পশুদের সম্রাট সিংহ আয়নায় নিজেকে বার বার দেখছে। আশ আর মেটে না। আহা, আমি কত সুন্দর, অভিজাত তো বটেই। আমার অনুগত প্রজাকুলকে দেখাতে হয় যে, তাদের নেতা আগাপাশতলাই একজন সম্রাট।
পশুরাজ সিংহ তার রাজকীয় পোশাক-আশাক পরে নিয়েছে, হীরে-জহরত দিয়ে বানানো মুকুট মাথায় চাপিয়েছে। সোনা-রুপার যতগুল পদক আছে সবগুল জামায় ঝুলিয়ে নিয়েছে।
মহাসমারোহে সিংহটি রাজপথে নেমেছে, যে তার সামনে পড়ছে, সে দেখে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে তাকে সম্মান দেখাচ্ছে। পশুরাজ বলে ঠিক আছে, ঠিকই আছে। আমার লোকজনরা তো আমায় এভাবেই সম্মান করবে, তাজিম করবে। আমি তো তাদেরই সম্রাট। হঠাৎ তার নজর পড়ল একটা কাচপোকা (নুবার পোকাও বলে কেউ কেউ) রাজপথে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে পশুপতির মেজাজ খিচরে যায় চিৎকার করে বলে, হ্যারে কাচপোকা, তুই এখনো দাঁড়িয়ে আছিস। মাটিতে শুয়ে প্রণাম করে আমাকে সম্মান জানাসনি! তাড়াতাড়ি সর্বাঙ্গে প্রণাম কর।
কাচপোকা থতমত খেয়ে বলে, মহারাজ, আপনি অনেক উঁচু থেকে আমাকে দেখছেন তো, নিচু হয়ে ভাল করে নিরিখ করলেই দেখবেন, আমি এখনো মাটিতে মাথা ঠেকিয়েই আছি। সম্রাট মাথাটা ঝুঁকিয়ে দেখতে শুরু করে কিন্তু কিছুই তার নজরে পড়ছে না। রেগেমেগে বলে ওরে কাচপোকা আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি নে। তুই যে আমাকে সম্মান দেখাচ্ছিস, বুঝতেই পাচ্ছি নে।
কাচপোকা বলে মহামতি সম্রাট আপনি আরো নিচু হয়ে আরো কাছে থেকে দেখুন, দেখবেন আমি এখনো মাটিতেই উবু হয়ে আছি।
পশুরাজ সিংহ আরো ঝুঁকলেন, আরো একটু। হয়েছে – কী, রাজকীয় পোশাক, মুকুট, হীরে-জহরত খচিত পোশাক, সোনা-রুপার ভারী ভারী পদক সবটা মিলিয়ে শরীরের উপরের দিকটা বেশি ভারী হয়ে পড়েছিল। নিজের ভার সইতে না পেরে সিংহ, আমাদের মহামতি পশুরাজ ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল, আর গর্জন করতে করতে রাস্তার পাশেই ছিল একটা নালা সেই নালার মধ্যে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ল।
কাচপোকা গতিক খারাপ দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে পালিয়ে যায়। পশুরাজ সিংহের চুল থেকে নখ পর্যন্ত কাদায় মাখামাখি, কে যেন সমস্ত শরীরে কাদা দিয়ে লেপে মুছে দিয়েছে।
নীতিকথা : উঁচু আর শক্তিমানদের অর্জনেও দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়।
(আর্নল্ড লোবেলের গল্প অবলম্বনে)
প্রকাশকাল : জুলাই ২০১৬।



