একজন আলোর মানুষ

0
2

কিছু কথা, কিছু গল্প, কিছু স্মৃতি জন্মই নেয় উপন্যাস হয়ে, মহাকাব্য হয়ে| কিন্তু শুরুই তো করতে পারছি না| আর শুরু করলেই মনে হয় কুলহারা জোয়ারের মত শব্দের বাঁধ ভেঙে যাবে| তা ঠেকাবো কি দিয়ে? তার উপর মনের বিগলিত আবেগ বারবার চোখের কোণে উপুড় হয়ে পড়ছে| অসংখ্য বই আর জ্ঞান ভাণ্ডারের একটা লাইব্রেরি পুড়ে গেছে আমাদের| একটি বহমান চলচ্চিত্রের হঠাৎ পর্দা পড়ে গেছে, গল্পের একটা পরিপূর্ণ সিন্দুক খাটিয়ায় ভর করে আজিমপুরে তলিয়ে গেছে|
আবিদ ভাই, ডা. আবু হেনা আবিদ জাফর, আমাদের প্রিয় ভাই, প্রিয় বন্ধু, প্রিয় নাট্যকার, প্রিয় মডারেটর, প্রিয় পরিচালক, প্রিয় লেখক, প্রিয় দায়িত্বশীল গত ২০ জুন, শুক্রবার রাতে এ দুনিয়ায় সফর শেষ করেছেন|
আবিদ ভাই আপনার অফিসে, বাসায়, গাড়িতে, অপারেশন থিয়েটারে, রিডিং, রাইটিং, লুকিং এমনকি বাথরুমে আপনার ভিন্ন ভিন্ন চশমার ফ্রেমগুলো এখনো হয়তো ওভাবেই পড়ে আছে, আপনার নাকের কিছুটা সামনের দিকে বসে উপর দিয়ে আমাদের দিকে তাকানোর ভঙ্গির অপেক্ষায়, এখনো তো ধুলোও জমতে পারেনি| একজন মানুষের এতগুলো চশমা থাকে- এর আগে দেখিনি| পাটুয়াটুলী থেকে একসাথে অনেকগুলো চশমার ফ্রেম কিনতেন, হারাতেনও খুব|

ঝিনেদাহ ক্যাডেট কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায়ই নাটকের ভেতরে ঢুকে পড়েছিলেন আবিদ ভাই| ক্যাডেট কলেজের কঠোর ডিসিপ্লিনের মধ্যেও নাটক আর সাহিত্যের পাতা কুড়াতে কুড়াতে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে এসে এর বন-বনানীতে আবিদ ভাইর পুরোদস্তুর পদচারণা শুরু হলো| আমাদের অঙ্গনে কোনো অনুষ্ঠান হবে আর আবিদ ভাই থাকবেন না- এটা ভাবাই যেতো না, আর নাটক হলে তো কথাই নেই| অগ্রণী ব্যাংক শিশু নাট্য প্রতিযোগিতায় পরিচালক হিসেবে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন|
আবিদ ভাইকে এখন যারা দেখি, মানে দেখতাম উনি কিন্তু আগে এত নাদুস-নুদুস ছিলেন না, একেবারে হ্যাংলাপাতলা কাঠির মতো ছিলেন| একবার উনার ধরা পড়লো পেপটিক আলসার| ক্ষিধে লাগলেই পেট ব্যথা হতো| তাই পকেটে কিছু খাবার রাখার পরামর্শে উনি রাখতেন গোটা গোটা সেদ্ধ ডিম| ক্ষিধে লাগলেও খান, না লাগলেও খান| ক’দিনের মধ্যেই আমাদের পাটকাঠি আবিদ ভাই পেটের কাছাকাছি এসে দু’জন হয়ে গেলেন|
আবিদ ভাই যখন ক্রিসেন্ট গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালের মেডিকেল ডিরেক্টর ছিলেন প্রায়শই উনার রুমটায় আমাদের মজমা বসতো| হাসান মুর্তাজা ভাই, মুহিব্বুল্লাহ ভাই, মাহিন ভাই, মহিউদ্দিন ভাই| উপস্থিত না থাকলেও মল্লিক ভাই, বদরু ভাইসহ সবার প্রসঙ্গ চলে আসতো| জোনাকি পোকা থেকে ছায়াপথ, শিশির বিন্দু থেকে মহাসিন্ধু, সুর থেকে সিম্ফনি, পিঁপড়া, হাতি, নাটক, কবিতা, গান, চলচ্চিত্র, রাজনীতি, অর্থনীতি- গল্প আলোচনায় কোনটাই বাদ পড়তো না| এমন কোনো বিষয় ছিলো না যেটা আবিদ ভাই জানতেন না| কোনো বিষয় জানতে চাইলে তার নাড়ি নক্ষত্র, শান, মান, নোক্তা, মাখরাজসহ বলতেন|

মৃত্যুর মাত্র একদিন আগে ফেসবুকে এআই দিয়ে আমার একটা ছবি পোস্ট করেছিলাম, আবিদ ভাই কমেন্টে লিখেছেন, ‘শার্লক হোমসের মতো লাগছে, সিনেমায় নামার চিন্তা করতে পারেন|’ মাঝে মাঝেই আমাকে বিভিন্ন রিল, খবর পাঠাতেন| কিছুদিন আগে নিজের একটা বায়োডাটা পাঠিয়েছেন, নীচে লেখা- দেইখেন| আবিদ ভাই, এখনো সবই আছে, শুধু আপনি নেই|
এইতো সেদিন ‘দেশীয়’র গাইড হাউজের ইফতার অনুষ্ঠান শেষে শুধু কথা বলার সুবিধার জন্য দুজন হেঁটে রওয়ানা দিয়েছি| পথ শেষ হয়ে গেছে, কথা শেষ হয়নি|
আবিদ ভাই, কত কথা বাকি রয়ে গেল, কত পরিকল্পনা বাস্তবতা পায়নি| আপনি চলে গেলেন, রতন ভাই, নূরী ভাই, কবি আল মাহমুদ ভাই, বিচারপতি আবদুর রউফ ভাইয়া, মল্লিক ভাই, ওবায়েদ ভাই চলে গেলেন| আমরাও আসছি| বেহেশতের সুশোভিত বাগানে ফুলকুঁড়িদের আসর হবে ইনশাআল্লাহ|

প্রকাশকাল : জুলাই ২০২৬