বৃদ্ধ জেলে তার তরুণ ছেলেকে নিয়ে সাগরে মাছ ধরছে। ছেড়া জাল ও ভাঙা নৌকা নিয়ে মাছ ধরছে তারা। বৃদ্ধ জেলেটি জাল ফেলছে সাগরে, আবার টেনে তুলছে। ছেলেটি শক্ত হাতে নৌকা নিয়ন্ত্রণ করছে। কাজটি বেশ কষ্টের। সেই সকাল থেকে তারা সাগরে জাল ফেলছে আর তুলছে, কিন্তু মাছ উঠছে না জালে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। বৃদ্ধ জেলে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
আবার তারা জাল ফেলে সাগরে। এবার বৃদ্ধ জাল টেনে তুলতে গিয়ে বুঝতে পারে, জালে মাছ আটকেছে। বড় ভারী একটি মাছ, এমনি মনে হচ্ছে বৃদ্ধের কাছে। স্বাভাবিকের চেয়েও ভারী ঠেকছে তার জাল। মাছ, নাকি অন্যকিছু? জালের সূক্ষ¥ সুতায় এ কেমন শীণ শীণ শব্দ! বৃদ্ধ জেলে তার সারা জীবনের অভিজ্ঞতায়ও জালে এমন শব্দ শুনতে পায়নি। বুঝে উঠতে পারছে না, জালে তার কী মাছ ধরা পড়েছে। জাল ঝাঁকি দিচ্ছে প্রচণ্ড বেগে। যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতে চায় মাছটি। বৃদ্ধ জেলে অবশেষে টেনে টেনে জাল নৌকায় তোলে।
জালে যে মাছটি উঠে এসেছে, সেটি দেখে তারা ভীষণ অবাক হয়। বড়োসড়ো সুন্দর একটি মাছ। মাছটি লম্বায় বৃদ্ধের তরুণ ছেলেটির মতো। মাছের গায়ের রঙ উজ্জ্বল সোনা রঙের। বিকেলের সূর্যের কোমল আলো মাছটির গায়ে পড়ে ঝিলিক দিয়ে উঠছে। চোখ ঠিকরে যায় ঝলকে। উত্তাল সাগরে তাদের ভাঙা নৌকাটি সোনামাছের আলোয় ঝলসে ওঠে।
এমন সুন্দর সোনা রঙের মাছ পেয়ে পিতাপুত্র ভীষণ খুশি। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তরুণ ছেলেটির মন বিষাদে ছেয়ে যায়। কেন এমন হলো? এটি কি আসলেই কোনো মাছ? নাকি অন্য কিছু?
বৃদ্ধ জেলে তার ছেলেকে বলে, নিশ্চয়ই এটি কোনো সাধারণ মাছ নয়রে খোকা। এটি সোনামাছ। এই মাছের বংশজাত কেউ একজন সাগরের সকল মাছের অধিপতি, মৎসরাজ। এই মাছটি বিক্রি করলে অনেক অর্থ পাওয়া যাবে। যেমনি এর গায়ের রঙ, তেমনি এর আকৃতি। রাজকীয় মাছ। এই মাছ রাজ-রাজারাই খায়। আমাদের দ্বীপের খান সাব এই মাছটি পেলে নিশ্চয়ই অনেক দাম দিয়ে কিনে নিবেন।
বাপ-ছেলে নৌকা বেয়ে সাগর কূলে আসে। বৃদ্ধ জেলে তার পুত্রকে বলে, তুমি নৌকায় বসে মাছটিকে নজরে রেখো। আমি খানের প্রাসাদে যাই। তাকে এমন মাছের কথা বলে আসি। শুনে তিনি নিশ্চয়ই খুশি হবেন। অনেক দাম দিয়ে কিনে নেবেন মাছটি। তুমি ততক্ষণে নৌকায় বসে পাহারায় থাকো।
ছেলেকে কূলে রেখে বৃদ্ধ জেলে চলে যায় খান সাহেবের প্রাসাদে।
বিকেল বেলায় খান সাব আয়েশী ভঙ্গিতে তার দহলিজে বসে হুঁকো ফুঁকছিলেন। আশেপাশে ছিল তার খাস নওকর, নায়েক, পেয়াদা ও নাজির।
ঠিক সেই মুহূর্তে বৃদ্ধ জেলে তার দহলিজে গিয়ে হাজির। জেলেকে খান সাব আগে থেকেই চেনেন। অনেক মাছ কিনেছেন তিনি এই বৃদ্ধ জেলের কাছ থেকে। জেলেটি করজোড়ে সালাম দিয়ে খান সাবকে বলে, জাঁহাপনা, আজ ভাগ্য আমার বড়ই সুপ্রসন্ন। সাগর থেকে বড় এক মাছ ধরেছি। সোনা রঙের মাছ। দেখতে যেমনি সুন্দর, তেমনি মাছের গায়ের রঙ। স্বাদেও ভীষণ রকমের মজাদার হবে নিশ্চয়ই। মাছটি আমার নৌকার পানিতে জিইয়ে রেখেছি। আপনি যদি দয়া করে একবার আসতেন! যদি মাছটি একবার দেখতেন, নিশ্চয়ই বড় ভালো লাগবে আপনার।
খান সাহেব ওইদিন বড় খোশমেজাজে ছিলেন। জেলের কথা শুনে তিনি আর দেরি করলেন না। নওকর, কোতোয়াল ও নাজিরকে নিয়ে তিনি ঘোড়ায় চেপে বসলেন। ছুটে এলেন সাগর পাড়ে। আগের দিনের রাজা-বাদশারা ঘোড়ায় চেপে চলাফেরা করতেন।
