‘না, নাআআ..! তোতন! তোতন…!’
ঘুমের মধ্যেই বলে উঠলো তাসফি। ভয়মিশ্রিত সে ডাক। পরক্ষণেই ধড়ফড় করে উঠে বসলো বিছানায়। বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে।
হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেল তাসফি’র আম্মু নাইমা বেগমের। বিছানায় উঠে বসলেন। বেড সুইচ টিপে লাইট জ্বালিয়ে দিলেন।
তাসফি’র শরীরটা কাঁপছে। পুরো শরীর ঘেমে গেছে তার। বিস্ফোরিত চোখে এদিক ওদিক তাকালো। যেনো খুঁজছে কিছু।
তাসফি’র মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে ওকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন নাইমা বেগম। এক বোতল পানি মাথার কাছে নিয়েই ঘুমান তিনি। বোতলের মুখ খুলে ছেলের মুখে ধরলেন।
ঢকঢক করে খানিকটা পানি পান করলো তাসফি। বুকের কাঁপুনি এখনও থামেনি। মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো।
‘ওরা আবার এসেছিলো আম্মু! এবার অনেকগুলো হেলিকপটারে করে এসেছিলো।’ তাসফি’র কণ্ঠটা কেঁপে উঠলো।
ছোট্ট তাসফি’র মাথার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললেন আম্মু, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে তাসফি বাবা! এই যে আমি আছি না!’
তাসফি’র ভয় তখনও পুরোপুরি কাটেনি। ‘তোতন খুউব ভালো ছিলো আম্মুজি!’
আম্মুর চোখজোড়াও এবার ভিজে উঠলো। অনেক কষ্টে আটকালেন। বললেন, ‘এখন অনেক রাত, তুমি ঘুমাও, আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।’
আম্মু জানেন যে, সেদিন যে মর্মান্তিক ঘটনাটা ঘটে গেছে, তা হয়তো ছোট্ট তাসফি কোনোদিনও ভুলতে পারবে না। সারাজীবন ওকে তাড়া করে ফিরবে।
সারাদেশ তখন উত্তাল, থমথমে। কখন কী ঘটে যায়! প্রতিনিয়ত খবর আসছে মৃত্যুর। পুলিশ আর সন্ত্রাসী-গুণ্ডারা নির্বিচারে নিরীহ ছাত্রজনতার ওপর গুলি ছুঁড়ছে। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ক্রমেই ফুঁসে উঠছে। তাদের দাবি তো বেশি কিছু না, সরকারি চাকরিতে মেধার মূল্যায়ন চাইছে। সকল ক্ষেত্রে বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। এই যৌক্তিক দাবিটাকে তারা কিছুতেই মেনে নিতে চাইছে না। বরং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দমাতে নানান ফন্দি আঁটতে থাকে। সরকার তার বিভিন্ন বাহিনী লেলিয়ে দিলো হত্যার নির্দেশ দিয়ে। ফলে যেখানেই ছাত্ররা জড়ো হচ্ছে, সেখানেই পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে একত্রে মিলিত হতে লাগলো একদল ছাত্র নামের সন্ত্রাসী-খুনি-পিশাচ। প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র আর নানান আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হত্যার নেশায় মেতে উঠলো। খবর এলো- রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদকে প্রকাশ্য রাজপথে বিনা উস্কানিতে বুকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এদিকে এই ঢাকাতেই আন্দোলনরত আহত ছাত্রজনতাকে পানি পান করানোর অপরাধে(!) লাশ হতে হলো সদা হাস্যোজ্জ্বল মীর মুগ্ধকে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবার নতুন মাত্রা পেলো। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এই আন্দোলন এখন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকলো না। এবার তাতে যোগ দিলো দেশপ্রেমী সকল মানুষ। এখানে কোনো পেশা, ধর্ম, বর্ণ এমনকি বয়সও বাধা মানলো না। মায়েরাও নেমে পড়লেন রাস্তায়। তাসফি’র আম্মুও তাসফিকে নিয়ে নেমে গেলেন রাস্তায়। আরও অনেক মায়েরাও ছিলেন। সবাই নেমে এলো রাজপথে। দাবি এখন একটাই— এই স্বৈরাচার শাসককে আর ক্ষমতায় থাকতে দেয়া হবে না। বিদায় নিতেই হবে। স্বজাতির রক্তে রাজপথ রাঙানো এই খুনি শাসককে আর মেনে নেয়া হবে না কিছুতেই!
