‘শরতের আলোয় এই যে চেয়ে দেখি মনে হয় এ যেন আমার প্রথম দেখা।’ – রবী ঠাকুরের মতো আমিও বলি যেন চোখ মেলে দেখি প্রকৃতির রূপ। মনের মাধুরীতে সাজানো বাগানে আঁকা কোনো ছবি। জীবন্ত। প্রাণবন্ত। সৃষ্টির রহস্যের কোনো দরজা নেই। অবাক চেয়ে থাকা মনে ভাবি এতো রূপ কোথায় লুকানো থাকে। সময়ের পরিবর্তনে যা আমাদের প্রাণিত করে। নরম শরীরে স্নেহমুখ নিয়ে ধীর পায়ে হাজির হয়। সর্বাঙ্গে সুখের পরশ বুলিয়ে রাঙা হয়ে আসে। নামটি শরৎ। নামের মধ্যেও কেমন এক পুলক অনুভব হয়। কাউকে না বলে চুপিচুপি এসে পড়ে। মিষ্ট স্বভাব নিয়ে আসে। প্রলয়ের মাঝেও যে স্নিগ্ধতা আছে তা ছড়িয়ে দিতেই আসে এ ঋতু। আদিগন্ত সবুজের সমারোহে আসে শরৎ। ভাদ্র ও আশ্বিন এ দুই মাস শরতের যৌবন। শৈশবের দুরন্তপনার ঢেউ সামলেই যেমনটি আসে যৌবন তেমনি যেন শরতের আগমন। বর্ষার অবিরাম ঝরে পড়ায় ক্লান্ত না হয়ে মুচকি হাসি নিয়ে আকাশে মেঘরঙের বাহার সাজিয়ে শরৎ আসে জীবনকে নতুন রঙে রাঙাতে, নতুন অবয়বে সাজাতে।
সবাই আকাশ ছুঁঁতে চায়। চায় পাখির মতো উড়তে। আমিও যদি পাখি হতাম। ইশ! পাখির স্বাধীনতা মনকে চনমনে করে তোলে। শরৎ নিজেকে ছড়িয়ে দেয় আকাশে। অবিরাম ঝড়ো হাওয়ায় আকাশ বকসাদা হয়ে দেখা দেয়। সমস্তটা জুড়ে কেবলই শুভ্রতার পরশ মেশানো। বড় বড় শিমুল গাছের তুলা যখন জমিন ছুঁঁয়ে যায়, মনে হয় যেন ঢেউ খেলছে। তেমনি আকাশেও মেঘেদের লুকোচুরি প্রেমকে জাগ্রত করে। এক পাশ থেকে অন্য পাশ সমস্ত আকাশে থোকায় থোকায় জমে থাকা মেঘ তাদের রাজত্ব প্রকাশ করে। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়ানোই যেন তার কাজ। ছেঁড়া কম্বলের উড়ে উড়ে আসা মেঘ জমিন ছুঁয়ে যায়। মন চায় সেই মেঘের সাথে খেলতে। উড়তে। নিজেকে প্রকাশ করতে। এ এক অন্যরকম আনন্দ। প্রকৃতির সৌন্দর্য মনকে আন্দোলিত করে। বেঁচে থাকার সুখ অনুভূত হয়। কষ্ট, কত না পাওয়া যেন ফানুস হয়ে উড়ে যায় দিগন্তের নীলিমায়। কানে কানে এসে বলে দেখো শরৎ এসেছে লজ্জারাঙা হয়ে। অবিরাম বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে সব কালো রঙ। কেবলই এখন সাদার রাজত্ব। শরৎ এসে বলে দেখবে এসো কেমন করে আকাশ আজ সাদা মেঘের ভেলায় সেজেছে।
পৃথিবীর যত রঙ আছে সবই মুছে গিয়ে কেবলই শরতের আকাশে নীলের রাজত্ব। আকাশের বুকজুড়ে নীল কেবলই নীল। পাহাড়ের কোলঘেঁষে নীল আকাশ হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এতোটা সুন্দরে মিশ্রিত প্রকৃতির এই রঙ মনের সব কষ্টকে এনে সামনে রাখে। না বলা সব বলে যায়। মাঝেমাঝে মনে হয় আকাশও বুঝি লুকিয়ে পড়ে নীলের গভীরতায়। সমুদ্রের জলরাশিও নীলের রঙ-এ রাঙানো। উত্তাল ঢেউ যখন আছড়ে পড়ে পাড়ে তখন সাদা ফেনা আর নীল সমুদ্রের ঢেউ মিলেমিশে এক হয়ে নিজেকে প্রকাশ করে। প্রেমের স্বরূপ তুলে ধরে উজ্জ্বলতায়। জীবনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে। গাংচিল মেঘেরাও এ সময় সাগরে নেমে তাদের শীতল করে। সমুদ্রস্নানে নীলের উঠোনে উৎসবের আয়োজন চলে। উৎসাহী হাসি, শব্দহীন হাসির ফোয়ারা শরতের আকাশে জেগে ওঠে। শরতের এই উৎসব আরো নানা উপকরণ নিয়ে হাজির হয়।