এদিকে, সোনা রঙের মাছটি নৌকার ভেতরের অল্প পানিতে হাঁসফাঁস করছিল। পুচ্ছ নাড়ছিল আর মুখ হা করে বড় কষ্টে শ্বাস ছাড়ছিল। মাছের এমন হাঁসফাঁস দেখে তরুণ জেলেপুেত্রর মন ভীষণ রকমে খারাপ হয়ে যায়। মায়ায় পড়ে যায় মাছটির। মনে মনে বলে, আহারে মাছটি। এমন সুন্দর সোনামাছ, কী কষ্টই না পাচ্ছে। দম ছাড়তে পারছে না। কিছুক্ষণ পর তো মারা পড়বে মাছটি। বাবা সেই কখন যে গেল, এখনো ফিরে এলো না।
তরুণ জেলেপুত্র মাছটিকে দু’হাত দিয়ে ধরে। মনের গহীনে যেন সে শুনতে পায়, মাছটি বলছে, আমাকে ছেড়ে দাও, বন্ধু। মেরে ফেল না আমাকে।
কোনো কিছু না ভেবেই মাছটিকে সাগরে ছেড়ে দিল সে। ‘যাও প্রিয় সোনামাছ, চলে যাও তুমি তোমার বাবা-মার কাছে। আর ধরা দিও না আমাদের জালে। পরের বার ধরা পড়লে কিন্তু তোমাকে আর কেউ বাঁচাতে আসবে না। জেলেপুত্র ছেড়ে দিল সোনামাছটিকে।
মাছটি ছাড়া পেয়ে তার পুচ্ছ নাচিয়ে সাগরে ডুব দেয়। আবার ভেসে ওঠে। খুশিতে লাফ দিয়ে আকাশের উপরে উঠে যায়। আবার ডিপ করে সাগরে পড়ে। মাছটির খুশি যেন আর ধরে না। সে সাঁতরিয়ে ঢেউয়ের দোলায় খেলা করে। তারপর কোনো এক সময় জলের অতল তলে অদৃশ্য হয়ে যায়।
এর কিছুক্ষণ পরই খান সাহেব নওকর, কোতোয়াল ও নাজিরকে নিয়ে বৃদ্ধ জেলের সাথে হাজির হন সাগরপাড়ে। এসে তিনি বৃদ্ধ জেলেকে বলেন, কই, দেখাও তোমার সোনা রঙের মাছটি।
খান সাহেব ঘোড়া থেকে নেমে নৌকার কাছে যান। বৃদ্ধ জেলেও ছুটে যায় নৌকায়। কিন্তু কই, মাছটি কই? জেলের ছেলেটি নৌকায় বসা। সে দাঁড়িয়ে খান সাহেবকে বলে, দুঃখিত খান সাব। মাছটি আমি ছেড়ে দিয়েছি। এমন মাছটিকে দেখে আমার বড্ড মায়া হয়। তাই, আমি মাছটিকে ছেড়ে দিয়েছি সাগরে।
ছেলেটির এমন কথা শুনে রাগে ফেটে পড়লেন খান সাহেব। খামোশ ছেলে! তুমি কার সাথে কথা বলছো? ভুলে গেছো আমি কে? আমার সাথে বেয়াদবি! তোমার জন্য কী শাস্তি অপেক্ষা করছে ভাবতে পারো? এই কে আছিস। বেঁধে ফেল এই পামরকে। তারপর এই নৌকায় ভাসিয়ে দে সাগরে।
উপস্থিত নওকর ও কোতোয়াল ছুটে এল নৌকায়। বৃদ্ধের ছেলেকে রশি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হলো পাটাতনের সাথে। এ দৃশ্য দেখে বৃদ্ধ জেলে আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি ছুটে গিয়ে খান সাহেবের পায়ে পড়ে গেলেন। ক্ষমা করুন খান সাব। আমার ছেলেটি ভুল করেছে। তাকে ক্ষমা করে দিন।
বৃদ্ধের এমন আকুতি দেখে খান সাহেব আরো ক্ষেপে গেলেন। তিনি ঘোড়ার চাবুক দিয়ে কষে কয়েক ঘা বসিয়ে দিলেন বৃদ্ধের পিঠে। বললেন, ওরে হতভাগা জেলে। আমাকে মিথ্যে বলে এখানে নিয়ে এসেছিস। পৃথিবীতে কেউ কখনো সোনামাছের নাম শুনেছে? আমার সাথে মশকরা? এবার দেখ, কী ভাগ্য বরণ করতে হয় তোর ছেলেকে।
এদিকে খান সাহেবের নওকর ও কোতোয়াল জেলের ছেলেকে নৌকার সাথে আচ্ছে মতো বেঁধে ফেলল। তারপর নৌকাকে সজোরে ধাক্কা মেরে ভাসিয়ে দিলো সাগরে। সবার চোখের সামনে নৌকাটি ভেসে ভেসে চলে গেল গহীন সাগরের দিকে। তখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। কোনো এক সময় সবার দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গেল নৌকাটি।
নওকর, কোতোয়াল ও নাজিরকে নিয়ে খান সাহেব চলে গেলেন সাগর কূল থেকে। হতাশ বৃদ্ধ জেলে একা পড়ে রইলেন সাগরকূলে। শূন্য চারিদিক। পৃথিবীটাই যেন শূন্য হয়ে গেল তার। মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে গেল সব ঘটনা। কী হবে এখন তার? পুত্রহীন একা একা জীবনের বাকি সময়টা কাটিয়ে দিতে হবে তাকে!
