আটি আর পাটি

0
3

অনেক দিন আগের কথা। এক দেশে ছিল আটি আর পাটি নামে দুটি জমজ ভাই। আটি ছিল বড় আর পাটি ছিল ছোট। একদিন আটি তার ছোট ভাই পাটিকে বলল- এখন তো স্কুল বন্ধ, চল আমরা মামা বাড়ি বেড়াতে যাই।
আটির কথা শুনে পাটি খুশি হয়ে বলল- তুমি ঠিকই বলেছো ভাইয়া, আমরা মামা বাড়িতে গিয়ে, মজা করে পিঠা খাবো। চল আম্মুকে বলে আজ দুপুরেই আমরা মামা বাড়িতে রওনা হয়ে যাই।
এই কথা বলে আটি আর পাটি দুই ভাই মিলে তাদের আম্মুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঠিক দুপুর বেলা চলল মামাবাড়ির দিকে। সবুজ শ্যামল গ্রাম পেরিয়ে, হাট পেরিয়ে, মাঠের পরে মাঠ পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওরা চলল এক বনের পাশ দিয়ে। অমনি বনের ভেতর থেকে একটা লিকলিকে জিন বেরিয়ে এসে বলল- তোঁরা কাঁরা রে…এ্যাঁ! আমার বাঁড়ির পাঁশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিস। বলি আমার খাঁজনা কোথায়? জানিস নাঁ… এঁই পথ দিয়ে যেঁতে হঁলে আঁমাকে খাঁজনা দিয়ে যেঁতে হঁয়?
জিনের শরীর-স্বাস্থ্য দেখে আটি আর পাটি তো হেসেই কুটিকুটি। ওরা বলল- হ্যাঁরে তালপাতার সিপাই, তোর নাম। কি রে? দেখে তো মনে হচ্ছে তুই একটা কাকলাশ!
আটি আর পাটির কথা শুনে জিন তো গেল ভীষণ রেগে। সে রাগে কটমট করে বলল-হুঁ এঁই কঁথা! আঁমাকে দেঁখে তোঁদের পছন্দ হচ্ছে নাঁ। তোঁরা মোটেও ভয় পাঁচ্ছিস না… অ্যাঁ! আঁরে আমি হঁলাম গিয়ে কাঁঠিজিন। এই পথ দিয়ে যেতে হলে আমাকে মাঁঁছ, মুরগি, হাঁস, মুঁড়ি, মুড়কি খাঁজনা দিয়ে যেতে হয়।… তাঁ কি জানিস নাঁ এ্যাঁ

জিনের কথা শুনে আটি বলল- ও! তুই তাহলে কাঠিজিন? সে জন্যই তো কাঠির মতো চিকন লিকলিকে তোর শরীর। তাহলে তুই কোন সাহসে আমাদের কাছে খাজনা চাচ্ছিস? আমরা দুই ভাই মিলে তো তোকে কিলিয়ে তাল পাকিয়ে দেবো। জানিস না, আমরা দুই ভাই জিন পিটানোর যম। আমাদের কাছে কোন সাহসে খাজনা চাচ্ছিস? দাঁড়া, তবে আজ তোকে দেখাচ্ছি মজা। তোর বাপের নাম আজ ভুলিয়েই ছাড়বো।
এই কথা বলে দুই ভাই মিলে কাঠিজিনকে গাছের ডাল ভেঙে সেই ডাল দিয়ে পেটাতে পেটাতে তাড়িয়ে দিল বনের ভেতর। তারপর দুই ভাই মিলে আবার হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসল নদীর ঘাটে। ওখানে এসে ওরা দেখল কী। একটা বৈঠা নিয়ে নৌকা ভিড়িয়ে বসে আছে একজন মাঝি। আটি আর পাটি মাঝিকে বলল- তোমার নাম কী ভাই?
মাঝি বলল- আমার নাম লাঠিমাঝি। তোমরা কোথায় যাবে? আমার নৌকায় এসো।
আটি আর পাটি বলল- আমরা নদীর ওপার মামা বাড়িতে যাবো। তুমি নদী পার করতে কতো টাকা নেবে লাঠিভাই?
লাঠিমাঝি বলল- আমাকে এক টাকা দিতে হবে। তোমরা রাজি তো?
