একটি বালক। হালকা পাতলা শরীর। ডাগর ডাগর দুটি চোখ, দুরন্ত সাহস। ফরফর করে উড়তো মাথার চুল। অনেক অনেক ভাবনা তার। যেন সে এক অন্যরকম রাজ্যের রাজকুমার। তার ছিল হরেক রকম পাখি। এক বিশাল নীল আকাশ, অথই সাগর, সাগরে কত রকমের ঢেউ। সাগর পাড়ে বিশাল বাগান। বাগানে নানা রকম গাছপালা। সেই বাগান থেকে মউ মউ গন্ধ আর হিমশীতল বাতাস বইতো। পাখিরা কুহু কুহু তানে ভরিয়ে দিত সমস্ত বাগান। পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে রাজকুমার টগবগ করে কত মাঠ-ঘাট পেরিয়ে হাজির হতেন হাতেম তায়ীর দেশে। আবার কখনো গভীর রাতে পাড়ি দিতেন সাতসাগর। সপ্তডিঙ্গা সাজিয়ে যাত্রা করতেন নতুন বাণিজ্যের উদ্দেশে।
পাকা নাবিক তিনি। মাস্তুল ধরে বসে আছেন। দাঁড় টানছেন মাঝি। করকর করে দাঁড় টানার শব্দ ভেসে আসছে। চারিদিকে ঝিঁঝি পোকার মিটমিট আলো। ঝিঁঝি শব্দ। দূর থেকে ভেসে আসছে গাঁয়ের মাঝিদের ভাটিয়ালি গানের সুর। এদিকে সমস্ত আকাশ মেঘে ঢেকে গেছে। রাত পোহাবার এখনও অনেক বাকি। শেষ গন্তব্যস্থলে যেতে হবে তাঁকে। ঢেউয়ের দেয়াল ভেঙে ভেঙে ডিঙা এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। বার বার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখছেন। মাঝিকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘ও মাঝি! রাত পোহাবার আর কত দেরি গো? সকাল হবে কখন?’ কিন্তু এখনো যে রাত পোহাবার অনেক দেরি। থামলে চলবে না। গন্তব্যস্থলে যে পৌঁছতেই হবে।
বালকটি ছিলেন আপনভোলা। রাতে মোটেও ঘুমাতেন না। মাথা নাড়তে নাড়তে পথ চলতেন। রাজ্যের চিন্তা, আজব চিন্তাও করতেন। ওসব চিন্তার কথা শুনলে সত্যি তোমাদের হাসি পাবে।
একদিন সকালবেলা। বালকটিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। সবাই খোঁজাখুঁজি করছে। দাদি, বড় ভাইয়া সবাই খুঁজছেন। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় কোথাও তাকে পাওয়া গেলো না। আচ্ছা, গাঁয়ের বাড়িতে আমাদের মা-চাচিরা মুরগির বাচ্চা ফুটায় কীভাবে তা কি কখনো দেখেছো? একটা টুকরির মধ্যে খড়কুটা দিয়ে রাখা হয়। তারপর মুরগির ডিম পাড়ার সময় হলে এ টুকরিতে গিয়ে মুরগি ডিম পাড়ে। ডিম পাড়া শেষ হলে ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটায়। দাদিও তেমনি চৌকির তলায় একটি টুকরির মধ্যে খড়কুটা দিয়ে মুরগির বাচ্চা ফুটানোর জন্য রেখেছেন। যথাসময়ে মুরগি ডিম পেড়েছে। বাচ্চাও ফুটেছে। কিচকিচ শব্দ করে বাচ্চা ডাকছে চৌকির তলায়। হঠাৎ দাদির মাথায় এলো, চৌকির তলাটা এবার একটু খুঁজেই দেখি না! মনভোলা বালকটি ওখানে থাকতেও তো পারে। আসলেই তা-ই। চৌকির তলায় সে মুরগির বাচ্চা দেখছে। বড় ভাইয়া জিজ্ঞেস করলেন, কীরে, ওখানে কী করছিস? ডাগর ডাগর চোখে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলেন, মুরগির বাচ্চা দেখতে ভালো লাগে, তাই দেখছিলাম।
আর একদিন ঘটলো আরেক অবাক কাণ্ড! সকালবেলা। দাদি তাকিয়ে দেখেন বিছানা ভর্তি ভাঙা ডিম। চিন্তায় পড়ে গেলেন তিনি। বিছানায় আবার ভাঙা ডিম এলো কোত্থেকে! আদরের নাতিকে ডাকলেন। বললেন, আচ্ছা দাদু ভাই বলতো দেখি, বিছানায় এত ভাঙা ডিম এলো কোথা থেকে? সে কি বললো জানো? জানো দাদি, পিঠের তলায় কটা ডিম রেখে ঘুমিয়েছিলাম বাচ্চা ফোটানোর জন্য। কিন্তু ডিমগুলো মচমচ করে ভেঙে গেলো, বালকটির কথা শুনে হাসতে হাসতে দাদির খিল ধরে গেলো।
