সুরমা, কুশিয়ারা, যমুনা, গোয়াই নদীর স্বচ্ছ পাানিতে প্লাবিত শ্রীময় ভূমির নাম সিলেট। অনেকে তাকে বলেন শ্রীহট্ট। সবুজ টিলা আর শ্যামল বর্ণের মাঝখানে ভারি সুন্দর জায়গা সিলেট। একদিকে ঝাউগাছের পাতায় বাতাসের মর্মর ধ্বনি, আরেক দিকে নির্জন দুপুরে পায়রাদের নিঃশব্দ ওড়াউড়ি, অন্যদিকে দুটি পাতা একটি কুঁড়ির চা বাগানে খাসিয়া মেয়েদের টুকরি ভরে চা পাতা সংগ্রহ দেখে মনে হয়, আল্লাহ বুঝি অনেক মমতা, অনেক যত্ন নিয়ে রঙিন তুলিতে এঁকেছেন এই অঞ্চলকে। খরস্রোতা পাহাড়ী নদী, আর কূলকিনারাহীন হাওর এর আরেক সৌন্দর্য। স্ফটিক স্বচ্ছ পানিতে দরিয়ার মতো ঢেউ জাগানো হাওর, তার বুকে অজানা গন্তব্যের দিকে আপন মনে নৌকা বাইতে বাইতে কিশোর মাঝির কণ্ঠ গেয়ে ওঠে, ছাড়িলাম হাসনের নাওরে।
এই হাসনের নাম তোমরা নিশ্চয়ই শুনেছ। যাকে আমরা মরমী কবি হাসন রাজা নামে জানি। এই হাসন রাজার এক নাতির কথাই আজ বলবো তোমাদের। হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, করিমগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট সদর এই পাঁচটি জেলাই এক সময় ছিল মহকুমা। আর এই পাঁচটি মহকুমা নিয়ে এক সময় ছিল সিলেট জেলা। সুনামগঞ্জের এক নিভৃত পল্লী গ্রাম তেঘরিয়া। এই তেঘরিয়া গ্রামে নানা মরমী কবি হাসন রাজার বাড়িতেই জ্যোৎস্নায় আলোকিত রাতে চাঁদের মতো ফুটফুটে একটি শিশু জন্ম নেয়। সেদিনটি ছিল ১৯০৬ খ্রিাষ্টব্দের ২৫শে অক্টোবর, ৯ই কার্তিক শুক্রবার। তাঁর পিতার নাম দেওয়ান মোহাম্মদ আসফ। তিনি ছিলেন দুহালিয়ার জমিদার। আর মাতার নাম বেগম রওশন হোসেন বানু। শিশুটির নাম রাখা হলো দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ এই নামটি আমাদের সবারই পরিচিত। তিনি আমাদের দেশেরই একজন মনীষী ছিলেন। তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রাম বাংলার আলো-ছায়ায়। যদিও তিনি জমিদার পরিবারের সন্তান ছিলেন। তবুও গরিব প্রজাদের দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে পারতেন না। তখন থেকেই তিনি দেখেছেন গ্রামের মুসলমান সমাজের দুরবস্থা। তা শুধু ভাত-কাপড় আর চিকিৎসার অভাবই নয়- তার চেয়েও বড় ছিল অস্তিত্ব ও মান-সম্মান নিয়ে টিকে থাকার প্রশ্ন। কৃষক-মজুর প্রায় সকলেই সে সময় ছিল মুসলমান। তাদের অবস্থা ছিল খুব খারাপ। জমিদার-জোতদাররা শিক্ষা ও সম্পদে ছিল অগ্রগণ্য। আর এই জমিদার-জোতদারদের হাতেই নানাভাবে অত্যাচারিত হতো গ্রামের দরিদ্র কৃষককুল ও দিনমজুর। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ শৈশবকাল থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন মুসলমান সমাজকে বাঁচাতে হলে চাই শিক্ষার আলো। শৈশবের সেই উপলব্ধিই ক্রমে ক্রমে তাঁকে কর্মবীর ও সাহিত্য সাধক করে তুলেছিল। আজীবন তিনি ক্লান্তিহীন কাজের মধ্যে ডুবে ছিলেন। তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্যই ছিল মানুষের কল্যাণ সাধন করা। মায়ের নয়নের মণি আজরফের লেখাপড়া শুরু হলো বংশের রীতি অনুযায়ী। মৌলবি সাহেবের কাছে তিনি কুরআন শরিফ ও বোগদাদি ধারণা ও পণ্ডিত মশাইয়ের কাছ থেকে বাংলা ব্যাকরণ পাঠ নেন। ছেলেবেলায় অপর দশটি বালকের সঙ্গে মেতে থাকতেন তিনি। অবসর সময়ে হাওরের অতল পানি আর আকাশের সীমাহীন নীলের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। দেখতেন সাদা বলাকার ঝাঁক আকাশে উড়ে যাচ্ছে। দেখেন বিলের পানি আলো করে ফুটে আছে লাল শাপলা। ১৯১৩ সালে মাত্র সাত বছর বয়সে আজরফকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হলো, তিনি সুনামগঞ্জ জুবিলী হাইস্কুল থেকে ফার্সী বিষয়ে লেটার মার্কসহ প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপর ভর্তি হন মুরারী চাঁদ কলেজে। এই কলেজ থেকে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ লাভ করেন। ১৯৩০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে ডিস্টিংশনসহ বিএ এবং ১৯৩২ সালে দর্শন শাস্ত্রে এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ সিলেটের গোলাপগঞ্জ মোহাম্মদ চৌধুরী একাডেমীতে প্রধান