ছোট্ট বন্ধুরা, আশা করি ভালো আছো। মাঝে মাঝে ভ্রমণ করলে মন ভালো থাকে। আর তা যদি হয় কোনো শিক্ষামূলক স্থানে, তা হলে তা জ্ঞান অর্জনেও সহায়ক। একবার গেলাম নেত্রকোণা জেলার চীনামাটি এলাকা দেখতে। আজ তার কাহিনিই বলছি। এই চীনামাটি আমাদের দেশের একটি অর্থকরী জিনিস। এটার সাথে যুক্ত আছেন অনেক মানুষ।
আমাদের বাংলাদেশ সুন্দর একটি দেশ। যেখানে আছে অনেক দর্শনীয় স্থান। গারো পাহাড়ের পাদদেশের নৈসর্গিক এক জনপদের নাম নেত্রকোণা। একে মহুয়া মলুয়ার দেশও বলা হয়। হাওড়-বাওড়, খাল-বিল, নদী-নালা নেত্রকোণা জেলার বৈশিষ্ট্য। নেত্রকোণা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ময়মনসিংহ বিভাগের একটি প্রশাসনিক জেলা। এখানে রয়েছে পাহাড়ি জলপ্রপাত, চীনামাটির পাহাড়, টিলা, হাওড়, নদী, খাল এবং অসংখ্য ছোট-বড় বিল। ধান, পাট, গম, কুমড়া, কমলা ইত্যাদি কৃষিপণ্য এই অঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক পণ্য হলেও বিভিন্ন ছোট শিল্প এবং খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে এই জেলায়। কাচ বালি, সিলিকন বালি, কয়লা, কেউলিন (চীনামাটি) এবং পাথর এই জেলায় পাওয়া যায়। ছোট্ট একটি জেলা নেত্রকোণা কিন্তু যার পরতে পরতে জড়ানো সৌন্দর্য। এখানে দেখার মতো আছে গারো পাহাড়, সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি, টংক আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ, সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী, হাজং মাতা রাশিমণি স্মৃতিসৌধ, সাদা মাটির পাহাড়। বালিশ মিষ্টি এই জেলার তথা দেশের বিশেষ আকর্ষণ।
নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের আড়াপারা গ্রামে চীনামাটির পাহাড় । স্থানীয়ভাবে এটি সাদা মাটির পাহাড় নামেও পরিচিত। এটি নেত্রকোণার খুবই পরিচিত ও জনপ্রিয় একটি জায়গা। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই জায়গাটি বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যেও অন্যতম।
নেত্রকোণা জেলার বিরিশিরি এমন একটি পর্যটনের স্থান। বিরিশিরির মূল আকর্ষণ বিজয়পুর চীনামাটির খনি। চীনামাটির পাহাড়, সাদামাটির পাহাড়, গোলাপি পাথরের পাহাড়, সবুজ লেকের পাহাড় ইত্যাদি বিভিন্ন নামে এই চুনাপাথরের অঞ্চলটি পরিচিত। পাশাপাশি ৩-৪টি পাহাড় ও ২-৩টি লেক নিয়ে এই অঞ্চলটি গঠিত। লেকের একপাশে পাহাড় আর অন্যপাশে বিস্তীর্র্ণ অঞ্চল জুড়ে মাঠ।
এ ছাড়াও দেখার মতো আরও রয়েছে রানীখং গির্জা, কমলা রানীর দীঘি এবং সোমেশ্বরী নদী। শীতের সময়টা বিরিশিরি ঘোরার উপযুক্ত সময়। কারণ অনেকটা পথ মাটির। বৃষ্টির দিন কাদামাটির পথ মাড়ানো ঝামেলার। বিরিশিরির সৌন্দর্য কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলিয়ে দেবে সব ব্যস্ততা।
২.
গত জানুয়ারিতে গেলাম ঘুরতে আমরা কয়েকজন। আমরা বলতে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণি ও ভার্সিটি পড়ুয়া কিছু বন্ধু আর আমাদের সাথে ঘুরতে যাওয়া একটি পরিবার। ছিলেন আমাদের এক স্যার। মোট সাত জন বেরিয়ে পড়লাম নাটোরের গুরুদাসপুর থেকে নেত্রকোণার উদ্দেশ্যে। আমাদের ভ্রমণের সব আয়োজন করে দিলো ট্রাভেল বাংলা হলিডেজ নামে একটি ভ্রমণ সংস্থার এক আপু ও এক ভাইয়া। ফলে কোনো অসুবিধাই হলো না।
সকালে রওয়ানা হয়ে পৌঁছে গেলাম নেত্রকোণা দুপুর নাগাদ। পৌঁছাতে মোটামুটি ৫ ঘণ্টা লেগেছিলো। নেত্রকোণায় কিছু হোটেল আছে আর আছে সরকারি ডাকবাংলো। ডাকবাংলোয় থাকার ব্যবস্থা হলো। আমাদের সাথে আছে দুটো শিশু; যথাক্রমে পাঁচ ও সাত বছর বয়সী। তাদের কথা ভেবেই হোটেল নেয়া ও এক রাত্র হল্ট করা। ওদের পরিবারের জন্য এক রুম আর আমার তিন বান্ধবী ও আমি মিলে এক রুম। রুমটা বেশ বড়। ফলে কোনো অসুবিধাই হলো না। আমাদের এক স্যারকে দেয়া হলো আলাদা একটি ছোট রুম। দুপুরের পরপরই ঘুরতে বের হয়ে গেলাম আমরা।
বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক আবহাওয়া, কংশ-টেপা-সোমেশ্বরীর কাশবন আর দূরে আকাশে হেলান দিয়ে গম্ভীর গারো পাহাড়ের ধ্যানমগ্ন প্রতিকৃতি সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই সৌন্দর্যপিপাসুদের মন কেড়ে নেয়। জানা গেলো, বর্ষায় সোমেশ্বরীর তীরবর্তী বিরিশিরির সৌন্দর্য বেড়ে যায় অনেক গুণ। আমরা পরদিন যাবো বিরিশিরি। আরও কিছু এলাকা ঘুরে সন্ধ্যায় ডাকবাংলোতে ফিরে এলাম।
৩.
