সাহারার মরুপ্রান্তর

0
2

এই লেখা যখন লিখছি, তখন জুন মাসের প্রচণ্ড গরম বেশ অসহনীয় হয়ে পড়েছে। মাঝেমাঝে এক পশলা বৃষ্টি এসে যেন তেতে ওঠা এই তপ্ত পরিবেশে প্রশান্তি বয়ে আনছে। আচ্ছা, ভাবো তো, এই প্রশান্তির বৃষ্টি যদি না হতো? কী কষ্টই না হতো আমাদের! আর যদি এরকম বছরের পর বছর ধরে চলতো, তাহলে?
এমনই উত্তপ্ত এক বিশাল এলাকার নাম সাহারা, যাকে আমরা সাহারা মরুভূমি নামে চিনি। যতদূর চোখ যায় কেবল বালি আর বালি। এই বালির মহাসমুদ্রে চলতে গেলে মাইলের পর মাইল শত শত মাইল কোনো জনমানব বা প্রাণের দেখা মিলে না। এখানে একা কেউ হারিয়ে গেলে মনে হবে, এই পৃথিবীতে বুঝি বালি ছাড়া আর কিছুই নেই। এই সাহারা মরুভূমির বালির পরিমাণ এত বেশি যে, ধারণা করা হয়, তা দিয়ে পুরো দুনিয়াকে প্রায় ৮ ইঞ্চি বালির চাদরে ঢেকে দেয়া যাবে।
বন্ধুরা, সাহারা মরুভূমির নাম আমরা সবাই শুনেছি। তোমরা অনেকেই গল্প বা বইয়ের পাতায় পড়েছো, কেউ কেউ টিভিতে বা মোবাইলে কোনো ভিডিও বা লেখা দেখতে গিয়েও এর নাম শুনে থাকতে পারো। সাধারণভাবে পৃথিবীর বৃহত্তম মরুভূমি বলা হয় একে। তবে তোমরা যারা নিয়মিত ফুলকুঁড়ি পত্রিকা পড়ো, তোমরা জানো, মরুভূমি মানেই বালি নয়। বরং মরুভূমি এমন জায়গাকে বলা হয়, যেখানে বছরে অন্তত ২৫০ মিলিমিটার বা ১০ ইঞ্চির কম বৃষ্টিপাত হয়। সে হিসাবে পৃথিবীর বৃহত্তম মরুভূমি হলো সর্বদক্ষিণের বরফের রাজ্য এন্টার্কটিকা। তবে উষ্ণ মরুভূমি হিসেবে সাহারাই বৃহত্তম।
যাই হোক, আজ আমরা এখানে কেবল সাহারা নিয়েই জানার চেষ্টা করবো। দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে আদিগন্ত প্রসারিত সাহারার বালির বুকে লুকানো বিভিন্ন বিষয় আজ জানবো আমরা।


আমরা জানি, আয়তনে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ আফ্রিকা। আর এই আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ জায়গা জুড়েই রয়েছে সাহারা মরুভূমি। শুধু কি তাই? আমরা মিশর, সুদান, লিবিয়া, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়ার নাম শুনেছি — এমন মোট ১১টি দেশের ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে আছে এই বিশাল সাহারা। কোনো কোনো দেশের তো বেশিরভাগ অংশই এই মরুভূমির দখলে।
এই কথা জানার পর একটা প্রশ্ন আমার মনে বারবার উঁকি দিতো; প্রশ্নটি তোমাদের সাথেও শেয়ার করি। এতগুলো দেশের এত বড় এলাকা যদি মরুভূমিই হয়, তাহলে এই দেশগুলোর এত মানুষ — বর্তমানে সব মিলিয়ে প্রায় ৩৯ কোটি — এরা কি সবাই বালির বুকে বসবাস করে? অথচ আমরা জানি, এই দেশগুলোতে কত উন্নত আর বড় বড় শহর আছে; সেগুলো দেখলে তো একটুও মরুভূমি মনে হয় না। তাহলে আসল ঘটনাটা কী?
