চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক ইবনে সিনা

সবাই তাঁকে চেনে ইবনে সিনা নামে। তাঁর পুরো নামটি কিন্তু বেশ লম্বা। আবু আলী আল হুসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে সিনা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক বলা হয় তাঁকে। এই মহাজ্ঞানী চিকিৎসা বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, দর্শন, গণিত, জ্যামিতি, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর ‘কানুন ফিত তিব’ নামে যে বিশ্বকোষ রচনা করেছেন, এটি মুসলিম বিশ্বে এবং ইউরোপে ১৮ শতক পর্যন্ত প্রামাণ্যগ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিলো। ইউনানি চিকিৎসায় এখনও এর অবদান অপরিসীম।
৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে তুর্কিস্তানের বিখ্যাত শহর বোখারার (বর্তমান উজবেকিস্তান) নিকটবর্তী আফসানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ইবনে সিনা। তাঁর পিতার নাম আব্দুল্লাহ এবং মাতার নাম সিতারা বিবি। আজ ইবনে সিনা বিষয়ে আমরা জানবো।
ইবনে সিনার পিতা বোখারার সম্রাটের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। জন্মের কিছুকাল পরেই তিনি ইবনে সিনাকে বোখারায় নিয়ে আসেন। সেখানে তাঁর লেখাপড়ার সুব্যবস্থা করেন। তাঁর মাতৃভাষা ছিল ফারসি। কিন্তু আরবি ভাষাকে তিনি জ্ঞান প্রকাশের মূল বাহন হিসেবে গ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে লুকিয়ে ছিল মেধা ও প্রতিভা। মাত্র ১০ বছর বয়সেই তিনি পবিত্র কোরআনের ৩০ পারা মুখস্থ করেন। তাঁর তিনজন গৃহশিক্ষক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ইসমাইল সুফী শিক্ষা দিতেন ধর্মশাস্ত্র, ফিকাহ শাস্ত্র ও তাফসির, মাহমুদ মসসাহ শিক্ষা দিতেন গণিতশাস্ত্র এবং বিখ্যাত দার্শনিক আল না’তেলী শিক্ষা দিতেন দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র, জ্যামিতি প্রভৃতি।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে সকল জ্ঞানই তিনি অর্জন করেন। বিখ্যাত দার্শনিক আল না’তেলী’র নিকট এমন কোনো জ্ঞান অবশিষ্ট ছিলো না, যা ইবনে সিনাকে শিক্ষা দিতে বাকি ছিলো। তাই তিনি ইবনে সিনাকে স্বাধীনভাবে গবেষণা করার সুযোগ দেন। এবার তিনি নিজেই চিকিৎসা বিদ্যা সম্পর্কিত কিতাব সংগ্রহ করে গবেষণা শুরু করেন। তিনি জ্ঞান সাধনায় মনোনিবেশ করলেন। তিনি কোনো জটিল বিষয়ে সমস্যার সম্মুখীন হলে মসজিদে গিয়ে নফল নামাজ আদায় করতেন। আল্লাহর দরবারে সেজদায় পড়ে বলতেন- “হে আল্লাহ তুমি আমার জ্ঞানের দরজাকে খুলে দাও”। তাঁর অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো স্বপ্নের ন্যায় তার মনে ভাসতো এবং জ্ঞানের দরজা খুলে যেত।

১৮ বছর বয়সে তিনি চিকিৎসা বিদ্যায় ইন্দ্রজালের সৃষ্টি করেন। বোখারার বাদশাহ ‘নূহ বিন মনসুর’ এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। দেশ ও বিদেশের সকল চিকিৎসকের চিকিৎসা ব্যর্থ হয়। ইবনে সিনার খ্যাতি ততোদিনে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় বাদশাহর দরবারে তাঁর ডাক পড়ে। তিনি সু-চিকিৎসা দিয়ে বাদশাহকে সম্পূর্ণ সারিয়ে তুললেন। আরোগ্য লাভের পর বাদশাহ ইবনে সিনাকে পুরস্কার দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন। এ সময় ইবনে সিনা চাইলে বিপুল সম্পদ ও উচ্চপদ লাভ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি কেবল বাদশাহর কাছে শাহি কুতুবখানায় (বাদশাহর দরবারের গ্রন্থাগার) প্রবেশ করে পড়াশুনার অনুমতি প্রার্থনা করেন। বাদশাহ তার প্রার্থনা মঞ্জুর করেন।