বৃদ্ধ জেলে অন্ধকার সাগর পানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। সব কিছু নিকষ কালো অন্ধকার। জেলের জীবনের বাতিটিও নিভে গেল সেই অন্ধকার সাগরে।
এদিকে ভাঙা নৌকায় ভেসে ভেসে বৃদ্ধ জেলের তরুণ ছেলেটি সাগরের আরও গহীনে চলে যায়। অন্ধকার সাগরের উত্তাল ঢেউয়েও ভেসে চলছে তার ভাঙা নৌকা। অন্ধকার ভেদ করে ভেসে কোন গহীনে যাচ্ছে, কেউ জানে না। ভাঙা নৌকায় ভেসে চলছে ছেলেটি। একদিন দুইদিন তিনদিন। কোনো কূল-কিনারা নেই সাগরের। চতুর্থদিন সকালে বলা তরুণ ছেলেটি চোখ মেলে দেখে নৌকা তার ভিড়ে আছে এক অচিন দ্বীপে। দ্বীপের সবকিছুই নতুন। সব কিছুরই ভিন্ন রকম, ভিন্ন গড়ন ও ভিন্ন প্রকৃতি। বৃক্ষলতা পশু-পাখি এবং দ্বীপের পাথুরে বালুও যেন অন্যরকম। তার চেনা পৃথিবীর মতো নয়।
এ কোন পৃথিবী এটি! অবাক বিস্ময়ে দ্বীপের দিকে তাকায় জেলের ছেলেটি। হঠাৎ সে দেখতে পায়, বেশ কিছুটা দূরে ঠিক তার মতোই আরেকটি ছেলে হেঁটে হেঁটে এদিকেই আসছে। ছেলেটির বয়স, উচ্চতা, গায়ের রঙ এবং পরনের পোশাক সবকিছুই হুবহু তার সাথে মিল। একেবারে হুবহু মিল। ছেলেটি যেন তারই প্রতিকৃতি। ডুপ্লিকেট। যেন একটি আপেলের দু’টি টুকরা। চেহারায় এমন মিল কি হয় কখনো পৃথিবীতে?
অচিন দ্বীপের ছেলেটি ততক্ষণে হেঁটে হেঁটে নৌকার কাছে চলে এসেছে। এসে সে নৌকায় বাঁধা জেলের ছেলেটির বাঁধন খুলে দেয়। বন্ধন মুক্ত হয় তরুণ জেলে। অচিন দ্বীপের ছেলেটিকে সে ধন্যবাদ দেয়। বন্ধুত্বের ভালোবাসায় আলিঙ্গন করে তাকে।
অচিন ছেলেটি তার টুপলি থেকে এক টুকরা রুটি বের করে। সেটিকে সে সমান দুই ভাগে ভাগ করে নেয়। তারপর একভাগ নিজের জন্য রেখে অন্যভাগ তরুণ জেলের হাতে দেয়। বলে, নাও বন্ধু, এটি খেয়ে নাও। নিশ্চয়ই অনেক ক্ষুধা পেয়েছে তোমার।
এভাবেই বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয় তারা দু’জন। এমন বন্ধু যেন অনন্তকালের আত্মীয়। যেন একই গাছের দু’টি কুঁড়ি, যেন অবিচ্ছেদ্য দুই ভাই।
তারা দু’জন এবার হেঁটে হেঁটে দ্বীপটি ঘুরে ঘুরে দেখে। এখানে বৃক্ষরাজি, ওখানে ছোট্ট পাহাড়, সেখানে গোচারণ ভূমি। হেঁটে হেঁটে তারা বেশ খানিকটা দূর এগিয়ে যায়। দেখে, এক বৃদ্ধ ছোট্ট একটি গাছের নিচে বসা। সামনে তার বিস্তৃর্ণ চারণভূমি। সেখানে চরে বেড়াচ্ছে এক পাল ভেড়া। তারা দুই বন্ধু মেষ চরানো ওই বৃদ্ধের কাছে এগিয়ে যায়।
ছেলে দু’টি বৃদ্ধের কাছে গিয়ে তাকে সালাম দেয়। বৃদ্ধ লোকটি সালামের জবাব দিয়ে বলেন, আহা, কী সুন্দর দু’টি যুবক। চেহারায় কত মিল! তোমরা এক কাজ করো। সোজা চলে যাও এই দ্বীপের উত্তরে। এখান থেকে তিন দিনের পথ। সেখানে দেখবে এক খান সাহেব বড়ই দুখী। তোমাদের দেখতে পেলে তিনি খুশি হবেন।
যুবক দু’জন জিজ্ঞেস করে, খান সাহেব এতো দুখী কেন? আমাদের দেখে তিনি খুশিই বা হবেন কেন?
