কমাতে হবে দীর্ঘসূত্রিতা

0
0

‘হোমওয়ার্ক জমা দিতে হবে আগামী সপ্তাহে। ও আচ্ছা! তাহলে তো ৭ দিন সময় আছে। আগের দিন করে ফেলবো নে’। কিংবা ‘পরীক্ষা আগামী মাসে শুরু হবে। অসুবিধা নেই, শেষ সপ্তাহে পড়ে ফাটিয়ে দিবো’। অথবা ‘কাজটা কীভাবে করবো/শুরু করবো/কীভাবে করলে এটা সবচেয়ে সেরা হবে এটা ভাবতে ভাবতে কাজ শেষ করার সময় চলে এলো’- এই যে কাজ শুরু করতে দেরি করা এবং শেষ করতে দেরি করা, এর নামই দীর্ঘসূত্রিতা।
দীর্ঘসূত্রিতার ফলে কাজটা করা হয় একেবারে শেষ সময়ে, অনেকটা দায়সারাভাবে। কিংবা সময় পার হয়ে যায় কাজ করতে করতে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ জমা দিতে না পারায় সুনাম নষ্ট হয়। এর ফলে নিজের মধ্যে অনুশোচনা তৈরি হয়। এতে দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ থাকে। দীর্ঘসূত্রিতার ফলে আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণায় দেখা গেছে স্কুলের ৬৬ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী দীর্ঘসূত্রিতায় ভোগে। আর কলেজে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৭৯ শতাংশ। স্কুলের শিক্ষার্থীদের ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী বুঝে উঠতে পারে না, যে কাজটা কীভাবে শুরু করবে; ফলে সময়মতো শেষ করতে পারে না।
এই যে কালকে করবো, বা পরে করবো এই মানসিকতার পেছনে কী কী কারণ আছে? কেন আমরা কাজ ফেলে রাখি? শুরু করে কেন ঝুলিয়ে রাখি? যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী লিন্ডা সাপাডিন দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে কাজ করেছেন দীর্ঘ সময় ধরে। তিনি দীর্ঘসূত্রিতার পেছনে ৬টি মানসিকতাকে দায়ী করেছেন। সেগুলো থেকে উত্তরণের উপায়ও বলেছেন তিনি।

১. পারফেকশনিস্ট বা নিখুঁত হতে চাওয়া:
তুমি চাও যে তোমার প্র্যাকটিকেল খাতাটা ক্লাসের সবার চেয়ে সুন্দর এবং আকর্ষণীয় হবে। এই ভাবনায় কাজটার পেছনে অনেক সময় দিচ্ছো। অথবা কীভাবে করলে অন্যদের চেয়ে আলাদা হবে সেটা নিয়ে চিন্তা করছো। ফলে কাজটা শুরুই করা হয়ে উঠছে না। এর ফলে সময়মতো শেষ করতে পারছো না, জমাও দিতে পারছো না।
সমাধান- নিজের নিখুঁত হবার ভাবনাটাকে ধরে রেখেই কাজের বাস্তববাদী পরিকল্পনা করো। কাজটিকে ভাগ করে কোন অংশ কতদিনে শেষ করবে তাও নির্ধারণ করে ফেলো। ভুল হওয়াকে ‘স্বাভাবিক’ বলে ভাবতে শেখো। নিখুঁত হতে গিয়ে কাজে পিছিয়ে পড়ার চাইতে কিছু ভুল নিয়ে কাজ শেষ করাটা বেশি জরুরি। আর তুমি যতই চেষ্টা করো না কেন, দেখা যাবে কিছু ভুল থেকেই যাচ্ছে, সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া বা বিষণ্ন হবার কোনো কারণ নেই।

