অহংকারী চিলের শিক্ষা

0
0

পাকুড়গাছটাতে কী এমন হট্টগোল লেগে গেল কিছুই বুঝতে পারছে না শালিকটা। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। সেই কখন সূর্য উঠে সূর্যের তেজ এখন অনেক বেড়ে গেছে। এখন পর্যন্ত বাচ্চাদের খাবার জোগাড় করতে পারল না।
গত রাতে পাশের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানের লাইটিং আর মিউজিকের বিকট শব্দে রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। তাই ঘুম থেকে উঠতে দেরি। ক্ষুধার্ত ছানাদের কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙে। উড়ে একটু দূরের মাঠ থেকে নরম পোকা মাকড় আনতে হবে বাচ্চাদের জন্য। যাওয়ার পথে পাকুড়গাছে হট্টগোল দেখে থামে শালিক। কাউকে যে কিছু জিজ্ঞেস করবে, সে সুযোগ নেই। সবাই যে যার মতো চেঁচামেচি চিল্লাচিল্লি করছে। ইচ্ছামতো মনের ক্ষোভ ঝাড়ছে। অপেক্ষাকৃত একটা উঁচু ডালে বসে আছে একটি চিল ও একটি সারস। শালিক পাখি ঘটনা বোঝার চেষ্টা করে। কথোপকথনের দু’একটা বাক্য কানে আসতেই বুঝতে পারে ব্যাপারটা এ গাছে বসবাস নিয়ে। তার কৌতূহল আরো বেড়ে যায়। কারণ আগামী সপ্তাহখানেক পরেই তাকে বসবাসের নতুন জায়গায় যেতে হবে। বেশ বড় আর ঝোপডাল বলে আগে থেকেই এ গাছটার কথা ভেবে রেখেছিল শালিক। এখন যে গাছে বাস করছে, বাসা বানিয়ে ডিম পেড়ে বাচ্চা হয়েছে সেটি কিছুদিনের মধ্যেই কেটে ফেলা হবে। জমির মালিক সেখানে মার্কেট তৈরি করবে।

হাত জোড়ের মতো দুটি পাখা এক করে কাঠঠোকরা পাখি বলল, দয়া করে সবাই চুপ কর। এভাবে সবাই এক সাথে হইচই করলে কিছু সমাধান হবে? এক এক করে কথা বলতে হবে। তার কথায় সবাই থামল। আমরা এতদিন বিভিন্ন গাছে বসবাস করতাম। কিন্তু দিন দিন মানুষ গাছ কেটে ফেলছে। গত দশ বছর আগে আশে পাশে অনেক গাছ ছিল। শেষ হতে হতে এই এলাকায় এখন মাত্র তিন চারটা গাছ আছে। তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড় ও নিরাপদ গাছ। আমরা বসবাস করা তো দূরের কথা, এ গাছে বসলেই এ বজ্জাত চিল আমাদের ওপর চড়াও হয়। ধাওয়া করে। যেন তার বাপের কেনা সম্পদ! তাই আজ আমরা সব পাখি এক হয়েছি। এর একটা বিহিত চাই।
এক টানে বলে গেল অপেক্ষাকৃত বয়সে তরুণ দোয়েল পাখি।
হ্যাঁ হ্যাঁ আমরা এর বিহিত চাই! এ গাছ কারো একার না। এখানে থাকার অধিকার ছোট বড় সবার আছে। দোয়েলের সাথে সুর মিলাল চড়ুই।