মেষপালক বৃদ্ধ বলেন, শোনো তাহলে, বলছি সেই কাহিনি। ওই খান সাহেবের একটি মাত্র মেয়ে। রূপে গুণে অনন্যা। হাসি আনন্দ আর কথাবার্তায় মাতিয়ে রাখতো সে সবাইকে। কিন্তু একদিন কী হলো, মেয়েটি কথা বলা বন্ধ করে দিল। যেন মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে কেউ। সেই থেকে আজ পর্যন্ত মেয়েটি কোনো কথা বলে না। আগের মতো হাসি তামাশাও করে না কারো সাথে। অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কেউ তাকে কথা বলাতে পারেনি। খান সাহেব অবশেষে ঘোষণা করলেন, তার মেয়েকে যে কথা বলাতে পারবে তাকে খুবই মূল্যবান এক পুরস্কার দিবেন তিনি। এমন পুরস্কার, যা কেউ কোনোদিন পায়নি। আর যদি কেউ এসে চেষ্টা করেও তাকে কথা বলাতে না পারে, তাহলে তার গর্দান কেটে নেয়া হবে। কত মানুষ যে চেষ্টা করতে গিয়ে জীবন বিসর্জন দিয়েছে। আহারে হতভাগারা।
বৃদ্ধ মেষপালক বললেন, তোমাদের দেখতে তো বেশ বুদ্ধিমান মনে হয়। তোমরা সেই খান সাবের বাড়ি গিয়ে নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করে আসতে পারো। আমার ধারণা, তোমাদের কপাল খুলে যেতে পারে হয়তো।
বৃদ্ধের কথা শুনে যুবক দুটি অবাক হয়। তারাও সিদ্ধান্ত নেয়, খান সাহেবের বাড়ি যাবে তারা। নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করে আসবে। হয় এসপার, না হয় ওসপার।
তিন দিনের যাত্রা শেষে তারা দুই বন্ধু সেই খান সাহেবের প্রাসাদে গিয়ে ওঠে। সোজা চলে যায় তারা প্রাসাদের সিংহ দরজায় কাছে। এবার দ্বীপের নতুন যুবকটি তার বন্ধু জেলে যুবককে বলে, বন্ধু, আগে আমি গিয়ে দেখি খানের কন্যার মুখে কথা বলাতে পারি কিনা। যদি সফল হই এবং খানের কাছ থেকে পুরস্কার পাই সেটি আমরা দু’জনে সমান ভাগ করে নেব। আর যদি আমি ব্যর্থ হই, তাহলে তো তোমার সাথে আর দেখা হবে না। গর্দান কাটা যাবে আমার। তুমি তখন যদি চাও তো তোমার ভাগ্যটাও পরীক্ষা করে নিও। আর যদি না চাও, তাহলে চলে যেও তোমার দেশে। বিদায় বন্ধু, বিদায়। এই বলে নতুন দ্বীপের নতুন যুবকটি খান সাহেবের প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করে।
প্রাসাদের ভিতরে যাওয়ার পর পরই খান সাহেবের মেয়ের দুই দাসী ছুটে এলো যুবকটির কাছে। তারা তাকে কুর্ণিশ জানিয়ে বলল, সাবধান যুবক! তোমার মতো হাজারো যুবক এসে চেষ্টা করেছে। কিন্তু খানকন্যাকে কেউ কথা বলাতে পারেনি। শেষে জীবন দিতে হয়েছে। তুমি বেশ সুদর্শন। দেখে বড় মায়া হয়। আহারে, শেষে তোমার জীবনটাও চলে যায় কিনা, কে জানে।
কিন্তু নির্ভীক তরুণ যুবকটি বলে, সে চিন্তা তোমাদের করতে হবে না। তোমরা আমাকে বোবা মেয়েটির খাস কামরায় যাওয়ার পথ দেখিয়ে দাও। নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতেই আমি ভালোবাসি।
দাসী দুজন যুবকটিকে খানকন্যার ঘরে নিয়ে যায়। যুবকটি বোবা হয়ে থাকা সুন্দরী মেয়েটিকে সালাম দিয়ে বলে, ক্ষমা করবেন হে সুন্দরী খানকন্যা, আমি তোমাকে কথা বলাতে আসিনি। আমি এসেছি তোমাকে একটি গল্প শোনাতে।
এ কথা বলে যুবকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। ভাবছে, দেখি গল্প শোনার অনুপ্রেরণায় মেয়েটি কিছু বলে কিনা। কিন্তু না, মেয়েটি আগের মতোই নির্বিকার বসে রইল। শুধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে যুবকটির দিকে। হয়তো মনে মনে ভাবছে, আহারে যুবক! শেষে তোমাকেও প্রাণ দিতে হবে?