আটি বলল- ঠিক আছে, আমরা তোমাকে এক টাকাই দেবো। এবার নৌকা ছাড়ো।
এই কথা বলে আটি আর পাটি নৌকায় উঠে বসল।। লাঠিমাঝি নৌকা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে চলল নদীর অপর পারে। আটি আর পাটিও লাঠিমাঝির সাথে সাথে গান ধরল-

নাইয়ারে নায়ের বৈঠা দিয়া ওই পারে যাও নিয়া
সেথায় থাকেন আমার মামা তার গায়েতে রঙিন জামা
তিনি এসে যাবেন মোরে বাড়ির ভিতর নিয়া।
নাইয়ারে নায়ের বৈঠা দিয়া ওই পারে যাও নিয়া।।

তারপর আটি আর পাটি নদীর ওপার পৌঁছে লাঠিমাঝিকে একটাকা দিয়ে ছুটে চলল মামা বাড়ির দিকে। অমনি ওদের মামা দুজনাকে দেখে খুশি হয়ে ওদেরকে নিয়ে গেলেন বাড়ির ভেতরে। আটি আর পাটি মামা-মামীকে সালাম করে আবদার ধরল মামা আমরা মজা মজা করে পাটিশাপটা পিঠা খাবো।
মামা বললেন- বেশতো ভাল কথা। তোমারা হাত-পা ধুয়ে আসো। তোমাদের মামী আজ তোমাদের জন্যে পিঠা বানিয়ে দেবেন।
তখন আটি আর পাটি অনেক খুশি হয়ে হাত-পা ধুয়ে এসে দেখে কী। মামী চালের গুঁড়া, নারিকেল, খেজুরের গুড়, দুধ আর তেল নিয়ে পাটিশাপটা পিঠা বানাতে বসে গেছেন। ওদের মামাতো বোন মিঠুও লেগে গেছে পিঠা বানাতে। তবুও পিঠা বানিয়ে শেষ করতে করতে বেশ রাত হয়ে গেল। তাই একবারে রাতের খাবার আর পিঠা একসাথে খেয়ে দুই ভাই মিলে লেপ মুড়ি দিয়ে দিল আরামে ঘুম। কিন্তু ঠিক রাত দুপুরে ওরা জানালার কাছে হঠাৎ শুনতে পেল হুঁ-হুঁহুঁ-হুঁ, হুঁ-হুঁহুঁ-হুঁ, হুঁ-হুঁহুঁ-হুঁ শব্দ। আটি আর পাটি শব্দ শুনে চুপি চুপি জেগে উঠে আস্তে আস্তে জানালা খুলে উকি দিয়ে দেখে কী। ওদের জানালার কাছে সেই বনের কাঠিজিনটা এসে ওদেরকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে আর হুঁ-হুঁহুঁ-হুঁ, হুঁ-হুঁহুঁ-হুঁ, হুঁ-হুঁহুঁ-হুঁ বলে শব্দ করছে। ওরাও কম নয়। চুপচাপ মামাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলল- ওঠো মামা, জলদি ওঠো। জানালার ওপাশের উঠানে কাঠিজিন এসেছে। লাঠি নিয়ে চল জিনটাকে পিটিয়ে তাড়িয়ে দেই গিয়ে।
ওদের কথা শুনে মামা বলল- ওরে বাবারে, জিনের কথা শুনে আমার ভীষণ ভয় করছে। আমি পারবো না জিনকে পেটাতে। তোমরাও যেও না।
মামার কথা শুনে আটি আর পাটি বলল- না মামা, কোনো ভয় নেই। জিনটা একেবারে কাঠির মতো সরু। ওকে পিটুনি দিয়েই পালিয়ে যাবে। চল তো, জলদি করে চল।
