স্মৃতি সমুদ্রের এক বিরল পুরুষ শাহাবুদ্দীন আহমদ। তার সাথে আমার পরিচয় অনেক দিন থেকে। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। যখন অবসর থাকতেন তখনই ডাকতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতেন, নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করতেন, গান শুনাতেন। কোনো সময় অফিসে গেলে শাহাবুদ্দীন ভাইকে দেখতাম টেবিলের উপর বাদাম রেখে দিয়েছেন। একটার পর একটা চিবুচ্ছেন। আবার কখনো কখনো কুট কুট করে ভাজা বুট চালান করে দিচ্ছেন দাঁতের ফাঁকে। অনেক সময় এক জাতের ফলও খেতেন। হাতের মুঠে গুঁজে গোটা পেয়ারা- কামড়িয়ে খুব মজা করে চিবিয়ে চিবিয়ে খেতেন। তিনি যা খেতেন আমাকেও খেতে দিতেন। ফাঁকে ফাঁকে গল্প করতেন। কবি নজরুলের কবিতা, কবি নজরুলের গান গাইতেন। কবি নজরুলকে তিনি যেন গিলে খেয়েছেন।
আমি জীবনে দু’বার কবি নজরুলকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। প্রথম বার দেখেছি কবি ভবনে। দ্বিতীয় বার দেখেছি টিএসসির সামনে চিরনিদ্রায়। কবি নজরুলকে আমি যেদিন প্রথম দেখেছি সে দৃশ্যটি আজও আমার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। নজরুল গোসল সেরে ভেজা শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন একটি সাদা চাদর। আর ডাগর ডাগর দুটি চোখের দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে। সেদিন আমি নজরুলের ঐ দুটি চোখের ভেতর বাংলাদেশকে দেখেছি। দেখেছি আমার গাঁয়ের মেঠোপথ আর গ্রাম বাংলার অপরূপ দৃশ্য। টিএসসি চত্বরে কবি নজরুলকে চিরনিদ্রায় দেখে মনে আঘাত পেয়েছিলাম। কারণ বসু মাস্টারের পাঠশালায় এ দুটি চোখের কতো বর্ণনাই না শুনেছি।
বসু মাস্টার কতো সুন্দর করে বর্ণনা দিতেন, কবির মন মনন আর চোখের ভেতর কীভাবে লুকিয়ে আছে শ্যামল, সবুজ, একটা সোনার বাংলাদেশ। সত্যিই আমিও সেদিন নজরুলের চোখের ভেতর একটা বাংলাদেশকে খুঁজে পেয়েছিলাম। তাহলে আজ থেকে কি সেই দৃশ্য মুছে যাবে?
না মোটেও না। এর ছয় বছর পর ৯৪/১ নিউ এলিফ্যান্ট রোডে ফুলকুঁড়ি অফিসে শাহাবুদ্দীন ভাইয়ের সাথে প্রথম দেখা হলো, তখন আমি কবি নজরুলের ঐ ডাগর ডাগর চোখ দুটি খুঁজে পেয়েছিলাম। হতবাক হলাম। এ কেমন করে হয়। এ তো কবি নজরুলের হারিয়ে যাওয়া চোখ। যে চোখে আমি আমার মায়ের ভালোবাসা, গাঁয়ের বধূর কলসি কাঁধের দৃশ্য, রাখালের গরুর পাল আর রাখালিয়া বাঁশির সুর শুনতে পেয়েছিলাম।
সত্যিই তাই। শাহাবুদ্দীন ভাই ছিলেন আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের প্রতিচ্ছবি। যেন আরেকজন নজরুল। কেনইবা হবেন না। যার হৃদয়ে নজরুল, লেখনীতে নজরুল, সুরে নজরুল সব কিছুতেই নজরুল। তাঁর মাঝে তো নজরুলকে খুঁজে পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
প্রত্যেক দেশের মহান ব্যক্তিরা স্ব-প্রতিভার গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জাতির কাছে নিজেদের বিকশিত করেন। এসব মহান ব্যক্তিরা দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তাই এদের নিয়ে, প্রতিটি জাতি অহংকার ও গৌরব বোধ করে। এসব কীর্তিমান পুরুষ নিজেদের চাওয়া পাওয়াকে তুচ্ছ করে জাতির আশা- আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সদা সচেষ্ট থাকেন। নিজেদের জাতির কাছে দায়বদ্ধ মনে করেন। যা পালন করতে গিয়ে নিজেকে বিলিয়ে দেন জাতির কাছে। জাতির কাছে তাঁরা কিছুই প্রত্যাশা করেন না। যুগযুগ ধরে তারা স্মরণীয়- বরণীয় হয়ে থাকেন। বাইরে নয়।
