আবির আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই আম্মুকে জোরে জোরে শব্দ করে বলতে লাগলো, আম্মু আমি কিন্তু ডিম ভাজি দিয়ে নাস্তা করবো|
আম্মু বললেন, রোজ তো তাই খাস| আজকে নতুন করে আবার বলার কী আছে?
– নতুন করে বলার কারণ আছে আম্মু| আমি কিন্তু এক হালি ডিম ভাজি খাবো|
– কী!
– আম্মু, বুঝো না, এক হালি এক হালি|
– ডিম কী গাছে ধরে? ঝাঁকাইলে পড়বে? এতো ডিম নাই|
আবির না শোনার ভান করে বলে, আম্মু এক হালি, এক হালি|
আম্মু এবার আর কোনো প্রতি উত্তর করে না| আবির বাবলুর রুমের দরজার পাশেই ছিলো| সেখান থেকে জোরে জোরে আম্মুর সাথে কথা বলছিলো| সে আবার চিৎকার করে বললো, আম্মু এক হালি আনতে বলবো? একথা বলেই আবির বাবলু’র রুমের দরজায় নাম ধরে শব্দ করে ডাকতে থাকলো| সে বিছানা থেকেই বললো, দরজা খোলা আছে| বলেই মাথা গায়ে লেপ দিয়ে ঘুমানোর ভান করে থাকলো| আবির দরজা খুলে রুমে ঢুকেই বলল, ও মা! তুই এখনো ঘুমাচ্ছিস? ওঠ, ওঠ। আম্মু তোকে দোকান থেকে এক হালি ডিম নিয়ে আসতে বললো|
লেপের ভিতর থেকে বাবলু বললো, আম্মুকে বলো ফ্রিজে এক লিটার একটা সেভেন আপ আছে| সেটা বের করে রান্নার কাজ শেষ করতে|
আবির একটুকুও ক্ষেপলো না| বললো, আরে ভাইয়া ঠান্ডার দিনে পানীয় চলে? চলে হচ্ছে ডিম ডিম| আমি তো এক হালি ডিম দিয়ে নাস্তা করবো আজকে|
– তুমি এক হালি খাও আর দেড় হালি খাও না হয় দুই হালি খাও তাতে আমার সমস্যা কী? বলেই পা দিয়ে গায়ের লেপ লাথি দিয়ে সরিয়ে বের হয়ে গেল বাবলু| আবির ও বাবলু দুই ভাই| এক বছরের ছোট-বড় হলেও সমবয়সী বলা চলে| ফুটবল বিশ্বকাপের জ্বরে সারা দেশ যেমন দুই ভাগ হয়ে গেছে| তেমনি আবির বাবলুদের বাড়িও দুই ভাগ হয়ে গেছে| দুই ভাইয়ের দুই দেশ| আবির করে ব্রাজিল আর বাবলু আর্জেন্টিনা| বাইরে যেমন দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে সব সময় বাক-বিতণ্ডা লেগে থাকে, তেমনি আবির ও বাবলুদের মাঝেও লেগে থাকে|
দুই ভাইয়ের দুই দলের সমর্থক হওয়ায় ওদের আব্বুর হয়েছে বিপদ| চাইলেও পছন্দের দলের জার্সি পরতে পারছেন না| দুই ভাইকে দুই দলের রেডিমেড জার্সি কিনে দিলেও নিজের জার্সিটা দর্জির কাছে বানিয়ে নিতে হয়েছে| যার এক সাইড ব্রাজিল আর অন্য সাইড আর্জেন্টিনা| সেটা বানিয়েও রক্ষা নেই| ছোট ছেলে এটা নিয়েও অভিমান করলো| অভিমানের কারণ হলো ব্রাজিলের সাইড পড়ে গেছে বাম পাশে আর আর্জেন্টিনার সাইডটা পড়ে গেছে ডান দিকে| বাবুলের কথা বাম সাইডে হার্ট থাকে তুমি সেই জন্য ঐদিকে ব্রাজিল রেখেছো না? আব্বু বিভিন্ন ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু কোনোভাবেই বোঝাতে পারে নাই| যে কারণে সে জার্সিও তিনি পরছেন না| ছেলেদের মন রক্ষা করে চলতে হবে তো| তবুও মাঝে মাঝে ওদের দল নিয়ে রসিকতা করেন| কখনো সে রসিকতা আর্জেন্টিনার পক্ষে হয়ে যায়| কখনো হয়ে যায় ব্রাজিলের পক্ষে|
গতকাল তো ওদের নাম নিয়ে রসিকতা করলেন| তাতে অবশ্য দুজনের তেমন কেউ কোনো মন খারাপ করেনি| তবে নাম বদলের বিষয়টাতে তারা রাজি হয়নি| নাম বদলের ঘটনাটা বলি| আবির এর আ দিয়ে হয় আর্জেন্টিনা| আর বাবলুর ব দিয়ে হয় ব্রাজিল| অথচ আবির করে ব্রাজিল আর বাবলু আর্জেন্টিনা| এটা হইলো? তাই বাবা ঠাট্টা করলো, হয় তোমরা দল পরিবর্তন করো না হয় নাম পরিবর্তন করো| কিন্তু কেউই এটাতে রাজি হলো না|