গাছ কারো একার না,
হিংসা ছেড়ে চলে যা।

ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকে অন্য পাখিরাও।দয়া করে সবাই থামো থামো বলে স্লোগান থামিয়ে সবার চেয়ে বয়সে সিনিয়র সারস পাখি বলল, এ বিষয়ে চিল তোমার কী কথা আছে বলো। চিলের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে, বেচারা চাপে পড়ে খানিকটা নরম হয়ে গেছে মনে হয়। নিচু সুরে চিল বলল, আসলে আমি দীর্ঘদিন ধরে এ গাছে বসবাস করে আসছি। তাই আমার অধিকার বেশি। আচ্ছা ঠিক আছে সবাই এ গাছে বসবাস করতে পারো। তবে আমার কিছু শর্ত আছে। যেমন- খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলে গাছের ডাল নোংরা করা যাবে না। রাতের অন্ধকার শুুরুর আগে অর্থাৎ সন্ধ্যার আগেই গাছে ফিরে আসতে হবে। বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ার পর বাচ্চা বড় হলে বাসা ভেঙে খড় কুটা, ডাল পালা ইত্যাদি সবাই নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার করবে।
চিলের কথায় অন্য পাখিদের তেমন জোড়ালো আপত্তি না থাকায় সেদিন থেকে গাছটিতে পাখিদের বসবাস শুরু হলো।
চাপের মুখে অন্য পাখিদের বসবাস করতে দিতে রাজি হলেও বদ মনের চিল মনে মনে অন্য পাখিদের মোটেই মেনে নিতে পারছে না। তাই কয়েকদিন যেতে না যেতেই ছোটখাটো নানা বিষয়ে সবার সাথে খটর মটর শুরু করে দিলো।
কথায় আছে না—

ইল্লত যায় না ধুলে
স্বভাব যায় না মলে।

পান থেকে চুন খসলেই চিলের সে কী চোখ রাঙানী! অন্য পাখিদের ভাড়াটিয়া মনে করে অহংকারী বাড়িওয়ালার মতো আচরণ করতে থাকে। বাড়িওয়ালা ভাব ধরে রাখার জন্য খাবারের প্রয়োজন ছাড়া গাছ থেকে বাইরে তেমন একটা যায় না। গেলেও খুব দ্রুত চলে আসে। আজ চড়ুই পাখি চেঁচামেচি করেছে। কাল শালিক পাখির বাসা থেকে ডিমের খোসা পড়েছে। পরশু কাক নোংরা জিনিস এনে পরিবেশ নষ্ট করেছে। এভাবে একটা না একটা অভিযোগ আর তা নিয়ে মোড়লিপনা চলতে থাকে নিয়মিত। আজকের গুরুতর অভিযোগ, দুপুরবেলা কাঠঠোকরা পাখির ঠোঁট দিয়ে কাঠ ঠোকরানোর আওয়াজে নাকি চিলের ঘুমে ডিস্টার্ব হয়েছে। বল তো দুপুরবেলা কি পাখিদের ঘুমানোর সময়?