তারপর ঘটতে থাকলো একের পর এক খুনের ঘটনা।
পাশের ফ্লাটের ছোট্ট তোতন তাসফি’রই বয়সী। বিকালে ওরা ছাদে উঠে খেলাধুলা করে। ওদের মাঝে বেশ ভাব।
সেদিন তোতনের আব্বু তোতনকে নিয়ে ছাদে উঠেছিলেন একটু খোলা হাওয়া শরীরে লাগানোর জন্যে। হঠাৎ তোতনের মাথাটা একদিকে হেলে পড়লো। মুহূর্তে সমস্ত শরীর লাল হয়ে উঠলো। মাথার মগজও বেরিয়ে এলো— ছিটকে পড়লো আব্বুর মুখে-বুকে।
কেবল একটা ‘আহ্!’ শব্দ তোতনের মুখ থেকে বের হতে পারলো, যা আব্বুর কানে গেল।
বুকের ওপর তোতনের নেতিয়ে পড়া মাথাটা সোজা করতে চাইলেন আব্বু। ছেড়ে দিতেই আবার নেতিয়ে পড়লো।
হু হু করে উঠলো আব্বুর বুকের ভেতরটা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটে গেল সবটা।
তাসফি তোতনের সাথে খেলা করার জন্য এই ছাদেই উঠছিলো, ঠিক এই সময় ঘটে ঘটনাটা। এবং একটি হেলিকপটারকে উড়ে যেতে দেখে। হেলিকপটারের খোলা দরজা দিয়ে ছাদের দিকেই বন্দুক তাক করে আছে দু’জন ভয়ঙ্কর(!) লোক।
প্রিয় সাথীর রক্তেভেজা দেহটা দেখে হোঁচট খেয়ে পড়লো তাসফি। তারপর ওখানেই জ্ঞান হারালো।
এতক্ষণ ধরে যেনো তাসফি’র আম্মুর চোখের সামনেই ঘটে গেল এসব। কল্পনার জগত ছেড়ে বাস্তবে ফিরে এলেন তিনি। ছেলেটা এখন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে।
মায়ের বুকের মাঝে বেদনার নীল ক্ষতটা আবারও তাজা হয়ে উঠলো। তাসফি যেভাবে বারবার এই ঘটনাটা স্বপ্নে দেখছে, এমনকি, মাঝে মাঝে এমনিতেই আর্তনাদ করে উঠছে, তাতে ছেলেটার কোনো ক্ষতি হয়ে যায় কি না— তা নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন তিনি।
দু’জনে দু’জনার হাত ধরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছাদে হাঁটছে আর গল্প করছে ওরা— তাসফি ও তোতন। কতো না বলা কথা যেনো জমে আছে ওদের বুকের মধ্যে। অধিকাংশই অর্থহীন কথাবার্তা। কিন্তু তাতে কী! মনের জমানো কথাগুলো প্রিয় বন্ধুকে না বললে যে পেট ফেটেই মরে যাবে ওরা।
বছরঘুরে আজ আবার এসেছে জুলাই। জুলাইয়ের ছত্রিশে যে বিজয় অর্জিত হয়েছে— এ জাতির ইতিহাসে তা জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত।
হঠাৎ যেনো হোঁচট খেলো তাসফি। কোথায় গেল তোতন? সারা ছাদ এমনকি, উঁকিঝুঁকি দিয়ে সামনের রাস্তা ও আশপাশটাও দেখলো। নাহ্! কোথাও নেই ওর বন্ধু। যেনো হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে!
বেদনার ক্ষতগুলো ওকে আবার জড়িয়ে ধরলো। মনে পড়ে গেল সব। তোতন কোত্থেকে আসবে? সে তো নেই! বেহেশতের বাগানে সবুজ পাখি হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে মনের সুখে। আম্মু বলেছেন, পৃথিবীতে তো ও বেশিদিন থাকতে পারেনি, তাই আল্লাহতায়ালা ওকে সবুজ পাখি বানিয়ে বেহেশতে ছেড়ে দিয়েছেন। ওখানে ও যেখানে খুশি উড়তে পারবে।
ছাদটা এই মুহূর্তে কেমন যেনো নীরব হয়ে গেছে। তাসফি’র বুকের মধ্যখানটা খাঁ-খাঁ করে উঠলো। চিনচিনে ব্যথার একটা শিহরণ বয়ে গেল ওর সমস্ত দেহে। ছাদের যে কোণায় তোতনের নিথর দেহটা বাবার কোলে ঢলে পড়েছিলো, সেখানে একটা টবে গোলাপ গাছ লাগিয়েছে তাসফি। এ কয়দিনে গাছটা বেশ বড় হয়ে গেছে। প্রতিদিন গাছটার পরিচর্যা করে ও। গতকালও দেখে গেছে কুঁড়ি দু’টো। আলতো করে হাত বুলিয়ে গেছে। যেনো বন্ধুর মাথায় হাত বুলাচ্ছে— এমন একটা অনুভূতি কাজ করছিলো তখন ওর মনে।
তোতনের আব্বুর কাছ থেকে তোতনের রক্তমাখা শার্টের একটি টুকরো চেয়ে নিয়ে সেটা লেমিনেটিং করে গোলাপ গাছটায় বেঁধে রেখেছে। ওটা দেখলে তোতনকে দেখতে পাবে— এটা ওর বিশ্বাস।
লাল টকটকে দু’টো ফুল ফুটেছে গাছটিতে। তাসফি’র কাছে মনে হলো— গোলাপ দু’টো যেনো প্রিয় বন্ধুর রক্ত মেখে নিয়েছে। সেজন্য গাঢ় লালরঙে সেজেছে।
সেদিকে আর তাকিয়ে থাকতে পারলো না তাসফি। দুপদাপ করে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলো। হু হু করে কাঁদছে ও।
তাসফি’র এ কান্না কি থামবে কোনোদিন?
প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৫



