মওলানা আকরম খাঁ

আচ্ছা বলতো- মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ কে?

হ্যাঁ, তা হলে বলছি শোনো। মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। তিনি ছিলেন আমাদের আজাদী আন্দোলন, সংবাদপত্র আন্দোলন, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন স্মরণীয় মানুষ। তিনি কলকাতা থেকে দৈনিক আজাদ প্রকাশ করেন এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি মাসিক মোহাম্মদীরও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের চব্বিশ পরগনা জেলার বশিরহাট মহকুমার হাকিমপুর গ্রাম। এই গ্রামেরই এক বাসিন্দা, নাম তাঁর মাওলানা আবদুল বারী খাঁ। তিনি ছিলেন মুজাহিদ আন্দোলনের একজন নেতা। তাঁর পিতা তোরাব আলী খাঁ ছিলেন বীর যোদ্ধা শহীদ তিতুমীরের একজন শিষ্য। তাঁর আর একজন পূর্বপুরুষ বালাকোটের যুদ্ধে শহীদ হন। এই সংগ্রামী পরিবারে ১৮৬৮ সালের ৭ জুন জন্মগ্রহণ করেন মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ।
পিতামাতার আদরের সন্তান আকরম খাঁ প্রথমে মক্তবেই সাধারণ শিক্ষা শুরু করেন। মক্তবে তিনি কোরআন শরীফ ছাড়াও শেখ সাদীর ‘গুলিস্তাঁ ও বোস্তাঁ’ পাঠ করেন। কিন্তু পিতা-মাতার তত্ত্বাবধানে ও স্নেহে আকরম খাঁ বেশিদিন পড়াশুনা করতে পারেননি। মাত্র এগার বছর বয়সে একই দিনে তাঁর পিতা-মাতা দু’জনই কলেরা রোগে ইন্তেকাল করেন। তারপর তাঁর নানা ও বড় ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে বড় হতে থাকেন। এইভাবে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে এফ এম পরীক্ষায় পাশ করেন।

আরবি-ফারসি ভাষাতে তিনি বেশ দক্ষ ছিলেন। তিনি ফারসিতে অনেক কবিতা লেখেন। কিন্তু তাঁর বড় ভাই কবিতা লেখা পছন্দ করতেন না। একবার তিনি আকরম খাঁর লেখা কবিতার পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলেন। এরপর আকরম খাঁ কবিতা লেখা ছেড়ে দেন।
মাদ্রাসার শেষ পরীক্ষা পাসের পর তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। সংবাদপত্র পাঠের প্রতি তাঁর ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক ছিল। সংবাদপত্র পাঠ করতে করতেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু। তিনি দেখলেন মুসলিম জাতি শিক্ষাদীক্ষায় সর্বক্ষেত্রেই পিছিয়ে আছে। তাই মুসলমান জাতিকে টেনে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তাইতো ১৯০৪ সালে তিনি ‘মোহাম্মদী’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। তারপর তিনি ‘দৈনিক আজাদ’ প্রকাশ করেন। এই পত্রিকা মুসলিম জাগরণে বিরাট ভূমিকা রাখে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পত্রিকাটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত হতো। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা প্রকাশ করেন। মুসলিম সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এবং মুসলিম জাগরণে যে অবদান রেখে গেছেন জাতি চিরদিন তা স্মরণ রাখবে।

তার সাহিত্য কর্মও উল্লেখযোগ্য। তার বইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ‘মোস্তফা চরিত’। এটি এখনো পঠিত হয় ঘরে ঘরে। এর বহু সংস্করণ হয়েছে। অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে সমস্যা ও সমাধান, আমপারার বাংলা অনুবাদ, মোস্তফা-চরিতের বৈশিষ্ট্য, বাইবেলের নির্দেশ ও প্রচলিত খ্রিষ্টান ধর্ম, মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, তাফসীরুল কোরআন এবং মুক্তি ও ইসলাম। ইত্যাদি।
তিনি নিজের দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তাই তাঁর চলন-বলন, আচার-ব্যবহার, পোশাক-আশাক সবকিছুতেই দেশপ্রেম ছিলো। মওলানা আকরম খাঁ সরল জীবনযাপন করতেন। তিনি ছিলেন বিনয়ী ও অনাড়ম্বর জীবনের অনুসারী। ১৯২৮ সালে হজ্জে গিয়ে তিনি যে পোশাক পরিধান করেছিলেন, তা দেখে আরবের বাদশাহ ইবনে সউদ আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন। ইবনে সউদ তাঁর পরিষদকে বলেছিলেন, ‘তাঁর দেশের কল্যাণের জন্যেই তিনি খদ্দরের পোশাক পরেছেন। তাঁর মোটা কাপড় পরার কারণ হলো এটা তাঁর দেশের তৈরি।’ মওলানা আকরম খাঁ মাথায় সবুজ পাগড়ি পরতেন, গায়ে সাদা জামা, মাথায় সাদা টপি, এগুলো সবই ছিলো মোটা কাপড়ের তৈরি।

আকরম খাঁ ছিলেন বেশ অমায়িক, সব সময় রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে খুব পছন্দ করতেন। তিনি খুব পড়াশুনা করতেন। সত্যের পক্ষে সব সময় ছিলেন সোচ্চার। এমনিভাবে সাংবাদিকতা, রাজনীতি, সংগ্রামী জীবন কেটে তাঁর বয়স এসে দাঁড়িয়েছে একশ’র কোটায়। বয়সের ভারে তিনি নুইয়ে পড়েননি। ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। নানা রোগে পেয়ে বসলো তাঁকে। কিন্তু এই রোগ থেকে আর মুক্তি পেলেন না। অবশেষে ১৯৬৮ সালের ১৮ আগস্ট তিনি পি.জি. হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন।

প্রকাশকাল : আগস্ট ২০২৬