শহরে একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটেছে। একজন অচেনা লোক কোথা থেকে যেন উদয় হয়েছে, যার মস্তিষ্কের শক্তি অস্বাভাবিক রকম ধারালো। সে নাকি অর্থনীতি, রাজনীতি, ইতিহাস, ভূগোলসহ যে কোনো বিষয়ে যে কারো প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিতে পারে অত্যন্ত সহজেই। তবে লোকটা পাগলাটে রকমের। বেশ অদ্ভুত তার বেশভূষা। পুরনো আমলের আলখাল্লা টাইপ রয়েল ব্লু কালার লম্বা ময়লা জামা। গলায় চড়া লাল রঙের পুঁথির মালা। মাথার উসকোখুসকো চুল, তবে ঘন। পায়ে নাগরা জুতো হলুদ রঙের। লোকটা ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি, চীনাসহ আরো অনেক ভাষায় কথা বলতে পারে। তবে আচার আচরণ খুব একটা স্বাভাবিক না। ইচ্ছে হলে কথা বলে, না হলে না। সকলের সাথে কথা বলেও না।

লোকটার সম্পর্কে প্রথম জেনেছে ইতুল। বাসার পাশের মাঠে ছিল লোকটা। ইতুল গিয়ে তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ওকে ইগ্নোর করেছে লোকটা। তবে অন্য দুজন লোকের সাথে বেশ আগ্রহের সাথেই কথা বলেছে। ওদের প্রশ্ন ছিলো খুব সহজ। যেমন আকাশের দেখা তারাগুলো পৃথিবী থেকে কত দূরে? জবাবে সে বলেছে- আমরা যেটাকে আকাশ বলি, সেটা মূলত মহাশূন্য বা বায়ুমণ্ডল। তারা বলেও কিছু নেই, এগুলো এক একটা পৃথিবীর চেয়েও অনেক বড় গ্রহ নক্ষত্র। পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের গ্রহ হচ্ছে শুক্র। পৃথিবী থেকে এ গ্রহের দূরত্ব ৪.৩ কোটি কিলোমিটার। এই শুক্র গ্রহটি ভোরে শুকতারা এবং সন্ধ্যায় সন্ধ্যাতারা নামে চিনে থাকে পৃথিবীর সাধারণ মানুষেরা।
সেখানে উপস্থিত কিশোর ছেলে মেয়েরা ছাড়াও কিছু মিডিয়ার লোকেরা জড়ো হয়েছে। তারাও বিভিন্ন জটিল প্রশ্ন করছে, কিন্তু লোকটি জবাব দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সে কেবল ছোটদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে। ইতুল দু-একটা প্রশ্ন করে জবাব না পেয়ে ভাবলো, সবাইকে ডেকে আনা দরকার। লোকটা দেখতে সাধারণ হলেও সাধারণ কেউ না আসলে। আবার ইনি কতক্ষণ এখানে থাকবেন তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই সে দ্রুত মাহতাব, সাজিদা আর সুমাইয়াকে কল করে ডেকে নেয়। কিশোর বিজ্ঞানী দল ‘বি এস আর’ এর চারজন এক হয়েছে অচেনা ব্রিলিয়ান্ট ভদ্রলোকটাকে দেখতে। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে। মিডিয়াও গুরুত্ব না পেয়ে চলে গেছে। চলে গেছে উৎসুক ছেলে-মেয়েরাও।
অবস্থান সামান্য পরিবর্তন করে তিনি একটা পুরনো ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসেছেন। তার পোশাক আশাক অদ্ভুত আর প্রাচীন হলেও মুখে এক রকম গাম্ভীর্য আর ব্যক্তিত্ব স্পষ্ট ছিলো। দেখলেই মনের প্রসন্নতা বাড়ে।
ওদের আসতে দেখে ভদ্রলোক নিজেই হাত বাড়িয়ে দেন ওদের দিকে। ওরা ভীষণ অবাক হয়। চারজনের সাথেই হাত মিলিয়ে নিজের নাম জানান, ইসুমাসা!
ওরা উনার কাছে কী জানতে চায় তা বলতে বলেন। সবাই একদম নীরব হয়ে যায়। কী প্রশ্ন করবে, তা বুঝতে পারে না। অবশেষে ইতুল ভদ্রলোকের মগজ কিছুটা ঝালিয়ে নেয়ার জন্য একটা পরীক্ষায় ফেলতে চায়, ‘আচ্ছা ইসুমাসা, আপনার ব্রেইন নাকি অত্যন্ত দ্রুত কাজ করে। আমি আমাদের চারজনের ফোন নম্বর, সাথে মেইল আইডিও বলবো। আপনি একবার শুনেই সব মনে রাখতে পারেন কি না দেখতে চাই। ইতুলের কথায় বাকি তিনজনের মুখ উজ্জল হয়ে যায়।
ইসুমাসার মুখেও প্রশস্ত হাসি ফোটে,- ‘বলো শুনি।’
ওরা চারজন একে একে নিজেদের ফোন নম্বর বলে, তারপর ইমেইল আইডি। ওরা থেমে গেলে ইসুমাসা ওদের মা-বাবার ফোন নম্বর, ইন্সটা, এফবি আইডি স্পেলিংসহ বলতে বলে। ওরা তাও বলে। এরপর হাউস, রোড নাম্বারসহ পূর্ণ ঠিকানাও বলে।
তারপর ইসুমাসা ওদেরকে অবাক করে দিয়ে সবকিছুই স্পেলিংসহ বলে দেয় গড়গড় করে!
