গ্রামটির এক দিকে ছোট্ট পাহাড়। অন্যদিকে বয়ে চলা নদী। নদীটির ঠিক কিনারেই বাড়িটি। বাড়ি তো নয়, কুঁড়েঘর। বড় একটি বৃক্ষ, অনেক লতাগুল্ম ও ঝোঁপঝাড়ের মাঝে কুঁড়েঘরটি রাতের ভূতুড়ে ছায়ার মতো দেখায়। আবছায়া অন্ধকারে সহজে চোখে পড়ে না কারো। কিন্তু লোকটির চোখে ঠিকই পড়লো। সে হেঁটে হেঁটে কুঁড়েঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়।
নিজের বাড়ি, নিজের ঘর। তবুও চোরের মতো চুপি চুপি দরজা খোলে সে। তারপর ঘরে ঢোকে। ভেতরটা অন্ধকার। এক কোণে একটি তেলের কুপি। টিপটিপ করে জ্বলছে। কুপির আলো-আঁধারিতে সে দেখতে পেলো, তার স্ত্রী ঘরের এক কোণে কাত হয়ে শুয়ে আছে। পাশেই মরার মতো ঘুমিয়ে আছে তার তিন তিনটি সন্তান। ঈষৎ অন্ধকারে ঘুমন্ত শিশুসন্তানদের দিকে চোখ পড়তেই লোকটির বুক হাহাকার করে ওঠে। আহ্হারে! আজও না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ওরা। হু হু করে কেঁদে ওঠে বাবার বুক।
“কোনো কাজের সন্ধান হলো?” স্ত্রীর কথায় চমক ভাঙে তার। বলে, “না, ক্যামনিক শহরের অলিতে গলিতে সারাদিন ঘুরে বেড়ালাম। কোথাও কোনো কাজ মিললো না।”
স্ত্রী একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার চোখ বুজে থাকে।
লোকটির নাম পোহারভ মিরু। বয়স তিরিশের কোটায়। সে এবার পরনের কাপড় বদলিয়ে ঘরের অন্যপ্রান্তে গিয়ে শুয়ে পড়ে। নিভু নিভু বাতিটি নিভিয়ে দেয় সে। জীবনের দুঃখ-কষ্ট থেকে অন্ধকারে নিজেকে কিছুটা আড়াল করার চেষ্টা।
ক্ষুধার্ত পেটে ঘুম নেই তারও। সারাদিন কাজের সন্ধানে হেঁটে বেড়িয়েছে। কিন্তু কাজ পায়নি কোথাও। বিছানায় শুয়ে সে চোখ বুজে পড়ে থাকে। অন্ধকারে নিজের জন্য আলাদা এক জগৎ সৃষ্টি হয় তখন। সেটা কল্পনার জগৎ। সেই জগতে নিজের মতো করে সুখ তৈরি করে নেয়া যায়। বুকের ভিতরের কষ্ট কিছুটা কমে। সেই চেষ্টাই সে করছে এখন।
শুয়ে শুয়ে অন্ধকারে সে যেন ঈশ্বরকে খুঁজে পায়। তার কাছে প্রার্থনা করার এক সুযোগ হয় যেন তার। কল্পনায় নিজের দু’খানি হাত উঁচু করে ধরে। তারপর বলে, “হে ঈশ্বর, আমাকে জীবিকার একটি উপায় বের করে দাও হে। না হয়, মৃত্যু দাও আমাকে। নিজের চোখের সামনে সন্তানদের ক্ষুধার এই যন্ত্রণা আর সইতে পারি না আমি। হে প্রভু, বেঁচে থাকার কোনো সাধ নেই আর। আমায় মৃত্যু দাও।”
এমনি এক করুণ প্রার্থনার অতলে ডুবে যায় পোহারভ মিরু। তারপর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে। আর ওই রাতেই দেখে স্বপ্নটা।
