বর্ষাকালে অঝোর ধারার ঝরছে বৃষ্টি। অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এ সময় দেখা দেয় বন্যা। এছাড়াও রসালো ফলের সুবাসিত মিষ্টি আমেজ বর্ষার অনন্য বৈশিষ্ট্য। ষড়ঋতুর দেশ আমাদের বাংলাদেশ। সুজলা-সুফলা এদেশ। আষাঢ় ও শ্রাবণ এই দুই মাস নিয়ে বর্ষাকাল। পৃথিবীর আর কোনো দেশে ঋতু হিসেবে বর্ষার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বা নাম নেই। বর্ষা ঋতু যেন শুধু বাঙালিদের ঋতু।
ঋতু বৈচিত্র্যের দিক থেকে আমাদের দেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে অনন্য। কদম ফুলের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ যুগে যুগে নগরবাসী কিংবা গ্রামবাসীকে মুগ্ধ করে এসেছে। তাই বর্ষা কবিদের ঋতু। ‘বৃষ্টি ঝরুক আর নাই-ই-বা ঝরে পড়ুক, বাদল দিনে প্রথম কদম ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক, জুলাই-আগস্ট যেন একান্তই বর্ষার। ময়ূর পেখম মেলুক আর নাই-বা মেলুক, আজ শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে কবিতার খাতা, ডায়রির পাতা ভরে তোলার দিন। মেঘের ভেলায় ভেসে কদম ফুলের ডালি সাজিয়ে নব যৌবনা বর্ষার সতেজ আগমন ঘটে এই দিনে। কারণ, সেদিন দুপুরে হঠাৎ ঝরেছিল প্রবল বৃষ্টি। স্নাত করে দিয়েছিল শুষ্ক মাটির বুক, সিক্ত করেছিল তৃষ্ণার্ত গাছপালা। বৃষ্টির শীতল স্পর্শ জুড়িয়ে দিয়েছিল তপ্ত হৃদয়। বৃষ্টির স্বচ্ছ পানি ভিজিয়ে দিয়েছিল আমাকে। আর আমি হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিয়েছিলাম বৃষ্টিকে!
কদম ফুলের সরস রূপে সেজে নগরে বর্ষা এসেছে। কদম ফুলের সুঘ্রাণ জানান দিয়ে যায় নবযৌবনা বর্ষার আগমনী বার্তা। কদম গাছগুলো সাদা-হলুদের মিশ্র রঙের ফুলে ছেয়ে গেছে। বর্ষা মানেই গুচ্ছ গুচ্ছ কদম ফুলের সুবাস। পথ চলতে কিংবা বাসে ছোট শিশু কিংবা কিশোরীর হাতে শোভা পায় তরতাজা একগুচ্ছ কদম ফুল। হাত বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে ‘আফা নিবেন?’ মাত্র ১০ টাকা। বর্ষা মানেই বৃষ্টির রিনিঝিনি কিংবা নূপুর-নিক্কণ ধ্বনি।
বর্ষা বিহীন বাংলাদেশ ভাবাই যায় না। বর্ষা ঋতু তার বৈশিষ্ট্যের জন্য স্বতন্ত্র। বর্ষার কোনো জুড়ি নেই। বর্ষা ঋতু কাব্যময়, প্রেমময়। বর্ষা কবিদের ঋতু, কবিতা-গানের ঋতু, আবেগের ঋতু, প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাবার আকাঙ্ক্ষার ঋতু। তাই তো বর্ষা প্রবল বর্ষণে নির্জনে ভালোবাসার সাধ জাগে, চিত্তচাঞ্চল্য বেড়ে যায়, ব্যথিত-বঞ্চিত-নিঃসঙ্গ জীবন প্রেম সুধায় ভরিয়ে দেয়ার সাধ জাগে। শত ঘটনার ভিড়েও কোথায় যেন মিলে এক চিলতে বিশুদ্ধ সুখ। কদম ফুলের মতো তুলতুলে নরম, রঙিন স্বপ্ন দু’চোখের কোণায় ভেসে ওঠে ঠিক যেমন করে আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। কদমের সুঘ্রাণে তৃপ্ত হয় তৃষিত হৃদয়।
ঋতু হিসেবে বর্ষাকাল একান্তই বাঙালিদের নিজস্ব। ‘বর্ষণমুখর সন্ধ্যা বা বৃষ্টিভেজা রাত আমার দেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও কি মিলবে? শীতপ্রধান দেশে বা পৃথিবীর অন্য দেশের কবিরা বর্ষার সঙ্গে পরিচিতই না। তাই বর্ষার কদরও তারা জানেন না। যেমন আমাদের বাঙালি কবিরা বর্ষায় কাব্য রচনায় নিমগ্ন থেকেছেন। ফররুখ বৃষ্টিকে চিত্রায়িত করেছেন এইভাবে-