ডাইনিং রুমে গিয়ে আব্বু-আম্মুর একসাথে দেখা পেলো বাবলু| বাবলু বললো, আম্মু তুমি কি আমাকে ডিম আনতে যেতে বলেছো|
– কই, না তো| বললো আম্মু|
– আম্মু তুমিই না বললে ডিম নাই বাসায়| বাবলুকে ঠেলে ডাইনিং-এ ঢুকতে ঢুকতে বললো আবির|
– সবার জন্য তো ডিম ভাজা হয়ে গেছে| এখন তো আর লাগতেছে না|
– আমার জন্য না এক হালি ডিম ভাজার কথা|
– অ্যাই, এক হালি ডিম কেউ একসাথে খায় নাকি? জিজ্ঞেস করে আম্মু|
আম্মুর কথা শুনে আব্বু মুচকি মুচকি হাসতে শুরু করলো| আব্বু বিষয়টা বুঝতে পেরেছে কিন্তু আম্মু পারে নাই|
– কেউ খায় না বলে যে আমার খাওয়া যাবে না, তা কোথাও লেখা আছে? বলে আবির|
– খাবে না তুমি হালি, তোমার খাওয়া লাগবে গালি| বলেই হন হন করে বাইরে বেরিয়ে গেল বাবলু|
আম্মু চিৎকার করে বলে, অ্যাই কই যাস, নাস্তা করবি না?
ওদিক থেকে বাবলুর আওয়াজ আসে, মুখ ধুয়ে আসতেছি| এদিকে আবিরও ফ্রেশ হওয়ার জন্য বাইরে গেল|
আব্বু আম্মুকে বললো, এই ডিম তারপর হালি এগুলো নিয়ে আর কথা বাড়িও না| অন্য দিকে কথা নিয়ে যাও|
– কেনো?
– আরে গতকাল রাতে ব্রাজিল এক হালি গোল দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে| আর সে জন্য তোমার আবির হালি হালি নিয়েই ক্ষেপাচ্ছে বাবলুকে|
– ও মা, তাই নাকি!
– হুম| আচ্ছা শোনো, তুমি কোনো কথাই বলবে না| আমি ওদের কে অন্যদিকে ডাইভার্ট করতেছি|
একটু পরে দুই ভাই ফিরে এলো ডাইনিং এ| নাস্তা করতে শুরু করলো|
আব্বু বলল, তোমরা তো কালকে আমার কথা মানলে না?
দুই ভাই একসাথে বলে উঠলো, কোন কথা আব্বু?
– নাম বদলের| আচ্ছা শোনে নাম বদলাতে হবে না| সংযুক্ত করতে হবে| যাতে বোঝা যায় তুমি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা|
– আবির বলে সেটা কী রকম?
– হুম, বলছি| বলেই পানির গ্লাস নিয়ে তিনি ঢক ঢক করে পানি পান করলেন| এরপর বলেন আবির যেহেতু ব্রাজিল করে ওর নাম হবে আবির ওরফে নেইজার| মানে নেইমারের নামের সাথে মিল রেখে আরকি| আর বাবলু যেহেতু আর্জেন্টিনা করে ওর নাম বাবলু ওরফে লিও টিন| মানে লিওনেল মেসি’র লিও আর আর্জেন্টিনার টিন|
দুই ভাই বাবার রসিকথায় মনে মনে হাসতে শুরু করে|
আব্বু বলে, তোরা যদি দেশ ত্যাগ করে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনাও চলে যাস তবুও মানুষ নামের টাইটেল শুনে বলবে ওরা দুজন তোছাদ্দেক হোসেন এর পুত্র|
– কেমনে? দুই ভাই এক সাথে জানতে চায়|
– তোমাদের দুজনের নামের শেষের টাইটেল কী? টাইটেল হলো জার আর টিন| দুটোর মানে একই|
– কী সেটা? জিজ্ঞেস করে আবির|
এবার আম্মু মুচকি মুচকি হাসতে থাকে|
আব্বু বলে, আমি তো প্লাস্টিক এর বয়াম আর টিনের কৌটা তৈরির ব্যবসা করি|
– হুম| তার সাথে এর সম্পর্ক কী? বলে আবির|
– সম্পর্ক তো একই| জার মানে বয়াম| যেমন কাচের জার প্লাস্টিকের জার| আবার টিন মানেও তাই| যেমন মুড়ির টিন বিস্কুটের টিন|
আম্মু এবার শব্দ করে হাসতে থাকলো| আম্মুর হাসিকে পাত্তা না দিয়ে আব্বু আবার বললো, তাহলে তোমাদের নাম হলো নেইজার আর লিও টিন| ঠিক আছে তো|
আব্বুর কথায় এবার শব্দ করে হেসে উঠলো দুই ভাই সাথে আম্মু| কিছুক্ষণের মধ্যে আব্বুর হাসির শব্দও যোগ হলো ওদের সাথে|