কিন্তু জাতির কাছে আত্মপ্রকাশ সহজ কাজ নয়। এর কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই। এই পথ অত্যন্ত কঠিন পথ। যে পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য কঠিন সংগ্রামে মুখোমুখি হতে হয়। এর জন্যে প্রয়োজন মেধা, প্রজ্ঞা, প্রত্যয়, সততা, মহানুভবতা, নিরপেক্ষতা, উদারতা, জাতীয়তাবোধ ও কঠোর সাধনা। এর সব কিছুই শাহাবুদ্দীন ভাইয়ের মাঝে।
শাহাবুদ্দীন ভাইয়ের খুব কাছাকাছি থাকার কারণে আমি তাঁকে দেখার, বুঝার এবং জানার অনেক সুযোগ পেয়েছি। তাঁর সাথে অন্তরঙ্গভাবে মেশা এত বেশি হয়েছে যে তিনি আমার মতো একজন ছোট মানুষকে বন্ধুর মতোই আচরণ করতেন। তাঁর সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে মেশার কারণে তাঁর নীতি আদর্শ ও বিশ্বাস সম্পর্কে যতটুকু পরিচয় পেয়েছি এতে আমি অভিভূত।
আমার ক্ষুদ্র জীবনে কতো বিখ্যাত লেখক, বুদ্ধিজীবীর সাথে পরিচয় হয়েছে, হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া নির্ভেজাল ও খাঁটি দেশপ্রেমিক ব্যক্তিত্বের সংজ্ঞার সন্ধান পাওয়া কঠিন। অনেকেই দেখা যায় নিজের স্বার্থের জন্য অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পন করেছে কিন্তু শাহাবুদ্দীন ভাই ছিলেন এর ব্যতিক্রম।
তাঁর আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনায় এমনকি পোশাক পরিচ্ছদেও স্বীয় নীতি বিশ্বাস থেকে এক চুলও বিচ্যুত হননি। দেশের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা থাকার ফলেই এসব সম্ভব হয়েছে।
অথচ আমরা এই দেশপ্রেমিক বিরল মানুষটির কাছ থেকে শুধু নিয়েছি কিন্তু তাঁকে দেওয়ার মতো কিছুই করিনি। আমরা তাঁকে জাতীয়ভাবে সম্মান জানাতে পারিনি। তিনি জীবিত অবস্থায় সরকারি কোনো পুরস্কারই পাননি। তার একমাত্র কারণ হলো তিনি কখনো মাথা নত করেননি। নতি স্বীকার করেননি। মিথ্যার কাছে পরাজয় বরণ করেননি। কথায় কথায় যে মানুষটি বাঘের মতো গর্জে ওঠেন সে কখনো পরাজিত হতে পারেন না। এজন্য যত দায়ভার সব আমাদের। গোটা জাতির এ অন্যায় মেনে নেয়া যায় না।
আমাদের কাছ থেকে যখন কোনো গুণী মানুষ বিদায় নেয় তখন আমরা কতো কথাই না বলি, আমাদের ইতিহাসের কথা বলি, গর্ব করার মতো আরো কতো কথাই না বর্ণনা করি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তা সংরক্ষণ রাখি না। কালস্রোতে এক সময় তা হারিয়ে যায়। মানুষ তার অতীত বেশিদিন মনে রাখে না, ভুলে যায়।
আবার অনেকে তা ধরেও রাখতে চায় না। অথচ বিত্তশালী দেশগুলো উন্নত কেবল ধনে নয়, জ্ঞানেও। তারা তাদের গুণীজনদের সম্মান করে, ইতিহাসে তা লিখে রাখে। যা স্মরণ করে, জাতীয় উন্নতির দিকে এগিয়ে যায়। যেখানে গুণী মানুষের- সম্মান নেই, যাদের ইতিহাস ধরে রাখে না, তাদের অস্তিত্ব পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যায়। তারা বেশিদিন টিকে থাকে না।
শাহাবুদ্দীন ভাই চিরদিনের জন্যে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আমাদের তার আর কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু তাকে যদি আমরা ইতিহাসে ধরে রাখতে পারি আমরাই লাভবান হবো। ধন্য জাতি।
প্রিয় মানুষ শাহাবুদ্দীন ভাইয়ের জন্য দোয়া করি আল্লাহ যেন তার ভালো কাজগুলোর পুরস্কার দেন। জান্নাতবাসী করেন।
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৪


