‘ঈদ মানে তো খুশির খেলা
ফুলের মতো গন্ধে দোলা
ছন্দে ঝরা বৃষ্টি ধারা
টাপুর টুপুর
ঈদ মানে তো দোল দোলা
সকাল-দুপুর।’
তুমি যদি তোমার খাতায় যেন তেন একটা মিনার এঁকে তারপাশে একটা সরু চাঁদ একে দাও তাহলে যে কেউ বুঝতে পারবে তুমি কী বুঝাতে চাও। বাসায় তোমার ছোট ভাইটাও বুঝতে পারবে- হয়তো উল্লাসে চিৎকার করে উঠবে- ‘ঈদ মোবারক’। এ ঈদ কার জন্য? কয়েকজনের জন্য? না, তা কী করে হয়? এই খুশির দোলা ওদের দোল দোলা তো সবার জন্য। পৃথিবীর সব মানুষের জন্য। এতেই ঈদের প্রতিচ্ছবি আমাদের সামনে ভেসে উঠবে।
সত্যি ঈদ আমাদের কাছে একটা পরিচিত নাম-একটা পর্বের নাম। ঈদের কথা বলতে তোমাদের অনেকেরই মন আনন্দে নেচে ওঠে। চোখে ভাসে এক এক করে আনন্দের ছবি- নতুন জামা, জুতো, ফিরনি, পায়েস, পোলাও কোরমা কোলাকুলি আর এ বাড়ি ও বাড়ি বেড়ানো। কিন্তু ঈদের আনন্দ কি শুধু এ সবেই? নাহ্ সব কিছুর ওপরও একটা আনন্দ আছে। আর সেই আনন্দই ঈদের প্রাণ। আমাদের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদ তাঁর কবিতায় ঈদের খুশিকে কী বলেছেন জানো?
‘ভ্রাতৃপ্রেমের বার্তা শোনায়
খুশির এ চাঁদরাত,
যায় ছড়িয়ে বিশ্বধরায়
আনন্দ সওগাত।’
তাহলে বুঝতেই পারছো- এ আনন্দ কী ধরনের আনন্দ! এ আনন্দ হল নিজের মনটাকে পবিত্র করার আনন্দ। এ আনন্দ লোভ-লালসা, হিংসা-অহঙ্কার সব কিছুকে জয় করে বিজয়ের নতুন পতাকা উড়াবার আনন্দ। অন্যকে আপন করে নেয়ার আনন্দ। সহানুভূতির পরশে অন্যের দুঃখ কষ্টকে দূর করার আনন্দ। তুমি, আমি সবাই মানুষ হিসেবে সমান- কথাটি বুঝতে পারার আনন্দ।
এ আনন্দই বড় আনন্দ। এ আনন্দকে পাওয়ার জন্য আমরা পুরো এক মাস রোজা রাখি। সাধনা করি ত্যাগ করি
‘রমজান অবসান এল ঈদ ভাইরে
গুলবাগে ফুলকুঁড়ি হাসে আজ তাইরে
রাঙালাল টুকটুক
কোমল ও কচি মুখ
খুশবুতে ভরা বুক
তুলনা যে নাইরে’
তোমাদের আগেই বলেছি- পুরো এক মাস রমজানের ত্যাগ ও সাধনার পর আসে এই উৎসবের দিন। রমজান হল নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সাধনা। স্কুলের কঠিন পরীক্ষার পর ছুটি পাওয়ার যে আনন্দ, এই উৎসব তেমনি বান বইয়ে দিল সব মানুষের অন্তরে।
রমজানে অনুভব করা যায় অন্যের কষ্ট। একজন গরিবকে দিলে তুমি সাধ্য মতো দান। তোমার ছোট্ট গরিব বন্ধুটিকে কাছে টেনে নেবে তোমার ভালবাসায় তাকেও জড়িয়ে নেবে-
আতর যেমন ছড়ায় সুবাস
প্রাণের গুলিস্তানে
তেমনি ঈদ ছড়ায় খুশি
সবার প্রাণে প্রাণে।
ঈদের দিনে কেউ কাঁদতে নেই। আর কাউকে কাঁদাতেও মানা। ঐদিন তো খুশির দিন। একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরার দিন। তোমার বন্ধু যদি কোনো কারণে দুঃখ পায় তাহলে তুমি তার দুঃখ দূর করে কাছে টেনে নেবে। চোখের পানি মুছে দিয়ে খুশির ভাগটা তাকেও দেবে বলবে-
কাঁদছো কেনো বন্ধু তুমি
কাঁদতে যে আজ মানা
আজকে হল খুশির ঈদ
নেই কি তোমার জানা।
আগেই তো বলেছি, রমজানে অনুভব করলে অন্যের কষ্ট-এ এক অন্য ধরনের আনন্দ, তাই না। মানুষের মাঝে আমরা যে মিথ্যার দেয়াল তুলে রেখেছি সে দেয়াল ভেঙে যাওয়ার আনন্দ। ঈদ কিন্তু এভাবেই ভাবতে শেখায়। তোমাকে অনুপ্রেরণা জোগায়। অন্যের দুঃখ ঘুচাবার শপথ নিতে শেখায়।
ঈদের এই পটভূমিতে এসো আজ নিজেকে যাচাই করি। যাচাই করে দেখি নিজের লোভ-লালসা ও অহঙ্কারকে কতটুকু দমন করতে পেরেছি আমরা।
কতটুকু আপন করতে পেরেছি আমরা অন্যকে, নিজের বন্ধু-বান্ধবকে, পথের ভিখারীকে। আর এটাই হল ঈদুল ফিতর অনন্য এক উৎসব। পবিত্র উৎসব। শুধু নতুন কাপড় পরার উৎসব নয়। এই উৎসব নতুনভাবে নিজেকে গড়ার উৎসব। মানবতার বাগানে প্রেম-প্রীতি, ভালবাসার ফুল ফোটানোর উৎসব।
তিরিশ রোজার ফসল ভরা
নাও দোলে, প্রাণ পাগল করা।
বেহেশতের বন্দরের পানে
চলে ও নাও উজান টানে।
আনন্দ ঢেউ উছলে পড়ে
শ্যামল মাটির ঘরে ঘরে
ঈদ হবে কাল ঈদ হবে
ভরবে খুশির সৌরভে।


