শের-ই-মহীশুর : টিপু সুলতান

0
3

সামনে ছবির মতো হেঁটে বেড়াচ্ছে! চোখে আর পলক পড়ে না। নিজের অজান্তেই চিৎকার করে উঠলো-
– ‘আব্বাজান! ওরা বাঘ’?
– ‘হ্যাঁ, শাহজাদা’!
– ‘কী ভয়ংকর’!
– ‘তুমি ঠিকই বলেছো, খুব ভয়ানক প্রাণী। তবে সাহসী মানুষরাও বাঘের মতোই। কখনো কোনো কিছুতেই ভয় পায় না’।
পিতার কথাগুলো ছেলেটির মনে সোনার মোহরের ছাপ এঁকে দিলো। ছোট্ট বুকের ভেতর যেন শুনতে পেলো অনেক বাঘের মিলিত গর্জন! ভয়ের বদলে তার মনে এলো ফুর্তি!
দূর থেকে রঙ-বেরঙের বাঘ-দলের হেলে দুলে চলা দেখে তাই তার আবদার-
– ‘আব্বাজান! আমি বাঘ পুষতে চাই’!
– ‘সাবাশ বেটা’! তিনি উৎসাহ দেন বন্ধুর মতো।
ছেলেটি পিতার মুখে সবসময় শুনেছে বাঘের নানা রকম গল্প। শিকারের গল্পগুলো টান টান উত্তেজনাময়। রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় ভরা সেসব কাহিনী মনে জাগায় বিষ্ময়। শুনে শুনেই বাঘ চিনে গেছে সে। তারও অনেক সাহস, একটুও ভয় পায় না। বাঘের মতোই তো সে হতে চায়। তাহলে ভয় পেলে চলবে কেন?
মহীশুরের নবাব হায়দার আলী শিকার খুব ভালোবাসেন। অনেকদিন পর তিনি বাঘ-শিকার অভিযানে বের হলেন। এবার বাঘ-প্রিয় ছোট ছেলেকেও নিয়ে এসেছেন শিকার অভিযানের সঙ্গী করে।
নবাবজাদার ফরমায়েশ! তক্ষুণি লোক ছুটলো বাঘের বাচ্চার খোঁজে। ছেলেটি উপহার পেলো দুটি বাঘ-শিশু। তার আনন্দ দেখে কে! সেই থেকে তার বাঘ-প্রীতি আরও বেড়ে গেল। বাঘই হলো তার প্রিয় সঙ্গী, খেলার সাথী। তাদের যত্ন নিতে মোটেও ভোলে না। ভয়ানক বাঘকে ভালোবেসে ‘শের ই মহীশুর’ উপাধি পাওয়া বিখ্যাত ছেলেটির নামই ‘টিপু সুলতান’।
টিপু সুলতানের জন্ম হয় ১৭৫০ সালের নভেম্বর মাসের ২০ তারিখে। মা ‘কাডাপ্পা’ প্রদেশের গভর্নর মইনুদ্দীন খাঁ’র কন্যা ফখারুন্নিসা। তিনি এক কামেল দরবেশের নামে ছেলের নাম রাখেন ‘টিপু’। মহিশূরের কানাড়ি ভাষায় টিপু শব্দের অর্থ ‘বাঘ’। দাদার নাম ফতেহ আলী’র সাথে মিলিয়ে রাখা হয় ‘ফতেহ আলী টিপু’। নামের মতোই ‘বাঘ’ তার আজন্ম সাথী হয়ে গেল।
বড় হলে টিপুকে এ রাজ্যের রাজা হতে হবে। সেজন্যে চাই সব ধরনের শিক্ষা, সাহস আর বুদ্ধি। সে তো জন্মেছেই অসাধারণ বুদ্ধি আর সাহস নিয়ে। তার শিক্ষার দিকে ছিল পিতার কড়া নজর। চার বছর বয়স হতেই ‘বিসমিল্লাহ খানী’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দাওয়াত দেয়া হয় রাজ্যের সকল জ্ঞানী-গুণিজনকে। শ্রেষ্ঠ ওস্তাদদের হাতে টিপুকে দেয়া হলো শিক্ষার সবক।