আসল কথা হলো গায়ে পড়ে ঝগড়া। সব পাখির সাথেই গায়ে পড়ে ঝগড়া করে। খারাপ ব্যবহার করে চিল। চেহারাটা গম্ভীর করে একটা ভাব নিয়ে থাকে সবসময়। তাকে কেউ পছন্দ করে না। চিলের আচরণে অতিষ্ট। অশান্তিতে আছে এ গাছে বসবাসকারী সব পাখি। তারা এক জোট হয়ে ভাবছে কীভাবে বদ চিলকে একটা উচিত শিক্ষা দেয়া যায়।
একদিন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা প্রায়। প্রতিদিন এসময় অন্য পাখিরা যে যার মতো গাছে ফিরে আসে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। রাতের আঁধার নেমে আসার বেশ আগেই সবাই ফিরে আসলো। কিন্তু গাছটা আজকে কেমন যেন নীরব। চিলের কোনো সারা শব্দ নেই। কী ব্যাপার কী হলো চিলের! সত্যি সত্যিই তো গাছে চিল নেই। সবাই মিলে পুরো গাছে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও চিলকে কোথাও পাওয়া গেল না।
কোনো বিপদ হলো না তো! চলো সবাই মিলে আশেপাশে খুঁজে দেখি। সারসের কথা শুনে শ্যামা পাখি বলল, এই বজ্জাত চিল আমগোরে বহুত জ্বালাইছে। বিপদে পরুক, নইলে মরুক। আমরা কেন তারে বাঁচাইতে যামু?
শ্যামা পাখির কথা শেষ হতে না হতেই কাক বলল, দেখ চিল আমাদের সাথে যা করেছে, তার ফল সে পাবে। এখন তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হয়তো কোনো বিপদে পরেছে। আমাদের উচিত তাকে খুঁজে বের করা। কোনো বিপদে পড়লে উদ্ধার করা।
কাকের কথায় দোয়েল, শালিক, চড়ুই, টুনটুনি, শ্যামা, কোকিল, হলুদিয়া পাখি সমস্বরে বলে উঠল, হ্যাঁ হ্যাঁ চলো আগে সবাই চিলকে খুঁজি!
তোমরা গেলে যাও। আমি নাই। এই চিল আমারে অনেক কষ্ট দিয়েছে। সব ভুলে আমি এত উদার হইতে পারুম না। অভিমানী কাঠঠোকরা পাখির কথা শুনে সারস তাকে বোঝায়। সারসের কথায় মত পরিবর্তন করে কাঠঠোকরা বলে, চলো তাহলে চিল কোথায় আছে খুঁজি।
বয়সে বুদ্ধিতে সবার চেয়ে বেশি উপযুক্ত হওয়ায় সারসকে নেতা বানিয়ে তার নেতৃত্বে সবাই চিলকে খোঁজ করতে বেরিয়ে পড়ল। পূর্বে দিঘির পাড় পশ্চিমে চিতাখোলা উত্তরে পালমহল পর্র্যন্ত সম্ভাব্য প্রতিটি জায়গায় খোঁজা শেষ। চিলকে কোথাও পাওয়া গেল না। সবাই খুব ক্লান্ত। এদিকে সন্ধ্যার আবছা আলো শেষ হয়ে অন্ধকারও ঘনিয়ে এলো প্রায়। আরেকটু অন্ধকার হলেই চোখে দেখা যাবে না। চিলকে খুঁজে পাওয়া তো দূরের কথা; নিজেরা ফিরে যেতেই সমস্যায় পরে যাবে। তাই একটু জিড়ানোর ইচ্ছা মনে আসলেও মুখে বলছে না কেউ।
দক্ষিণ দিকটাই শুধু বাকি আছে। চলো দক্ষিণের দরগাতলা পর্যন্ত সবাই ভালো করে খুঁজি। বলেই শোঁওও করে দক্ষিণদিকে উড়াল দিলো সারস। তাকে অনুসরণ করল অন্য পাখিরাও। যেতে যেতে দরগাতলার কাছাকাছি কুয়ার পাড় অতিক্রম করার পর কোকিল বলল, কুয়ার পাড়ের ওখানে আমি কিছু একটা আওয়াজ শুনতে পেয়েছি।

চলো সবাই সেদিকে গিয়ে ভালো করে দেখি বলেই সারস গতি পরিবর্তন করে পেছনের দিকে রওনা দিলো। সাথে অন্যরাও। কুয়ার পাড়ে একটি তালগাছের কাছে পৌঁছতেই চিঁ… চিঁ… জোরে জোরে আওয়াজ শোনা গেল। চিলের আওয়াজ। কাছে গিয়ে দেখা গেল চিলটি কীসের সাথে যেন তালগাছে আটকে আছে। ছোটার জন্য প্রাণপণে জাপটাজাপটি করছে। আর তার পাশেই আধাছেঁড়া একটি সবুজ রঙের ঘুড়ি তাল পাতার সাথে আটকে দোল খাচ্ছে। কারো বুঝতে বাকি রইলো না। চিল ঘুড়ির সুতার সাথে বেকায়দায় পেঁচিয়ে আটকে গেছে।
এদিকে গোল গোল চোখের পেঁচাও এসে সবার সাথে যোগ দিলো। বাসায় গিয়ে ছানার কাছে আধো আধো বোলে ঘটনা শুনতে পেয়ে সেও খুঁজতে বের হয়েছিল। অনেক খোঁজার পর সবাইকে পেয়েছে।
সবাইকে দেখে চিলের মনে বাঁচার আশা জেগে উঠল। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে চিল বলল, ভাগ্যিস তোমরা এসেছ। আরেকটু হলে তো হার্ট ফেল করে মারাই যেতাম। ভাই দয়া করে তোমরা আমাকে বাঁচাও!

