ওয়ালেস লাইন ভূগোলের আশ্চর্য সীমারেখা

0
2

পৃথিবীতে অনেক কাল্পনিক রেখা আছে। বিষুব রেখা, অক্ষ রেখা, সময় রেখা ইত্যাদি। অদৃশ্য এসব রেখা আমরা বানিয়েছি নিজেদের সুবিধার জন্য। যে কোনো মানচিত্রের বইতে এগুলো দেখা যাবে। কিন্তু একটি রেখা পাওয়া যাবে না। সেটি ওয়ালেসের রেখা। আজ সেই আজব রেখা সম্পর্কে জানবো।
ইন্দোনেশিয়ার বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র বালি দ্বীপের পূর্ব উপকূল থেকে ফেরিতে পুবদিকে রওনা হলে দ্রুতই পৌঁছানো যাবে লম্বক নামের একটি দ্বীপে। দুটি দ্বীপের মাঝে দূরত্ব মাত্র ৩৫ কিলোমিটার (২২ মাইল)। ওয়ালেসের রেখা এই বালি ও লম্বক দ্বীপের মাঝ দিয়ে টানা হয় উত্তর-দক্ষিণে। সেটি আরও উত্তর দিকে টেনে দিলে বোর্নিও এবং সুলাবেসির মাঝ দিয়ে চলে গেছে ফিলিপাইনের পাশ দিয়ে। রেখাটি শত শত বছর ধরে প্রকৃতিবিদ ও বিজ্ঞানীদের বিমোহিত করে রাখে।

এই রেখা কেন আশ্চর্যের?
কারণ, এটি প্রাণীজগৎকে পৃথক করেছে। মানে, রেখার পুব পাশে বালিতে যেসব প্রাণী দেখা যাবে পশ্চিম পাশে লম্বকে সেগুলো পাওয়া যাবে না। পুবে আছে হাতি, গণ্ডার, বানর, বাঘ, ছাগল, কাঠঠোকরা ইত্যাদি। এগুলো এশীয়। লম্বকের প্রাণীগুলো একেবারে ভিন্ন ধরনের, যেমন- ক্যাঙারু, কোয়েলা, এমু এবং কাকাতুয়া। এগুলো অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের।
রেখাটির নাম ওয়ালেসের রেখা কেন?
আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস নামের একজন ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ ১৮৬০ সালে প্রথম দুপাশের প্রাণীদের মধ্যে এই পার্থক্য আবিষ্কার করেন। তাই তার নামে এ রেখার নাম রাখা হয়। তিনি লক্ষ করেন, দু’পাশের প্রাণীরা ভৌগোলিকভাবে এত কাছাকাছি অথচ আশ্চর্যজনকভাবে আলাদা। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, পাখিরা এই রেখার উপর দিয়ে চলাফেরা করলেও তারা সাধারণত এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যায় না; নির্দিষ্ট সীমারেখা সবসময় মেনে চলে। তবে রেখার দুই পাশে প্রাণীদের মধ্যে ভিন্নতা দেখা গেলেও উদ্ভিদে তা দেখা যায় না।
এ রেখা এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রাণীজগতকে প্রাকৃতিকভাবে আলাদা করেছে। এটি হলো জৈব-ভূগোলের সবচেয়ে মজার উদাহরণ এবং পৃথিবীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক বিভাজনের একটি।

ওয়ালেসের লাইন কেন বিদ্যমান?
ওয়ালেসের রেখার অস্তিত্ব মূলত এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের কারণে। লক্ষ লক্ষ বছর আগে, এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ সমুদ্রের গভীর পরিখা বা অতল খাদ দিয়ে আলাদা ছিল যা প্রজাতির চলাচলে বাধা হিসেবে কাজ করে। ফলে দুটি অঞ্চলের মধ্যে স্থলভিত্তিক প্রাণীর মিশ্রণ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। রেখার উভয় পাশের উদ্ভিদ ও জীব লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে বিবর্তিত হয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে।

সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত তাৎপর্য
বর্তমানে ওয়ালেস লাইন ভৌগোলিক অবস্থান ও ইতিহাসের সাথে জীব-বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হিসেবে বিবেচিত, যা বিজ্ঞানীদের প্রজাতির ঐতিহাসিক গতিবিধি এবং বিবর্তনের উপর ভৌগোলিক বাধার প্রভাব বুঝতে সাহায্য করে। পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণেও এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়ালেস লাইনের আশেপাশের অঞ্চলগুলো জীববৈচিত্র্যের লালনভূমি। বিশ্বের কোথাও পাওয়া যায় না এমন অনেক প্রজাতির আবাসস্থল এই অঞ্চল। তবে, অঞ্চলটি বন উজাড়, প্রাণীদের আবাসস্থলের ক্ষতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বড় ধরনের হুমকির মুখে। এই বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা কেবল সেখানে বসবাসকারী প্রজাতির জন্যই নয়, বরং ওয়ালেস লাইন প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং বিবর্তনের ইতিহাসের যে সুস্পষ্ট প্রতিনিধিত্ব করে তা বজায় রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

ওয়ালেস লাইন কেবল একটি অদৃশ্য বিভাজনই নয়; এটি প্রাকৃতিক নির্বাচনের শক্তি এবং পৃথিবীতে জীবনের বিবর্তনের উপর ভূগোলের প্রভাবের প্রমাণ। এই লাইন কেবল প্রজাতির বৈচিত্র্যকেই তুলে ধরেনি বরং জীবন কীভাবে অভিযোজিত হয়, বিবর্তিত হয় এবং টিকে থাকে, তার গভীর বোঝার পথও প্রশস্ত করেছে।

প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৫