বন্ধুরা, গবেষণা থেকে জানা গেছে, মানবদেহের কোলেস্টেরলের মাত্রা থেকে শুরু করে মানসিক রোগ পর্যন্ত সবকিছুর সাথে অন্ত্র বা পেটের স্বাস্থ্যের সংযোগ রয়েছে। তাই পেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখা কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং কীভাবে পেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখা যেতে পারে সে সম্পর্কে আমাদের জানা আবশ্যক।
মানবদেহের অন্ত্র অর্থাৎ পাকস্থলী থেকে পায়ু পর্যন্ত লম্বা প্যাঁচানো যে নালি থাকে সেটার গঠন বেশ জটিল। এই জটিল গঠনের কারণে, অন্ত্রের সুস্থতা সনাক্ত করা অন্যান্য অঙ্গের সুস্থতা সনাক্ত করার মতো সহজ নয়। অন্ত্রের স্বাস্থ্য পরিমাপ করার জন্য এমন কোনও একক উপায় নেই যা ব্যবহার করা যেতে পারে। আমাদের অন্ত্র মাইক্রোবস বা জীবাণুতে পূর্ণ। এগুলোর সংখ্যা এতটাই বেশি যে সব মাইক্রোবসকে যদি একত্রিত করা হয়, তবে তাদের ওজন এক কেজি ৮০০ গ্রামের বেশি হবে।
অন্ত্রে পিত্ত, শ্লেষ্মা, বিভিন্ন ধরনের অণুজীব, হজম হওয়া খাবার, অপাচ্য বা শোষিত খাবার, বিপাকীয় খাবার এমন বিভিন্ন ধরনের উপাদান থাকে। অন্ত্রের এসব উপাদানের প্রতি গ্রামে ১০ হাজার কোটি ব্যাকটেরিয়া রয়েছে।
অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. ক্যাটেরিনা জনসন। তিনি বলেছেন, একটি সুস্থ অন্ত্রে অনেক বৈচিত্র্যময় মাইক্রোবস বা জীবাণু থাকে। মাইক্রোবায়োম বিজ্ঞান এখনও তুলনামূলকভাবে একটি অপরিণত গবেষণা ক্ষেত্র, অর্থাৎ আমরা এখনও বিশদভাবে জানি না যে একটি সুস্থ অন্ত্র দেখতে কেমন হয়। আমাদের মাইক্রোবায়োমগুলো বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এতই স্বতন্ত্র আর বৈচিত্র্যময়, তার মধ্যে মাইক্রোবায়োমগুলোর হাজার হাজার প্রজাতি রয়েছে (এবং প্রজাতির মধ্যে বিভিন্ন স্ট্রেন রয়েছে), যার অধিকাংশেরই কার্যকারিতা সম্পর্কে আমরা জানি না।
অন্ত্র সুস্থ থাকা কেন জরুরি? অন্ত্র ‘শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে’ প্রভাবিত করতে পারে। মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে যা গাট ব্রেইন এক্সিস অর্থাৎ বাংলায় অন্ত্র-মস্তিষ্কের অক্ষ নামে পরিচিত। এখানে অন্ত্র ও মস্তিষ্ক একে অন্যের জন্য অপরিহার্য – গবেষণায় দেখা গেছে যে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের অনুপস্থিতির কারণে মস্তিষ্কের বিকাশ অস্বাভাবিক হতে পারে।
বন্ধুরা, অন্ত্রকে কখনও কখনও দ্বিতীয় মস্তিষ্ক বলা হয়, কারণ অন্ত্রে থাকে ব্যাকটেরিয়া যা মস্তিষ্কের ১০ কোটি নিউরনের মাধ্যমে আমাদের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। নিউরন হলো আমাদের মস্তিষ্ক এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে থাকা কোষ যা আমাদের শরীরকে বার্তা দেয় যে কখন কেমন আচরণ করতে হবে। আমাদের অন্ত্র, মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি করতে পারে যা আমাদের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। নিউরোট্রান্সমিটার এক ধরনের বার্তাবাহক যা স্নায়ুসন্ধি দিয়ে এক নিউরন থেকে অপর নিউরনে রাসায়নিক সিগন্যাল পাঠায়।
আমাদের অন্ত্রের সবচেয়ে বড় কাজ খাদ্য থেকে পুষ্টি শোষণ করা। যুক্তরাজ্যের দ্য গাট হেলথ ডক্টর নামে পরিচিত মেগান রসি বলেন, অন্ত্রে জীবাণুর ভারসাম্যহীনতা দেখা দিলে ৭০টিরও বেশি বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। এরমধ্যে রয়েছে হৃদরোগ ও শ্বাসযন্ত্রজনিত অসুস্থতা। সেইসাথে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো অটোইমিউন রোগও হতে পারে। আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ করার ইমিউন কোষগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ অন্ত্রে বাস করে এবং এই কোষগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমের সাথে প্রতিনিয়ত সংযুক্ত থাকে। এই কারণেই যেসব মানুষের অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো তাদের ইমিউন সিস্টেম স্বাভাবিক থাকে বলেই মনে হয়।
বন্ধুরা, এবার এসো আমরা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখার উপায় সম্পর্কে জেনে নিই। বেশ কয়েক বছর আগে আমেরিকান গাট প্রজেক্ট পরিচালিত এক গবেষণার পর, বিশেষজ্ঞরা অন্ত্রে মাইক্রোবায়োমের বৈচিত্র্য বাড়াতে প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৩০টি ভিন্ন ভিন্ন উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিতে শুরু করেছেন। এর মধ্যে শুধু ফল ও সবজিই নয় বরং বীজ, মশলা আর বাদামও রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস অনুসারে, ফাইবার সমৃদ্ধ বা আঁশযুক্ত খাবার আমাদের পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি দিয়ে থাকে। ফাইবার আমাদের হজমে সহায়তা করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে, এ কারণে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন অন্তত ৩০ গ্রাম ফাইবার খাওয়ার পরামর্শ দেয়। এক্ষেত্রে সাদা রুটির চাইতে হোল গ্রেইনের বাদামি রুটি বা দানাদার রুটি বেছে নেয়া যেতে পারে। সেইসাথে বাদামি চাল বা আস্ত গমের পাস্তা বেছে নিলে বেশি ফাইবার খাওয়া হবে।
ফাইবারের অন্যান্য উৎসের মধ্যে রয়েছে আলু এবং ডালজাতীয় খাবার যেমন : মটরশুঁটি, মসুর ডাল বা ছোলা, যা তরকারি ও সালাদে যোগ করা যেতে পারে। প্রোবায়োটিক খাবার (নির্দিষ্ট ধরনের ফাইবার ও কার্বোহাইড্রেট) অন্ত্রে ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে কলা, পেঁয়াজ ও পেঁয়াজ পাতা, রসুন, বাঁধাকপি, লিক, ওটস, অ্যাসপারাগাস, নেক্টারিন ফল, ব্লুবেরি ও আঙ্গুর।
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার অন্ত্রের জন্য ভালো নয়। অনেক বেশি প্রক্রিয়াজাত খাবারে এমন উপাদান থাকে যা আমাদের অন্ত্রে ‘ভালো’ ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিকে দমন করে কিংবা ‘খারাপ’ ব্যাকটেরিয়া বাড়িয়ে দেয়।
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৫