তাকে কে যেন বলছে, “সকালে তুমি যখন ঘুম থেকে উঠবে, তোমার বালিশের নিচে হাত রাখবে। সেখানে তিনটি জিনিস পাবে তুমি। একটি আরশি, একটি রঙিন রুমাল এবং একটি নকশিকাটা নেকাব। জিনিস তিনটি তোমার জামার পকেটে লুকিয়ে রেখে চুপি চুপি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়বে। তোমার বাড়ির পাশ দিয়ে যে নদীটি বয়ে গেছে, সেখানে চলে আসবে ভোরে। তারপর সোজা নদীটির কোল ঘেঁষে চলে যাওয়া পথটি ধরে হাঁটতে থাকবে উত্তরে। হেঁটে হেঁটে চলে যাবে তুমি পাহাড়ের কাছে। কাউকে কিচ্ছু বলবে না। মুখে টু শব্দটিও উচ্চারণ করবে না তুমি, খবরদার।
পাহাড়ের কাছে এসে দেখবে একটি ঝরনা। ওপর থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে নিচে নেমে এসেছে ঝরনাটি। তারপর মিশে গেছে একটি নীল পানির সরোবরে। ওই সরোবরের পাশেই তুমি দেখতে পাবে মেয়েটিকে। একটি সাদা পাথরের ওপর বসে থাকবে সে। পরমা সুন্দরী মেয়েটি সরোবরে গোসল করার জন্য বসে থাকবে। কিন্তু কাউকে সঙ্গী পাচ্ছে না। তাই অপেক্ষা করছে। তোমাকে দেখেই সে কাছে ডাকবে। বলবে, তোমার জন্যই বসে আছি, হে যুবক। চলো গোসল করি এই নীল জলের সরোবরে।
কিন্তু সাবধান! তার কথার কোনো উত্তর দেবে না। মুখে একটি শব্দও উচ্চারণ করবে না তুমি। কথা বলেছো কী বিপদ ডেকে এনেছো। কথা বললেই মন্ত্রতাড়িত হয়ে পড়বে তুমি। তখন আর নিজের ইচ্ছায় কিছুই করতে পারবে না। একেবারে অনুগত হয়ে যাবে তার। চিরকাল তার দাস হয়ে থাকতে হবে। তোমার নিজস্ব শক্তি বলে আর কিছুই থাকবে না তখন। আর তুমি যদি কথা না বলো, তা হলে মেয়েটি অবাক হবে। অপমানিতও হবে খানিকটা।
সে তখন একটি সোনার চিরুণী বাড়িয়ে দেবে তোমার দিকে। বলবে, গোসল করবে না? আচ্ছা নাও। এই চিরুণী দিয়ে চুলগুলো আমার বেণী করে দাও। তুমি তখন হাত বাড়িয়ে চিরুণীটি নেবে এবং কোনো কথা না বলেই তার চুলগুলো বেণী করে দিতে থাকবে।
আসলে সেই পরমা সুন্দরী কোনো মনুষ্য রমনী নয়। সে হলো ড্রাগন কন্যা ‘মুরিয়া মিজ’। তার জিহ্বায় আগুন জ্বলে। চোখে জ্বলে অগ্নিবাণ। একবার সুযোগ পেলে তোমাকে সে চোখের বাণে বিদ্ধ করে মেরে ফেলবে। তারপর তার জিহ্বার আগুনে জ্বালিয়ে রান্না করে খাবে তোমাকে। খবরদার! তুমি কোথায় থাকো, কোথা থেকে এসেছো, কী করো এসব কোনো কিছুই বলবে না। সেই ড্রাগন কন্যা তোমার মুখ থেকে কথা বের করতে না পারলে তার জিহবা কিংবা তার চোখ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
