অতিরিক্ত লবণে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কম খেলে হতে পারে মৃত্যুও

0
0

বন্ধুরা, কথিত আছে, খাবারে লবণ না দিলে তাতে কোনো স্বাদই হয় না। কথাটা অনেকাংশে সত্য, কিন্তু লবণ কি কেবল খাবারের স্বাদই বাড়ায় নাকি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী? যুক্তরাষ্ট্রের রটগার্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল ব্রেসলিন বলেন লবণ আমাদের জীবনের জন্য অপরিহার্য। নিউরন, মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড, পেশি, ত্বক এবং হাড়সহ আমাদের সব কার্যকর কোষের জন্য লবণ গুরুত্বপূর্ণ।
লবণ আমাদের শরীর এবং মনে শক্তি যোগায়। লবণে থাকা সোডিয়াম আমাদের লালায় দ্রবীভূত হয় এবং স্বাদ কোষে প্রবেশ করে সেগুলোকে সক্রিয় করে। এগুলো এক ধরনের ছোট বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গের মতো। তার মতে, লবণের কারণে সৃষ্ট এই বৈদ্যুতিক সংকেতগুলো আমাদের চিন্তা ও অনুভূতিকে উদ্দীপিত করে।
ক্যালসিয়ামের মতো আমাদের শরীর সোডিয়ামও সংরক্ষণ করতে পারে না। ফলে শরীরে সোডিয়াম কমে গেলে একমাত্র সমাধান হলো সোডিয়াম তথা লবণ খাওয়া। যথেষ্ট সোডিয়াম গ্রহণ না করলে তা মৃত্যুর কারণও হতে পারে বলে সতর্ক করেন অধ্যাপক ব্রেসলিন। শরীরে সোডিয়াম কম থাকলে হাইপোনাট্রেমিয়া দেখা দিতে পরে। যার ফলে বিভ্রান্তি, বমি, খিঁচুনি এবং খিটখিটে মেজাজ হয়ে যেতে পারে, এমনকি ব্যক্তি কোমায়ও চলে যেতে পারে।
লবণ কি কেবল স্বাদ বাড়ায়? হ্যাঁ, এ কথায় প্রায় সবাই একমত যে, লবণ খাবারের স্বাদ বাড়ায়। কিন্তু কিছুক্ষেত্রে লবণ তিক্ততা লুকানোর কাজটিও করে। যেমন টক কিংবা তিতা কিছু খাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই লবণ ব্যবহার করেন। যেমন, আমলকী। তখন কিন্তু লবণ আমলকীর স্বাদ বাড়ায় না, বরং এতে তিতকুটে যে বিষয়টা থাকে তা কমিয়ে দেয়।
আবার পাউরুটি বানানোর সময় যদি লবণ ব্যবহার করা না হয় তবে তা বাদামি রঙা হবে না এবং খুবই ফ্যাকাসে দেখাবে। এর থেকে টাটকা বা সতেজ ঘ্রাণও আসবে না। লবণই মূলত পাউরুটির বাদামি ভাব আর ঘ্রাণ নিয়ে আসে। অর্থাৎ শুধু স্বাদই না, খাবারের চেহারা এবং ঘ্রাণেও প্রভাব রাখে লবণ।
বন্ধুরা, জানো কি, কতটুকু লবণ আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিটি ব্যক্তির নিয়মিত পাঁচ গ্রাম লবণ গ্রহণ করা উচিত যাতে করে শরীর দুই গ্রাম সোডিয়াম পেতে পারে। বিশ্বব্যাপী ব্যক্তিপ্রতি লবণ গ্রহণের গড় প্রায় ১১ গ্রাম। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ হৃদরোগ, গ্যাস্ট্রিক, ক্যান্সার, অস্টিওপোরোসিস, স্থুলতা এবং কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, লবণ বেশি গ্রহণের কারণে প্রতি বছর প্রায় ১৯ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। তবে শরীরের ওপর লবণের প্রভাব নির্ভর করে ব্যক্তির জিনগত বৈশিষ্ট্যের উপর। বিশ্বব্যাপী একশ’ কোটিরও বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। লবণ কম খাওয়া উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লেয়ার কলিন্স বলেন, কেউ যখন খুব বেশি লবণ গ্রহণ করে, তখন তা প্রতিরোধের জন্য তার শরীর প্রথমে এটি গলিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। আর তা করতে শরীর অতিরিক্ত পরিমাণে পানি ধরে রাখে। অতিরিক্ত এই তরলকে ধরে রাখার চেষ্টা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, যা বেশ ক্ষতিকারক হতে পারে। তিনি বলেন, যদি কারো রক্তনালী দুর্বল হয়, অতিরিক্ত চাপের কারণে সেগুলো ফেটে যেতে পারে এবং ব্যক্তি স্ট্রোক করতে পারে। কার জন্য কতটুকু লবণ প্রয়োজন তা নির্ভর করে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা কোন পর্যায়ে আছে তার উপর।
কিছু দেশের মানুষ লবণ বেশি খায় কেন? কিছু দেশের মানুষের লবণ বেশি খাওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। কারণ তারা প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খায়। আর এ ধরনের খাবারে লবণের মাত্রা অনেক বেশি থাকে। আবার কিছু দেশে লবণ বেশি খাওয়া তাদের সংস্কৃতির অংশ। কাজাখস্তানে একজন ব্যক্তি গড়ে প্রায় ১৭ গ্রাম লবণ গ্রহণ করে, যা লবণ খাওয়ার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় ছয় গ্রাম এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের প্রায় তিন গুণ বেশি।
কাজাখস্তানের মানুষ মাংস খেতে পছন্দ করে। বিশেষ করে আবহাওয়ার কারণে শীতের সময় কেবল সবজি খাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে অনেক বেশি ক্যালরি, চর্বি আর মাংস তাদের খাদ্য তালিকায় থাকে। আর এই মাংস সংরক্ষণ করা হয় কেবল লবণ দিয়ে। তাই অনেক পরিবার শীতের সময়ের জন্যও লবণ সংরক্ষণ করে।
বছরের অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশটিতে অনেক ঠান্ডা পড়ে। ফলে সেখানে খাবার সংরক্ষণের জন্য এখনও প্রচুর লবণ ব্যবহার করা হয়। আর তা শুধু মাংসের জন্যে না, দুধের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। লবণ শুধু মসলা না, বরং এটি খাবার মজুত রাখার একটি উপায়।

প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৪