেসমিন (Night flowering Jasmine)। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যেমন- ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমারে এই ফুলের আদি নিবাস। ধবধবে সাদা পাঁচ থেকে সাতটি পাপড়ি একটি কমলা রঙের টিউবের মতো বৃন্তের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। শিউলি ফুল মাঝারি আকারের হয়। পাঁচটি সাদা পাপড়ি, মাঝে কমলা বৃন্ত। শিউলি গুচ্ছাকারে ফোটে। সন্ধ্যা থেকে ফুটতে শুরু করে এবং সকালে ঝরে পড়ে। দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কিছু দেশে এ ফুলটি দেখা যায়।
শরৎকালের আরেকটি ফুল ছাতিম ফুল। সৌরভ বিশিষ্ট সবুজ মেশালে সাদা রঙের থোকা থোকা ছাতিম ফুল ঝুলে থাকে গাছ থেকে। ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই ফুলের আদি নিবাস। ছাতিমগাছের কাণ্ডের মূলাবর্তে সাতটি করে পাতা থাকে বিধায় সংস্কৃতে এই গাছের নাম সপ্তপর্ণা। অ্যাপোসাইনেসি বর্গের এই গাছের বৈজ্ঞানিক নাম অ্যালস্টোনিয়া স্কালারিস (Alstonia scholaris)। ইংরেজি নাম ডেভিলস ট্রি (Devil’s Tree)। ধারণা করা হয় ছাতিম গাছে ভূত থাকে। তাই এই নাম।
শরতকালের দিনের বেলা নদী-নালা, খাল-বিলের ধারের কাশফুলের শোভা ছাড়াও রাতের বেলার জোছনাস্নাত সৌন্দর্য বিমুগ্ধকর। খাল-বিল নদী-নালা, বিলজুড়ে সাদা-লাল শাপলা আর পদ্মফুলের মেলা। বিলের পাড়ে নদীর পাড়ে অনেক গাছ ডুবে থাকে পানিতে; গাছের পাতাগুলো ছুঁয়ে থাকে নদী বিলের পানিতে। শান্ত নদীতে ভেসে চলেছে একটি বা অনেক নৌকা এমন দৃশ্যে কে না প্রকৃতিপাগল হয়!
শুধু শাপলা আর পদ্মফুলের মেলা নয়, খালে বিলে নানান লতা, বাগানে বা পথের ধারে কামিনী, মালতি, জবা, টগর, হাসনাহেনা আর আমাদের মনে শরতের আগমনী বার্তা বেশি করে দেয় কাশফুল আর শিউলি ফুল। কবিরা লিখেছেন কত কবিতা ও গান এ নিয়ে।
শরতের আগের ঋতু বর্ষা। বর্ষায় পানি টইটম্বুর থাকে। শরৎ এলে পানি কমতে থাকে। তখন খাল, বিল, নদী-নালায় মাছ ধরার উৎসব চলে। কই, শিং, মাগুর, পাবদা, পুঁটি, বোয়াল, শোল, টেংরা, বৌ, চিংড়ি, খইলসা, মলা মাছে ভরা থাকে বাংলাদেশের জলাশয়গুলো। ছোট ছোট এই সব মাছের সাথে রুই, কাতলা, আইড়, বাঘাইড়সহ নানান স্বাদের দেশি মাছ তখন পাওয়া যায় খুব সহজেই।
শরতের উচ্ছ্বল ও প্রাণবন্ত পরিবেশ প্রকৃতিকে করে তোলে অসম্ভব সুন্দর। এর পর হেমন্তের আগমনী বার্তা জানিয়ে আশ্বিনে বিদায় নেয় শরৎ। মনে মনে থেকে যায় শরতের কাশফুলের কথা, শেফালি ফুলের কথা।
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৫



