মনে করো, তুমি গ্রামে গিয়ে নদীতে গোসল করতে নামলে। তোমার আবার সাপের ভয় আছে বেশ। তাই তুমি গ্রামের চাচাত ভাইকে জিজ্ঞেস করলে, পুকুরে সাপ-টাপ নেই তো? সে বললো- না, একটাও নেই। যা ছিল, সব কুমির খেয়ে নিয়েছে।
ভাবো তো তোমার কী অবস্থাটাই না হবে! তোমার ইচ্ছা হবে তখনই যেন সুপারম্যানের মতো সাঁই করে উপর দিকে উঠে যাই। নাহলে কখন না জানি কুমির মামা তার বিশাল চোয়াল দিয়ে তোমাকে ‘আদর’ করতে চলে আসে।
এই যে তুমি কুমিরের নাম শুনেই ভয়ে অস্থির হয়ে যাচ্ছ, এটা কিন্তু শুধু তোমার ব্যাপার নয়। ধারণা করা হচ্ছে এক প্রকার কুমির এমন ছিল, যাদেরকে ডাইনোসররাও ভয় পেত। হ্যাঁ, একদম ঠিক পড়েছ। সেই আদ্দিকালের ভয়ংকর ডাইনোসর, যাদের নাম শুনলেই একটা ভয়ের ব্যাপার কাজ করে, তারাও নাকি এই কুমিরকে ভয় পেত। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক বিশেষ প্রজাতির কুমিরের ফসিল বা কঙ্কাল পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সেই কুমির ছিল প্রায় ১৫ মিটার বা ৪৯ ফুট লম্বা! এবং তা ঐ সময়কার অধিকাংশ ডাইনোসরের ভয় পাওয়ার মতো যথেষ্ট বড়। একারণে কুমিরকে জীবিত ডাইনোসরও বলা হয়। বুঝতেই পারছ, কুমির পৃথিবীতে অনেক আগে থেকেই আছে। ধারণা করা হয়, প্রায় ২০ কোটি বছর আগেও কুমির পৃথিবীতে ছিল। পরিবেশ বা প্রকৃতির বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে কুমিরের অনেক পরিবর্তন হয়েছে সত্য, কিন্তু কুমির টিকে থেকেছে বেশ, ডাইনোসর বা এরকম আরো অনেক প্রাণীর মতো হারিয়ে যায়নি।
এখন কিন্তু আর অতবড় কুমিরের সাক্ষাত পাওয়া যায় না। ততবড় না হলেও, এখনকার কুমির সাইজে ২০ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর এগুলোর ওজন হতে পারে প্রায় ১০০০ কেজি বা ১ টন পর্যন্ত। মজার বিষয় হলো মানুষের মতো কুমিরেরও বামন বা খাটো প্রজাতি আছে। এই বামন কুমিরগুলো হয় প্রায় ৫ থেকে ৬.২ ফুট পর্যন্ত। এই বিশাল আকৃতির কুমিরগুলো জন্মের সময় কিন্তু পিচ্চিই থাকে। ডিম ফুটে যখন এগুলোর জন্ম হয়, তখন এগুলোর সাইজ থাকে ২০ সেমি বা ৮ ইঞ্চির মতো। কুমিরের বাচ্চা হয় কীভাবে জানো? কুমির ডিম দেয়। ডিম জলাশয়ের আশেপাশে কোথাও বানানো কুমিরের বাসায় রাখা থাকে। মা কুমির সেই বাসার আশেপাশে পাহারায় থাকে, আর বাচ্চা জন্ম হলে মা কুমির সেই বাচ্চাদের পানিতে নিয়ে যায়।
কুমিরের কথা বললে আমরা ভয় পাই কেন বলো তো? হ্যাঁ, তার সেই ভয়ঙ্কর হা করে থাকা মুখ, আর তার ভেতরে বড় বড় সেই দাঁতগুলো দেখলে কে না ভয় পাবে? কুমিরের বিভিন্ন সাইজের ৬০-১১০টি দাঁত হয়। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, এই দাঁত কিছুদিন পরপর পরিবর্তন হয়। কুমির তো প্রায় ৭০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। তো এই জীবনকালে তার দাঁতগুলো প্রায় ৫০ বারের মতো নতুন করে গজায়। হিসেব করলে দেখা যায়, একটি পূর্ণবয়স্ক কুমির তার জীবনে প্রায় ৫০০০ এর মতো দাঁত ব্যবহার করে থাকে। আর কুমির যেহেতু মাংসাশী প্রাণী, তাই এই দাঁতগুলোর ভালোই ব্যবহার হয় বলতে পারো। মাংস ছাড়া কুমির অবশ্য ফলমূল খায় বলে সাম্প্রতিক একটা গবেষণায় জানা গেছে। এর বাইরে একটা সারপ্রাইজিং জিনিসও কুমির খায়। সেটা হলো পাথর। এগুলো এক বিশেষ ধরনের পাথর, যা কুমিরের হজমের ক্ষেত্রে আর শরীরের ওজন বাড়িয়ে জলে ডুবে থাকার জন্য সহযোগিতা করে। ঘটনা এখানেই শেষ না। কখনো কখনো কুমিরকে অন্য কুমিরের পা কামড়ে নিতে দেখা গেছে, এমনকি বড় কুমির ছোট কুমিরকে খেয়ে ফেলার ঘটনাও ঘটে। কী অদ্ভুত অবস্থা না!