শিক্ষকের পদে যোগদানের মাধ্যমে শুরু করেন তার কর্মজীবন। পরবর্তীতে তিনি সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। এক সময় তিনি সুনামগঞ্জ কলেজে যোগদান করেন। এই কলেজেই পরবর্তীতে তিনি ভাইস প্রিন্সিপাল হন, এর মাঝে তিনি নরসিংদী কলেজ ও মতলব কলেজের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে তিনি ১৯৮০ সাল পর্যন্ত আবুজর গিফারী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সাল থেকে ৮৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন, পরে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এবার তা হলে আমরা এ মহান লোকটির সাহিত্য জীবন সম্পর্কে কিছু জানার চেষ্টা করি। ১৯১৮ সালে তিনি প্রথম গল্প লিখেন। আর এ গল্পটির শিরোনাম কি ছিল জানো? ‘শিয়াল মামা’। এই ‘শিয়াল মামা’ গল্প লেখার মাধ্যমেই তিনি সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশ করেন। তাঁর প্রথম কবিতার নাম ছিল ‘যাত্রী’। এই কবিতাটি ১৯২৫ সালে মুরারী চাঁদ কলেজের একটি ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ সর্বসাকুল্যে ১০৭টি গল্প লিখেন। গল্পগ্রন্থ, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থসহ তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা পঞ্চাশাধিক। বাংলা ও ইংরেজিতে তাঁর রচনার অধিকাংশ প্রবন্ধ। তোমরা তো ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে সবাই জানো। দেওয়ান আজরফ একজন ভাষা ˆসনিক ছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি আসাম আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সাল থেকে ইন্তেকাল পূর্ব পর্যন্ত তমদ্দুন মজলিসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ বহু সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন এবং সব প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি তাঁর জীবনে বহু সম্মান ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার, বাংলা একাডেমি ফেলো নির্বাচিত, নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক, মুসলিম ওয়েলফেয়ার মিশন পুরস্কার, অতীশ দিপঙ্কর পুরস্কার, আকরম খাঁ স্বর্ণপদক, জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার স্বর্ণপদক, ড. মো. শহীদুল্লাহ& স্বর্ণপদক, আহসান উল্লাহ স্বর্ণপদক, জালালাবাদ যুব ফোরাম পুরস্কার, বাংলা সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, একুশে পদক, জগদীশ চন্দ্র বসু পুরস্কার, মঙ্গল সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় অধ্যাপকসহ অগণিত পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ছিলেন আমায়িক, শান্ত, ভদ্র ও সদালাপী মানুষ। তিনি বড়দের যেমন আনন্দ দিতে পারতেন, তেমনি তোমাদের মতো ছোট্ট বন্ধুদেরকেও অতি সহজে আপন করে নিতে পারতেন। ধর্মের ব্যাপারে আজরফ ছিলেন নিবেদিত। নিজের ধর্ম ইসললাম সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান থেকেই তিনি লাভ করেছিলেন একটি স্বচ্ছ সুন্দর ধারণা। আল্লাহর নির্দেশ ও রসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের মাধ্যমেই তিনি দেখেছেন শান্তি, সমৃদ্ধি ও মুক্তির পথ। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের শৈশব, কৈশোর কেটেছে গ্রামে। গ্রামের মুক্ত পরিবেশে মুক্ত মন নিয়ে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। গ্রামের সাধারণ মানুষের সংগে মিশেছেন অবাধে। তাঁর সেই মেলা-মেশায় কোন সংকোচ অথবা দ্বিধা ছিল না। গ্রাম বাংলার নদী-নালায়, গাছপালা, পাখ-পাখালি অবারিত মাঠ প্রান্তর তাঁর শিশু মনে যতখানি রেখাপাত করেছিল তার চাইতে অনেক বেশী রেখাপাত করেছিল গ্রামবাংলার সরল ও দরিদ্র জন সাধারণ। দেওয়ান আজরফ তাঁর সাহিত্য কর্মে ও তার জীবনের বিশাল কর্মকাণ্ডে তাঁর প্রমাণ রেখে গেছেন। ১৯৯৯ সালের ১ নভেম্বর ঢাকা হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে এই বড় মানুষটি ইন্তেকাল করেন।
প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৫



