দুনিয়ার সেরা খাবার

0
0

অনেক অনেক দিন আগের কথা।
সারা দুনিয়াতে একজনই রাজা ছিলেন সেই সময়।
তার নাম ওবাটালা। অনেক বয়স হয়েছে তার। রাজত্ব করতে করতে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। আগের মতো আর পারেন না। কখন কী হয়ে যায়, কেউ বলতে পারে না।
ভাবলেন, যোগ্য ও বুদ্ধিমান একজন উত্তরাধিকারী ঠিক করা লাগে। যে ঠিকমতো দুনিয়া চালাতে পারবে। কিন্তু সমস্যা হলো, কে হবে সেই যোগ্য লোক? কীভাবে তা ঠিক করা যায়? সেজন্য একটা উপায় বের করা দরকার। দিনরাত এখন শুধু এটিই তার চিন্তা।
রাজা ওবাটালার একজন সহকারী আছে। নাম তার ওরুলা। বয়সে তরুণ। বেশ চটপটে। বেশ কাজের এই স্মার্ট তরুণটি। বয়স কম বলে অভিজ্ঞতাও কম ওর। কোনোভাবে সে কি হতে পারে সিংহাসনের উপযুক্ত উত্তরাধিকারী? এ নিয়ে দ্বিধা আছে। রাজা শিওর নন। প্রশ্ন উঁকি দেয় মনে, ওকে দিয়ে ঠিকঠাকমতো কাজ হবে তো? ওর কথাই তিনি ভাবলেন সবার আগে। তবে নিশ্চিত হতে হবে। বুদ্ধিশুদ্ধি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেমন সেটা পরখ করে নিতে হবে।
অনেক ভাবনা চিন্তা করার পর উপায় একটা পাওয়া গেল। তিনি একদিন ওরুলাকে ডাকলেন। বললেন,
এক কাজ করো বাছা। আমার জন্য দুনিয়ার সেরা খাদ্য তুমি রান্না করো। একইসঙ্গে আরেকটা জিনিস রান্না করবে। সেটা হলো দুনিয়ার সবচাইতে খারাপ খাবার। এখনি যাও, কাজে লেগে পড়ো। আজই করতে হবে এই কাজটা।

০২.
ওরুলা তখনি বাজারে চলে গেল। কী কী জিনিস পাওয়া যাচ্ছে, গভীর মনোযোগে দেখল। সময় নিয়ে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। হ্যাঁ, নানা ধরনের জিনিস রয়েছে। অদ্ভুত, বিচিত্র সব খাদ্য। রসালো সব উপকরণ। যা দিয়ে মজার মজার খাবার রান্না করা যায়। কোনটা ছেড়ে কোনটা নেওয়া যায়? মহা ফাঁপরে পড়ে গেল ওরুলা। দুর্লভ ও দামি কিছু জিনিসও পাওয়া যাচ্ছে আজ। যেমন পাহাড়ি ছাগলের মগজ, সামুদ্রিক মাছ, মুখরোচক মাশরুম ইত্যাদি।
নাহ। এসব কোনোটাতেই চলবে না। সবার সেরা জিনিসটা চাই। কী কঠিন পরীক্ষায় যে পড়েছি। ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করুন। আকুল হয়ে মনে মনে প্রার্থনা করে ওরুলা। অনেক মাথা ঘামাতে হলো। শেষ পর্যন্ত সে কিনলো গরুর জিভ। খসখসে, রাবারের মতো।
প্রাসাদে ফিরে শুরু করলো রান্নার তোড়জোড়। আলু, গাজর দিয়ে রাঁধলো গরুর জিভ। স্বাদ বাড়ানোর জন্য সুগন্ধি এক ধরনের সস দিলো। বাহ। মনমতো হয়েছে। তৈরি হলো চমৎকার মুখরোচক একটা ডিশ। দারুণ সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
রাজা ওবাটালাকে পরিবেশন করলো সেই নতুন স্বাদের ডিশ। অদ্ভুত এক রেসিপি এটার। অনেক মাথা খাটিয়ে বের করা হয়েছে নতুন টাইপের এই রেসিপি। সময় লেগেছে অনেক। তা লাগুক। পরীক্ষায় পাশ করতে পারলে সব পরিশ্রম সার্থক হবে।

রাজা পরম তৃপ্তি নিয়ে খেলেন। খিদে পেয়েছিল খুব। অমৃতের মতো লাগলো নতুন ধরনের এই খাদ্য। ওরুলাকে জিজ্ঞেস করলেন,
বেশ ভালো রেঁধেছো বাপু। তা একটা কথা তোমাকে শুধাই। দুনিয়াতে এত কিছু থাকতে গরুর জিভের দিকে গেলে কেন তুমি? আরো আরো চমৎকার সুখাদ্য তো ছিল। বলি, রহস্যটা কী?
ওরুলা সবিনয়ে নিবেদন করে,
মহামান্য রাজা। গরুর জিভ আমি বেছে যে নিয়েছি, তার গূঢ় কারণ আছে। জিভ হচ্ছে দুনিয়ার সবচাইতে শক্তিশালী অঙ্গ। ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করে জিভ। সুসংবাদের ঘোষণা দেয়। মানুষকে সহজ সরল পথে চলবার নির্দেশনাও দেয়। কোনো জিভ কোনো দেশের মানুষের মধ্যে আস্থা বিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে। সমৃদ্ধিও নিয়ে আসতে পারে। আবার বিপরীতে দেখুন, এই জিভ দিয়েই মিথ্যা কথা বলা হয়। মানুষকে বিভ্রান্ত করার ব্যাপারেও জিভের ভূমিকাই বেশি। সুতরাং জিভ দিয়ে রান্না করা খাবার সেই বিবেচনায় সবচাইতে খারাপ খাদ্য।
এমন দামি কথা শুনে রাজা খুশিতে হাততালি দিলেন। তার আশেপাশে যারা ছিল, তারাও এতে যোগ দিলো। রাজার দেখাদেখি তারাও করলো এই কাজটা।

তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে রাজা বললেন, তোমার কথা ঠিক। শতভাগ সত্য। তুমিই হবে আমার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। আমার মৃত্যুর পর দুনিয়া তুমি চালাবে। তোমার বিচক্ষণতায় আমি মুগ্ধ।

প্রকাশকাল: নভেম্বর ২০২৪