২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর| বাংলাদেশে তখন প্রায় রাত ১২টা বাজে| কিন্তু ঘড়ির কাঁটার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছে যেনো সবাই| কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা বড় বড় চত্বরে প্রজেক্টর বা এলইডির বিশাল স্ক্রিনে, অথবা ঘরের ভেতরে সবাই মিলে টিভিতে, তাও না পারলে মোবাইলের ছোট্ট পর্দায় সবার চোখ যেনো আঠার মত লেগে আছে| আর্জেন্টাইন ফুটবলার গঞ্জালো মন্টিয়েলের সেই শিরোপা নির্ধারণী পেনাল্টির পর কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে যে উল্লাস তৈরি হয়েছিলো, তা যেনো ছড়িয়ে পড়েছিলো একসাথে সেই ঐতিহাসিক ফাইনাল দেখতে থাকা সারাবিশ্বের প্রায় ১৫০ কোটি মানুষের অন্তরে| আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির হাতে অধরা বিশ্বকাপ যখন ধরা দেয়, তার সবসময়কার প্রতিদ্বন্দ্বীরাও যেনো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলো| বন্ধুরা, বুঝতেই পারছো, বলছিলাম ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলার কথা| বিশ্ব কাঁপানো সেই বিশ্বকাপ ৪ বছর পর আবার হাজির হয়েছে আমাদের মাঝে| সেই ‘কাঁপাকাপি’র প্রভাবেই দেখো, তোমার প্রিয় ফুলকুঁড়ি পত্রিকাও যেনো ফুটবলময় হয়ে গেছে|
এবার বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হচ্ছে আটলান্টিকের ওপারে উত্তর আমেরিকার ৩ প্রতিবেশী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয়| নামে শুধু খেলার কথা থাকলেও বিশ্বকাপ ফুটবল দিনে দিনে যেনো প্রযুক্তির এক মেলা হয়ে উঠেছে| এবারের বিশ্বকাপে এর সাথে যুক্ত হয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন নতুন সব আইডিয়া| বিখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান লেনোভো তো এবার অফিশিয়ালিই পার্টনার হিসেবে যুক্ত হয়ে এআই চালিত ডিভাইস, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইত্যাদি সরবরাহ করছে| খেলার টিকেট বিক্রি থেকেই যেনো এর যাত্রা শুরু| সাধারণত কোন খেলার টিকিটের দাম কতো, সেটা আগে থেকেই ফিক্সড থাকতো| কিন্তু এবার ফিফা এক্ষেত্রে অন্যভাবে চিন্তা করেছে| এবারের প্রিন্সিপাল হলো, ‘বেশি ডিমান্ড, বেশি দাম’| অর্থাৎ যে খেলার টিকেটের চাহিদা বেশি থাকবে, সেটার দামও বেড়ে যাবে| আর এই দাম কমবেশি হওয়ার পুরো ব্যাপারটাই মানুষের অনলাইনে টিকিট সার্চ দেখে রিয়েল টাইম ডেটা দেখে এআই নির্ধারণ করবে|
এবারে স্টেডিয়ামে প্রবেশের ক্ষেত্রেও দর্শকরা নতুন অভিজ্ঞতা পাবেন| কারণ এবার হাতে হাতে টিকেট চেক করার ব্যাপার থাকছে না| বরং এবারে স্টেডিয়ামে প্রবেশের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে ফেসিয়াল রিকগনিশন টেকনোলজি| অটোম্যাটিকভাবেই ক্যামেরা দর্শককে চিহ্নিত করে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে দিবে| ফলে দীর্ঘ লাইনের ঝামেলা থাকছে না, আর নিজের মুখই যেনো হয়ে উঠছে ফিজিক্যাল টিকেট|
স্টেডিয়াম প্রবেশের পরেও থাকছে আরও অনেক চমক| লেনোভো এরই মধ্যে তৈরি করে নিয়েছে স্টেডিয়ামের ভার্চুয়াল কপি বা টুইন স্টেডিয়াম| অর্থাৎ সবগুলো স্টেডিয়ামের একেবারে হুবহু ডিজিটাল রেপ্লিকা তারা তৈরি করেছে| এরফলে প্রায় ৮২ হাজার দর্শকের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন স্টেডিয়ামেও দর্শকরা চলাচল করতে কি কি সুবিধা অসুবিধা হতে পারে, তা সিমুলেশনের মাধ্যমে যাচাই করে নেয়া হচ্ছে| এছাড়া স্টেডিয়ামের ভেতরে থাকবে হাইস্পিড ফাইভ-জি ইন্টারনেট| এর ফলে দর্শকরা একজায়গায় অনেক মানুষ থাকলেও ইন্টারনেট ব্যবহারে তারা কোনো ধরনের সমস্যা অনুভব করবেন না|
