‘সাবধান!
আস্তে আস্তে পা দিতে হবে। জায়গাটা ভীষণ পিচ্ছিল, যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।’ রাফিকে সতর্ক করলো অনিক। কিন্তু বলটা কোথাও দেখা যাচ্ছে না!

‘কী ব্যাপার! বলটা কি হাওয়ায় মিশে গেল নাকি?’ অবাক হয়ে বললো রাফি।
অনিক উত্তর দিলো, ‘সত্যি তো, আস্ত একটা ফুটবল এভাবে হারিয়ে যাবে? দেখ, ভালো করে খুঁজে দেখ। নিশ্চয়ই কোনো ডালপালার ভেতর ঢুকে আছে।’
মাঠ থেকে আসিফ, নাহিদ, রাহীম ও মুন্না হট্টগোল শুরু করে দিলো ‘কী ব্যাপার? বল খুঁজতে এতক্ষণ লাগে? সন্ধ্যা হয়ে এলো, আর কতক্ষণ লাগবে?’
অনিক যখন জানালো যে বলটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন সবার চোখ কপালে উঠলো। সবাই রাফি ও অনিকের দিকে তাকিয়ে রইলো। এই নিয়ে দুটি বল উধাও হলো! বলগুলো কোথায় হারিয়ে যায়, এটা ভেবে সবার মনেই ভয় কাজ করা শুরু করলো।
গ্রামটির নাম অতলপুর। আধুনিকতার ছোঁয়া সবখানে থাকলেও এই গ্রামে তা নেই বললেই চলে। গ্রামের লোকজন অতি সহজ-সরল। সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথেই এখানে ঘোর অন্ধকার নেমে আসে, রাতে মানুষের আনাগোনা থাকে না। টানা তিন দিন মুষলধারে বৃষ্টির পর চারদিকে এখন বর্ষার পানি। হঠাৎ একদিন অতলপুর বাজারের প্রায় দশটি সোনার দোকানে একসাথে ডাকাতি হলো। প্রায় লক্ষাধিক টাকার স্বর্ণ নিয়ে গেল ডাকাতরা। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। ঠিক সাত দিন পর বাকি দোকানগুলো থেকেও মালামাল চুরি হলো, যার মধ্যে একটি ছিল অনিকের বাবার দোকান!
খবরটা শুনে অনিক জেদ ধরল, ‘না, এমনটা আর হতে দেওয়া যাবে না। কিছু একটা করতেই হবে।’
রাফি ভয় পেয়ে বললো, ‘আমরা কী করতে পারবো? ডাকাত দেখলেই তো আমার ভয় লাগে, আমি ওসবে জড়াব না।’
অনিক অভয় দিয়ে বললো, ‘এখন দোকানে চুরি করছে, কয়েক দিন পর বাড়িতে হানা দেবে। তুই শুধু আমার সাথে থাকবি, তোকে কিছু করতে হবে না।’
রাফি অনিচ্ছাসত্ত্বেও সায় দিলো। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা ঠিক করলো আজ রাতে তারা ঘুমাবে না। এই রহস্যের ভেদ করতেই হবে। সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথেই তারা বেরিয়ে পড়লো। আজকের রাতটা অন্য রাতের চেয়ে আলাদা পরিষ্কার চাঁদনি রাত। তারা দুজন প্রথমে সেই চুরি হওয়া বাজারে গেল। পুরো বাজারে সুনসান নীরবতা। মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে! বাজারের পাশে মস্ত বড় এক বটগাছের আড়ালে তারা দুজন ওত পেতে বসে রইলো। অনিক গভীর দৃষ্টিতে দোকানের দিকে তাকিয়ে আছে, আর রাফি কিছুটা ভয় নিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। হঠাৎ রাফির নজরে এলো সামনের জঙ্গলটায় কে যেন হাঁটছে!
সে ফিসফিস করে বললো, ‘অনিক, কেউ যেন আমাদের ফলো করছে! আমার খুব ভয় লাগছে।’
অনিক বললো, ‘শান্ত থাক, কিছু হবে না।’
তারা সাবধানে জঙ্গলের দিকে এগোতেই দেখলো, কেউ একজন তাদের চোখে টর্চের আলো ফেলে দৌড়ে পালাচ্ছে। তারাও পিছু নিলো। কিছুদূর যাওয়ার পর অনিক লক্ষ করলো, সামনে একটা ছেলে দৌড়াচ্ছে। তার গায়ে থাকা জার্সিটা অনিকের খুব চেনা মনে হলো। একটু ভাবতেই মনে পড়লো এটি পাশের গ্রামের বিজয়পুর ইউনাইটেড ক্লাবের জার্সি! জার্সি নম্বর ফাইভ, নাম রাহীম।
অনিক স্তব্ধ হয়ে গেল। তারই সহপাঠী রাহীম এখানে কী করছে? অনিক চিৎকার করে বললো, ‘রাহীম! আমি অনিক। পালাচ্ছিস কেন? দাঁড়া!’