বর্ষার স্রোত বহমান থাকে শরতের কোলজুড়ে। পালতোলা নৌকায় মাঝিদের ভাটিয়ালি গান জীবনকে আনন্দে ভরিয়ে তুলতো। স্বপ্নের মতো মায়াবী সেই দিনগুলি। আজ যদিও শরতের এই সময়ে সেইভাবে পালতোলা নৌকার দৃশ্য খুবই বিরল। চারিদিকে কেবলই শহরায়নের আয়োজন। কেবলই ছুটছে মানুষ। প্রাপ্তির পরিণয়ের সমাপ্তি কোথায় জানা নেই। তবুও মন বিষণ্ন হয়। ছুটে যেতে চাই অরণ্যে। চারিদিকের সবুজ বন যেন রূপে মাখামাখি। যাপিত জীবনের আয়োজনকে উপেক্ষা করে আজও স্রোতস্বিনী দুই কিনারায় সবুজের সমারোহে দূর হতে বহু দূরে বয়ে চলে। সীমানা খোঁজার তাড়া নেই কোনো।
শরৎ ঋতুর এক অনিন্দ্য সৌন্দর্যের নাম কাশফুল। এই কাশফুল বেড়ে ওঠে নদীর কিনারায়। কোথায় নেই এই কাশফুল। ফুল ভালোবাসে না এমন কেউ কি আছে পৃথিবীর বুকে? নেই বোধহয়। হেলেদুলে কাশফুল মাতোয়ারা করে তোলে প্রকৃতির কোল। বিকেল হলেই কাশফুলের মেলা বসে। ঢেউ খেলানো কাশফুলের সৌন্দর্য মাখতে সবাই যেন উৎসুক। শরতের এই সময়ে বিনোদনের একটি মাধ্যম হলো কাশফুল দেখতে যাওয়া। শরৎ তার বুকজুড়ে ফুলের রাজত্বে ভরিয়ে তোলে। শাপলা, শালুক, পদ্ম, জুঁই, কেয়া, শিউলি, জবা, কামিনী, মালতি, মল্লিকা, মাধবী, ছাতিম ফুল, বরই ফুল, দোলনচাঁপা, বেলি, জারুল, নয়নতারা, ঝিঙে, স্থলপদ্ম আরো কত ফুল। ফুল যেখানে প্রেম সেখানে। মানুষ স্বভাবতই ফুল ভালোবাসে। নদীর বুকজুড়ে রাজত্ব করে শাপলা-শালুক-পদ্ম। শুভ্র শাপলার হাসি হৃদয়কে উচ্ছ্বসিত করে। দূর থেকে মনে হয় ফুলের বিছানা। রাতের অন্ধকারে কামিনী, মালতী, মল্লিকা ফুলের সুবাসে মাতোয়ারা হয় মন। মিষ্টি গন্ধে ভরে ওঠে অন্ধকারের পাঠ। কবিরা কবিতা লিখেন। শরৎ নিয়ে তেমনই লিখেছেন কবি জাকির আবু জাফর-
‘তোমরা যারা রাত্রি ঠেলে ভোরকে আনো
বুকের কাছে নতুন দিনের আকাশ টানো।
শরৎ ঋতু ভেজায় তাকে কোমল জলে
মন ছুটে যায় আকাশ ভরা মেঘের দলে।
মেঘের বাড়ি কোন সুদূরে কোথায় জানি
কেমন করে মেঘের বুকে বৃষ্টি পানি
কেমন করে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরতে থাকে
হাতের মুঠোয় বন্দি করে রাখছি তাকে।’
অন্ধকার কেটে গিয়ে যখন পূব আকাশে উঁকি দেয় সূর্য সে সময়ের সৌন্দর্যের কোনো তুলনা হয় না। শরতের ভোর শিশিরে ভেজা স্নিগ্ধতা নিয়ে হাজির হয়। পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয় প্রকৃতি। নতুন কুঁড়ির রূপ অলীক সৌন্দর্যে দেহ-মন ও চোখ ভরিয়ে তোলে। কতরকম স্বপ্ন বোনে মন। স্বপ্নগুলো উড়তে থাকে। উড়তে উড়তে ছুটতে থাকে। দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছুটে চলে। কত প্রেম এসে ভীড় করে মনাকাশে। রাতভর ঝরে পড়া শিশিরে পা রাখলে শরীর চনমন হয়ে ওঠে। কোমল রোদের আনন্দে জ্বলে ওঠে শিশিরে ভেজা ঘাস। ঘাসের বুকে ছড়িয়ে থাকা শিউলি ফুল এক অন্যরকম সৌন্দর্যে মাতিয়ে তোলে চারপাশ। শরতের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন কবি কাজী নজরুল ইসলামও। তিনি প্রকৃতির সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে লিখেছেন,-