এবার মামা সাহস করে লাঠি নিয়ে চললেন আটি আর পাটির সাথে। ওরা পেছনের দরজা খুলে দৌড়ে গিয়েই কাঠিজিনকে ধরে লাগাল আচ্ছা করে পিটুনি। পিটুনি খেয়ে কাঠিজিন তো ওরে বাবাগো, ওরে মাগো, মরলামগো বলে দৌড় দৌড় দৌড়। এক দৌড়ে গেল পালিয়ে। আটি আর পাটি মামাকে নিয়ে আবার এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুম আর আসে না। তখন অনেক রাত। হঠাৎ ওরা শুনতে গেল- ভূত-ভূতুম-ভূত, ভূত-ভূতুম-ভূত, ভূত-ভূতুম-ভূত, ভূত-ভূতুম-ভূত বলে কে যেন আবার ভয় দেখাতে চাচ্ছে। তাই দুই ভাই আবার লাঠি নিয়ে বেরিয়ে এল ঘরের বাইরে। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। ওরা আবরো শুনতে পেল- ভূত-ভূতুম-ভূত, ভূত-ভূতুম-ভূত, ভূত-ভূতুম-ভূত, ভূত-ভূতুম-ভূত।
এবার ঠিকই খুঁজে পেল ভূত-ভূতুমকে। ওরা আবছা আলোতে দেখে কী। একটা গাছের খুব নিচু ডালে বসে বড় একটা ভূতুম পেঁচা- ভূত-ভূতুম-ভূত, ভূত-ভূতুম-ভূত, ভূত-ভূতুম-ভূত, ভূত-ভূতুম-ভূত বলে ডেকেই চলেছে। শুনলে রীতিমতো ভয়ই লাগে। শরীরটা কেমন যেন শির শির করে ওঠে। মাথাটাও কেমন যেন ঝিম ঝিম করে। মনে হয় এই বুঝি এখনি কেউ ঘাড় মটকে দিয়ে রক্ত চুষে খাবে। তাই বলে আটি আর পাটি মোটেও ভয় পেল না। দুই ভাই বুদ্ধি করে ওদের মামার জাল এনে হেইও বলে ছুড়ে দিয়ে আটকে ফেলল ভূতুম পেঁচাটাকে। তারপর দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রেখে দুইজনা বিছানায় গিয়ে আরাম করে দিল এক ঘুম।
পরের দিন সকালে উঠে সবাইকে দেখাল আটি আর পাটির বেঁধে রাখা পেঁচাটাকে। হৈ হৈ রৈ রৈ করে ছুটে এল পাড়ার সব ছেলে-মেয়ে। পেঁচাটাকে দেখে সবার সেকি ভয়। কেউ তো কাছেই আসতে চায় না। তখন আটি ভুতুম পেঁচার মাথার ঝুটি ধরে টেনে দিয়ে বলল- বেয়াদব পেঁচা মশাই, বলতো সত্যি করে, তুই কেনো রাতের বেলা আমাদেরকে ভয় দেখাচ্ছিলি?
আটির কথা শুনে পেঁচা আকুল হয়ে কেঁদে কেঁদে বলল- দেখুন হুজুর, আমি মোটেও কাউকে ভয় দেখাচ্ছিলাম না। শুধু শুধু আমারে কেন দোষ দিচ্ছেন হুজুর।
পেঁচার কথা শুনে তো আটি গেল রেগে। তাই পেঁচাটাকে আস্তে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল- ফের মিথ্যা কথা। তাহলে অতো রাতে তুই ভূত-ভূতুম-ভূত, ভূত-ভূতুম-ভূত বলে ডাকছিলি কেন? আমরা বুঝি ভয় পাইনি…অ্যাঁ?