তার কথা মতো তুমি ড্রাগন কন্যার মাথার চুলগুলো প্রথমে বিলি কেটে দিবে। চিরুণী দিয়ে আঁচড়িয়ে দিবে। আর তখনই তুমি দেখতে পাবে সেই চুলের গোছা! তুমি অবাক হয়ে দেখবে, তার মাথায় এ যেন ভিন্ন রকমের এক গোছা চুল। পতেং ঘুড়ির সুতার মতো মোটা, কাচের মতো স্বচ্ছ, কিন্তু রক্তের মতো লাল। ওই চুলের গায়ে তুমি তোমার নিজের প্রতিচ্ছবিও দেখতে পাবে। তুমি তখন তার অজান্তে তোমার হাতের তর্জনিতে সেই চুলটি পেঁচিয়ে ধরবে। তারপর এক ঝাটকা টানে চুলটিকে তুলে নিয়ে দিবে দৌড়।
সেই আগের পথ ধরেই ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে থাকবে তুমি। ড্রাগন কন্যা মুরিয়া মিজ যখন বুঝতে পারবে, তার অমূল্য সম্পদ লাল চুলের গোছা লুট হয়ে গেছে, তখন সে পিছু নেবে তোমার। দৌড়াতে থাকবে তোমার পিছে। তুমি মরণপণ ছুটতে থাকবে। কিছুতেই যেন ধরতে না পারে তোমায়। মনে রেখো, ড্রাগন কন্যা সে। দৌড়ে তার সাথে পেরে ওঠা ভার। তাই যখনই সে তোমাকে ধরে ফেলতে যাচ্ছে বলে মনে হবে, তখনি তুমি প্রথমে নকশিকাটা নেকাবটি ফেলে দেবে পথে। ড্রাগন কন্যা নেকাবটি তুলে নিতে গিয়ে কিছুটা পেছনে পড়বে। সেই ফাঁকে তুমি এগিয়ে যেতে পারবে আরো খানিকটা পথ।
আবার যখন তোমাকে ধরে ফেলার মতো কাছে চলে আসবে সে, তখন তুমি রঙিন রুমালটি ফেলে দেবে পথে। রুমালটি তুলে নিতে গিয়ে আবারও কিছুটা পিছে পড়ে যাবে সে। এরপরের বার তোমাকে ধরার উপক্রম হলে পথে ফেলে দেবে তোমার আরশিটি। এইভাবে তৃতীয়বারের মতো তাকে কিছুটা পেছনে ফেলে দিতে পারলে, তুমি চলে আসতে পারবে তোমার গাঁয়ের কাছে পাহাড়ের ঢালে। তখন বিপদসীমার বাইরে চলে আসবে তুমি। কারণ, ওই পাহাড় পর্যন্তই মেয়েটির চলার সীমা। এরপরে সে আর এগুতে পারবে না তোমাকে ধরার জন্য।
এবার তুমি মুক্ত। চুলের গোছা লুকিয়ে রাখবে তোমার জামার পকেটে। তারপর চলে যাবে ক্যামনিক শহরে। সেখানে চুলের বাজারে নিলামে ওঠাবে তোমার চুল। উপযুক্ত মূল্য পাবে তুমি। রাতারাতি অনেক টাকার মালিক হয়ে যাবে।”
স্বপ্ন শেষ হতেই ঘুম ভাঙে পোহারভ মিরুর। রাত তখনো পোহায়নি। অন্ধকারে সে বালিশের নিচে হাত রাখে এবং অবাক হয়। সত্যিই তো! স্বপ্নে দেখা সেই তিনটি জিনিস- একটি আরশি, একটি রুমাল ও একটি নকশিকাটা নেকাব পড়ে আছে বালিশের নিচে। খুবই আশ্চর্য হয় সে। মনে মনে ভাবে, সত্যিই কি এটা স্বপ্ন? নাকি অন্যকিছু। স্বপ্নে দেখা জিনিসগুলোই তো পেলাম এখানে। এ যে স্বপ্ন নয়, বাস্তব। পোহারভ মিরু উঠে বসে। জিনিস তিনটি সে লুকিয়ে রাখে তার জামার পকেটে। তারপর ভোর না হতেই বেরিয়ে পড়ে স্বপ্নের ঠিকানায়।