নতুন দ্বীপের তরুণ যুবকটি ভাবল, প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হলো তার। গল্প শোনার আগ্রহ জানাতে মেয়েটি তাকে কোনো অনুরোধই করল না। অথচ গল্প শুনতে সবাই ভালোবাসে।
এবার যুবকটি বলে, আমি আমার জীবনের গল্পটিই বলব তোমাকে। আমরা তিন ভাই। একদিন তিন ভাই বনে গেলাম জ্বালানি কাঠ কাটতে। আমার বড় ভাইটি খুবই দক্ষ চিত্রকর। সে একটি গাছের ডাল কেটে সেই ডালটি খোদাই করে সুন্দর এক পক্ষীর অবয়ব বানিয়ে ফেলে। পাখিটি দেখতে এতোটাই নিখুঁত যে একেবারেই জীবন্ত বলে মনে হয়। এই বুঝি পাখিটি উড়ে যাবে, এমনি নিখুঁত পাখি হয়ে উঠল সেটি।
এমন সময় আমার মেজো ভাই, আমাদের রেখে বনের আরো গহীনে চলে যায়। অনেকক্ষণ পর ফিরে আসে সে অদ্ভুত কিছু বিচিত্র রঙের পাখির পালক নিয়ে। পালকগুলো সে পাখিটির কাছে রাখে। এদিকে আমি করলাম কি, সেই পালকগুলো একটি একটি করে ওই খোদাই করা পাখির গায়ে বসিয়ে দিতে লাগলাম। এতে করে পাখিটি আরো সুন্দর ও জীবন্ত হয়ে ওঠে।
ঠিক তখন বনের ভিতর থেকে অন্য একটি পাখি অচেনা স্বরে ডেকে ওঠে। টিউ টিউ টিউ, টিট টি টিউ। আর তখনি ঘটে অবাক করা এক ঘটনা। আমার হাত থেকে আমাদের বানানো পাখিটি ফুরুৎ করে উড়ে চলে যায় বনের ভিতরে সেই অচেনা স্বরে ডেকে ওঠা পাখিটির কাছে। এরপর পাখিটিকে আর খুঁজে পাইনি আমরা।
পাখিটি চলে যাবার পর আমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। পাখিটি কার স্পর্শে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এই নিয়ে ঝগড়া। বড় ভাই বলে, পাখিটি তার কারণেই জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কারণ তিনিই এমন নিখুঁতভাবে খোদাই করে পাখিটি এঁকেছে। মেজো ভাই বলে, না না, পাখিটি আমার কারণে জীবন্ত হয়ে ওঠে। আমি যদি বনের গহীন থেকে এমন সুন্দর পালকগুলো কুড়িয়ে না আনতাম, তা হলে পাখিটি জীবন্ত হয়ে উড়ে যেতে পারতো না। আমার পালক পেয়েই পাখিটি জীবন্ত হয়ে ওঠে। আর আমি বলি, পাখিটি আমার কারণেই এমন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আমি যদি পাখির গায়ে পালকগুলোকে সঠিক স্থানে সঠিক পালকটি বসিয়ে না দিতাম, তাহলে পাখিটি জীবন ফিরে পেত না।
আমরা তিন ভাই এখনো নিজেদের পক্ষেই যুক্তি দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কেউ কারো যুক্তি মেনে নিতে পারছি না। সবাই নিজের যুক্তিটাকেই সঠিক বলে মনে করছি। এখন তুমি কি বলতে পারবে, আসলে কার হাতের ছোঁয়ায় পাখিটি জীবন্ত হয়ে উঠেছে?
এ কথা শুনে খানকন্যা নিজের আসন থেকে ওঠে দাঁড়ায়। তার চোখ মুখ ও চোখের পাপড়ি আন্দোলিত হয়। মৃদু হাসির একটি আভা ছড়িয়ে পড়ল তার ঠোটে। কিন্তু না, একটি কথাও সে উচ্চারণ করল না। হঠাৎ সে নিজের হাতের তর্জনি দিয়ে নিজের ঠোট চেপে ধরল এবং মাথা ঝাঁকাল। অর্থাৎ সে কোনো কথা বলবে না।
এ অবস্থায় তরুণ যুবকটি ভীষণ ক্ষেপে যায়। সে চিৎকার দিয়ে বলে, তোমার জন্য যদি আজ আমাকে মারা যেতে হয় তাহলে, মনে রেখো এই তরবারি দিয়ে আমি এক্ষনি তোমার গর্দান কেটে নেব। এই বলে সে কোমড়ে ঝুলিয়ে রাখা তার তলোয়ার বের করে এবং হাতে নিয়ে হাওয়ায় কয়েকবার তরবারি চালায়।
যুবকটির এমন রাগান্বিত চেহারা দেখে মেয়েটি এবার ভয় পায়। ভয়ে সে তখন চিৎকার দিয়ে বলে, ‘না আমাকে মেরো না।’ এই বলে মেয়েটি আছড়ে মাটিতে পড়ে যায়। ঠিক তখনি একটি সাদা রঙের সাপ বের হয়ে আসে মেয়েটির মুখ থেকে। সেটি ফনা তোলে মেয়েটিকে ছোবল মারতে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তরুন ছেলেটি তরবারির এক কোপে সাপটি দু’ভাগ করে ফেলে। মরে যায় সাপটি।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মেয়েটি। চোখ তার অশ্রুসিক্ত হয়। সে বলে, এই সাপটিই এতোদিন আমাকে কথা বলতে দেয়নি। কথা বললেই সে আমাকে ছোবল দিয়ে মেরে ফেলবে, এমন ভয় দেখিয়েছে। ধন্যবাদ হে যুবক।
মেয়েটি তার হাত থেকে নিজের হীরার আংটিটি খুলে যুবকের হাতে দেয়। তারপর বলে, আংটিটি নিয়ে তুমি আমার বাবার কাছে যাবে। এটি দেখতে পেলে তিনিই তোমাকে পুরস্কৃত করবেন।
তরুণ যুবকটি চলে আসে খানকন্যার খাস কামড়া থেকে। এরপর সে সোজা চলে যায় খানপ্রাসাদের বাইরে। যেখানে তার তরুণ জেলে বন্ধু অপেক্ষা করছে। খুশি ও আনন্দে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ভাগ্য তোমার খুলে গেছে বন্ধু। খানকন্যা কথা বলেছে। এবার তোমার পুরস্কার নেবার পালা। এরপর সে তার জেলে বন্ধুর কাছে কী ঘটেছিল সব খুলে বলে। কিভাবে গল্প বলেছিল, কিভাবে মেয়েটিকে ভয় দেখিয়ে কথা বলতে বাধ্য করেছিল, সবকিছু খুলে বলে সে তার জেলে বন্ধুকে।
এরপর খানকন্যার কাছ থেকে পাওয়া উপহার হীরার আংটিটি তার বন্ধুর হাতে পরিয়ে দিয়ে বলে, এই নাও বন্ধু, এই হীরার আংটিটি নিয়ে তুমি চলে যাও খান সাহেবের কাছে। এই আংটিটি দেখালেই তিনি তোমাকে পুরস্কৃত করবেন। একই চেহারা আমাদের, কণ্ঠস্বরও আমাদের একই। ঘুর্ণাক্ষরেও কেউ টের পাবে না, কে তুমি, আর কে আমি। তাছাড়া, আমি তো মানুষ নই। আমি মৎস কুমার। তোমাদের খানের পুরস্কার নিয়ে আমি কী করব?