বৃষ্টি এলো কাশ বনে
জাগলো সাড়া ঘাস বনে
বকের সারি কোথা রে
লুকিয়ে গেল বাঁশ বনে
আষাঢ়-শ্রাবণে বর্ষার অশ্রু প্লাবনে প্রকৃতি হয়ে ওঠে সরস-শ্যামল। প্রবল বারিধারায় চারপাশ সতেজ ও প্রাণবন্ত হয়ে জেগে ওঠে। গোধূলির পর অজস্র করুণার অমৃতধারার আবির্ভাব হয়। মেঘ-মাধুর্যে পরিপূর্ণ আকাশটাও সঙ্গীতের অপূর্ব সুর-মূর্ছনায় ঝংকারিত হয় বৃষ্টি ঝরার তালে তালে। সেই রিনিঝিনি বৃষ্টির ধ্বনি মনের কিনারা ছুঁয়ে কী এক অজানা অনুভূতি স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে। মনের আকাশটাও তাই মেঘ-মাধুর্যের সৌন্দর্যে কোমল ও সিক্ত হয়।
আঁধারের আঁচলে সূর্যের চোখ বেঁধে রেখে মেঘ আর সূর্যের লুকোচুরি খেলার মাধুর্যময় দৃশ্য অনির্বচনীয়। তাই তো এসব দৃশ্য অবলোকন করে কবির অশান্ত হৃদয় উতলা হয়েছে, জেগে উঠেছে মুগ্ধতায়। আর কবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে, প্রকৃতির রূপে নিজেকে হারিয়ে অনেক ভাবুক মন খুঁজে বেড়াচ্ছে স্বপ্নের খেই। তাই বাধ্য হয়ে কলম নিয়ে বসতে হলো কদম ফুল আর সুজলা-সুফলা, নবযৌবনা বর্ষার বন্দনা করতে।
কদম ফুলকে বলা হয় বর্ষা ঋতুর হাসি। বৃষ্টিতে ধুয়ে-মুছে কদম ফুল হেসে ওঠে পাতার আড়াল থেকে। প্রতিটি ঋতুতেই ফুলে ফুলে ভরে যায় প্রকৃতি। এসব ফুল প্রকৃতিকে সাজিয়ে তোলে অপরূপ সাজে, প্রকৃতি হয় নিরুপমা। এমনই একটি ঐতিহ্যবাহী বনফুল হচ্ছে কদম ফুল। বৃষ্টির পানিতে সিক্ত মোহনীয় ঘ্রাণে ভরপুর এই কদম ফুলকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে রচিত হয়েছে অসংখ্য ছড়া, কবিতা, গান ও উপন্যাস। কদম ফুলের সতেজ সৌন্দর্য আর মোহনীয় সুঘ্রাণে শুধু কবিরাই মুগ্ধ হন না, প্রতিটি বাঙালির মনেও সৃষ্টি করে ভিন্ন অনুভূতি, রয়েছে কদম ফুলের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আকর্ষণ। হলুদ-সাদার মিশ্রণে গোলাকৃতির এই ফুল এখন কদম গাছে গাছে শোভা পাচ্ছে। কদম গাছের শাখে পাতার আড়ালে ফুটে থাকা অজস্র কদম ফুলের সুগন্ধ লোকালয় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। আর তাই তো কদম ফুলকে বলা হয় বর্ষার দূত। কদম ফুলের আরেকটি নাম হচ্ছে নীপ। কদম ফুলের সৌন্দর্যের মতোই আরও কিছু চমৎকার নাম রয়েছে। বৃত্তপুষ্প, সর্ষপ, সুরভী, মেঘাগমপ্রিয়, মঞ্জুকেশিনী, কর্ণপূরক, পুলকিত এসবও কদম ফুলের নাম। কদম নামটি এসেছে সংস্কৃত নাম কদম্ব থেকে। কদম ফুল শুধু বর্ষায় প্রকৃতির হাসি নয়, এর রয়েছে নানা উপকারিতা। কদম গাছের ছাল জ্বরের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোথাও তো কদম ফুল তরকারি হিসেবে রান্না করেও খাওয়া হয়। কদম গাছের কাঠ দিয়ে দিয়াশলাই তৈরি করা হয়ে থাকে।
বর্ষায় প্রকৃতির সতেজ-সজীব রূপ-রস যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয় জয় করে এসেছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সব আবর্জনা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে। বন্যার পানি পলিমাটি বয়ে এনে দেশকে করে সুজলা-সুফলা। তাই তো বর্ষা ঋতু এত কাব্যময়, প্রেমময়, ঐশ্বর্যশালী। তাই বর্ষাকাল বাঙালির এত প্রিয়।
প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৫