নদীর পাড় ঘেঁষে পথটি। সোজা চলে গেছে উত্তরে ওই পাহাড়ের কোলে। ওইখানে রয়েছে নীল পানির সরোবর। সেই সরোবরেই দেখা হবে পরমা এক সুন্দরীর সাথে। পোহারভ মিরু মনে মনে ভাবছে, গিয়ে দেখিই না। কী যে লেখা আছে কপালে আমার।
নদী পাড়ের পথ ধরে পোহারভ মিরু হাঁটছে। হাঁটছে তো হাঁটছেই। ওই তো পাহাড়টি। কাছাকাছি মনে হলেও সে যে আরো অনেক দূর। কিন্তু হাঁটায় ক্লান্তি নেই তার। হেঁটে হেঁটে অবশেষে পৌঁছে যায় সে নীল পানির সরোবরের কাছে। সেখানে গিয়ে দেখে, সত্যিই তো! এক অনন্যা সুন্দরী কন্যা বসে আছে সাদা এক পাথরের ওপর। সকালের হালকা রোদের আলোয় মেঘের মতো জমাট বেঁধে আছে তার চুলের খোঁপা।
পোহারভ মিরু কাছে যেতেই মেয়েটি বলে, শুভ সকাল, হে যুবক। তোমার নাম কী? কোত্থেকে এসেছো এখানে?
পোহারভ মিরু কোনো উত্তর দেয় না। সে আরও একটু কাছে এগিয়ে যায় মেয়েটির। ড্রাগন কন্যা বলে, চলো হে যুবক, নীল পানির সরোবরে গোসল করি দু’জন।
এবারও চুপ পোহারভ মিরু। স্বপ্নের কথা মনে আছে তার। কোনো কথা বলা যাবে না। বললেই জাদুগ্রস্ত হয়ে পড়বে সে।
মেয়েটি এবার একটি সোনার চিরুণী বাড়িয়ে দেয় যুবকটির দিকে। বলে, আচ্ছা নাও, আমার মাথার চুলগুলো বেণী করে দাও। গোসল না হয় পরেই হবে। নয় তো হবে না আজ।
পোহারভ মিরু এবার সোনার চিরুণীটি হাতে নেয়। তারপর তার মাথার চুলগুলো বেণী করার জন্য খোঁপা খুলে দেয়। কালো মেঘের মতো গড়িয়ে পড়ে চুলগুলো তার পিঠে। পোহারভ মিরু তার মাথায় চিরুণী চালাতে থাকে। আর খুঁজতে থাকে সেই কাঙ্ক্ষিত লাল চুলের গোছা। বেশিক্ষণ লাগেনি তার। চুলে চিরুণী চালাতে চালাতে এক সময় তার চোখে পড়ে সেই রক্তের মতো লাল চুল। পতেং ঘুড়ি ওড়ানো সুতার মতো মোটা সেই চুলের গোছা। অন্য চুলগুলো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এবার সে তার তর্জনিতে পেঁচিয়ে এক ঝটকা টানে তুলে নিয়ে আসে সেই চুল। এরপর দেয় ছুট। যুবকটির ঝটকা টানে চুল উঠে পড়ায় প্রচণ্ড ব্যথা পায় ড্রাগন কন্যা। সে যখন বুঝতে পারে এক অমূল্য সম্পদ নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে যুবকটি, তখনই সে পিছু নেয় তার। সেও দৌড়াতে থাকে যুবকটির পিছে।
কিছুটা পথ যেতে না যেতেই সে প্রায় ধরে ফেলার উপক্রম হয় যুবকটিকে। আর তখনই পোহারভ মিরু ফেলে দেয় তার নকশিকাটা নেকাবটি। ড্রাগন কন্যা পথে এমন সুন্দর একটি নেকাব দেখতে পেয়ে তুলে নেয় হাতে। এই ফাঁকে পোহারভ মিরু দৌড়ে আরো কিছুটা পথ এগিয়ে যায়। আবার ড্রাগন কন্যা দৌড়াতে থাকে পোহারভ মিরুর পিছে।