প্রথম আলাপ হলো মরুভূমি মানে সবখানে শুধু বালি আর বালিই থাকে, আর কিছু থাকে না, এই ধারণা সঠিক নয়। মরুভূমির মধ্যে অনেক জায়গা থাকে, ভূগর্ভস্থ পানির উৎসের কারণে গাছপালা জন্মায়। এগুলোকে বলে মরুদ্যান। আবার অনেক জায়গায় পানির উৎসও থাকে। পানির উৎসগুলোকে কেন্দ্র করে অনেক শহর ও গ্রাম এই মরুভূমির মাঝেই গড়ে উঠে। আবার দেখা যাবে এই মরুভূমির মাঝে অনেক নদী আছে, সেই নদীগুলোর তীর ঘেঁষেও অনেক জায়গা মানুষের বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। এসব জায়গাতেই সাধারণত মানুষ বসবাস করে থাকে। এছাড়া তুমি যদি একটু ম্যাপ দেখো, সেখানে দেখবে, মিশর, আলজেরিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়া ইত্যাদি দেশগুলো ভূমধ্যসাগরের পাশে অবস্থিত। তো, এই সাগরের কাছেও অনেক মানুষ বসবাস করে এবং সাগরের পাশেই অনেক বড় বড় শহর গড়ে উঠেছে। সেখানে একটা বড় অংশ মানুষ বসবাস করে।
একটা ছোট্ট উদাহরণ দিয়ে এই বিষয়টা তোমাদের বুঝানোর চেষ্টা করি। এই দেশগুলোর মধ্যে মিশরের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১২ কোটি। কিন্তু মিশরের ৯৫ শতাংশ এলাকাই বসবাসের অযোগ্য মরুঅঞ্চল। তাই তার গোটা জনসংখ্যা দেশের এই ৫% এলাকা জুড়েই গাদাগাদি করে বসবাস করে।
সাহারা মরুভূমিতে প্রায় ৮০ হাজার বর্গমাইল এলাকা হলো মরুদ্যান। এটি সাহারার মোট আয়তনের প্রায় ২ শতাংশ। এছাড়া এখানে রয়েছে বেশকিছু নদী, হ্রদ। তবে নদীগুলো আবার ঋতু অনুযায়ী শুকিয়ে যায় বা জীবন্ত থাকে।
মরুদ্যানের কথা বললে মরীচিকার কথাও বলতে হয়। মরুভূমিতে আলোর খেলার কারসাজিতে অনেকসময় দৃষ্টিসীমায় পানির অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয়। মরুর বুকে পানির জন্য অস্থির হয়ে থাকা পথচারীর কাছে তখন তাকে মনে হয় বহুল আকাঙ্ক্ষিত কোনো মরুদ্যান। কিন্তু আসলে তা কেবলই দৃষ্টিভ্রম বা সূর্যের আলোর কারসাজি। ওখানে আসলে সেই বালিই আছে। এই অস্তিত্বহীন বস্তুকে বাস্তব মনে করার ব্যাপারটাকে মরীচিকা বলা হয়।
এই যে নদী বা সাগরের তীর বা কোনো মরুদ্যানকে কেন্দ্র করে আবাস গড়ে ওঠা, এর বাইরেও ২৫ থেকে ৪০ লাখ মানুষ আছেন, যারা এই মরুভূমিতে যাযাবর হিসেবে জীবনযাপন করেন। এই মরুর বুকে তাদের জীবনযাপন কোনো দেশের সীমানা মানে না। তারা তাদের পশুর পাল নিয়ে সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়। কোনো এলাকায় বসতি স্থাপন করার পর সেখানে যদি পশুর খাবার ফুরিয়ে যায়, তারা নতুন মরুদ্যানের খোঁজে চলে যায়। এভাবেই চলে তাদের জীবনযাপন।
এ যাত্রায় সাহারা মরুভূমি নিয়ে আরেকটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার জেনে নেয়া যাক। সাহারা মরুভূমি কিন্তু পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই এমন বালিময় মরু নয়। প্রায় ৪ কোটি বছর আগে এখানে ছিল প্রাচীন ‘টেথিস সাগর’। বিজ্ঞানীরা মিশরের একটি জায়গার নামকরণ করেছেন ওয়াদী আল হিতান বা তিমি উপত্যকা। এখানে প্রাচীন সামুদ্রিক তিমির প্রচুর জীবাশ্ম বা কংকালের অবশেষ পাওয়া গেছে, যা এখানে সাগর থাকার ধারণাকে নিশ্চিত করে। এরপর প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে একসময় এটি ভূমিতে পরিবর্তিত হয়। এছাড়া ৭০০০-৯০০০ বছর আগেও এই এলাকা ‘গ্রিন সাহারা’ বা নদী, গাছ, হ্রদে ঘেরা এক সবুজ অরণ্য ছিলো। ধারণা করা হচ্ছে, ১৫,০০০ বছর পর সাহারা আবার একটি সবুজ এলাকায় পরিণত হয়ে যাবে।
বর্তমানে সাহারা মরুভূমি অত্যন্ত উত্তপ্ত একটি এলাকা। এটি পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক এলাকাও বটে। এখানে প্রায় অর্ধেক এলাকায় বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র ২ সেন্টিমিটারের মতো। আবার অনেক এলাকায় বছরজুড়ে কোনো বৃষ্টি না হওয়ার ঘটনাও বিরল নয়। আর বাকি এলাকায় এর চেয়ে অবস্থা একটু ভালো, সেখানে ১০ সেন্টিমিটার মতো বৃষ্টি হয়। দিনের বেলা সাধারণত এখানে তাপমাত্রা গড়ে ৪৬ থেকে ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠানামা করে। তবে রাতে তা সাধারণত ১৫-২০ ডিগ্রিতে নেমে আসে। তবে কখনো কখনো তা হিমাঙ্কের নিচে ৬ ডিগ্রি পর্যন্ত নামতে পারে।