দ্বীপের যুবক বন্ধুটি বলে, এবার আমার বিদায় নেবার পালা বন্ধু। খুব দ্রুতই আমাকে গা ঢাকা দিতে হবে। তা না হলে, সবকিছু ফাঁস হয়ে যেতে পারে। তবে, যাবার আগে আমার নিজের কাহিনী বলে যাই তোমাকে। দ্বীপের বন্ধুটি বলে, আমিই তোমাদের জালে ওঠা সেই সোনামাছ। যে মাছটিকে তুমি করুণা করে সাগরে ছেড়ে দিয়েছিলে। তোমার বাবা সাগরে জাল ফেলছিল, তুমি নৌকা সামাল দিচ্ছিলে আর গান গাইছিলে। তোমার গাওয়া গানটি আমার বাবাকে এবং আমাকে বিমোহিত করছিল। আরেকটি কথা বলতে ভুলে গেছি। আমার বাবা এই কাসপিয়ান সাগর জলের রাজা। সাগর তলদেশে আমাদের প্রাসাদ। তুমি যখন গান গাইছিলে, আমি বাবার অনুমতি নিয়ে সাগরপৃষ্টে ওঠে আসি তোমার গান শোনার জন্য। আর তখনই আটকা পড়ে যাই তোমাদের জালে। এর পরের কাহিনী তো তোমার জানা। তুমি আমাকে দয়া দেখালে। আমার কষ্ট দেখে তুমি ছেড়ে দিলে আমাকে সাগরে। আমার জীবন ফিরিয়ে দিলে তুমি।
যখন তোমাদের দেশের সেই দুর্বৃত্ত খান সাহেব এসে তোমাকে নৌকায় বেঁধে সাগরে ভাসিয়ে দিল, তখন আমি আর স্থির থাকতে পারিনি। আমি সাগরের কয়েকটি বড় মাছকে পাঠালাম তোমাকে সাহায্যের জন্য। তারা তোমার নৌকাকে পিঠ দিয়ে এমনভাবে আগলে রেখেছিল যাতে নৌকাটি উল্টে না যায়। সেই মাছেগুলো পিঠে করে তোমার নৌকাকে ভিড়িয়ে দিয়েছিল এই দ্বীপে। এরপর আমি বাবার অনুমতি নিয়ে তোমাকে সাহায্য করতে এই দ্বীপে আসি। আসার সময় ঠিক তোমার মতই নিজের চেহারাকে বানিয়ে নিই এবং এখানে এসে তোমার বন্ধু হয়ে যাই। এখন সময় এসেছে আমার সাগরে ফিরে যাবার। তোমার হাতে পরিয়ে দেয়া এই আংটি নিয়ে তুমি চলে যাও খানের কাছে এবং তার প্রতিশ্রত পুরস্কারটি গ্রহণ করো বন্ধু।
মৎস কুমার বলে, যাবার আগে আমি তোমাকে আরেকটি কথা বলে যাই। কখনো যদি আমার সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তাহলে একটি কাজ করো বন্ধু। সাগর কুলে চলে যেও। গিয়ে আমাকে ‘মৎস কুমার’বলে পর পর তিনবার ডাকবে। আমি সাগর থেকে তোমার ডাক শুনতে পাবো। উঠে আসবো কিনারে। এ কথা বলে মৎস কুমার নিজেকে সোনামাছে রূপান্তরিত করে সাগরে ঝাপ দেয়। উত্তাল সাগর জলে ডুব দিয়ে পরক্ষণেই অদৃশ্য হয়ে যায়।
তরুণ জেলেপুত্র অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে তার মৎস বন্ধুর চলে যাওয়া জলের দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ভারাক্রান্ত মনে সে ফিরে আসে খানপ্রাসাদের সিংহ দরজায়। রাজ নওকরেরা এসে তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে যায় তাকে খান সাহেবের কাছে। তরুণ জেলেপুত্র খান সাহেবকে বলে, হে মহারাজ, নিশ্চয়ই শুনেছেন আপনার মেয়ে এখন কথা বলতে পারছে। তার দেয়া এই আংটিই রাখলাম আপনার কাছে। এবার আপনি আপনার প্রতিশ্রুত ওয়াদা পালন করুন।
বৃদ্ধ খান সাহেব খুশির আতিশয্যে তরুণ জেলেপুত্রকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর বললেন, হাঁ, অতি মূল্যবান পুরস্কারটিই অপেক্ষা করছে তোমার জন্য, বৎস। আমার চোখের মনি, আমার মেয়েটিকেই দান করব তোমাকে। তার সাথেই বিয়ে হবে তোমার। সেই সাথে এই রাজ্যের ভবিষ্যৎ খান বানিয়ে দেব তোমাকে। দোয়া করছি, সুখে শান্তিতেই কাটবে তোমাদের জীবন।
পরের দিনই জেলেপুত্রের সাথে খানকন্যার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়েতে প্রচুর গানবাজনা ও আনন্দ উৎসব হয়। মোগলাই খানা খাওয়ানো হয় মেহমানদের।

বিয়ের পর দু’মাস কেটে যায় খানপ্রাসাদে। খানকন্যা লক্ষ্য করে, তার স্বামী যেন কেমন মনমরা হয়ে থাকে সারাক্ষণ। মনে হচ্ছে, এই খানপ্রাসাদে সে সুখে নেই। চোখে মুখে একটি উদাস করুণ দৃষ্টি ফুটে থাকে তার সবসময়।
একদিন খানকন্যা তার স্বামীকে জিজ্ঞেস করে, আমি তোমাকে কিভাবে যে বলি কথাটা।
জেলেপুত্র বলে, কী কথা?