আরবি, ফার্সি ভাষা, অংক, সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল, স্বাস্থ্য, সমাজ-রাজনীতিসহ অনেক বিষয়ে টিপুকে পড়তে হতো। সেইসঙ্গে চলে ঘোড়ায় চড়া, শিকার করা, তরবারী চালনা, রাজকীয় আদব কায়দা শেখা ইত্যাদি। টিপু মাতৃভাষা ছাড়াও বেশ ক’টি ভাষা শেখে।
প্রাসাদ থেকে অনেক দূরে লশকরী ময়দান- যেখানে পল্টনরা কুচকাওয়াজ করে। তারই পাশে থাকে পিলখানা আর ঘোড়াশাল। ফৌজি প্রহরীরা তাদের পাহারা দেয়। কিন্তু টিপুর শখ রাজবাড়িতেই বাঘ পোষার! টিপুর আবদার পিতা ফেলতে পারেন না। পিতার অনুমতি পেয়ে খুশিতে মাতোয়ারা। প্রাসাদ চত্বরে পড়লো বাঘের আস্তানা। প্রাসাদের কাছেই বাস করতে লাগলো কয়েকটি বাঘ! প্রিয় বন্ধুদের সাথে পাল্লা দিয়ে টিপু নিজের পোশাকের রঙও পাল্টে ফেললো! বানালো হলুদ আর কালো রঙের ডোরা কাটা পোশাক। বাঘের রঙে চিত্রিত সে পোশাক পরেই সে ঘুরে বেড়াতো। আচমকা লোকেরা দেখে চমকে যেতো।
টিপু তার পিতাকে ভীষণ ভালোবাসতো। পিতার নির্দেশনা মেনেই চলতো। পিতার পছন্দই তার পছন্দ। বীর হায়দার আলী এদেশ দখলকারী ইংরেজদের মোটেও পছন্দ করতেন না। এরা যেমন মিথ্যাবাদী, তেমনি লোভী, প্রতারক। পিতার অনুসারী টিপুও এদেশ দখলকারীদের ঘৃণা করতো। দেশকে তাদের হাত থেকে মুক্ত করার শপথ নেয়। দিনে দিনে টিপু মহাবীর হয়ে ওঠে। মাত্র সতেরো বছর বয়সেই পিতা তাকে যুদ্ধের মতো কঠিন কাজ শিখতে পাঠান। টিপুর বাঘের মতো ক্ষিপ্র গতি, দুর্জয় সাহস, অসাধারণ বুদ্ধি আর নিত্য-নতুন কলা-কৌশল দেখে শত্রুরা হতবাক হয়ে যেতো!
১৭৮২ সালে হঠাৎ তাঁর পিতা হায়দার আলী অসুস্থ হয়ে পড়েন। যুদ্ধের ময়দানেই তিনি ইন্তেকাল করেন। ভালো করে শোক প্রকাশও করতে পারলো না টিপু। ফিরে যেতে হলো যুদ্ধের ময়দানে। জীবন-মরণ লড়াই চলছিলো তখন ইংরেজদের সাথে।
যুদ্ধ শেষে বিজয়ীর বেশে ১৭৮২ সালের ২২ডিসেম্বর মহীশুরের সিংহাসনে বসেন পিতার সুযোগ্য ছেলে ফতেহ আলী টিপু। তখন থেকেই পরিচিতি পান ‘টিপু সুলতান’ নামে। টিপু তার সিংহাসন সাজিয়ে নেন তার প্রিয় শখ- বাঘের আকার দিয়ে। রাজ্যের শ্রেষ্ঠ কারিগররা কাঠের ফ্রেমে স্বর্ণ-রত্ন মিশিয়ে বানিয়ে দিলো আসনের মাঝে বাঘের মূর্তি আর চারপাশে দশটি বাঘের মাথা! ডোরাকাটা এ ‘বাঘের আসনে’ বসেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়তেন টিপু সুলতান। বলতেন, ‘শেয়ালের মতো ২০০ বছর বাঁচার চেয়ে বাঘের মতো দু’দিন বেঁচে থাকা উত্তম’!