কুমির তার শক্তিশালী চোয়াল দিয়ে যখন কোনো প্রাণীকে কামড়ে দেয়, তখন তা প্রতি বর্গইঞ্চিতে প্রায় ৫০০০ পাউন্ড বা সোয়া ২ হাজার কেজির বেশি পরিমাণের প্রেশার দিতে পারে। প্রাণীজগতের মধ্যে এত প্রেসার আর কোনো প্রাণীই তৈরি করতে পারে না। তোমার বুঝার জন্য বলি, একজন সুস্থ মানুষ তার চোয়াল দিয়ে প্রতি ইঞ্চিতে প্রায় ১০০ পাউন্ড মতো প্রেশার দিতে পারে, মানে কামড় দিলে যে চাপ পড়ে, সেটার কথা বলছি আর কি। তাহলে বুঝো, কুমিরের চাপ এর চাইতে ৫০ গুণ বেশি! একারণেই কুমিরের চোয়ালের নিচে ঠিকমতো পড়লে বাঁচার কোনো উপায় থাকে না। তবে এখানে একটা বেশ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার আছে। এই যে চাপ দিতে পারার শক্তির কথা বললাম, এটা কুমির মুখ বন্ধ করার সময় এই চাপ দিতে পারে। কিন্তু কুমিরের মুখ খোলার যে মাসল বা পেশী, তা কিন্তু এই তুলনায় বেশ দুর্বল। কেবল রাবার ব্যান্ড দিয়ে বা খালি হাতে চাপ দিয়েই কুমির মুখ চেপে রাখা যায়। সহজে বুঝার জন্য ব্যাপারটা হলো, মুখ বন্ধ অবস্থায় তা চেপে ধরলেই সে আর খুলতে পারে না; কিন্তু একবার খুলে গেলে প্রাণীজগতের সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে যায় তা। এ বিষয়টা বিজ্ঞানীদের কুমির নিয়ে গবেষণার কাজটা কিছুটা সহজ করে দিয়েছে। তবে সাবধান, এটার জন্যও বেশ ট্রেনিং আর প্রস্তুতি দরকার। নাহলে যে কী হতে পারে, তা তো বুঝতেই পারছ।
কুমির উভচর প্রাণী। জলে স্থলে দুই জায়গাতেই এরা চলতে পারে। কুমির বেশ দ্রুত সাঁতার কাটতে পারে, ঘণ্টায় সর্বোচ্চ প্রায় ৩৫ কিলোমিটার গতিতে। তাদের যে বিশাল লেজ আছে, সে লেজের সাহায্যে এদের এই গতি তাদের ব্যাপারে ভয় ধরানোর আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সে তুলনায় ডাঙায় এদের গতি কম, ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৭ কিলোমিটার প্রায়। তাছাড়া কুমির জলের মতো ডাঙায় স্বাচ্ছন্দও নয়। তাই রোদ পোহানো বা ডিম দেয়ার মতো প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া খুব একটা ডাঙায় আসতে চায় না। তুমি হয়তো ভাবছ, কুমিরের তুলনায় মানুষের গতি কেমন, বা কুমিরের সাথে একবার দৌড় বা সাঁতারের প্রতিযোগিতা করা যায় কি না। পানিতে মানুষের স্বাভাবিক সাঁতারের গতি হয় গড়ে ৩.২ কিমি, আর সর্বোচ্চ গতির ঝড় তোলা অলিম্পিকের সর্বকালের বিখ্যাত সাঁতারু মাইকেল ফেলপসের সর্বোচ্চ গতি ছিল ৯.৭ কিলোমিটার মতো। সুতরাং গতির দিক থেকে পানিতে কুমিরের ঢের পেছনে মানুষ। আর ডাঙাতেও সাধারণ মানুষ দৌড়াতে পারে ঘণ্টায় ১০-১৫ কিমি। তবে প্রফেশনাল দৌড়বিদরা অবশ্য ৩৫-৪৫ কিমি পর্যন্ত গতি তুলতে পারে। সুতরাং, কুমিরের সাথে সাঁতার বা দৌড় প্রতিযোগিতার আইডিয়াটা যে মোটেও ভালো হবে না, বুঝতেই পারছ।
