সেই বালক

0
1

পাঁচ আগস্ট, ২১১০ সাল। স্যাটেলাইট বিপর্যয়ে সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ। দুনিয়ার সব কাজ চলে ইন্টারনেট দিয়ে। ফলে ইন্টারনেট বন্ধ তো সব বন্ধ। অফিস, ব্যাংক, মার্কেট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব অচল। মানুষের ব্যস্ততার জোয়ারে ভাটা পড়েছে যেন। ইয়াফি, অরি ও সাফাদের আজ খুশির দিন। কারণ, অনেকদিন পর আজ তিন পরিবার একত্র হয়েছে। তাও আবার দাদুভাইয়ের সাথে।
ওরা তিনজন কাজিন। প্রত্যেকেই বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। ওদের ভার্চুয়াল ক্লাস, ওপেন বুক এক্সাম, অনলাইন গ্রুপস্টাডি- ইত্যাদি নিয়ে সবসময় খুব ব্যস্ত থাকতে হয়। বাবা মাও কর্মক্ষেত্রে বেশ ব্যস্ত থাকেন। তাই অনেকদিন ওদের একত্রিত হওয়া হয়ে ওঠেনি। প্রায় দুবছর পর আজ সরাসরি সবার দেখা। দেশে স্যাটেলাইট বিপর্যয়ের ফলে অফিস ও বিদ্যালয় কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। সবাই মোটামুটি ফ্রি। এ সুযোগে তিন পরিবার আজ দাদুর বাসায় একত্রিত হয়েছে। দাদুভাইর সাথে দেখা অনেকদিন পর। দাদুভাই থাকেন একটি স্বয়ংক্রিয় বাড়িতে। যেখানে তার সেবা ও সঙ্গ দেয়ার জন্য দুটি দামি ইনটেলিজেন্ট এআই রোবট ও একটি হিউম্যানয়েড রোবট রয়েছে।
অরি সবচেয়ে বেশি খুশি। দাদুভাইয়ের কাছ থেকে মজার গল্প শোনা যাবে। সেই গতবছর স্কুলের লাস্ট ভার্চুয়াল টার্ম পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বাবা মায়ের সাথে দাদুভাইর এখানে এসেছিল। সেদিন দাদু বেশ কয়েকটা গল্প বলেছিলেন। খুব আদর করেছিলেন। অনেক আনন্দে কেটেছে। কিন্তু মাত্র একদিন ছিল। বাবার অফিস ও মায়ের শপ ওপেনের জরুরি প্রয়োজনে ২৪ ঘণ্টা কাটাতে না কাটাতেই দৌড়াতে হয়েছে। এবার আর সে সমস্যা নেই। স্যাটেলাইট ঠিক না হওয়া পর্যন্ত অফিস, শপ কিছুই খুলছে না। খুব শিগগিরই ঠিক হওয়ার সম্ভাবনাও নাকি নেই।
আব্বু ও ছোট চাচ্চু ড্রইংরুমে চা খেতে খেতে বলাবলি করছিলেন, এটা নাকি খুব বড় স্যাটেলাইট দুর্ঘটনা। দেশের বড় বড় মহাকাশ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা দিনরাত পরিশ্রম করেও কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি। বিগত একশ বছরে নাকি দেশে এমন বিপর্যয় কেউ দেখেনি। বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ করছে এটি এলিয়েন স্পেস শিপের অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা হতে পারে। অথবা দেশি বা বিদেশি এআই নেটওয়ার্ক গ্রুপও কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে এ কাজ করতে পারে। জাতীয় জরুরি সেবা চালু রাখার জন্য অন্য একটি দেশের ফ্রিকোয়েন্সি থেকে সাময়িকভাবে ব্যান্ডউইথ কেনা হয়েছে। তবে তা সাধারণ গ্রাহকদের ব্যবহারের জন্য দেয়া হয়নি। তাই মানুষের ব্যক্তিগত ব্যবহৃত ডিভাইস নেট, রিস্ট নেট সব বন্ধ রয়েছে। রিস্ট নেট হলো, হাতের কব্জিতে লেজার প্রযুক্তিতে ইনস্টল করা মাল্টি প্রোগ্রাম টেকনোলজি। যেমন আজ থেকে বহুকাল অর্থাৎ প্রায় শত বছর আগে মানুষ ব্যক্তিগত তথ্য ও যোগাযোগের কাজে হাতের মুঠোয় বা পকেটে থাকা একটি ড্রোন আকৃতির জিনিসের ব্যবহার করতো। যাকে সেসময় মোবাইল ফোন বা মুঠোফোন বলা হতো। দাদু টাচ লকআপ থেকে সেরকম একটি জিনিস বের করে ইয়াফি, অরি ও সাফাকে দেখালেন।
ড্রয়িংরুমের বিশাল ফ্লোরে কার্পেট বিছিয়ে সবাই বসেছে। দাদুর সেই ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেল। ছোটবেলায় তার দাদা-দাদি সবাইকে নিয়ে উঠোনে বসে গল্প করতো। খুব আনন্দ হতো।
দাদুভাই আজকে একটা মজার গল্প বলো।
ছোট্ট অরি দাদুকে জড়িয়ে ধরে খুব করে ধরলো। ইয়াফি, সাফাও সুর মিলায়।
আচ্ছা ঠিক আছে আজকে তোমাদের একটা গল্প বলি। যেটি আমার নিজের জীবনের সত্য ঘটনা। তোমরা শুনতে চাও?
সবাই সমস্বরে বলে উঠলো, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা শুনতে চাই!
তাহলে শোন।

