রোবট এলিয়েনের যুদ্ধ

0
1

মবিন খুব দ্রুত হাঁটে। একটা ভুতুরে পরিবেশ। শহরজুড়ে গাঢ় অন্ধকার। এ রকম ভয়াবহ লোডশেডিং তাঁর চৌদ্দ বছর বয়সে দেখেনি সে। সন্ধ্যে হতে না হতেই দোকানপাট সব বন্ধ। অনির্দিষ্টকালের জন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। হঠাৎ একটা লোকের সাথে ধাক্কা খায় সে। কী আশ্চর্য! মানুষের শরীর এত শক্ত। সে থমকে দাঁড়ায়। নিচু গলায় বলল, ‘স্যরি।’
‘স্যরি বলতে হবে না। অন্ধকারে না দেখতে পারাটাই স্বাভাবিক।’ লোকটা ভাঙা ভাঙা গলায় বলল। কথার ধরন শুনে মবিন আঁচ করতে পারে, লোকটা আসলে মানুষ না।
‘মনে হচ্ছে আপনি মানুষ না, রোবট।’ মবিন সাহস করে বলল। তবে একটু একটু ভয়ও পায়।
‘হ্যাঁ আমি রোবট। আমার ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে যাচ্ছে। লং ওয়ে টু গো।’ রোবটটার গলায় একরাশ হতাশা।
‘কোথায় যাবেন আপনি? আর আপনার মালিক বা কে?’
‘দু’দিন হল উনি মারা গেছেন। উনার স্বজনরা উনার লাশ খুঁজে পায়নি।’
‘ও। তা উনি কিভাবে মারা যান?’
চট্টগ্রাম থেকে মাইক্রোবাসে করে ঢাকায় ফিরছিলাম। বস হেড ফোনে গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েন। দাউদকান্দি পর্যন্ত আসার পর হঠাৎ ফ্লাইং সসার থেকে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আর ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। আমাদের গাড়ি উল্টে আগুন ধরে যায়। আমি কোনো রকম পালাতে সক্ষম হই।’
‘এলিয়েনরা বড্ড বেড়েছে। প্রায় কোথাও কোথাও হামলা করছে। কিন্তু টার্গেট তো মানুষ না, রোবট?
‘হু। সত্যি।’
‘তুমি আমার সাথে চল বিকল্প পদ্ধতিতে ব্যাটারি চার্জ করে দেবো।’