আবার কখনো কখনো কি করতেন জানো? লম্বা পিরহানের জেবে কলসি ভাঙা, চাড়া, কড়ি এসব ভরে ঝুমুর ঝুমুর শব্দ করতেন। হাঁকতেন হিং নেবে হিং। আঙুর, কিশমিশ, পেস্তা, খুরমা, বাদাম নেবে। নিজে নিজে কাবলিওয়ালা সাজবেন। ছড়া কাটতেন-
‘সুলতান যাবে কাবুল দেশে
পেস্তা বাদাম খাবে ঠেসে।’
বৃষ্টির দিনে তোমাদের কেমন লাগে? খুব মজা তাই না! যখন বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা কাশফুলগুলোকে ভিজিয়ে দিতো, বৃষ্টির তোড়ে যখন কাশের বন কাঁপতো, বকেরা তখন বাঁশপাতার আড়ালে লুকিয়ে পড়তো। এক সময় ঝুমঝুম করে বৃষ্টির পানিতে সব ভাসিয়ে নিতো। এই দুরন্ত বালকটি কি তখন ঘরের কোণে বসে থাকতে পারে? মোটেও না। বৃষ্টি থেমে গিয়ে যখন আলো ঝলকে উঠতো তখন তিনি ঘর থেকে বের হতেন। পা টিপে টিপে পাখির বাসা খুঁজতেন। যাওয়ার সময় সাথীদেরও ডেকে নিয়ে যেতেন।
‘বৃষ্টি এলো কাশবনে
জাগলো সাড়া ঘাসবনে
বকের সারি কোথারে
লুকিয়ে গেল বাঁশবনে।’
পুকুরপাড়ে তালগাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়াতেন তিনি। তারপর বাবুই বাসাগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখতেন। বাতাসে বাসাগুলো ঝুলছে। ঝিলের ধারে ঝোঁপের মাঝে কোন বাসাটা লুকিয়ে আছে, কোন বাসাটার বাবুই পাখির মন মাতে। পাশেই একটা গাছে টুনটুনিরা কিচিরমিচির ডাকছে। এসব ডাক শুনে তার মন আনন্দে নেচে ওঠে। তার ভাবনায় বৃষ্টি থেমে যাওয়াতে টুনটুনিরা আনন্দে গান ধরেছে। তিনিও তাদের সাথে শরিক হতেন। তিনিও তখন মাথা নেড়ে নেড়ে ছড়া কাটতেন। বোশেখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে খুব গরম তাই না? এ সময় চাষিরা টালা মাথায় দিয়ে মাঠে কাজ করতেন। রাতের বেলায় গাঁয়ের বধূরা মা-চাচিদের সাথে উঠানে বিছানা পেতে বসতেন। পুরোনো দিনের গল্প শুনতেন। বাহির বাড়ির পুকুর পাড়ে জমতো পুঁথির আসর। বালকটি এসব আনন্দ থেকে মোটেও পিছিয়ে থাকতেন না। সারাজীবনের এসব বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে একসময় এ রাজকুমার তার গহিন রাজ্যকে আলোকিত করতেন। ফুলে ফুলে সাজাতেন। যে ফুলের গন্ধ আজো আমাদের আন্দোলিত করে।
বন্ধুরা! এতোক্ষণে হয়তো তোমাদের মনে অনেক প্রশ্ন জমা হয়ে গেছে, তাই না? হ্যাঁ, নানা প্রশ্ন জমা হওয়ারই কথা। কে সে রাজকুমার, কী তার নাম। তার সেই গহিন রাজ্যটিই বা কোথায়, এসবতো সবারই জানতে ইচ্ছে করে। তা হলে বলছি শোন-
মধুমতি নদী। এই নদীর তীরে ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা ছোট একটি গ্রাম। নাম তার মাঝআইল। এই গ্রামেই ১৯১৮ সালের ১০ জুন এই রাজকুমারের জন্ম। বাবার নাম খান সাহেব সৈয়দ হাতেম আলী । আর মা বেগম রওশন আক্তার। বাবা আদর করে নাম রাখলেন, ফররুখ আহমদ। আচ্ছা বলতে পারো ফররুখ অর্থ কী? হ্যাঁ, ফররুখ অর্থ হলো সৌভাগ্যবান। আর এই সৌভাগ্যবান বালকটিই তো সেই গহিন রাজ্যের রাজকুমার, তোমার আমার সবার প্রিয় কবি ফররুখ আহমদ। তার জীবনের এসব মজার মজার অভিজ্ঞতাগুলোকে তিনি ফুলের ডালায় সাজিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন আমাদের জন্য, যা আজ সারাদেশ জুড়ে ছোট বড় সবার হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। যার গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে সবদিকে। এখন আর তিনি আমাদের মাঝে নেই। ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি দুনিয়ার সফর শেষ করে চিরদিনের জন্য আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৪