পেঁচাটা এবার তার দুটি পাখা একসাথে করে বলল- ভূত-ভুতুম-ভূত, ভূত-হুতুম-ভূত বলে আমি ডেকেছি ঠিকই কিন্তু কাউকে ভয় দেখাতে আমি ওভাবে ডাকিনি। এটাতো আমার দোষ নয়। মহান আল্লাহই আমাকে এভাবে ডাকতে শিখিয়েছেন। তাই আমি অন্য কোন স্বরে ডাকতে জানি না হুজুর। আমাকে আপনি মাফ করে দিন।
আটি আর পাটি এবার একসাথে বলল-এমন পচা স্বরে যখন ডাকিস, তো- অন্য কোথাও গিয়ে ডাকাডাকি করতে পারিস না? শুধু শুধু আমরা ভয় পেলাম।
এবার পেঁচা আরো বিনয়ের সাথে বলল- দেখুন হুজুর, আমিতো এখানে আসি খাবারের লোভে। আর তখনই ডাকতে শুরু করি। আমার ডাক শুনে মাটির তলার কেঁচো, গর্তের ইঁদুর, ঝোপঝাড়ের সাপের বাচ্চা আর ঘরের কুনোব্যাঙ বেরিয়ে আসে। অমনি ওদের ধরে ধরে খাই। তারপর আবার ভূত-ভুতুম-ভূত, ভূত-ভুতুম-ভূত বলে ডেকে ডেকে আল্লাহর শুকরিয়া জানাই। আর সেই ডাক শুনে কেউ যদি ভয় পায় তাহলে কি আমি দায়ী হবো হুজুর? দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আমি গাছের গর্তে আমার বাসায় ঢুকে একটা ঘুম দেই গিয়ে। আবার তো রাতে শিকার ধরতে বের হতে হবে। নইলে যে না খেয়ে উপোস থাকতে হবে।
পেঁচার কথা শুনে আটি আর পাটির খুব মায়া হল। তাই ওরা পেঁচার পায়ের বাঁধন দিল খুলে। অমনি একটা উড়াল দিয়ে দূরের এক বিশাল কাঠবাদামের গাছে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। ওকে আর কেউ দেখতেই পেল না।

তারপর হল কী। মামি ডেকে নিয়ে আটি আর পাটিকে মুড়কি মুড়ি আর পাটিশাপটা পিঠা খেতে দিলেন। দুই মিলে মজা মজা করে পিঠা আর মুড়কি মুড়ি খেয়ে মামার সাথে গেল মাছ ধরতে। মামা নদীতে জাল ফেলে ফেলে ছোট বড় পাবদা, স্বরপুঁটি, কই, ট্যাংরা, শোল, বোয়াল আর ফলি মাছ তুললেন। দুই ভাই মিলে মাছগুলকে বাঁশের ঝাঁকায় ভরে নিয়ে এল মামা বাড়িতে। মামী মাছগুলকে কেটেকুটে ভাজা আর রান্না করলেন। তাই দিয়ে দুপুরে মজা মজা করে ভাত খেয়ে আটি আর পাটি গেল খেলার মাঠে। সেখানে গিয়ে দেখে কী। একটা বিরাট লাল ষাঁড়গরু বেশ হুমহাম করে তেড়ে আসছে। তাই দেখে ভয়ে ছুটে পালাচ্ছে সব ছেলে-মেয়ে।
আটি আর পাটি বুদ্ধি করে ছুটে গেল মামার বাড়িতে। ওরা মোটা একটা দড়ি নিয়ে আবার মাঠের দিকে ছুটে এল। তারপর সাহস করে ষাঁড়গরুটার গলা বেঁধে টানতে টানতে টানতে নিয়ে গেল একটা মোটা গাছের কাছে। অমনি গাছের সাথে দড়ির আরেক প্রান্ত শক্ত করে বেঁধে দিল। তখন লাল ষাঁড়গরুটা রাগে তার বড় বড় শিং দুটি দুলিয়ে কেবল গোঁ গোঁ করতে লাগল। কিন্তু আর মাঠে এসে কাউকে গুঁতো দিতে পারল না। এই না দেখে পাড়ার সব ছেলে মেয়ে ছুটে এসে আটি আর পাটিকে অনেক অনেক সাবাস জানাল। তারপর সবাই মিলে গোল্লাছুট খেলয় মেতে উঠল। এমনি করে খেলতে খেলতে যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল তখন সবাই চলে গেল যার যার বাড়িতে। আটি এবং পাটিও বাঁশ বাগানের পাশ দিয়ে মামা বাড়ির পথ ধরল।
অমনি ছর ছর ছর ছর শব্দ করে পুরো বাঁশবাগান কাঁপিয়ে নেমে এল দশ হাত ওয়ালা একটা জিন। জিনটা মাটিতে নেমেই আটি আর পাটিকে কাতুকুতু দিতে লেগে গেল। কাতুকুতুর চোটে দুই ভাই তো হেসেই কুটিকুটি। তবুও থামল না জিনটা। কাতুকুতু দিতেই থাকল। কতো আর হাসা যায়। তাই হাসির বদলে এবার রেগেই গেল আটি আর পাটি। রাগের চোটে দুই ভাই মিলে জিনটাকে ধরে শক্ত করে একটা গাছের সাথে বেঁধে রাখল। তারপর চিল্লিয়ে বলল- মামা, জলদি হারিকেন নিয়ে এসো। আমরা একটা জিন ধরেছি। জলদি হারিকেন নিয়ে এসো।
