বিজয়ের রং

0
5

ক্লাসজুড়ে রঙের উৎসব। বিজয় দিবস উপলক্ষে ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা চলছে। নানা রকম রঙের মিষ্টি গন্ধে ঘর মৌ মৌ করছে। প্রতিটি সাদা আর্ট পেপার যেন লাল-সবুজের আলোয় উদ্ভাসিত। কেউ আঁকছে স্মৃতিসৌধের দৃঢ়তা, কেউবা গ্রামের সবুজ মাঠের ওপর উড়ন্ত এক বিশাল পতাকা।

কিন্তু রিয়া স্থির। তার তুলিটা এখনো রঙের কৌটায় ডোবেনি। সাদা খাতাটার দিকে তাকিয়ে সে শুধু ভাবছে, ‘সবাই একই ছবি আঁকছে কেন? লাল-সবুজ তো কেবল পতাকার রং। কিন্তু বিজয় তো বিশাল- তার রং কি শুধু এই দুটো?’

তার বন্ধু আনিকা এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে রিয়া, তুই কিছু আঁকছিস না যে? আর মাত্র এক ঘণ্টা আছে।’
রিয়া বিষণ্ন গলায় বলল, ‘আমার শুধু পতাকা আঁকতে ইচ্ছে করছে না, আনিকা। মনে হচ্ছে, বিজয়ের রং তো আরও অনেক কিছুই হতে পারে।’
আনিকা একটু ভেবেচিন্তে ঠোঁট উল্টে বলল, ‘কী জানি! পতাকার রংই তো বিজয়ের রং।’

রিয়া কোনো উত্তর দিল না। মন খারাপ করে সে ক্লাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।
স্কুলের এক কোণায় ছোট্ট বাগান। সেখানে করিম চাচা আপন মনে গাছগুলোর যত্ন নিচ্ছে। করিম চাচা একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু তিনি তার যুদ্ধের গল্প খুব একটা বলেন না। তার চেহারাটা শান্ত, সারাদিন ফুল-ফলের গাছ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন।
রিয়ার হঠাৎ মনে হলো, করিম চাচাই হয়তো তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে সে তড়িঘড়ি করে বাগানের দিকে ছুটে গেল।

করিম চাচা তখন একটা কচি চারাগাছে আলতো করে পানি দিচ্ছিলেন। রিয়াকে দেখে স্নেহের হাসি হেসে বললেন, ‘কী ব্যাপার, আম্মাজান? এত দৌড়ে এলে যে। আঁকাআঁকি শেষ?’

রিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে তার মনের দ্বিধার কথা খুলে বলল। ‘চাচা, সবাই লাল-সবুজ দিয়ে বিজয় আঁকছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, বিজয়ের তো আরও অনেক রং থাকতে পারে। আপনি তো যুদ্ধ করেছেন… আপনি কি বলে দেবেন, বিজয়ের আসল রং কী?’

করিম চাচা হাসলেন। হাতের কাজ থামিয়ে রিয়ার পাশে বসলেন। তিনি বাগানের কচি সবুজ ঘাসের দিকে ইশারা করলেন।
তারপর নরম গলায় বললেন, ‘এই যে সবুজ, এটা চারাগাছের রং, আবার স্বপ্নেরও রং। আমরা এমন একটা দেশের স্বপ্ন দেখতাম, যেখানে শিশুরা নির্ভয়ে চারাগাছের মতো বেড়ে উঠবে। তাই বিজয়ের প্রথম রং সবুজ।’

এরপর তিনি টকটকে লাল এক জবা ফুলের দিকে তাকালেন।
‘আর এই যে লাল, এটা শুধু রক্ত নয়, আম্মাজান। এটা হলো ভালোবাসা, দেশের জন্য মানুষের ত্যাগের প্রতীক। তাই বিজয়ের আরেকটা রং লাল।’
রিয়া মুগ্ধ হয়ে মাথা নাড়ল।

করিম চাচা এবার আকাশের দিকে তাকালেন। তার চোখ যেন অনেক দূরে কিছু খুঁজছে। ‘কিন্তু শোনো, বিজয়ের সবচেয়ে গোপন আর সুন্দর রংটা হলো… সোনালি।’
‘সোনালি?’ রিয়ার চোখে অসীম কৌতূহল।

করিম চাচা গভীর নিঃশ্বাস নিলেন, ‘যুদ্ধ শেষ। যখন আমরা জয়ী হলাম, সেই ভোরে প্রথম সূর্যটা যখন উঠল, রক্ত ঢালা মাটির ওপর তার নরম সোনালি আলো এসে পড়ল। মনে হলো যেন নতুন করে জীবন শুরু করলাম। ওই সোনালি রঙই হলো…’

রিয়ার চোখ দুটো নতুন এক আলোয় ঝলমল করে উঠল। সে তার মনের ক্যানভাসটা খুঁজে পেয়েছে। সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে করিম চাচাকে শক্ত করে একটা স্যালুট দিয়ে দৌড়ে ক্লাসে ফিরে গেল।

এবার তার তুলি এক মিনিটের জন্যও থামল না। সময় আছে মাত্র আধ ঘণ্টার মতো। দ্রুত হাতে সে তার সাদা খাতায় প্রথমে আঁকল সোনালি ভোরের স্নিগ্ধ আকাশ। নিচে আঁকল এক বিশাল সবুজ মাঠ। সেই মাঠে একটি মা তার শিশুকে বুকে নিয়ে হাসছে- ঠিক যেন মুক্তির প্রতিচ্ছবি। আর সেই সবুজ মাঠের এক কোণায় সে ফুটিয়ে তুলল একটি টকটকে লাল গোলাপ।

বিকেলের দিকে ফলাফল ঘোষণা করা হলো। প্রতিযোগিতায় রিয়ার ছবিটাই প্রথম স্থান অধিকার করেছে। করিম চাচা এই খবর শুনে শান্তভাবে হাসলেন। তিনি জানেন, বিজয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল রং হৃদয়েই জন্ম নেয়—যা নতুন প্রজন্মের চোখে সোনালি স্বপ্নে ধরা দেয়।

প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৫