২. স্বপ্নচারী হওয়া:
ধরো, তোমার একটা অ্যাসাইনমেন্ট হচ্ছে বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা। বাহ, তুমি খুব খুশি! এতো খুব সহজ। বইয়ে কত সুন্দর করে দেয়া আছে। দেখে দেখে করে ফেলবো, কোনো ব্যাপারই না। করতে গিয়ে দেখলে বইয়েরটা তো সুন্দর ঠিকই, কিন্তু তুমি আঁকতে গেলেই হয়ে যাচ্ছে নানান রকমের আকৃতি। কোনোটাই ঠিকমতো মানচিত্র হয়ে উঠছে না। ব্যস, তুমি হাল ছেড়ে দিলে- ‘আমাকে দিয়ে আর মানচিত্র আঁকা হবে না’। অর্থাৎ যে স্বপ্ন দেখেছিলে যে মানচিত্র আঁকা খুবই সহজ, বাস্তবে দেখলে তা খুবই কঠিন। অনেক পরিশ্রমের ব্যা পার। ফলে তুমি পিছিয়ে যাচ্ছ কাজটা শেষ করতে।
সমাধান- কাজ করার বাস্তব পরিকল্পনা করতে হবে। একটা কাজ করার পেছনে কী কী সমস্যা থাকতে পারে সেটাও পরিকল্পনায় আনতে হবে, কীভাবে তা সমাধান করা হবে তাও ভেবে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে- স্বপ্নের আলাদীনের দৈত্য কখনো এসে তোমার এসাইনমেন্ট করে দিয়ে যাবে না। বরং তোমাকেই কষ্ট করে হোমওয়ার্ক/এসাইনমেন্ট শেষ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কষ্ট স্বীকার করতেই হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হলে চাপ নিয়েই কাজটা সম্পন্ন করতে হবে।

৩. দুশ্চিন্তাকারী হওয়া:
তুমি সবসময় চিন্তায় থাকো। কারণে, অকারণে ভাবো যদি এটা করলে সেটা হয়, ওটা করলে সেটা হয়! তুমি পরিবর্তনে ভয় পাও, সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাও। ‘আগে কখনো করিনি, এখন কি পারবো?’ অথবা ‘যদি আমার মানচিত্রটা স্যারের পছন্দ না হয়?’ কিংবা ‘যদি সবার সামনে আমাকে মানচিত্রটা এঁকে দেখাতে বলে?’- তাহলে কী হবে! এমন ভাবনা তোমার মনে সবসময় উঁকি মারতে থাকে। এসাইনমেন্ট ভুল হবার ভয়ে তুমি শুরুই করতে পারো না। অহেতুক একগাদা দুশ্চিন্তা নিয়ে সারাক্ষণ ভাবতে থাকো, যার কোনোই বাস্তবতা নেই, কখনো ঘটেনি, ঘটবেও না হয়তো।
সমাধান- নিজেকে সাহস দিতে হবে। নিজের যোগ্যতা এবং ভালো দিকগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। তোমার সম্পর্কে সবসময় খারাপ মন্তব্য করে এমন লোকের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে হবে। মনের দুশ্চিন্তামূলক ‘যদি/কিন্তু’ প্রশ্নগুলোকে সামনে এনে উত্তর রেডি করে ফেলতে হবে। যেমন- ‘যদি স্যার আমার মানচিত্রটা পছন্দ না করে?’ উত্তর হলো- ‘প্রয়োজনে আবার আঁকবো, সমস্যা কী!’ ‘কিন্তু আমি তো মানচিত্র আঁকায় সবসময় কম নম্বর পেয়েছি, (কীভাবে ভালো হবে আমার আঁকা?)’ উত্তর হলো- ‘এবার আমি আরো বেশি মনোযোগ দিয়ে আঁকার চেষ্টা করবো’। কাজের পরিমাণ যদি অনেক বেশি হয়, চাপ মনে হয়, তাহলে কাজটিকে ভাগ করে ফেলো। একটু একটু করে কাজটি শেষ করো। তাহলে দুশ্চিন্তা বাড়বে না। মনে করো দুশ্চিন্তা হলো তোমার জুতা। মসজিদে ঢুকতে গেলে যেমনিভাবে জুতা খুলে রেখে ঢুকতে হয়, তেমনিভাবে কাজ শুরু করার সময় দুশ্চিন্তাগুলোকে খুলে একদিকে রেখে তারপর কাজ শুরু করবে। তাহলে কাজের মধ্যে নানান প্রশ্ন আসবে না।