রাহীম থমকে দাঁড়লো। রাহীম পড়াশোনার পাশাপাশি একটি গোয়েন্দা দলের লিডার, তবে সেই পরিচয়টা অনিক ছাড়া আর কেউ জানতো না। তারা দুজনে মিলে আগেও অনেক রহস্যের জট খুলেছে। হাঁপাতে হাঁপাতে রাহীম জিজ্ঞেস করলো, ‘এত রাতে তোরা এখানে কেন?’
অনিক পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘তোরই বা এখানে কী কাজ?’
রাহীম বললো, ‘দূর থেকে তোদের চিনতে পারিনি, তাই লুকিয়ে যাচ্ছিলাম। সাথে কে?’
অনিক জানালো এটি রাফি। রাফি ততক্ষণে ভয়ে আধমরা হয়ে তাদের কাছে পৌঁছালো।
রাহীম গম্ভীর হয়ে বললো, ‘জানিস অনিক, আমাদের গ্রাম থেকে এই নিয়ে ৭ জন কিশোর নিখোঁজ হয়েছে। আমি তাদের সন্ধানেই এখানে এসেছি। আমার মনে হচ্ছে, তোদের গ্রামের চুরি আর আমাদের গ্রামের কিশোর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে একই চক্র কাজ করছে।’
এমন কথা শুনে অনিক অবাক হয়ে গেল। ঠিক তখন রাফি বললো, ‘আমি একটা জিনিস দেখেছি, জলদি আমার সাথে চল!’
অনিক ও রাহীম বললো কী দেখেছিস, বল এখুনি। রাফি বললো, ‘আমার সাথে চল না বটগাছটার পাশে নিজেরাই দেখতে পাবি!’
তারা বটগাছ থেকে প্রায় ৪০ কদম দূরে ঝোপঝাড়ের আড়ালে একটি সুড়ঙ্গ দেখতে পেল। সুড়ঙ্গটি গাছের পাতা ও ম্যানহোলের ঢাকনা দিয়ে খুব চতুরভাবে ঢাকা ছিল। অনিক রাফিকে পাহারায় রেখে রাহীমকে নিয়ে সুড়ঙ্গের ভেতর ঢুকলো। ভেতরে গিয়ে দেখলো এক বিশাল পথ। সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় পৌঁছাতেই তারা হারিয়ে যাওয়া সেই ফুটবল দুটি দেখতে পেল।
আরও কিছুটা এগোতেই তারা দেখলো, তাদের খেলার মাঠের পাশের জঙ্গলে পৌঁছে গেছে তারা। জঙ্গলের ভিতর একদল সশস্ত্র ডাকাত ঘাঁটি গেড়েছে। পাশেই সেই নিখোঁজ ৭ জন কিশোরকে হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এক কোণে পড়ে আছে বস্তাভর্তি চুরি হওয়া স্বর্ণালংকার।
ডাকাতদের কাছে আধুনিক অস্ত্র দেখে অনিক চিন্তায় পড়ে গেল। সে রাহীমকে ফিসফিস করে বললো, ‘এখন কী করবো? আমাদের কাছে তো কিছুই নেই।’
রাহীম মুচকি হেসে বললো, ‘দেখ আমি কী করি।’
তারা সাবধানে সুড়ঙ্গ দিয়ে কিছুটা পিছিয়ে এলো এরপর রাহীম তার পকেট থেকে একটি ওয়াকিটকি বের করে তার দলকে সব জানালো।
মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে সেখানে পুলিশ ও গোয়েন্দা দল হাজির হলো। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ডাকাতরা গুলি চালাতে শুরু করলো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা হার মানলো। পুলিশ ডাকাতদের আটক করলো এবং নিখোঁজ কিশোরদের সাথে সব স্বর্ণালংকার উদ্ধার করলো। এভাবেই অনিক, রাহীম ও রাফির সাহসিকতায় অতলপুরের এক বিশাল রহস্যের অবসান হলো।
প্রকাশকাল : আগস্ট ২০২৬



