ঈশা খাঁ ও মানসিংহের যুদ্ধ

তোমরা হয়তো ঈশা খাঁ আর মানসিংহের যুদ্ধের কথা শুনেছো। তখন সম্রাট আকবরের পুত্র যুবরাজ সেলিমের নির্দেশে রাজা মানসিংহ বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন। রাজা মানসিংহ বাংলায় আসার সময় তার পুত্র দুর্জয় সিংহ, হিম্মত সিংহ, জগত সিংহ ও রাজা রামচন্দ্র দেব ও বেশ কিছু সংখ্যক মোঘল আমত্যকে সঙ্গে নিয়ে বাংলায় আগমন করেন। সেই ১৫৯৬ সালের জুলাই মাসে রাজা মানসিংহ শেরপুর থেকে রংপুরের ঘোড়াঘাটে এসে অবস্থান নেন। ঐ সময় তিনি হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন চিকৎসকরা তার জীবন সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়েন। ঈশা খাঁর নিকট তখন এই সংবাদ পৌঁছার পর মাসুদ খান ও বীর করিমের নেতৃত্বে এক বিশাল নৌবহর মোঘল সৈন্যদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করার জন্য অতিদ্রুত তাদের অবস্থানের ২৪ মাইলের মধ্যে গিয়ে পৌঁছেন। ঐ সময় ঈশা খাঁর বাহিনীকে প্রতিরোধ করার মতো সামরিক শক্তি মোঘলদের ছিলো না। ফলে ঈশা খাঁর সৈন্যদের আক্রমণে রাজা মানসিংহের বাহিনী  বিপর্যস্থ হয়ে পড়ে। যুদ্ধে প্রায় পাঁচ সহস্রাধিক মোঘল সৈন্য নিহত হয়।
রাজা মানসিংহ তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে অতিদ্রুত সোনারগাঁয়ের দিকে যাত্রা করলেন। ঈশা খাঁ তখন মানসিংহের সাথে সন্ধি করতে চাইলেন কিন্তু মানসিংহ তা প্রত্যাখান করে শীতলক্ষ্যার তীরে একডালা দূর্গের দিকে অগ্রসর হলেন। এ সংবাদ পেয়ে ঈশা খাঁ এগার সিন্ধুরে চলে এলেন। মানসিংহও ব্রহ্মপুত্রের তীরে অবস্থিত ঈশা খাঁর দূর্গের কাছে চলে এলেন। যুদ্ধ শুরু হলো। সাতদিন ধরে অবিরাম রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধ চলতে থাকলো। রাত নেমে এলো। পরদিন আবার যুদ্ধ চলবে।
এই রক্ত ক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য ঈশা খাঁ এক দূত মারফত মানসিংহকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহবান করলেন। কিন্তু মানসিংহ যুদ্ধে নিজে অবতীর্ণ না হয়ে তার জামাতাকে পাঠালেন। এই যুদ্ধে মানসিংহের জামাতা ধরাশায়ী হয়ে প্রাণ হারান।
এবার মানসিংহ ঈশা খাঁর সাথে যুদ্ধে নামলেন। প্রথমে অশ্বপৃষ্ঠে দুই বীরের মধ্যে চললো লড়াই। কিন্তু মানসিংহ তার অশ্বপৃষ্ঠ থেকে পড়ে গেলেন। এমতাবস্থায় ঈশা খাঁ রাজা মানসিংহকে আঘাত না করে তাকে হাত ধরে টেনে তুলে নিলেন। অতঃপর মানসিংহ কৃতজ্ঞ চিত্বে ঈশা খাঁর দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলেন।
১৫৬৩ সাল। এই সালেই ভাটি বাংলার অধিশ্বর হিসেবে ঈশা খাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। তিনি দীর্ঘ ৩৬ বছর যাবত সমগ্র পূর্ব বাংলার মহান রাজ্য নায়ক হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অসামান্য রণকৌশল, অসাধারণ প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার ফলে সম্রাট আকবরের প্রায় প্রতিটি সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয় ঈশা খাঁর দুর্জয় প্রতিরোধের মুখে।
দীর্ঘদিন যাবত মোঘলদের সাথে তাঁর অবিরাম যুদ্ধের ফলে জীবনের উচ্ছলতায় কিছু ভাটা পড়ে গেল। ফলে তার পুত্র মুসা খাঁকে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব দেন এবং তাঁকে মসনদ-ই-আলা উপাধিতে ভূষিত করেন।
তারপর ১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময় ঈশা খাঁ কিছুদিনের বিশ্রামের জন্য সোনারগাঁও থেকে মহেশ্বরদী পরগনা বর্তমান গাজীপুরের কালীগঞ্জের নিকট বক্তারপুর দুর্গের প্রাসাদ বাটিতে গমন করেন। সেখানে গিয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েন। চিকিৎসকরা অবিরাম চেষ্টা করেও তাঁকে সুস্থ করে তুলতে ব্যর্থ হন। অবশেষে ১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ সেপ্টেম্বর ঈশা খাঁ মৃত্যুবরণ করেন। বক্তাপুরেই বাংলার এই মহান বীরের সমাধী অবস্থিত।

প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৬