ওদের চিৎকার শুনে মামা একটা হারিকেন আর একটা লাঠি নিয়ে এলেন বাঁশবাগানের ধারে। এসে দেখেন কী। সত্যি সত্যি আটি আর পাটি একটা জিনকে গাছের সাথে বেঁধে রেখেছে। মামা জিনটাকে একটা পিটুনি দিয়ে বললেন- তোর এতো বড় সাহস আমার ভাগনেদের ভয় দেখাতে এই সন্ধ্যা বেলাতে এসেছিস। আজ তোরই একদিন কি আমারই একদিন। দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি মজা।
পিটুনি খেয়ে জিনটা বলল- ইস্, আমি কি এখন এসেছি। সেই বিকেল থেকে বসে আছি আটি আর পাটির সাথে কাতুকুতু খেলবো তাই। কিন্তু ওরা সন্ধ্যা করে এল বলেই তো এখন কাতুকুতু দিচ্ছিলাম। নইলে কি আর এতো সময় থাকি। আমার কতো কাজ। একটু পরেই যেতে হবে শাল পিয়ালের বনে।
মামা বললেন- অতো কথা বুঝি না। তুই আমার ভাগনেদেরকে কাতুকুতু দিয়ে ভয় দেখাচ্ছিলি তার শাস্তি তোকে পেতেই হবে। আগে বল তোর নাম কী?
জিন কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল- আমার নাম হন্দুল কুতকুত। রোজ বিকেলে ছোট ছেলে মেয়েদেরকে কাতুকুতু দেয়াই আমার কাজ। আটি আর পাটিকে আমার খুবই পছন্দ। তাই ওদেরকে কাতুকুতু দিতে এসেছি।
মামা জিনটাকে আরেকটা পিটুনি দিয়ে বললেন- কী! এতো বড় কথা। বল্ আর কোন দিন তুই এখানে আসবি?
হুন্দুল কুতকুত বলল- হ্যাঁ, আবারো আসবো।
মামা এবার আচ্ছা করে হুন্দুল কুতকুতকে পিটুনি লাগিয়ে বললেন- আজ তোকে পিটিয়ে চিড়া চ্যাপ্টা বানিয়েই ছাড়বো। সত্যি করে বল আর আসবি এখানে?
হুন্দুল কুতকুত ‘ওরে বাবারে, ওরে মারে’ বলে চিল্লিয়ে চিল্লিয়েই বলল- হ্যাঁ, আবারো আসবো। হাজার বার আসবো। আমি যে হুন্দুল কুতকুত।
মামা এবার চিৎকার করে বললেন-‘কী! তোর এতো বড় সাহস। দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি মজা’। এই বলে জিনটাকে মামা এমন পিটুনি দিলেন যে, বেচারা আর টিকতে না পেরে ওরে বাবাগো মরলাম গো, মরলাম গো বলতে বলতে দৌড়ে পালাল। সেই সুযোগে মামা আটি আর পাটিকে নিয়ে তাড়াতড়ি বাড়িতে চলে এলেন।
ওদিকে হয়েছে কী। মামার পিটুনি খেয়ে হুন্দুল কুতকুত সোজা চলে এসেছে কাঠিজিনের কাছে। হুন্দুল কুতকুতকে দেখে কাঠিজিন বলল- কিরে হুন্দুল কুতকুত, তোর মুখটা অমন পেঁচার মতো দেখাচ্ছে কেনরে? নিশ্চয় কোথাও মার খেয়ে এসেছিস।
কাঠিজিনের খোটা শুনে হুন্দুল কুতকুত আটি-পাটির মামার হাতে পিটুনি খাওয়ার কথা সব কাঠিজিনকে খুলে বলে হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগল।
কাঠিজিন হুন্দুল কুতকুতকে অভয় দিয়ে বলল- কাঁদিসনে হতভাগা। আটি আর পাটি তো এই বনের পাশ দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসবে। তখন আমরাও দল বেঁধে ওকে দেখাবো মজা। যা তুই গিয়ে জিনদের খবর দিয়ে আয়। আমরা সবাই মিলে বনের ধারের গাছের ডালে ডালে বসে থাকবো। যেই না আটি আর পাটি বনের ধার দিয়ে যাবে অমনি আমরা ওদের ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে ঘাড় মটকে দেবো।
এদিকে হয়েছে কী। কয়েক দিন পর পাটি মামাকে বলল- মামা অনেক তো বেড়ালাম। এবার বাড়িতে চলে যাই। আগামীকাল থেকে আমাদের স্কুল খুলবে। আর বেড়ালে আম্মু-আব্বু অনেক রাগ করবেন।
মামা বললেন- বেশ তো যাও। মামীও বললেন- বেশ তো যাও। স্কুল বন্ধ হলে আবার এমনি এসে কয়েক দিন বেড়িয়ে যাবে কেমন?