এই যে কুমিরের এত গুণের কথা বললাম, এগুলো দিয়ে কুমির কী করে? সহজ করে বললে শিকার করে এবং এর মাধ্যমে বেঁচে থাকে। কিন্তু কুমির কী খায়? বাচ্চা কুমিরগুলো পোকামাকড়, ছোট মাছ, ব্যাঙ, ছোট কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক ইত্যাদি খায়। আর বড় কুমিরের প্রধান খাদ্য হলো মাছ। এছাড়া এ তালিকায় আরো আছে পাখি (হাঁস, বক, জলজ পাখি), সাপ, হরিণ, বানর, পানির ধারে আসা গরু বা ছাগল ইত্যাদি। তবে কুমির হলো সুযোগসন্ধানী শিকারী। মানে সুযোগ মতো যাকেই পায়, হামলা করতে পারে। কুমিরের একটা বৈশিষ্ট্য হলো এরা দাঁত গিয়ে কামড়ে কামড়ে খায় না, বরং দাঁত দিয়ে কামড়ে মারার পর শিকারকে গিলে ফেলে। কখনো কখনো মারার পর নরম হওয়ার জন্য পানির নিচে ডুবিয়েও রাখে। এছাড়া কুমিরের রয়েছে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিডিক বা হজমশক্তি সম্পন্ন পাকস্থলী, যা হাড়, পায়ের খুর, শিং ইত্যাদিকে গলিয়ে খাওয়ার উপযোগী করে তুলতে পারে। তবে কুমিরের এত খাবারের আলাপ হলেও প্রয়োজনে কুমির প্রায় ১ বছর পর্যন্ত না খেয়েও কিন্তু থাকতে পারে।
এবার ঝটপট কুমিরের ব্যাপারে কিছু ইন্টারেস্টিং তথ্য জেনে নেই। শিকারের কাজে সহযোগিতা করার জন্য এবং একইসাথে নিজের নিরাপত্তার জন্য কুমিরের একটা বিশেষ পাওয়ার আছে। কুমিরের নাকে এক ধরনের ছোট ছোট সেনসিটিভ গর্ত আছে, সেগুলোর মাধ্যমে পানির ন্যূনতম পরিবর্তনও কুমির টের পায়। কুমির দিনে প্রায় ২০ ঘণ্টা বিশ্রাম নেয়। এরা ১ চোখ খোলা রেখেও ঘুমাতে পারে। আর পানির নিচে কুমির প্রায় ১ ঘণ্টা নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখতে পারে। এই সম্পূর্ণ ডুবে থাকা অবস্থাতেও কুমির চোখ খুলে দেখতে পারে। এছাড়াও কুমির কেবল তার নাক আর চোখ ভাসিয়ে রেখে পুরো শরীর ডুবন্ত রেখে সহজেই চলতে পারে। এ অবস্থায় কুমির দেখা গেলেও এর সত্যিকারের আকার কোনোভাবে ধারণা করা যায় না।
প্রতিবছরের কুমিরের আক্রমণে প্রায় ১০০০ এর মতো মানুষ মারা যায়। এদের অধিকাংশই ঘটে কুমিরের রাজ্যে মানুষের প্রবেশের কারণে। আর মানুষের কারণে কুমিরের মৃত্যু? আনুমানিক প্রায় ২০,০০০ এর মতো। এখানে যদিও কিছুসংখ্যক কুমিরকে আত্মরক্ষার জন্যই মারতে হয়, কিন্তু অধিকাংশকে মারা হয় কুমিরের চামড়া, মাংস ইত্যাদির জন্য। এছাড়া বিভিন্ন সময় এদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস করার কারণেও অনেক কুমির মারা যায়।
চিড়িয়াখানায় গেলে আমরা কুমির দেখতে পাই। কিন্তু কুমিরের সেই মহাপ্রতাপশালী ভাব তো চিড়িয়াখানার বন্দি দুনিয়ায় দেখা যায় না। এজন্য দরকার তার জন্য উন্মুক্ত কোনো প্রাকৃতিক পরিবেশ। সেরকম দেখতে পাওয়া তো আর সহজ না। তাই ইউটিউবেই সেরকম ভিডিও দেখতে পারো। আর হ্যাঁ, চিড়িয়াখানায় গেলে অনেকে বিভিন্ন প্রাণীর গায়ে এটা সেটা ছুঁড়ে মেরে উত্যক্ত করে। এটা কিন্তু একেবারেই অসভ্য আচরণ। এমন কাজ যেন আমরা কেউ না করি।
পরিবেশের প্রতি আমাদের, মানে মানবজাতির বিরূপ আচরণের কারণে দিন দিন এখানকার প্রাণীদের জন্য এখানে বাস করা কঠিন হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য কুমিরদের জীবনযাত্রার মধ্যে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যা মোটেও ভালো ব্যাপার নয়।
তাই এই সুন্দর পৃথিবীকে সকল প্রাণীর জন্য বাসযোগ্য রাখতে এসো আমরা আরো অনেক বেশি যত্নবান হই। তোমাদের সকলের জন্য দোয়া। আল্লাহ হাফেজ।
প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৫