আজ থেকে সাতাত্তর বছর আগের কথা। ২০২৪ সাল। তখন আমার বয়স এগারো। ক্লাস ফাইভে পড়তাম। আমাদের বসবাস ছিল ঢাকার বসিলায়। প্রতিদিনের মতো স্কুল থেকে ফিরছিলাম। ফেরার সময় একটু দূরে দেখলাম রাস্তায় কীসের যেন একটা হই হুল্লোড়। স্কুল কলেজের ছাত্ররা ‘কোটা না মেধা’ স্লোগান দিচ্ছে। আমি ছোট মানুষ। এসবের কিছুই বুঝতে পারি না। বাসায় চলে যাই।
পরদিন স্কুল বন্ধ। সকালবেলা পাশের বাসার মন্টুকে নিয়ে একটু সামনের রাস্তায় বের হই। মন্টু আর আমি একই ক্লাসে পড়তাম। রাস্তায় গিয়ে দেখলাম গতকালের চেয়ে অনেক বেশি ছাত্র। সবাই বিভিন্নরকম স্লোগান দিচ্ছে। ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ ‘আপস না সংগ্রাম? সংগ্রাম সংগ্রাম’ ইত্যাদি। পাশে চায়ের দোকানে বড়দের আলাপচারিতা থেকে জানতে পারলাম ছাত্ররা তাদের চাকরিতে বৈষম্য দূর করার জন্য আন্দোলন করছে। তখন বুঝিনি বৈষম্য মানে কী? কীসের বৈষম্য? ছোটবেলায় আমি ছিলাম একটু লাজুক ও শান্ত প্রকৃতির। মন্টু ছিল খুব সাহসী ও চঞ্চল। আমি চায়ের দোকানের পাশেই দাঁড়িয়ে রইলাম। মন্টু কী বুঝে সামনে এগিয়ে যায়। ছাত্রদের সাথে স্লোগান শুরু করে দেয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম মুহূর্তের মধ্যে বেশকিছু পুলিশ এসে মিছিলে হামলে পড়লো। পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ছুঁড়লো। ছাত্ররা ছোট ছোট ঢিল ছুঁড়ে প্রতিবাদের চেষ্টা করে। হঠাৎ পুলিশ উত্তেজিত হয়ে গুলি শুরু করে। কয়েকজন ছাত্র আহত হয়। তাদের এক এক করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরক্ষণেই দেখি সেই সারিতে আমার বন্ধু মন্টু। তাকে দুজন ছাত্র ধরাধরি করে একটি রিকশায় উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর খবর এলো আমার সে বন্ধুটি মারা গেছে। খবর শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। সারা শরীর নিথর হয়ে গেল। চোখের সামনে থেকে আমার বন্ধুটা মরে গেল! কী অপরাধ ছিল ওর? সারা রাত ঘুমাতে পারি না। বিছানায় ছটফট করতে থাকি। ইচ্ছে হয় যে পুলিশ আমার বন্ধুকে গুলি করে মেরেছে, তাকে আচ্ছামতো মেরে মনের ঝাল মিটাই। কিন্তু আমি ছোট্ট মানুষ। কী ই বা করতে পারি?
টেলিভিশনের নিউজে দেখায়, ছাত্রদের আন্দোলন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। সারা দেশে অনেক মিছিল হচ্ছে। রংপুরে ছাত্রদের মিছিলে হামলা হয়। আবু সাঈদ নামের একজন ছাত্র হাত মেলে বুক চিতিয়ে প্রতিবাদ করে। সে অবস্থায় পুলিশ তাকে নিষ্ঠুরভাবে গুলি করে। সে মারা যায়। সেই ভিডিও ছড়িয়ে যায় বিদ্যুৎ গতিতে। ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সারা দেশের মানুষ। ছাত্রদের সাথে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করে অভিভাবক, শিক্ষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ। আমার ছোট্ট মন ক্রমেই অস্থির হয়ে ওঠে। চোখের সামনে বন্ধুকে গুলি করে মেরে ফেলার ঘটনাটি কোনোভাবেই মন থেকে যাচ্ছে না।
দাদুকে থামিয়ে ইয়াফি বলল, ও হ্যাঁ, আমাদের ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি চ্যাপ্টারে আবু সাঈদের এ ঘটনাটা পড়েছি। তবে পড়ার সময় অত ভালো করে খেয়াল করিনি যে এটা আমাদের দেশেরই ঘটনা।
আচ্ছা তারপর কী হলো দাদু ভাই?
সন্ধ্যার পর মামা কাজ থেকে ঘরে ফিরলে মায়ের সাথে বসে ফেসবুকে আন্দোলনের ভিডিও দেখে। ঢাকায় মীর মুগ্ধ নামে এক ছাত্র ‘পানি লাগবে পানি’ বলে মিছিলে পিপাসার্ত আন্দোলনকারীদের পানি বিতরণ করছিল। সে অবস্থায় পুলিশ গুলি করে। মুগ্ধ মারা যায়। ক্ষুব্ধ ছাত্রদের মিছিল আরো বড় হতে থাকে। মিছিলে হাজার হাজার ছাত্র। সবার চোখে মুখে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। বুকে জমানো বারুদ। আমার ছোট্ট বুকেও তাই।
সব শ্রেণির মানুষ আরো প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলাম না। ইচ্ছে হচ্ছিল আমিও ছাত্রদের সাথে গিয়ে স্লোগান দেই, প্রতিবাদ করি। মন বলছিল, ইশ! যদি একটা আলাদিনের জায়নামাজ থাকতো, মুহূর্তেই উড়ে চলে যেতাম ছাত্রদের মিছিলে।