কী আশ্চর্য!, বলে মাহতাব।
ইসুমাসার থেকে ওরা আরো কোনো পরীক্ষা নিতে চায় কী না- জানতে চাইলে ওরা ভাবতে থাকে। এ সময় ইসুমাসা বলে- তোমরা খুব বেশি উত্তেজিত, তাই প্রশ্ন খুঁজে পাচ্ছো না। আমাদের উপযুক্ত সময়ের অপচয় এভাবেই হয়। ব্রেইন একটা অদ্ভুত রহস্যময় শক্তির কারখানা। ব্যবহার করতে পারলে তুমি সেরা কেউ। না পারলে সাধারণ। তোমরা তো বিজ্ঞানী হতে চাও। এজন্য মগজটাকে একটু বেশিই খাটাতে হবে। সবাই যেভাবে খাটায়, সেভাবে হলে হবে না তো, এক্সট্রা অর্ডিনারী দরকার।
সাজিদা বললো- আচ্ছা ইসুমাসা, কীভাবে আমরা ব্রেইনের সর্বোচ্চ ব্যবহার করবো? আমরা তো জানি ব্রেইনের ১০ ভাগের বেশি ব্যবহার করা যায় না।
– ভুল জানো তোমরা। তোমাদের মতো অনেকেই হয়তো এই কথাটি জানে যে আমরা সারা জীবনে মস্তিষ্কের শুধু ১০ ভাগ ব্যবহার করতে পারি, বাকিটা অলস থাকে। কিন্তু কথাটি ঠিক নয়। আমাদের মস্তিষ্ক মূলত ৪টি লোবে বিভক্ত থাকে। সেগুলো হচ্ছে ফ্রন্টাল, প্যারাইটাল, টেম্পোরাল ও অক্সিপিটাল। একেকটি লোব একেক কাজ করে। যেমন চিন্তাশক্তি নিয়ন্ত্রণ করে ফ্রন্টাল লোব, আবার শ্রবণশক্তির দায়িত্ব টেম্পোরাল লোবের। আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি, সেই এনার্জির ২০% শোষণ করে আমাদের মস্তিষ্ক, অথচ এর ওজন শরীরের মোট ওজনের ২% মাত্র। এতো এনার্জি দিয়ে তাহলে মস্তিষ্ক কী করে?
মস্তিষ্কে নিউরনের সংখ্যা প্রায় ১০০ বিলিয়নেরও বেশি। এতো বেশি নিউরনকে একসাথে কাজ করানোর মতো এনার্জি শরীরে নেই। তাই প্রয়োজন ও কাজের ধরন অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময়ে মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশ কাজ করতে পারে। আমরা প্রতিদিন যে শক্তি গ্রহণ করি, সেখান থেকে মস্তিষ্ক যেটুকু শোষণ করে, তা দিয়ে একসাথে সর্বোচ্চ ১৬% নিউরনকে কাজ করানো সম্ভব। তারপর আবার অন্য নিউরন। এভাবে মস্তিষ্কের পুরোটাকেই আমরা কাজে লাগাতে পারি, তবে একসাথে নয়। যদি কোনোভাবে একসাথে বেশিসংখ্যক নিউরনকে কাজ করানো যায়, তাহলে মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। ধরে নাও, এরকম সূত্র আমার জানা আছে। তাই আমি কিছুটা হলেও বেশি মাথা খাটাতে পারি।
– সেই সূত্রটা কী, আমাদের জানাবেন?