খানকন্যা বলে, এই প্রাসাদে কি তোমার কোনো কষ্ট হচ্ছে? অথবা এমন কিছু কি তোমার অপ্রাপ্তি আছে, যার জন্য তোমার মন সারাক্ষণ বিমর্ষ হয়ে থাকে?তুমি কি আমাকে পেয়ে সুখী হতে পারোনি?
জেলেপুত্র বলে, কোনো কিছুরই তো অভাব নেই এই প্রাসাদে। কিন্তু আমার মন অন্য কারণে ভারাক্রান্ত।
খানকন্যা বলে, কী সেই কারণ? আমাকে বলো। নিশ্চয়ই তোমার মন ভালো করে দেবার সামর্থ আমার আছে।
জেলেপুত্র বলে, রাজপ্রাসাদেরএই অলস জীবন আমার ভালো লাগে না। অলস জীবনযাপনে আমি তো অভ্যস্ত নই। সাগরে মাছ ধরা, সাগর জলের উত্তাল তরঙ্গে জাল ফেলা, নৌকা বাওয়া– এসব কাজ করেই আমি বড় হয়েছি। যখন হাতে কোনো কাজ থাকে না, তখন মন আমার অস্থির হয়ে ওঠে।
আজ বড় মনে পড়ে আমার জন্মভূমি সেই সোনালী দ্বীপের কথা। সেখানে আমার বৃদ্ধ বাবা একা একা পড়ে আছেন। আমি ছাড়া তার যে আর কেউ নেই। বৃদ্ধ বাবা আর ক’টা দিনই বা বাঁচবেন। এই সময়টা যদি আমি তার পাশে না থাকি, তাহলে বেঁচে থেকে আমার কী লাভ? বাবার কথা মনে হলে হৃদয় আমার ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। আহা, যদি আমি বাবার কাছে ফিরে যেতে পারতাম! কিন্তু – –
কিন্তু – – ? খানকন্যা জিজ্ঞেস করে, কিন্তু কী?
জেলেপুত্র আবার বলতে শুরু করে। তুমি খান সাহেবের মেয়ে। বিলাসী জীবন তোমার। দাস-দাসী পরিবেষ্ঠিত তোমার নিত্যদিন। তুমি তো পারবে না আমার মত কোনো সাগর পাড়ের এক জেলের এক জীর্ণ কুটিরে গিয়ে বসবাস করতে। একদিকে তুমি, অন্যদিকে আমার বাবা। কী করবো আমি এখন? তোমাকে গ্রহণ করে কী ভুলটাই না করেছি আমি।
খান সাহেবের মেয়ে বলে, তুমি কোনো ভুল করোনি। তুমি তোমার কাজের পুরস্কার গ্রহণ করেছো মাত্র। তোমাকে সুখী দেখতে পাওয়াই আমার জীবনের ব্রত। এর জন্য যে কোনো জীবনই আমি বেছে নিতে পারি। তুমি সুখে থাকলে দারিদ্রতা আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। কিন্তু এমন উত্তাল সাগর আমরা পাড়ি দেব কিভাবে? আমাদের এই দ্বীপে তো কোনো নৌকা নেই?
খানকন্যার এ কথা শুনে জেলেপুত্র বলে, সাগর পাড়ি দেবার উপায় জানা আছে আমার। তুমি যদি আমার দেশে যেতে চাও, সাগর পাড়ি দেবার জন্য প্রস্তুত হও। আমি আসছি। এই বলে জেলেপুত্র খান প্রাসাদ থেকে বের হয়ে আসে।
প্রাসাদ থেকে বেরিয়েই সে সোজা চলে আসে সাগরতীরে। এখানে এসে সে তিনবার তার মৎসবন্ধুকে ডাক দেয়, মৎস কুমার, মৎস কুমার, মৎস কুমার। সঙ্গে সঙ্গে সেই সোনামাছটি উঠে আসে জলের ওপর। তারপর বলে, ওহে আমার বিশ্বস্ত বন্ধু, কী উপকারে আসতে পারি আমি তোমার?