‘ড্রাগন কন্যা’ সে। গায়ে তার প্রচণ্ড তাগদ। দৌড়ে আবারও সে যুবকটিকে ধরে ফেলার উপক্রম হয়। আর তখনই পোহারভ মিরু ফেলে দেয় রঙিন রুমালটি। এমন ঝলমলে এক রুমাল দেখে ড্রাগন কন্যা আবারও থেমে যায়। তুলে নেয় সেটি হাতে। রুমালটি দেখে সে আরও অবাক হয়। এমন সুন্দর রুমাল! অবাক হয়ে রেখে দেয় সে রুমালটি নিজের কোমড়ে গুঁজে। ততক্ষণে পোহারভ মিরু আরো খানিকটা পথ এগিয়ে যাওয়ার সময় পায়।
ড্রাগন কন্যা দেখে যুবকটি তো চলেই যাচ্ছে। সে আবার ছুটে চলে তাকে ধরার জন্য। দৌড়ে দৌড়ে আবার তাকে ধরে ফেলার উপক্রম হয়। এবার পোহারভ মিরু পথে ফেলে দেয় তার স্বপ্নে পাওয়া শেষ বস্তুটি, সেই আরশিটি।
ড্রাগন কন্যা পথে আবার দেখতে পায় ঝলকানো কিছু একটা। চকচকে উজ্জ্বল কিছু একটা পড়ে আছে পথে। তাই, জিনিসটি তুলে নেয় সে হাতে। আরশির মতো এমন অবাক করা কোনো বস্তু ড্রাগন কন্যা আগে দেখেনি কখনো। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে বড়ই অবাক হয় সে। এতোকাল সরোবরের নীল পানিতেই শুধু নিজের চেহারা দেখেছে সে। আজ আয়নায় নিজের মুখের এমন পরিষ্কার ছবি দেখতে পেয়ে ভুলে যায় সব কিছু। অনেকক্ষণ সে চেয়ে থাকে আয়নায় নিজের ছবির দিকে। এক সময় সে ভুলে যায় যুবকটির কথা।
আবার যখন তার মনে পড়ে, তখন অনেকটা পথ পার হয়ে গেছে পোহারভ মিরু। পার হয়ে গেছে ড্রাগন কন্যার নাগালের প্রায় বাইরে।
বিপদসীমা পার হয়ে পোহারভ মিরু আকাশের দিকে তাকায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে ততক্ষণে। সে আর বাড়ি ফিরে যায় না। সোজা চলে যায় নিকটবর্তী ক্যামনিক শহরে।
সেখানে চুলের বাজারে নিলামে ওঠায় সে ঘুড়ির সুতার মতো মোটা লাল চুলের গোছা। এমন অপরূপ সুন্দর ও মোটা চুল দেখে অবাক হয় নিলামে আসা ক্রেতারা। অন্য কোনো চুলের সাথে এই চুলের মিল খুঁজে পায় না তারা। কোন্ কন্যার মাথার চুল গো এটি? সবার মনে এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খায়। এমন মোটা, এত লম্বা ও রক্তের মতো টকটকে লাল চুল গো! এমন চুল গো জীবনে দেখেনি কেউ।
এক মার্চেন্ট এসে দাম করে চুলের। তিনি বলেন, এক ডুকেট দেবো। এমন লাল রঙের চুল বলেই দামটা একটু বেশিই বললাম। (তখনকার যুগে স্লোভেনিয়ার স্বর্ণমুদ্রার নাম ছিল ডুকেট)
