রাত জেগে স্মার্টফোন ব্যবহারে যত ক্ষতি

বন্ধুরা, ইদানিং তোমাদের বয়সী তরুণ প্রজন্মের রাত জেগে স্মার্টফোনে ফেসবুক, গেম ও রিল স্ক্রলিং করা একটা অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বালিশের পাশে রেখেই ঘুমাচ্ছ অনেকে, আবার ঘুম থেকে উঠেই ফোন ব্যবহার করছ। এই স্ক্রিন টাইম যেমন ঘুমের সময়সূচি ও মান নষ্ট করে তেমনি পরের দিন মেজাজ খিটখিটে ও অস্থির করে তুলতে পারে।
হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিংয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবুজ আলোর তুলনায় নীল আলোর সংস্পর্শে প্রায় দ্বিগুণ সময় ধরে মেলাটোনিন দমন করা হয় এবং সার্কাডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ির ছন্দ দ্বিগুণ স্থানান্তরিত হয়। স্ক্রিন থেকে বেরিয়ে আসা নীল আলো মেলাটোনিন উৎপাদনে বাধা দেয়। মেলাটোনিন এক ধরনের হরমোন, যার অভাবে ঘুম আসে না এবং ঘুম আসতে দেরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে এটি কেবল ঘুমকেই প্রভাবিত করে না বরং অনিদ্রাও সৃষ্টি করতে পারে, ঘন ঘন ঘুম থেকে ওঠা এবং সকালের ক্লান্তির কারণ হতে পারে।

রাতে স্ক্রলিং চোখের ওপর প্রভাব ফেলে। এছাড়াও, রাতে ফোনে বেশি সময় ধরে স্ক্রলিং করলে শুধু ঘুমের ক্ষতি হয় না, চোখের ওপরও বেশ চাপ পড়ে। বিশেষ করে বিছানায় শুয়ে ফোন ব্যবহার করলে চোখে শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া এবং ব্যথা হতে পারে। দীর্ঘসময় স্ক্রিনের দিকে তাকানোর ফলে ‘টেক্সট নেক’ বা সার্ভিকাল স্ট্রেনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা ঘাড়ে ও মেরুদণ্ডে ব্যথা সৃষ্টি করে।

রাতে স্ক্রলিং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। ঘুমানোর আগে রিল স্ক্রলিংয়ে ব্যস্ত থাকাকালীন মস্তিষ্ক ক্লান্ত হওয়ার পরিবর্তে সতর্ক অবস্থায় থাকে। এটি ডোপামিন এবং অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে যা শিথিল করা কঠিন। এর ফলে অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা, বিষণ্নতা, মানসিক ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।

এটি স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ওপর প্রভাব ফেলে। ঘুমানোর আগে ইমোশনাল কন্টেন্ট বা নেতিবাচক খবর দেখলে তা স্ট্রেস হরমোনকে ট্রিগার করতে পারে। এর ফলে উদ্বেগ, দুঃখিত, চিন্তিত, বিরক্ত, হতাশ এবং এমনকি দুঃস্বপ্নেরও দেখা দিতে পারে। এমন অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়া কঠিন যার ফলে বিষণ্নতা বা অনিদ্রা হতে পারে।

রাতে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে ঘুমের মান খারাপ হয়ে যায়। যা মনোযোগ, ভুলে যাওয়া, প্রেরণার অভাব, বিভ্রান্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
ঘুমানোর আগে নিয়মিত রিল স্ক্রল করার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রয়েছে। এছাড়া গভীর রাত পর্যন্ত স্ক্রল করার দীর্ঘমেয়াদী পরিণতির মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, স্মৃতিশক্তি দুর্বল, মনোযোগের সময় কমে যাওয়া, হৃদরোগ, বর্ধিত চাপ, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং স্থুলতা।
তাই এসব সমস্যা এড়াতে গড়ে তুলতে হবে নতুন কিছু অভ্যাস।

১. ঘুমানোর কমপক্ষে তিন ঘণ্টা আগে স্ক্রিন ব্যবহার করা বাদ দিতে হবে।
২. যদি ঘুমিয়ে পড়ার জন্য বিনোদন দরকার হয় তাহলে স্ক্রিন ব্যবহারের পরিবর্তে বই পড়ার চেষ্টা করতে হবে।
৩. মোবাইল ফোনে সবসময় নাইট মোড ব্যবহার করতে হবে। রাতের বেলা স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার যেমন আমাদের ঘুমের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের জন্যও বিপজ্জনক। তাই এখনই সচেতন হও এবং একটি স্বাস্থ্যকর রুটিন গড়ে তোলো।
বন্ধুরা, এবার শিশুদের প্রসঙ্গে আসি। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা সর্বাধুনিক মডেলের মোবাইল ফোনও এখন কারো সাহায্য ছাড়াই চালাতে পারে। বাংলাদেশের শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ ঘণ্টা স্মার্টফোন ব্যবহার করে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত সর্বোচ্চ সময়ের প্রায় ৩ গুণ। চলতি বছর বাংলাদেশে শিশুদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ প্রি-স্কুল শিশু স্মার্টফোনে আসক্ত। এদের মধ্যে ২৯ শতাংশের মারাত্মক স্মার্টফোন আসক্তি রয়েছে। অন্যদিকে মাত্র ১৪ শতাংশ শিশু অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের স্মার্টফোনে আসক্তির কারণ মূলত সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের সময় না কাটানো, খেলার মাঠের অভাব, খেলার সাথীর অভাব, স্মার্টফোনে কার্টুন দেখা, স্মার্টফোনে গেম খেলা ইত্যাদি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেট গেম আসক্তি অন্যান্য নেশাজাত দ্রব্যের আসক্তির মতোই। ভার্চুয়াল এন্টারটেইনমেন্ট বা বিনোদন দেখার সময়ে আমাদের মস্তিষ্কের কোষ থেকে ডোপামিন নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরিত হয়। এই ডোপামিন আমাদের মনে ভালো লাগার অনুভূতি সঞ্চার করে। আসক্তি তৈরি করে।
স্মার্টফোন আসক্তি প্রতিরোধে পিতামাতাকে ৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের স্মার্টফোন দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। সন্তানকে সময় দিতে হবে। তাদের হাতে বই তুলে দিতে হবে। শিশুকে বাগান, পার্ক বা মাঠে খেলাধুলা করতে বা ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে। পারিবারিক সম্পর্কগুলোর চর্চা বাড়াতে হবে। শিশুদের সাথে খেলতে হবে। এতে তাদের মন প্রফুল্ল থাকবে, নানা বিষয়ে জানার আগ্রহ তৈরি হবে। ফলে তাদের মেধা বিকশিত হবে, ভালো থাকবে শরীরও। শিশুদের টিভি কিংবা মোবাইলে স্ক্রিন টাইম যেন এক ঘণ্টার বেশি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০২৫