প্রথমেই দেখবো চীনামাটির পাহাড়, যার বুক চিরে জেগে উঠেছে নীলচে-সবুজ পানির হ্রদ। সাদামাটি পানির রঙটাকে যেন আরো বেশি গাঢ় করে দিয়েছে। তবে বিরিশিরি গিয়েই এ সুন্দর দৃশ্য দেখতে পাবে না, যেতে হবে আরেকটু দূরে বিজয়পুর।
পরদিন ভোর ছ’টায় যখন দুর্গাপুর বাজার পৌঁছলাম, জানুয়ারির শেষ সময়ে গ্রামের সেই ভোরে ছিল হাড়কাঁপানো শীত। বিরিশিরি ঘুরতে গেলে অটো ভাড়া করে ঘুরতে হয়। চাইলে রিজার্ভ করেও নেয়া যায়। দলীয়ভাবে গেলে ভাড়া এমনিতেই কমে আসে। আমাদের সব ঠিক করা ছিলো, ফলে কোনো অসুবিধা হলো না। দুটো অটোতে করে চললাম।
কুয়াশাঢাকা শীতের সকালে সোমেশ্বরী নদী যেন মৃতপ্রায়। আমাদের নদী পার হয়ে যেতে হবে। নদী পারাপারের খরচ এই অঞ্চলের প্রতিটি ঘাটেই এক রকম- জনপ্রতি ৫ টাকা। একই নৌকায় মানুষের সাথে গরু, সাইকেল, মোটর সাইকেলও পারাপার হয়। সময় লাগে ৫ মিনিটের মতো।
নদী পার হয়ে শুরু হলো পরবর্তী যাত্রা পথের জন্য সময় অনুযায়ী যানবাহন নির্বাচনের পালা। আগে থেকেই ঠিক করেছিলাম- চীনামাটির পাহাড় আর সোমেশ্বরী নদী- শুধু এই দুটি স্থান ঘুরে দেখবো। আবারও অটোযাত্রা। সবাই বসে পড়লাম। এর পর রানীখং গীর্জা, কমলার বাগান দেখলাম। শীতকাল কিন্তু কমলা ফলনের সময় নয়।
সবুজ পানির লেকের ধারে বসে আলাপ জমালাম স্থানীয় এক অটোচালকের সাথে। তার নাম জামাল। আমি মামা ডাকলাম। জামাল মামা জানালেন এলাকার ইতিহাস। আমাদের শেষ গন্তব্য সোমেশ্বরী নদী। সেখানে পৌঁছে যে দৃশ্য দেখলাম তা স্বর্গীয় বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। সুদূরে জাফলংয়ের পাহাড়ের হাতছানি আর নদীর মাঝে জেগে ওঠা সোনালি বালুর চর মিলে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করেছিল।
নদীর পানি এত স্বচ্ছ আর পরিষ্কার ছিলো, যেন মনে হয় তলা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিলো। আমি এক সময় পানিতে নেমে যাই। অবশ্য ঘাটের কাছেই। হিমশীতল পানির হালকা স্রোতধারা এক অন্যরকম ভালোলাগার অনুভূতি জাগিয়েছিল।
সোমেশ্বরী নদীর সৌন্দর্য এতটাই মোহনীয় যে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা এখানে অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা চলছিলো নিজ গতিতে। তাই আমাদেরও ফিরে আসতে হলো। আবার বিরিশিরি ঘাটে নামিয়ে দেন অটোওয়ালারা। আবারও নদী পারাপার। এর পর আগের নিয়মে ফিরতি পথে ফিরে এলাম নাটোর হয়ে গুরুদাসপুর।
কীভাবে যেতে হবে: ঢাকা থেকে নেত্রকোণা ও সুসং দুর্গাপুরগামী বাস ছেড়ে যায়। অন্যান্য এলাকা থেকেও বাস আছে। ট্রেনেও যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে সুসং দুর্গাপুরে যাওয়ার এবং ফেরার জন্য সবচাইতে ভালো হবে নাইট কোচ বাস সার্ভিস। ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সুসং দুর্গাপুরে উদ্দেশ্যে নাইট কোচসহ দিনে ও রাতে বেশ কিছু বাস ছেড়ে যায়। এই বাস সুসং দুর্গাপুরের প্রাণকেন্দ্রের সামনে নিয়ে নামাবে।
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৪