মবিনের বিশাল ফ্ল্যাট। সে একাই থকে। দক্ষিণে বিশাল মাঠ। মশাল জ্বালিয়ে শত শত রোবট জড়ো হয়। নানা স্লোগানে সরগরম হয়ে ওঠে। মবিন রোবটকে নিষ্ক্রিয় করে ব্যাটারি চার্জ করে। অতঃপর রোবটে ব্যাটারি ভরে। রোবট সচল হয়। ব্যস্ত সমস্ত হয়ে পায়চারি করে। মবিন বলল, ‘তোমার মালিক কী কাজ করতো?’
‘উনি একজন মস্ত বড় ব্যবসায়ী। একটা বিদ্যুৎ কোম্পানিও আছে। উনার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সব বিদ্যুৎ কোম্পানি বিদ্যুৎ সাপ্লাই বন্ধ করে দেয়।
‘ও, তাই একটানা লোডশেডিং চলছে।’ মবিন রাতের খাবার খায়।
‘এ রকম সমস্যা দিন দিন বাড়বে। এলিয়েনরা চায় না যে মানুষ রোবট ব্যবহার করুক। মাসখানেক আগে বাংলাদেশের একদল বিজ্ঞানী মঙ্গলগ্রহে রোবট পাঠিয়েছিল। ঘটনাচক্রে সেখানে রোবট আর এলিয়েনরা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। রক্তমাংসের এলিয়েনরা লোহা স্টিলের তৈরি রোবটদের সাথে পারে না। ফলে প্রচুর এলিয়েন মারা পড়ে।’
‘তা না হল বুঝলাম। কিন্তু তারা তোমার মালিককে মারল কেন?’
‘কারণ ঐ একদল বিজ্ঞানীর মধ্যে আমার মালিকও একজন। এবার বুঝলে?’
‘হ্যাঁ।’
রোবট বাইরে যাওয়ার জন্য দরজা খোলে। ঠিক এ সময় মাঠের দিক থেকে চিৎকার, চেচামেচি, হৈ-চৈ এর শব্দ আসে। অসংখ্য ফ্লাইং সসার নামে মাঠে। মশাল মিছিল করতে আসা রোবটরা ওদের ঘিরে ধরে। মবিন জানালার পর্দা সরিয়ে সব দেখে চমকে উঠে বলল, ‘সর্বনাশ। মনে হচ্ছে আবারও একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হবে।
‘হুঁ। যে করে হোক আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে। এলিয়েনদের টার্গেট আমি। কারণ আমি স্যারের পিএস। এবং এ যাবৎকালের আবিষ্কৃত রোবটদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান।
‘দরজার কড়া নড়ার শব্দ হয়।। ভয়ে আঁৎকে ওঠে দু’জন। রোবট পল বাথরুমের ছাদে ওঠে লুকিয়ে থাকে। মবিন দরজা খোলে। দু’জন অস্ত্রধারী এলিয়েন দাঁড়িয়ে আছে। মবিনের সারা শরীর কাঁপে। একজন এলিয়েন বলল, ‘তোমার ঘরে কোনো রোবট আছে?’
‘না, না’। তার বুক হাঁপরের মতো ওঠানামা করে।
‘কী আশ্চর্য! আমাদের স্ক্যানিং মেশিন বলছে এ ফ্ল্যাটে রোবট আছে।
অথচ…।’ মাঠের দিক থেকে গোলাগুলির শব্দ আসে। এলিয়েন দু’জন তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। তারপর চলে যায়। মবিন দ্রুত জানালার কাছে যায়। রোবট আর এলিয়েনরা কী নিয়ে যেন তর্ক করছে। সে জানালার কাচ থেকে সরে এসে পল ছাদে উঠে দেখে রোবটটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে আছে। সে সুইচ অন করে। রোবটটা সক্রিয় হয়। নিচে নামে। সঙ্গে সঙ্গে মাঠের দিক থেকে যে আওয়াজ আসছিল তা বন্ধ হয়ে যায়।
রোবটটা বলল, ‘মনে হচ্ছে ধরা পড়ে যাচ্ছি। তোমাকে ধন্যবাদ। তোমার জন্য একটু বেঁচে থাকলাম। বেঁচে থাকা এক আশ্চর্য সুন্দর।’
প্রচন্ড গোলাগুলি শুরু হয়। পরপর কয়েকটা কামানের গোলার আঘাতে মবিনের জানালার কাঁচ ভেঙে রোবটটার ওপর এসে পড়ে। মুহূর্তে রোবটটা লুটিয়ে পড়ে। তার শরীরের বেশ কিছু অংশ থেঁতলে যায়। সে উঠে দাঁড়াতে চায়। কিন্তু পারে না। মবিন কী করবে ভেবে পায়না। সে উপুড় হয়ে মেঝেতে শুয়ে থাকে। তারও অনেক পরে ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙ্গে একদল এলিয়েন ঢোকে। তারা রোবটটাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায়। মবিন লক্ষ্য করে রোবটটার শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। তাহলে কি রোবটটা অর্ধেক মানুষ ছিল?

দু’দিন পরের কথা। ভোরবেলা মর্নিং ওয়ার্ক করতে বের হয় মবিন। সংসদ ভবনের দক্ষিণ দিকের রাস্তা ধরে হাঁটছে। হঠাৎ একটি লোক তার পথ আগলে দাঁড়ায়। সে থামে এবং লোকটার চেহারার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে। অবিকল সে রোবটের মতো। লোকটা বলল, ‘থ্যাংকস। একটা রোবটকে বাঁচার জন্য সহযোগিতা করে। মেনি মেনি থ্যাংকস।’
‘তুমি কে?’ মবিন চমকে ওঠে প্রশ্ন করে।
‘আমি মানুষ। স্যার আমাকে অনুসরণ করে রোবটটাকে বানিয়েছিল। তাই দেখতে হুবহু আমার মতো ছিল। চল সামনের দিকে এগোই।’
‘হ্যাঁ চল।’
পাশাপাশি হাঁটে দু’জন। মবিনের সংশয় কাটে না। মনে হচ্ছে এ ও রোবট। তিন হাজার ষোল সালে এসে প্রযুক্তি এত দূর এগিয়েছে যে, হঠাৎ কাউকে দেখলে বোঝার উপায় নেই সে মানুষ না রোবট।

প্রকাশকাল : জুলাই ২০১৬