বন্ধুরা, আফ্রিকার কিছু অংশে আবার এমপক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। আর এ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ থেকে জরুরি জনস্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও। আগে এই রোগটি মাঙ্কিপক্স নামে পরিচিত ছিল। অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইতোমধ্যেই অন্তত ৪৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে ২০২২ সালে এমপক্সের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল।
এমপক্স গুটিবসন্তের একই গোত্রীয় ভাইরাস থেকে হলেও এটা সাধারণত অনেক কম ক্ষতিকারক। প্রথমে এটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু এখন এটি মানুষ থেকে মানুষেও ছড়ায়। এ রোগে আক্রান্তদের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, ফোলা, পিঠে এবং পেশিতে ব্যথা। আক্রান্ত ব্যক্তির একবার জ্বর উঠলে গায়ে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। সাধারণত মুখ থেকে শুরু হয়ে পরে হাতের তালু এবং পায়ের তলদেশসহ শরীরের অন্যান্য অংশে তা ছড়িয়ে পড়ে। অত্যন্ত চুলকানো বা ব্যথাদায়ক এই ফুসকুড়িগুলো পরিবর্তন হয় এবং বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে স্ক্যাব বা গোল গোল পুরু আস্তরে পরিণত হয়ে শেষে ঝরে পড়ে যায়। এর ফলে দাগ সৃষ্টি হতে পারে। সংক্রমণের ১৪ থেকে ২১ দিনের মধ্যে এটি নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যেতে পারে। তবে ছোট শিশুসহ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণীর জন্য কিছু ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত মারাত্মক। এর আক্রমণের কারণে গুরুতর ক্ষেত্রে মুখ ও চোখসহ পুরো শরীরে ক্ষত তৈরি হতে পারে।
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মতো পশ্চিম এবং মধ্য আফ্রিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বৃষ্টিবিধৌত জঙ্গল সমৃদ্ধ দেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এমপক্স সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই অঞ্চলগুলোতে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এতে আক্রান্ত হয় আর শত শত মানুষের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা। বর্তমানে অনেক দেশে বিভিন্ন প্রাদুর্ভাব একইসঙ্গে দেখা যাচ্ছে- বিশেষ করে কঙ্গো এবং এর প্রতিবেশী দেশগুলোতে। রোগটি সম্প্রতি বুরুন্ডি, রুয়ান্ডা, উগান্ডা এবং কেনিয়ায় দেখা গেছে যা সাধারণত সেখানে দেখা যায় না।
বন্ধুরা, মোটাদাগে এমপক্সের দু’টি ধরন রয়েছে : ক্লেড ১ (যা সাধারণত আরও গুরুতর হয়) এবং ক্লেড ২। ক্লেড ১ ভাইরাস কয়েক দশক ধরে কঙ্গোতে বিক্ষিপ্ত প্রাদুর্ভাবের কারণ ছিল এবং এখন ছড়িয়ে পড়া ধরনটিও এটি। ক্লেড ১ এর কিছু ধরনে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুরা বেশি আক্রান্ত হবার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত বছরে সংক্রমিত অনেকের তুলনামূলকভাবে নতুন ও আরও গুরুতর ধরনের এমপক্স ক্লেড ১বি হওয়ায় এ নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্লেড ১বি সম্পর্কে অনেক কিছু জানা বাকি। তবে ধারণা করা হচ্ছে এটি সম্ভবত আগের ধরনের চেয়ে আরও সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে, একইসঙ্গে আরও গুরুতর রোগের কারণ হতে পারে।
আফ্রিকা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বলছে ২০২৪ সালের শুরু থেকে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত সাড়ে ১৪ হাজারেরও বেশি মানুষ এমপক্সে আক্রান্ত হয়েছে আর এতে ৪৫০ এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে এমপক্সের মৃদু ধরন ক্লেড ২ এর কারণে জরুরি জনস্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছিল। এশিয়া এবং আফ্রিকার মতো যে দেশগুলোতে সাধারণত এই ভাইরাস দেখা যায় না এমন প্রায় ১০০টি দেশে এটি ছড়িয়ে পড়ে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ লোকদের টিকা দেওয়ার মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
বন্ধুরা, এমপক্সের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে আমাদের জানতে হবে রোগটি কীভাবে ছড়ায়? এমপক্স সংক্রমিত ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শ কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি এসে কথা বলা বা শ্বাস নেয়ার মতো ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে একজনের থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাসটি ফাটা চামড়া, শ্বাসতন্ত্র বা চোখ, নাক বা মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ভাইরাসে দূষিত হয়েছে এমন জিনিস যেমন বিছানা, পোশাক এবং তোয়ালে স্পর্শের মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে। বানর, ইঁদুর এবং কাঠবিড়ালির মতো কোনো প্রাণী যদি এতে সংক্রমিত হয় আর কেউ যদি ওই সংক্রমিত প্রাণীর সঙ্গে বেশি কাছাকাছি আসে তবে তিনি এতে আক্রান্ত হতে পারেন।
এমপক্স থেকে বাঁচতে হলে এই রোগে আক্রান্ত কারও সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়িয়ে চলতে হবে এবং ভাইরাসটি যদি তোমাদের আশেপাশের কারও থাকে, তবে সাবান ও পানি দিয়ে তোমাদের হাত পরিষ্কার করতে হবে। সব ক্ষত সেরে না যাওয়া পর্যন্ত এমপক্সে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা উচিত।
এমপক্সের কোনো টিকা আছে কি? এমপক্সের টিকা আছে, তবে যারা ঝুঁকিতে আছে বা সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকছে কেবল তারাই এটি পেতে পারে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, যাদের প্রয়োজন তাদের সবার কাছে টিকা পৌঁছাবার জন্য ডব্লিউএইচও’র পর্যাপ্ত তহবিল নেই। তাই বৈশ্বিক কোনো পদক্ষেপ ছাড়া বর্তমান প্রাদুর্ভাব মহাদেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার উদ্বেগ রয়েছে।
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৪