আটি আর পাটি মামা-মামীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা চলে এল নদীর ঘাটে। এসে দেখে কী। সেই লাঠিমাঝি নৌকা ভিড়িয়ে বসে আছে ঘাটে। দুই ভাই আবার এক টাকা দিয়ে নদী পাড় হয়ে চলে এল নদীর এপারে। তারপর দুইজনা বুদ্ধি আঁটল- এবার আর আমরা সোজা পথে বাড়িতে যাবো না। আমরা যাবো বনে পেছন দিয়ে ঘুরে। যেন ভূতেরা আর আমাদের দেখতেই না পায়। যেই বলা, সেই কাজ। আটি আর পাটি চলল বনের পিছন দিক দিয়ে ঘুরে। যেতে যেতে যেতে ওরা বিকেল বিকেল পৌছে গেল তাদের বাড়িতে। আর এদিকে জিনেরা আটি আর পাটিকে ঘাড় মটকে দেয়ার আশায় বসে থাকতে থাকতে সবার মেজাজই গেল বিগড়ে। তাই জিনের রাজা আবলুগাবলু হুন্দুল কুতকুত জিনকে ধমকে দিয়ে বলল- কিরে হতভাগা, কোথায় আটি আর পাটি। আজ ক’দিন হল গাছের ডালে বসে আছি, ওরা তো আসছে না। তার চেয়ে তুই গিয়ে দেখে আয় তো আটি আর পাটি এখনো ওদের মামা বাড়িতে আছে, নাকি আমাদেরকে ফাঁকি দিয়ে বনের পেছন দিয়ে বাড়িতেই চলে গেছে।
আবলুগাবলুর কথা শুনে ভোঁ করে হুন্দুল কুতকুত ছুটে গেল আটি-পাটির মামাবাড়ি। আবার ফুড়ুৎ করে এসে হাজির। তারপর কাল মুখ করে বলল- মাননীয় জিনরাজ। ওরা তো গতকালই চলে গেছে ওদের বাড়িতে।
হুন্দুল কুতকুত জিনের কথা শুনে আবলুগাবলু তো রেগেই টং। সে রাগে গর গর করতে করতে বলল- হতভাগা কাঠিজিনকে না সব সময় খবর রাখতে বলেছি। আর ওই বেটা আমদেরকে ডালে ডালে বসিয়ে রেখে কেবল ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আরাম করেছে… এ্যাঁ। দাঁড়া তবে দেখাচ্ছি মজা। এখনি তোরা সবাই মিলে ওর ঘাড় মটকে দে। এটাই ওর উপযুক্ত সাজা।
রাজার হুকুম কি আর অমান্য করার সাহস কারো হয়। তাই আব-লুগাবলুর হুকুম শুনে সবাই মিলে শেষে কাঠিজিনের ঘাড়টাকে দিল মটকে। তারপর জিনের রাজা আবলুগাবলুর সম্মতি নিয়ে সবাই চলে গেল যার যার কাজে।
এখন আর আটি আর পাটির মামা বাড়ি যেতে কোন জিনের ভয়ে বনের পেছনের পথ ঘুরে যেতে হয় না। কারণ বনে এখন আর কাঠিজিনও নেই, জিনের ভয়ও নেই।

প্রকাশকাল : জুলাই ২০১৬