চিন্তা করো না। তোমার কিচ্ছু হবে না। যে করেই হোক আমরা তোমাকে মুক্ত করবোই। বলেই সারস মাথাটা ডানে বামে কাত করে দেখার চেষ্টা করে চিলের গায়ে কোথায় কোথায় সুতার প্যাঁচ লেগেছে। কিন্তু আবছা আলোতে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। পাশে থেকে জোনাকি পোকা সব ঘটনা দেখে সাহায্য করতে এগিয়ে আসলো। জোনাকির মিটিমিটি আলোতে স্পষ্ট দেখা গেল চিলের হাঁটু, কোমর, পাখনা তিন জায়গায় ঘুড়ির সুতা প্যাঁচিয়েছে। ছেলেরা ঘুড়ি কাটাকাটি করার জন্য সুতায় মাঞ্জা দিয়ে নিয়েছে। তাই সুতা খুব পোক্ত ও ধারালো হয়েছে।
সারস বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে। কাঠঠোকরাও চেষ্টা করে। কিন্তু দুজনই সুতার প্যাঁচ ছাড়াতে ব্যর্থ হয়। বাবুইপাখি সুযোগ পেয়ে ফোঁড়ন কেটে বলে, কুঠার দিয়ে লাকড়ি চিড়ানো যায়। কিন্তু সেলাই কাজে সুঁই লাগে। বলেই বাবুই এগিয়ে গিয়ে জোনাকির আবছা আলোয় চিকন ঠোঁট দিয়ে টেনে টেনে এক এক করে সুতার সব কয়টা গিঁট খুলে ফেলল।
সারাদিন সুতার বাঁধন খোলার জন্য ঝাপটাঝাপটি করতে করতে চিল খুবই দুর্বল হয়ে গেছে। থরথর করে পুরো শরীর কাঁপছে। পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। পানকৌড়ি এক উড়ালে কুয়া থেকে একটা শামুকের ভিতর থাকা পানিসহ শামুক খেতে দিলো চিলকে। খেয়ে মোটামুটি পিপাসা মিটলো। শরীরে একটু শক্তি পেলো।
চিলের শরীরের কাঁপুনিও কমে গেল। কিন্তু দু’চোখ দিয়ে টলটল করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।

ভারী গলায় কৃতজ্ঞতার সুরে চিল বলল, তোমাদের সাথে এতদিন আমি কত খারাপ ব্যবহার করেছি। আর আজ সবাই আমাকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে এলে! বলেই আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল চিল। সে তার ভুল বুঝতে পারল।
আচ্ছা হলো তো! আর কাঁদতে হবে না। এখন অন্ধকার হয়ে গেছে। ঠিকভাবে চোখে দেখা যাচ্ছে না। কীভাবে ফিরে যাওয়া যায়, সবাই সে ভাবনা ভাবো।
পেঁচা বলল, চিন্তা করো না। আজকে ভরা পূর্ণিমা। কিছুক্ষণের মধ্যেই চাঁদের আলো নেমে আসবে। তাছাড়া রাতে আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। তোমরা শুধু আমাকে অনুসরণ করে এগিয়ে যাবে।

কিছুক্ষণ পর জোসনার আলো নেমে এলো। পেঁচা সামনে আর তার পেছনে পেছনে চিলসহ সব পাখি উড়াল দিলো। সবার পেছনে পড়ে রইল উঁচু তালগাছটা। তালগাছের পাতার ফাঁকে উঁকি দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ধবধবে গোল চাঁদ।

প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৪