গ্রন্থাগারের ভিতরে গিয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন ইবনে সিনা। এই গ্রন্থাগারে এমন সব বইয়ের সন্ধান পেয়েছিলেন যা আগে কোথাও পাননি। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে সকল লেখকের বইয়ের অমূল্য ভাণ্ডার ছিল এই গ্রন্থাগারে। তিনি সেইগুলো অধ্যয়ন করতে শুরু করলেন। ইতোমধ্যে তাকে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। তিনি রাজনীতিতে দক্ষ ছিলেন না। তাই তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে তাঁর মূল অবলম্বন চিকিৎসা বিজ্ঞানের চর্চার জন্য নিরুদ্দেশ যাত্রায় বেরিয়ে পড়লেন।
ইবনে সিনা অনেক দেশ ভ্রমণ করছেন। তিনি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ নগরী খোয়ারিজমে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি পণ্ডিত আল বেরুনির সাথে সাক্ষাত করেছিলেন। আল বেরুনির মূল উৎসাহ ছিলো ভারতবর্ষ। কিন্তু ইবনে সিনা ভারতবর্ষে আসেননি। তার মূল উৎসাহ ছিল পশ্চিমের দিকে। তাই তিনি খোয়ারিজম থেকে বিদায় নিয়ে গুরুগঞ্জে উপস্থিত হন। এখানে তিনি চিকিৎসা বিষয়ে তাঁর অমর গ্রন্থ ‘কানুন ফিত তিব’ রচনা করেন। এবার ইবনে সিনার যাত্রার দিক ইরানে। তিনি ইরানের সুপ্রাচীন শহর হামাদানে গমন করেন। ঐশ্বর্যশালী এবং ঐতিহাসিক এই নগরীটি ভালো লেগেছিলো ইবনে সিনার। তাই এখানে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। বয়সও হয়েছিল অনেক। তাই তিনি শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি খুঁজছিলেন। হামাদানের সম্রাট তাঁর থাকা-খাওয়া ও নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তিনি এখানে চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে স্বাধীন জীবিকা উপার্জন করতেন। এ সময় হামদানের বাদশাহ শামস-উদ-দৌলা মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। মাত্র ৪০ দিন চিকিৎসা করে ইবনে সিনা তাঁকে মুমূর্ষ অবস্থা থেকে সুস্থ করে তোলেন। এই চিকিৎসায় খুশি হয়ে সম্রাট তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদে নিয়োগ দেন। কিন্তু রাজনীতিতে তিনি ছিলেন বরাবরের মতোই অপরিপক্ক। তাই সুলতানকে হামাদানের সেনাবাহিনীর প্রধান ইবনে সিনাকে বহিষ্কার করে নির্বাসনে দেওয়ার আবেদন জানান। আত্মসম্মানের ভয়ে ইবনে সিনা তার কিছু বন্ধুর সহযোগিতায় হামদান থেকে পালিয়ে ইরানের অন্যতম নগরী ইস্পাহানে চলে যান। ইস্পাহানের সম্রাট তাকে রাজসভায় আশ্রয় দেন।

ইস্পাহানে তিনি শান্তিতে জীবনযাপন করেন। এখানে বসে তাঁর বিখ্যাত দার্শনিক গ্রন্থ ‘আশ-শেফা’ ও ‘আল-কানুন’ রচনা শেষ করেন। তিনি জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘কিতাবুল ইশরাত’ এখানেই রচনা করেন। ইতোমধ্যে হামদান ও ইস্পাহানের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যায়। ইস্পাহানের সম্রাট চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য যুদ্ধ অভিযানে ইবনে সিনাকে হামদানে নিয়ে যান। এখানে এসে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। যুদ্ধ শিবিরে অবস্থান কালে ইবনে সিনা ১০৩৭ খ্রিষ্টাব্দে (৪২৮ হিজরি) মৃত্যুবরণ করেন।

প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৪