পরদিন সকালবেলা। ড্রইংরুমে মামার সাথে বসে আছি। টিভির স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগে আরো বড় মিছিল। সবাই স্লোগান দিচ্ছে। ভিডিওতে দেখে ওদের সাথে মনে মনে আমিও স্লোগান দেই। কিন্তু মনে মনে দেয়া স্লোগানে মোটেই তৃপ্তি আসে না। ঠিক করলাম যে করেই হোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিলে যাবো। বন্ধু হারানোর প্রতিবাদ করবো সরাসরি গিয়ে। কিন্তু কীভাবে যাবো বুঝতে পারি না। শুধু জানি যেতে হবে।
সকাল এগারোটার দিকে ঘর থেকে বের হয়ে যাই। সাথে নিজের মাটির ব্যাংকে জমানো কিছু টাকা নেই। খুব কাছেই লেগুনাস্ট্যান্ড। লেগুনায় উঠে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত যাই। সড়কের এক কিনারে দাঁড়িয়ে দেখি অনেক রকমের বাস যাচ্ছে। কোনটি কোনদিকে যাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারি না। হলুদ রঙের একটা বাস দেখে মনে পড়ে যায়, একবার মামার সাথে যখন বইমেলায় গিয়েছিলাম এই বাসটিতে চড়ে শাহবাগ গিয়ে বাকিটুকু হেঁটে যাই। খুব দূরে নয়।
যাওয়ার পথে মামা বলেছিলেন, এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আর ওই যে দেখছিস ওটা টিএসসি চত্ত্বর।
সাতপাঁচ না ভেবে সাহস করে উঠে পড়ি হলুদ বাসে। মনে নানা শঙ্কা ও ভয়। ঠিক বাসে উঠেছি তো? কিছুক্ষণের মধ্যেই শাহবাগ শাহবাগ বলে হেল্পার ডেকে ওঠে। বাস থেকে নেমে পড়ি। চারিদিকে ফুলের সুবাস। অনেক ফুলের দোকান। মনে পড়ে যায় মামার সাথে আসার সময় এ ফুলের দোকানগুলো দেখেছিলাম। গুটি পায়ে সামনে এগোই। প্রচুর পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। বুক দুরু দুরু করে। কিন্তু বন্ধু মন্টুর কথা মনে পড়ে মুহূর্তেই মনের মধ্যে বিদ্যুতের মতো একটা চিলিক অনুভব করি। ছোট্ট মনে বিদ্রোহের বারুদ জ্বলে ওঠে।