স্টেডিয়ামে বসা দর্শকদের জন্য ২০২২ সালেই ফিফা নিয়ে এসেছিলো FIFA+ অ্যাপ, যা অত্যাধুনিক অগমেন্টেড রিয়েলিটির সহায়তায় খেলা দেখার এক নতুন এক্সপেরিয়েন্স দেয়| এতে এই অ্যাপের মাধ্যমে স্টেডিয়ামে প্রবেশের পর দর্শক মাঠে খেলোয়াড়দের অবস্থান, তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য, লাইভ স্পিড ইত্যাদি দেখতে পারতেন| এছাড়াও চলমান খেলাকেই বিভিন্ন ক্যামেরা এঙ্গেল থেকে দেখতে পারেন| পাশাপাশি টিভির মত করে রিপ্লেও দেখতে পারতেন আর খেলা শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মাথায় সেখানে চলে আসতো খেলার সাথে প্রাসঙ্গিক সকল স্ট্যাটিসটিক্স| ২০২৬ এ এসে এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরও নতুন সব ফিচার| এবার সেখানে থাকবে থ্রিডিতে পুরো স্টেডিয়াম ঘুরে দেখার সুবিধা| এছাড়া দর্শক প্রবেশ বা বের হবার পথে কোনদিকে ভিড় আছে বা নেই, সেসব তথ্যও দেখে নিতে পারবেন|
ফুটবল খেলার একটা খুবই জটিল সমস্যা তৈরি হয় অফ সাইড নিয়ে| তোমরা তো অফসাইডের নিয়ম জানোই| ধরো আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের খেলা হচ্ছে| নিয়ম হচ্ছে, যদি আর্জেন্টিনার কোনো প্লেয়ার ব্রাজিলের গোল পোস্টের দিকে শট করে বা বল পাস দেয়, তখন আর্জেন্টিনার প্লেয়ার আর ব্রাজিলের গোলপোস্টের মাঝখানে অন্তত দুইজন ব্রাজিলের প্লেয়ার থাকতে হবে| অর্থাৎ কেউ আগে থেকে পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না| এখন এই লেখা পড়ার সময় এই ব্যাপারটাকে অনেক সিম্পল মনে হলেও মাঠে এই ব্যাপারটা ঠিকমতো বুঝতে পারা অনেক কঠিন| কারণ তখন তো সব খেলোয়াড় দৌড়ের উপর থাকে, মানে প্রতিমুহুর্তে স্থান পরিবর্তন করে| আর একেবারে বলে শট করার মুহুর্তে কে কোথায় আছে, তা খালি চোখে দেখে মাঠের রেফারির জন্য বলা কঠিন| তাই ফিফা আগে থেকে এজন্য প্রযুক্তির সহযোগিতা নেয়ার চেষ্টা করে আসছে|
২০২২ বিশ্বকাপে ফিফা এর জন্য বেশ আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে আসে| তারা বলের মধ্যে এমন সেন্সর লাগিয়ে দিয়েছিলো, যা প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার সিগন্যাল পাঠাতো| সহজভাবে বললে, প্লেয়ার কোন সময়ে বলে কিক দিয়েছে, এটা সেকেন্ডের ৫০০ ভাগের ১ ভাগ হিসেব করে নিখুঁত টাইমিং দিতে পারতো| এ তো গেলো বল, কিন্তু প্লেয়ারদের অবস্থান বুঝবে কিভাবে? এজন্য তখন স্টেডিয়ামের ছাদের নিচে ১২টা বিশেষ ক্যামেরা সেট করা হয়েছিলো, যা খেলোয়াড়ের শরীরের ২৯টি ডেটা পয়েন্ট ট্র্যাক করতো| এরফলে এক্সাক্টলি কোন সময়ে বলে কিক করা হয়, সে সময়টা যেমন নিখুঁতভাবে ধরা যেতো, একইসময়ে কোন খেলোয়াড় কোন জায়গায় ছিলো, সেটাও ধরা যেতো| এই দুটোর তথ্যকে সমন্বয় করে এআই ভিডিও এসিস্ট্যান্ট রেফারিকে অফসাইডের তথ্য জানান দিতো|