‘শিউলিতলায়
ভোরবেলায়
কুসুম কুড়ায় পল্লীবালা
শেফালি ফুলকে
ঝরে পড়ে মুখে
খোঁপাতে চিবুকে
আবেশ-উতলা।’
সূর্য যখন মাথার ওপর সে সময়টা আকাশ তার রূপ বদল করে। নীলিমার প্রান্ত ছুঁয়ে মালার মতো উড়ে উড়ে মেঘগুলো দূরে সরে যায়। আকাশজুড়ে নীল আর সাদা মেঘের খেলায় সবুজ মাঠের ওপর দিয়ে উড়ে যায় শালিক, ময়না, টিয়ের ঝাঁক। মাঠজুড়ে ফসলের উৎসবের দেখা মেলে। কৃষকের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। বর্ষার পানি সরে গিয়ে মাঠঘাট শুকিয়ে যায়। কৃষকেরা নতুন করে হেমন্তী ধানের চারা লাগাতে ব্যস্ত সময় পার করেন। সম্ভাবনার নতুন স্বপ্নে নতুন দিনের অপেক্ষায় দিনকাটে। সবুজ ফসলের আনন্দে কৃষক কৃষাণীর মন ভরে ওঠে। শরৎ ঋতু বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাইতো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেন,
‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি
ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি।’
প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে সবাই। প্রতিটি বাঙালির মনে বেজে ওঠে ছুটির বাঁশি। আকাশে-বাতাসে তার উদার মুক্তির আহবান। সময়টা বেড়ানোর জন্য ভীষণ আরামদায়ক। গরমও না আবার তেমন শীতও না। কেউ চায় পাহাড় দেখতে কেউ বা চায় সমুদ্র। প্রকৃতি নিজেকে প্রকাশ করে অবারিতভাবে। গ্রীষ্মের তাপদাহ হতে মুক্ত হয়ে মানুষ চায় স্বস্তিময় মুহূর্ত। গৃহবন্দি জীবনের ক্লান্তি ভুলতে মন ছুটে যায় দূর-দূরান্তে। এ সময় সৃষ্টির প্রতিটি প্রাণী ভালোবাসায় মেতে ওঠে। আকাশের নীলিমায়, দোয়েল-শ্যামার কলকণ্ঠ, ভ্রমরের গুঞ্জনে কেবলই উদাস হাতছানি দেয় ছুটির আমন্ত্রণে। এভাবেই সময় গড়িয়ে যায়। পার হয় বেলা। মন যেন গেয়ে ওঠে, ‘কী করি আজ ভেবে না পাই/ পথ হারিয়ে কোন বনে যাই।’
নিকষ কালো অন্ধকারে ডুবে যায় আলো ঝলমল দিনটি। স্নিগ্ধ আর কোমলতায় অপূর্ব রূপ নিয়ে আসে রাত। জোছনাধারায় মাখামাখি হয়ে ওঠে রাতের আকাশ। বাতাসের স্নিগ্ধতা মনকে প্রফুল্ল করে তোলে। জোছনার আলোতে শিশুদের খেলাধুলা নতুন রূপ পায় যেন। ভোরের ন্যায় আলোর কারণে ডেকে ওঠে কাক। এ সময় তালের পিঠা খুব প্রসিদ্ধ। এছাড়াও এ ঋতুতে আমলকী, জলপাই, বরই, করমচা, চালতা, ডেউয়া ফল দেখতে পাওয়া যায়। ফুল-ফল-সবুজের সমারোহে এমনই আমাদের শরৎ ঋতু। সবুজ, নীল আর সাদার অপূর্ব সমন্বয় আর কোনো ঋতুতে দেখা যায় না। হৃদয় উজাড় করে এ ঋতু মেলে ধরে নিজেকে। শরৎ আমাদের হৃদয়ের ঋতু। আনন্দের অগ্রদূত।
আমরা গাইবো তবে এই শরতের গান
শরৎ সুখে জাগবে মনে স্বপ্ন অফুরান।
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৪