সামনে এগিয়ে দেখি ছাত্রদের মিছিল আর মিছিল। স্লোগান চলছে মুহুর্মুহু। আমিও তাদের সাথে গলা ফাটিয়ে স্লোগান দেই। জানি না কোত্থেকে এত সাহস এলো। পাশেই ফুটপাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো শতশত পুলিশ। তাদের দেখামাত্র আবার আমার হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর কথা মনে পড়ে তীব্র ঘৃণা আমাকে অস্থির করে তোলে। নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। মুহূর্তেই পুলিশের দিকে দৌড়ে গেলাম। এক পুলিশের পেটে দুহাতে অনবরত ঘুষি দিতে থাকলাম। কী হচ্ছে পুলিশ সদস্যটি কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। আমি ছোট্ট মানুষ। তার বুলেট প্রুফ জ্যাকেটে আমার এ হাত ছোঁড়াছুড়িতে তেমন কিছু না হলেও পুলিশ সদস্যটি বেশ হতচকিত হয়ে যায়। এত ছোট্ট ছেলে এমন করছে কেন? কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। আশেপাশের লোকেরাও অবাক হয়ে সে দৃশ্য দেখে। এত্তটুকুন ছেলে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কীভাবে এলো? কোত্থেকে এলো? ছাত্রদের মধ্য থেকে একজন এসে আমাকে কোলে করে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। মনের ক্ষোভ পুরোপুরি মিটেনি বলে আমি সমানে হাত পা ছোঁড়াছুড়ি করতে থাকি।

সে সময় মানুষের মধ্যে ফেসবুক ও ইউটিউব খুব প্রভাব বিস্তার করতো। কিছু কনটেন্ট দ্রুত ভাইরাল হয়ে যেত। আমার এ কর্মকাণ্ডগুলো কৌতূহলী হয়ে কেউ একজন ভিডিও করে। পরদিন সে ভিডিওটি ফেসবুক ও ইউটিউবে সারাদেশে ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিওটি বিভিন্ন পেইজ ও চ্যানেলে ‘ক্ষুদে বিপ্লবী’, ‘ভাইরাল বয়’ ইত্যাদি শিরোনামে প্রচার পায়। লক্ষ লক্ষ ভিউ হয়। সে ভিডিও দেখে নাকি সারা দেশের সাধারণ মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে সাহসী হয়ে ওঠে। ছাত্র ও সাধারণ জনতার আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকে।

অবশেষে ছাত্রদের আন্দোলন বিজয়ী হয়। শুরু হয় বৈষম্যহীন দেশের নবযাত্রা। নতুন দেশ গঠন শুরু হওয়ার পর দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ইউটিউব চ্যানেল আমাকে খোঁজাখুঁজি করে বের করে। আমার ইন্টারভিউ নেয়। কেন আমি এমন প্রতিক্রিয়া দেখালাম, ছোট হয়েও এত সাহস কীভাবে পেলাম ইত্যাদি নানান প্রশ্ন।

প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৫