জেলেপুত্র সোনামাছকে বলে, আমি যে নিজের দেশে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু কিভাবে যাবো? আমার যে কোনো নৌকা নেই, নেই কোনো সাম্পান। কীসে আমি সাগর পাড়ি দিই?
সোনামাছ বলে, এজন্য তোমাকে ভাবতে হবে না বন্ধু। আমি তো আছি। যতদিন তোমার এই মৎস বন্ধু বেঁচে থাকবে, সাগরে তোমার কোনো ভয় নেই। তুমি তোমার দেশে যাবে। সব ব্যবস্থা আমি করে দেব। শুধু এক রাতের ভ্রমন। সকালেই তুমি পৌছে যাবে তোমার দেশে। যাও, তোমাদের মালসামানা নিয়ে চলে আসো এখানে। সন্ধ্যার পর এখানে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করবে প্রকাণ্ড এক মাছ। ওই মাছের মুখ গহ্বরে বসে তোমরা দু’জনসাগর পাড়ি দিবে।
জেলেপুত্র বলে, কিন্তু মাছটি যদি আমাদের গিলে ফেলে?
মৎস কুমার বলে, ভয় পেও না বন্ধু। যে মাছটিকে আমি পাঠাবো, সেটি নিতান্তই নিরীহ প্রকৃতির এক তিমি। বড় কোমল হৃদয়ের মাছ সেটি। তাছাড়া, সাগর রাজার আজ্ঞাবহ দূত সে। তোমাদের কোনো কষ্ট হয়, এমন আচরণই সে করবে না। তাহলে বিদায় বন্ধু। শুভ হোক তোমাদের দেশে ফেরার যাত্রা।
সোনামাছটি চলে গেল সাগরতলে।
রাত নামে। সাগরকুলে চলে আসে জেলেপুত্র ও খানকন্যা। আসতে না আসতেই সাগর কিনারে বিশাল ঢেউ তোলে তিমি মাছটি চলে আসে কিনারে। দৈত্যাকার এক তিমি মাছ। পিলে চমকে যাওয়ার মত চোহারা। তার পিঠের ওপরে একটি ছিদ্র আছে। সেই ছিদ্র পথে উর্ধ্বমুখে পানির ফোয়ারা ছিটালো মাছটি। তারপর সাগরকুলের নির্মল বাতাস টেনে নিল মুখ গহ্বরে। এবার সে সাগর বালুয়ারিতে তার মুখ বাড়িয়ে হাঁ করে রইল।
খানকন্যা এমন দৈত্যাকার মাছটি দেখে ভয়ে কাঁপতে থাকে। জেলেপুত্র তাকে অভয় দেয়। বলে, নির্ভয়ে আমার হাত ধরো। চলে এসো আমার সাথে।
তারা মাছের মুখ গহ্বরে প্রবেশ করে। সেখানে সুন্দর করে বিছানা ও কুশন পেতে বসে পড়ে দু’জন। সঙ্গে সঙ্গে মাছটি মুখ বন্ধ করে দেয়। এরপর যাত্রা শুরু করে তিমি। মাছটি এমন ভাবে সাঁতরাতে থাকে যে মাছের মৃদু দোলায় কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা দু’জন বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়ে। যেন এতো আরামের ঘুম তারা কোনো কালেই ঘুমায়নি।
রাত চলে গেল ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। তখন সবেমাত্র পূব আকাশে সূর্য্য উঁকি দিচ্ছে। দৈত্যাকার মাছটি সাঁতরিয়ে সাগর পাড়ি দিয়ে চলে এসেছে এপাড়, জেলেপুত্রের জন্মভূমি সোনালি দ্বীপে। এই দ্বীপে এসেই মাছটি বালুয়ারিতে মুখ এনে আবার হাঁ করে সে। খোলা হাওয়ার সংস্পর্শ্বে এসে ঘুম ভাঙ্গে জেলেপুত্র ও খানকন্যার। জেলেপুত্র সকালের আলোয় চোখ খুলে। দেখতে পায় তার নিজ গায়ের উপকুল। আনন্দে ভরে উঠে মন। সে ডেকে তুলে খানকন্যাকে এবং দু’জনে বের হয়ে আসে মাছের মুখ থেকে। তিমি মাছটিকে হাত নেড়ে বিদায় জানায় তারা। মাছ চলে যায় গহীন সাগরে।
সাগর তীর থেকে কিছুদূর সামনে এগিয়েই জেলেপুত্র দেখতে পায় তাদের সেই পুরোনো পর্ণকুটির। কুটিরের কাছে গিয়ে সে উঁকি দেয় কুটিরের ভিতর। দেখতে পায় তার বৃদ্ধ বাবাকে। একা একা বসে আছে সে কুটিরের ভিতরে। যেন আরো একটু বেশি বৃদ্ধ হয়ে গেছে। জেলেপুত্র ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে তার বাবাকে। বলে, আমি ফিরে এসেছি বাবা। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি তোমার পুত্রবধূকে। একথা শুনে বাবার আনন্দের সীমা থাকে না। তার পর্ণকুটিরে সুখের বন্যা বয়ে যায়। এর পর থেকে তারা তিনজন বড় সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে সোনালি দ্বীপে।
প্রকাশকাল: মে ও জুন ২০২৫