৪. ছক্কা মারা প্লেয়ার:
ক্রিকেট খেলতে গিয়ে দেখবে বন্ধুদের কেউ কেউ ব্যাটিং এ নেমে শুধু বল ঠেকায়। বলে- লাস্ট বলে একবারে ছক্কা মেরে পুষিয়ে দিবো। কিন্তু লাস্ট বলের সেই ছয়টা আর মারা হয় না। সিঙ্গেল রান নিয়েই শেষ করতে হয়। ফলে দল পরাজিত হয়। পড়াশুনার ক্ষেত্রেও অনেকের এ স্বভাব। পড়া জমতে জমতে অনেক বেশি হয়ে গেলে তখনই তাদের পড়ার সময় হয়। দেখা যায় পরীক্ষার সময় চলে এসেছে। তখন রাত জেগে পড়া শুরু হয়। তাদের মনোভাবটাই এমন হয়ে গেছে যে- ‘একটু চাপ না হলে কি পড়ায় মন বসে!’ কিন্তু এভাবে পড়লে পড়া আত্মস্থ হয় না। রাতের পড়া সকালে যা-ই কিছুটা মনে থাকে, পরে আর মনে আসে না।
সমাধান- নিজেকে বোঝাতে হবে লাস্ট বলে ছয় মারার মধ্যে কৃতিত্ব আছে যতটা, হেরে যাওয়ার ঝুঁকিও আছে ততটা। তাই সময়ের কাজ সময়ের মধ্যেই করে ফেলার চেষ্টা করতে হবে। তাহলে কৃতিত্বের পরিমাণও বাড়ার সুযোগ আছে। নিজেকে বোঝাতে হবে- পরীক্ষার আগের রাতে সিলেবাস শেষ করার চাইতে, আগের সপ্তাহে শেষ করতে পারলে পড়া রিভাইজ দেয়ার সুযোগ হয়। এতে করে পরীক্ষার দিনে চাপমুক্ত থাকা যায়।

৫. বিদ্রোহী মন:
অনেকের চিন্তাভাবনা বিদ্রোহী টাইপের। তারা ভাবে- ‘ধুর, টাইমলি এসাইনমেন্ট জমা দেয়ার কী আছে! আমি এই সব বাঁধা-ধরা নিয়মের মধ্যে নাই। আমার মতো আমি চলবো। যা হবার হবে’। অথবা হতে পারে কোনো টিচারকে ভালো লাগে না। সেজন্য তার দেয়া হোমওয়ার্ক করার ক্ষেত্রে শিথিলতা চলে আসে। ইচ্ছে করে না তার কথা অনুযায়ী এসাইনমেন্ট জমা দিতে। ফলে দেখা যায় ডেডলাইন পার হয়ে যায়। জমা দেয়া হয়ে ওঠে না।
সমাধান- এক্ষেত্রে নিজেকে দায়িত্বশীল হতে হবে। ভাবতে হবে যে পরিণামে আমারই ক্ষতি। নাম্বার কম পেলে কিংবা এসাইনমেন্ট অ্যাকসেপ্টেড না হলে আমিই ক্ষতিগ্রস্ত হবো। এক্ষেত্রে ড্যামকেয়ার মনোভাব বাদ দিতে হবে।

৬. মহাব্যস্ত:
এই শ্রেণীর মানুষেরা অনেক কাজে পারদর্শী। তাদের হাতে অসংখ্য কাজ থাকে। সবাই তাদের কাজ দিয়ে রাখে। নিজের সুনাম রাখার জন্য তারা কাউকে ‘না’ বলতে পারে না। ফলে হাজার ব্যস্ততায় তারা নিজের কাজটাই করতে পারে না। পরিণামে দীর্ঘসূত্রিতায় পড়ে।
সমাধান- নিজের সময়ের পরিধি জানতে হবে। কাজকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাজাতে হবে। অগ্রাধিকার করতে শেখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ৫ জনে তোমাকে ৫টা কাজ দিতে পারে। ভাবতে হবে কার কাজটা না করলেই না, কার কাজটা জরুরি, আর কার কাজটা পরে করলেও চলবে। মনে রাখতে হবে- তুমি সবাইকেই খুশি করতে পারবে না। কখনোই সম্ভব না। তাই তোমার ক্ষমতা অনুযায়ী যে কয়টা কাজ পারো, হাতে নিবে। আর যদি তোমার সময় না থাকে বিনয়ের সাথে ‘না’ বলবে। ‘না’ বলতে পারাটা জরুরি- নিজের স্বার্থে, অন্যদের বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজের স্বার্থে।

দীর্ঘসূত্রিতা একটি শেকলের মতো। তুমি যতই সামনে যেতে চাও, সে পেছনে টেনে ধরে রাখতে চায়। তাই এই শিকল ছিন্ন করার জন্য উঠে পড়ে লাগতে হবে। তাহলেই সামনের পথচলা হবে বাঁধাহীন।

প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৪