ডাহুক বোনের গল্প

0
14

ঘন বেত ঝাড়ের ভেতর ডাহুক পাখির বাসা। বাসা থেকে সাড়ে তিন চার হাত ঢালু নিচে ঘন সবুজ ফেনার পুকুর। বাবা ডাহুক খাবারের খোঁজে বেরোয়। যাওয়ার সময় তার বাচ্চা ডাহুক মেয়ে দুজনকে সাবধান করে দিয়ে যায়-দেখো, কোনো অবস্থাতেই বাসা থেকে বেরুবে না। বাসা থেকে বেরুলে ঢাল বেয়ে গড়িয়ে ফেনা পুকুরের জলে পড়ে যাবে। উঠতে পারবে না শেষে। বড়ো বেশি চেঁচামেচি করবে না। আওয়াজ শুনে বাজপাখি না আবার ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। বাচ্চা ডাহুক মেয়ে দু’জনকে আদর করে বলে- সাবধানে থেকো মা’রা আমার।

দুজন বাচ্চা ডাহুক মেয়ের মা নেই। সেদিন যে বাবা ডাহুককে সাথে রেখে মা ডাহুক খাবারের খোঁজে বেরিয়েছিল। আজ পর্যন্ত ফিরল না। বাবা ডাহুক অনেক খোঁজাখুঁজি করলো। না, মা ডাহুকের কোনো হদিস পাওয়া গেল না। বাবা ডাহুক বলল- শিকারির পেটে গেছে তোদের মা। বাচ্চা ডাহুক মেয়ে দু’টোর সাথে সাথেই কী কান্না! কাঁদছে তো কাঁদছেই। অঝোর ধারায় সে কান্না। থামতে চায় না সে কান্না। বাবা ডাহুক বাচ্চা ডাহুক মেয়ে দুটোকে সান্ত¦না দেয়ার বৃথা চেষ্টা করে। বাচ্চা ডাহুক মেয়ে কেঁদে কেঁদে হয়রান হয়ে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে সে রাতে।

সকাল হয়। ভোরের আলো ফোটে চারদিকে। বাবা ডাহুক অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাচ্চা মেয়ে ডাহুক দুজনকে রেখে তাদের জন্য খাবারের খোঁজে বেরোয়। বাবা ডাহুক খাবার নিয়ে আসে। বাবা ডাহুকের ঠোঁট থেকে বাচ্চা ডাহুক মেয়েরা খাবার খায় তাদের ছোট্ট কচি ঠোঁট দিয়ে।

সাতদিন গত হতে চললো। মা ডাহুক হারিয়ে গেছে। মা ডাহুকের জন্য বাচ্চা ডাহুক দু’বোনের বুকে কী কষ্ট! কী শোক! বাবা ডাহুক সান্ত¦না দেয়। -কী আর করা মা’রা আমার! আমাদের যে জীবনটাই এরকম। কখনো বাজপাখির নজরে পড়ি আমরা। কখনো বা সাপ-বেজির। আবার কখনো বা শিকারির হাতে শিকার হই। আমাদের কপালটাই এমন। বাচ্চা ডাহুক দু’বোনের শরীরে কিছু কিছু হালকা পালক গজিয়েছে এ ক’দিনে। বাবা ডাহুকের কথার অবাধ্য হয়ে চটজলদি আবার বাসায় ফিরে আসে দু’জন।
প্রতিদিনের মতো বাবা ডাহুক খাবারের খোঁজে বেরোয়। সকাল গড়িয়ে যায়। দুপুর গড়ায়। বিকেল গড়িয়ে সাঁঝ, তারপর রাত। না, বাবা ডাহুক খাবার নিয়ে বাসায় ফিরল না। বাচ্চা ডাহুক দু’বোন বাবা ডাহুকের জন্যে অপেক্ষা করে আর কান্না করে, দু’বোনের সে কী কান্না। তবে কি, আমাদের বাবা ডাহুকও মা ডাহুকের মতো শিকারির পেটে গেল? শিকারির শিকার হলো?

বাচ্চা ডাহুক দু’বোন দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে অবশেষে ঘুমিয়ে পড়ে। আবার সকাল হলো। নতুন আরেক সকাল। বাচ্চা ডাহুক দু’বোনের প্রচণ্ড খিদে লাগল। গতকাল থেকে কিচ্ছু পড়েনি পেটে। না আর খিদে সহ্য হচ্ছে না। গতকাল পুরোটা দিন পার হয়ে গেল শেষে কিছু না খেয়ে। তবু বাবা ডাহুক ফিরে আসেনি বাসায়। তাই খাবার খাওয়া হয়নি। মা ডাহুকের মতো বাবা ডাহুক ফিরবে না আর। বাচ্চা ডাহুক দু’জনের মনের ভেতর জানা হয়ে যায়।

বাবা ডাহুক আর মা ডাহুক তো নেই। আমাদের খাবার আমাদেরই সংগ্রহ করতে হবে-বাচ্চা ডাহুক দু’বোন বাবা ডাহুক ও মা ডাহুকের শোক বুকে নিয়ে বাসা থেকে বেরোয়। একসাথে দু’জন সত্যি সত্যি বেরোয় এই প্রথম খাবারের খোঁজে। বাচ্চা ডাহুক দু’বোন বেরোয় ঘন বেত ঝাড়ের নিচে ফেনা পুকুরের ফাঁকে, আড়ালে খাবারের খোঁজে গুটি গুটি পায়-আস্তে, অতি সাবধানে।

প্রকাশকাল : অক্টোবর ২০২৪