সেই মার্চেন্টের কথা শুনে অন্য মার্চেন্টরা ভাবলো, এই চুলের দাম হয়তো আরো অনেক বেশি। নিশ্চয়ই এই চুলের অন্যকোনো মাহাত্ম্য আছে। আছে কোনো জাদুর স্পর্শ। তাই আরেক মার্চেন্ট এগিয়ে এসে বললেন, তোমার এই চুলের গোছার দাম দেবো দশ ডুকেট। দিয়ে দাও আমাকে। আরেক মার্চেন্ট বললেন, বিশ ডুকেট দেবো দাম। আরেক মার্চেন্ট এসে বললেন, পঞ্চাশ ডুকেট দেবো তোমার এই চুলের দাম। এবার দিয়ে দাও আমাকে।
এভাবে ড্রাগন কন্যার মাথার ওই চুলের দাম একশো ডুকেটে গিয়ে দাঁড়ালো। তখন পোহারভ মিরুর কাছে মনে হলো, এই চুলের দাম আসলে কত, তা সে নিজেও তো জানে না। কত হলে চুলের সঠিক দাম পাবে সে। এক গোছা চুলের দাম একশ ডুকেট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পোহারভ মিরু চুল বিক্রি করছে না।
কানে কানে এমন খবর রটে গেল চারিদিকে। খবর চলে গেল তখনকার যুগের সম্রাট জারের কাছে। তিনি লাল চুলের ইতিহাস আগে থেকেই জানতেন। সেই চুলের কথা শুনে তিনি চমকে উঠলেন। ‘হ্যাঁ, এই চুলের গায়েই তো লেখা আছে রাশিয়ার প্রাগৈতিহাসিক যুগের অজানা কাহিনি!’
তিনি তখনই ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটলেন ক্যামনিক শহরের দিকে। চুলের নিলাম বাজারে এসে তিনি যুবকের কাছে এগিয়ে গেলেন। বললেন, “হে যুবক, তোমার নাম কী?”
“পোহারভ মিরু।”
“তুমি এই অদ্ভুত চুল কোথায় পেলে?”
পোহারভ মিরু তখন তার সমস্ত কাহিনি খুলে বলে জার সম্রাটের কাছে। সে এটাও জানায়, নিতান্তই গরিব সে। তাই তাকে স্বপ্নে আদিষ্ট করে সেই ড্রাগন কন্যার কাছে পাঠিয়েছেন স্বয়ং ঈশ্বর। তা না হলে, এই চুল সংগ্রহ করে আনা তার সাধ্যে ছিল না।
সম্রাট বললেন, “তুমি এক অসাধ্য সাধন করেছো হে যুবক। এই চুলের অভ্যন্তরে লুকিয়ে রয়েছে আমার পূর্বপুরুষদের ইতিহাস, তাদের বীরত্বের কাহিনি। তোমাকে আমি এই এক হাজার ডুকেট দিলাম। লাল চুলের গোছাটি তুমি আমাকে দিয়ে দাও। আমি জানি এই চুলের মাহাত্ম। আর মূল্য হিসেবে এক হাজার ডুকেট উপযুক্ত মূল্যই বটে। উপযুক্ত মূল্যেই আমি কিনে নেবো তোমার এই চুল। নিশ্চয়ই তোমারও দিন ফিরবে এবার। স্বচ্ছলতা ও সুখ ফিরে আসবে তোমার পরিবারে।
অবশেষে পোহারভ মিরু এক হাজার স্বর্ণমুদ্রায় বিক্রি করে দেয় ড্রাগন কন্যার মাথার চুল। বাড়ি ফেরার সময় স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য সে কিনে নিয়ে যায় অনেক অনেক সুস্বাদু খাবার ও দামি দামি পোশাক। পোহারভ মিরু ভাবছে, আহা! কতকাল আমার সন্তানেরা এমন খাবার মুখে দেয়নি। আজ অবশেষে পেট ভরে খাওয়াতে পারবো সবাইকে।
প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৪