টিপুর উদ্ভাবনী ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। রাজ্য শাসন, মুদ্রা তৈরি, ভূমি জরিপ, রেশম শিল্প ইত্যাদি বিষয়ে আনেন নতুনত্ব।
একবার হেক্টর মুনরো নামে এক ইংরেজ ছেলে বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে গেল সুন্দরবন। সেখানে সাগরের দ্বীপে যায় শিকারে। ওমনি বিরাট এক বাঘ এসে তাকে সাবাড় করে ফেলে। এ সংবাদ শুনে টিপুর মাথায় এক বুদ্ধি এলো। কারিগরদের ডেকে বানালেন অদ্ভুত এক খেলনা। দম দিয়ে ছেড়ে দিলে খেলনার অর্গান পাইপ থেকে ভয়ংকর বাঘের গর্জন, সেই সাথে গোঙানির আওয়াজ শোনা যায়। ক্লকওয়ার্ক সিস্টেম বসিয়ে বানানো এ খেলনা ‘টিপু’জ টাইগার’ নামে জনপ্রিয় হয়। টিপু’জ টাইগার বানানোর কারণ ছিলো ইংরেজদের প্রতি রাগ ও ঘৃণা। বৃটিশ মিউজিয়ামে আজও রয়েছে খেলনাটির একটি নমুনা।
পৃথিবীর প্রথম ‘রকেট আর্টিলারি’ টিপুই তৈরি করেন। টিপু সুলতান রকেট গবেষণার জন্য শ্রীরঙ্গপাটনা, বাঙ্গালোর, বিজানুর ও চিত্রদুর্গায় নির্মাণ করেছিলেন গবেষণাগার। মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র ‘নাসা’য় রয়েছে টিপু সুলতানের ভাস্কর্য। সেখানে মহীশুরের সেনাবাহিনীর রকেট হামলায় নাকাল ব্রিটিশ সৈন্যদের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ভারতে টিপুর পিতা হায়দার আলীই প্রথম বারুদ দিয়ে বানানো রকেট চালু করেন। টিপু গবেষণা করে এটিকে আরও উন্নত রূপ দেন। মহীশুর সেনাবাহিনীতে ছিল একদল ‘রকেট সেনা’ । ১৭৮০ সালের পল্লীলুরের যুদ্ধে ‘রকেট সৈন্য’দের আঘাতেই ব্রিটিশ সৈন্যরা নাস্তানাবুদ হয়েছিল। টিপুর সাথে যুদ্ধ চলার সময় ইংরেজ সেনাপতি ওয়েলেসলি ছিলেন শ্রীরঙ্গপাটনায়। হঠাৎ কাছেই একটি রকেট বিষ্ফোরিত হলে আতঙ্কে চিৎকার করে পালিয়ে যান। কারণ, ইংরেজরা তখনও রকেটের ব্যবহার জানতো না। বুদ্ধিমান টিপু সুলতান বুঝতে পারেন ইংরেজদের সাথে টিকে থাকতে নতুন কিছু উদ্ভাবনের বিকল্প নেই। এ তাড়না থেকেই রকেট উন্নয়ন নিয়ে তাদের গবেষণায় জোর দেন তিনি।
ইংরেজরা বুঝতে পারলো টিপুর সাথে যুদ্ধ করে তারা ঠিক টিকতে পারছে না। তাই টিপুর দরবারের লোকদেরকে যে কোনো উপায়ে নিজেদের পক্ষে নেয়ার চক্রান্ত করে। মহীশূরের সেনাপতি মীর সাদেককে মীর জাফরের মতোই ইংরেজরা প্রচুর মুদ্রায় কিনে ফেলে। এই বিশ্বাসঘাতক লোভী লোকটি ইংরেজদের পথ দেখিয়ে লুকিয়ে নিয়ে আসে প্রাসাদের ভেতর। সেনাপতি হিসেবে সবকিছুই তার জানা। কয়েকজন ইংরেজ সেনাকে প্রাসাদের মসজিদের কাছে নিয়ে যায়। টিপু সেখানেই নামাজ পড়ছিলেন। খবর পেয়ে টিপু সুলতান লাফ দিয়ে তার প্রিয় ঘোড়া ‘তাউস’র পিঠে চড়ে একাই তলোয়ার হাতে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত বীরের মতোই লড়াই করেন তিনি।
১৭৯৯ সালে ৪ই মে ‘মহীশূরের বাঘ’ বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে নিভে যায় ভারতবর্ষের স্বাধীনতার শেষ জ্বলন্ত সূর্য।
টিপুর মৃত্যুর পর ইংরেজরা বাঘ আসন, তরবারি, রাজ পরিবারের সমস্ত সম্পদ ও কয়েক হাজার ‘মাইসোরিয়ান রকেট’ ইংল্যান্ডে নিয়ে যায়। সেখানে তারা টিপুর রকেটের ওপর আরও গবেষণা করে উন্নততর রূপ দান করে।
শহীদ বীর টিপু সুলতান সবার হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। বিশ্বের বীরদের সাথে, শ্রদ্ধার সাথে আছে অবিষ্মরণীয় বীরের নাম- টিপু সুলতান। কর্ণাটকের মানুষের মনে তিনি চির মহান এক মানুষের নাম। দেশের ভালোবাসার নায়ক। দেশের মান বাঁচাতে জীবন দান করা টিপু সুলতানের জীবন থেকেই তারা শেখে। মহীশূরের বাঘের মতোই সবার মনে বেঁচে থাকবেন ‘শের-ই-মহীশূর’।

প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৫