২০২৬ এ এসে ফিফা এ ব্যাপারে আরও আধুনিক প্রযুক্তির দিকে অগ্রসর হয়েছে| এবার খেলায় অংশ নেয়া সকল প্লেয়ারের ডিজিটাল স্ক্যানিং-এর মাধ্যমে এআই চালিত থ্রিডি প্লেয়ার অ্যাভাটার তৈরি করেছে| যার ফলে আগের চাইতে সূক্ষ্মভাবে খেলোয়াড়দের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করা যাবে| মজার ব্যাপার কী জানো? এভাবে একেকজন খেলোয়াড়ের ফুল বডি থ্রিডি স্ক্যান করতে সময় লেগেছে মাত্র ১ সেকেন্ড করে| প্রযুক্তি কত ফাস্ট হয়ে গেছে, তাই না? যাই হোক, এসবের পাশাপাশি অফসাইড হলো কিনা, এটা টিভিতে যেনো গ্রাফিক্সের মাধ্যমে দেখানো হতো, তা আরও অনেক উন্নত করা হয়েছে|
তোমরা গোল লাইন টেকনোলজির কথা শুনে থাকবে| এর মূলত কাজ হচ্ছে, বল গোলপোস্টের লাইন পার করেছে কিনা, তা নিশ্চিত করা| যদিও বেশিরভাগ সময় বল একেবারে গোললাইন পার হয়ে অনেক ভেতরে চলে যায়, কিন্তু মাঝে মধ্যে লাইনের কাছাকাছি থেকেই ডিফেন্ডাররা রিটার্ন পাঠিয়ে দেন| তখন অনেকসময় সিদ্ধান্ত নেয়াটা রেফারির জন্য বেশ কঠিন হয়ে যায়| এজন্য ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে প্রথম এ টেকনোলজির ব্যবহার করা হয়| এখানে প্রতি গোলবারে ৭টা করে বিশেষ ধরনের ক্যামেরা সেট করা থাকে| এই ক্যামেরাগুলোর সাহায্যে তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্লেষণ করে গোলের সিদ্ধান্ত নেয়া হতো| ২০১৮ সালেও মোটামুটি এমনই ছিলো ব্যাপারটা| ২০২২ এর কাতার বিশ্বকাপে সেন্সরযুক্ত বল ব্যবহার হওয়ার কারণে এই ব্যাপারটা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে| এখানে ক্যামেরার পাশাপাশি বলের সাথে থাকা সেন্সরও বলের অবস্থান সম্পর্কে জানান দিতো| এর ফলে সিদ্ধান্ত নেয়া আরও সহজ ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠে| আর ২০২৬ বিশ্বকাপে এতে আরও নতুন ফিচার যুক্ত করা হয়| এবারে রেফারিদের সামনে যে ক্যামেরা লাগানো থাকবে, প্রয়োজনের সময় সেই ক্যামেরার ভিউটাই দর্শকদের জন্য প্রদর্শন করা হবে| এর ফলে দর্শকরা একেবারে মাঠ থেকে রেফারির চোখের ভিউটাও উপভোগ করতে পারবে| এছাড়া এই ভিউ রেফারির দৌড়াদৌড়ির কারণে ঝাপসা হলেও এআই এর সাহায্যে একে স্ট্যাবল বা স্থিতিশীল করে দেখানো হবে|
২০২২ বিশ্বকাপে ফিফা তৈরি করেছিলো ফিফা প্লেয়ার অ্যাপ| এর মাধ্যমে প্রতি ম্যাচ শেষেই খেলোয়াড়দের কাছে তাদের পারফরম্যান্সের ডিটেইল ডেটা চলে যেতো আর তারা নিজেদের আরও ডেভেলপ করার সুযোগ পেতো| কিন্তু এরপরেও একটা সমস্যা থেকেই গিয়েছিলো| সাধারণত অপেক্ষাকৃত বড় বা ধনী দলগুলোর কাছে (যেমন জার্মানি, ইংল্যান্ড, ব্রাজিল প্রভৃতি) খেলার ব্যাপারে অনেক বেশি ডেটা ও স্মার্ট অ্যানালাইসিস করার প্রযুক্তি থাকে, যা ছোট বা নতুন দলের (যেমন কেপভার্দে, হাইতি, পানামা ইত্যাদি) কাছে থাকে না| এ সমস্যা সমাধানে এইবারে ফিফা নিয়ে এসেছে ফুটবল এআই প্রো| এর সাহায্যে সকল দলের কাছেই এই ডেটা অ্যানালাইসিসের স্মার্ট সুবিধা ফিফার পক্ষ থেকেই দেয়া থাকবে|
বন্ধুরা, বিশ্বব্যাপী ফুটবল প্রেমীদের সাথে তোমরাও নিশ্চয়ই এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা উপভোগের প্রস্তুতি নিচ্ছো| তোমাদের জন্য ছোট্ট একটা কথা| আমরা অনেকেই এ সময় খেলা নিয়ে মাতামাতি বা মজা করতে গিয়ে আমাদের বন্ধু বান্ধব বা কাছের মানুষদের সাথে অনেক খারাপ আচরণ করে ফেলি| মজা আমরা করবো, কিন্তু তাতে যেনো কাউকে শারীরিক বা মানসিকভাবে খুব আঘাত দিয়ে না ফেলি, তা যেনো লক্ষ্য রাখি| তোমার এবং তোমার প্রিয় দলের জন্য আমাদের শুভকামনা জানিয়ে শেষ করছি|
আল্লাহ হাফেজ|
প্রকাশকাল : জুন ২০২৬