এতক্ষণ এই যে সাহারার মরু বা কঠিন পরিবেশের কথা পড়লে, এখানে কি কোনো প্রাণীর জীবনধারণ খুব একটা সহজ হওয়ার কথা? আসলেই হয় না। কিন্তু আল্লাহ এই এলাকার জন্যও কিছু প্রাণী যেন স্পেশাল ক্যাপাসিটি দিয়ে বানিয়েছেন। তোমরা মরুভূমির জাহাজখ্যাত উটের কথা সবাই কমবেশি জানো। মরুভূমিতে চলাচলের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন হিসেবে এই উট ব্যবহৃত হয়। এদের শরীরের গঠন এই প্রতিকূল পরিবেশের জন্য উপযোগী করেই তৈরি করা। এদের শরীরে পানি সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা থাকে, যা দিয়ে একবার ভালো করে পানি পান করার পর ৮-১০ দিন পানি পান ছাড়াই এরা চলতে পারে। এদের কুঁজে, মানে পিঠের উপর যে উঁচু জায়গাটা থাকে, সেখানে চর্বি জমে থাকে, যা খাবারের অনুপস্থিতিতে শক্তির জোগান দেয়। উট কয়েক মন বোঝা নিয়ে ২০-২৫ দিন পর্যন্ত চলতে পারে। এই চলাচলে যেন বালির মধ্যে পা না ঢুকে যায়, এজন্য এদের পা-ও বিশেষভাবে তৈরি।
শুধু উটই নয়, মরুভূমিতে থাকে ডেজার্ট ফক্স নামের এক বিশেষ ধরনের শেয়াল। এগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট শেয়াল। এগুলোর ছোট শরীরে থাকে স্বাভাবিকের তুলনায় বড় কান, যা এদের শরীরের তাপমাত্রার ব্যালেন্সের জন্য এয়ার কন্ডিশনিং এর কাজ করে। এছাড়া এগুলো দিনের প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচতে গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থাকে আর রাতের বেলা শিকার করতে বের হয়। এছাড়া মরুভূমিতে সাপ, বিচ্ছু ইত্যাদিও আছে।
সাহারা মরুভূমি নিয়ে আরেকটা তথ্য জানলে তুমি খুবই মজা পাবে। সাহারা মরুভূমি আর আমাজন বনের দূরত্ব কত জানো? প্রায় ৫০০০ কিলোমিটার। আর এই জায়গাটা হচ্ছে আটলান্টিক মহাসাগর। মজার ব্যাপার হলো এই সুবিশাল আটলান্টিকের জলপথের উপর দিয়ে ছোট ছোট বালিকণা হয়ে নিয়মিত এক বিশাল পরিমাণ বালি আমাজনের বনে পৌঁছায় এবং তার গাছের জন্য অতি প্রয়োজনীয় ফসফরাসের জোগান দিয়ে থাকে। ভাবতে পারো, একদিকে ধূ ধূ মরুভূমি, আরেকদিকে ঘন সবুজ বন। মনে হবে তাদের মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু লোকচক্ষুর অন্তরালে একজন যে আরেকজনের খাবার সাপ্লাই করে যাচ্ছে, তা যেন ভাবাই মুশকিল।
মরুভূমি নিয়ে এত কথা হবে, আর মরুঝড়ের কথা আসবে না, এ অসম্ভব ব্যাপার। মরুভূমির আতঙ্কের নাম হলো এই বালিঝড়। তীব্র বাতাস কয়েক টন বালি ও ধুলিকণা বিশাল দেয়াল তৈরি করে মরুভূমির মাঝখান দিয়ে যেন প্রলয় তৈরি করে। এর মাঝে মানুষের দৃষ্টিশক্তি প্রায় শূন্যে নেমে আসে। এই ধুলিঝড়ের কবলে পড়েই যে কত মানুষ মরুর বুকে হারিয়ে গেছে, তার ইয়ত্তা নেই।
বন্ধুরা, পৃথিবীর বুকে এরকম কতকিছু যে আমাদের জন্য আল্লাহ বানিয়েছেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আমরা মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা হিমালয়ের চূড়ার সেই বরফরাজ্যে যেমন বেঁচে থাকতে পারি, আবার মরুভূমির মাঝেও পারি জীবনধারণ করতে। আল্লাহ আমাদের বুদ্ধি দিয়েছেন, যেন আমরা মাথা খাটিয়ে সকল অবস্থার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারি। আমরা যদি এই বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের উপকার করি, তাতে আমরা অনেক মানুষের মুখে যেভাবে হাসি ফোটাতে পারবো, একইভাবে আমরা পারবো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে। আজ এখানেই থাকুক।
আল্লাহ হাফেজ।

প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৬