– সত্যিকারের মেধাবীরা কারো কাছে সূত্র চায় না। তারা আবিষ্কার করে। তবে আমি মস্তিষ্কের কিছু ব্যায়াম দিতে পারি। যা করলে ক্ষমতা কিছুটা বৃদ্ধি পাবে।
– কেমন সেটা? জানতে চায় সুমাইয়া।
– যেমন, তোমার যে শখ, তা একা না করে একই শখ আছে এমন একটি গ্রুপের সাথে যুক্ত হও। আবার চলার পথে যদি নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করো তাহলে সেটি বেশি মনে থাকে।
এছাড়াও মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়ানোর একটি ভালো উপায় হচ্ছে একে কোনো একটা চ্যালেঞ্জ দেয়া, যেমন, নতুন কিছু শেখা।
আবার সঙ্গীতও শোনা যায়। গান শোনার সময় কিংবা মস্তিষ্কের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীরাও সবার শেষে যা ভুলে যায় তা হচ্ছে গান।
মনে মনে অংক কষা, নতুন কোনো রান্না শেখা, পাজল মেলানোসহ এরকম ছোটখাটো বিষয়ে যুক্ত থাকাটাও মস্তিস্কের ব্যায়ামেরই অংশ।
তবে কেবল কাজ নিয়ে মেতে থাকলেই হবে না। কাজের বিরতি নেয়া এবং আমাদের মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয়াও জরুরি। স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আচ্ছা বুঝলাম। কিন্তু আপনি হয়তো জানেন না যে, আপনি যেসব তথ্য আমাদের দিয়েছেন, তার বেশিরভাগই আমরা জানি। যেসব কিছু জানি না এমন কিছু বলেন তো শুনি।
ইসুমাসার মুখে আবার নিঃশব্দ রহস্যময় হাসি।
– শোনো তবে। খরগোশ দেখেছো তো, কিংবা তোতাপাখি? খরগোশ ও তোতাপাখিকে কখনো পেছন ফিরে তাকানোর দরকার হয় না। তারা মাথা সোজা রেখেও পেছনের দৃশ্য খুব সহজেই দেখতে পায়। ইতুলের তো খুব লম্বা হবার শখ, এক কাজ করো, তুমি মহাশূন্যে যাও। মহাশূন্যে গেলে মানুষ কিছুটা লম্বা হয়। সেখানে মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় মেরুদণ্ডের উপর কোনো চাপ থাকে না। ফলে মেরুদণ্ডের দৈর্ঘ্য কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
ওদের চারজনের মধ্যে অবাক দৃষ্টি বিনিময় হলেও ইতুল আবার বলে- আপনার বলা এই তথ্যেরও কিছু আমার জানা আছে। জানি না কেবল আপনার এতো অল্প সময়ে আমাদের নাম্বার ও আইডি মুখস্থ করে তা নির্ভুলভাবে বলার রহস্য। এটা কী করে করলেন? আর আপনি আসলে কে, কোথা থেকে আসছেন?
– কিছু রহস্য থাক না। নিজেরা উদ্ধার করো। তবেই না আনন্দ। মজার ব্যাপার জানো? সবচে বেশি আনন্দের অনুভূতি উপভোগ করে আবিষ্কারকেরা।
আর আমার সম্পর্কে জানতে চাইছো তো? আমি কে তা আমিই যদি বলে দেই তবে বিজ্ঞানের কাজ কী? খুঁজে নাও। এটা খুঁজে বের করতে পারলে কোথা থেকে এসেছি সেটাও পেয়ে যাবে।
যাই হোক, আমার নির্দিষ্ট সময় শেষের দিকে। আমাকে যেতে হবে। তোমরা তো এখন পড়াশোনা করবে। ইতুল, তোমার বাড়িতে তোমার মামা আসছে, খুঁজছে তোমাকে। কিছুক্ষণ পর কল করবে। সুমাইয়ার তো আজ রাতে মায়ের সাথে কেক তৈরি করার কথা। তোমার ছোট্ট ভাইটির জন্মদিন কি ভুলে গেলে নাকি মেয়ে? মাহতাব, তোমার স্কুলব্যাগে নোট নিয়ে আসছো তোমার সহপাঠীর। সেটা সন্ধ্যার আগেই তাকে হোয়াটস্অ্যাপে পাঠানোর কথা। তাড়াতাড়ি না পাঠালে বেচারা পিছিয়ে যাবে। আর সাজিদা, তোমার বাবা কিন্তু বাড়ি ফিরে তোমাকে না দেখলে রাগ করবে। দ্রুত যাও।
তোমরা যাও, তবে যাবার আগে ইসুমাসার মগজের আরেকটা ক্ষমতা দেখে যাও। বলেই তিনি পথের ধারে পড়ে থাকা দুটো আস্ত ইটের দিকে চাইলেন। সম্ভবত এক মিনিটের মতো হবে তিনি একদৃষ্টে চেয়ে থাকলেন, তারপর ঘটলো অবাক কাণ্ড। ইট দুটো মনে হলো কয়েক ইঞ্চি সরে সামনে চলে আসলো একা একাই। কেবল তাই না, ইট দুটো একটা একটা করে ঠাস করে ভেঙে যেতে লাগলো। যেভাবে হাতুড়ি দিয়ে ইটা ভাঙা হয় সেভাবেই অদৃশ্য শক্তিতে ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে গেলো। শক্তিটা সম্ভবত ইসুমাসার মাথার ভেতর থেকে আসছে। কারণ তাকে প্রচণ্ড ঘামতে দেখা গেলো এসময়। এবং সামান্য কাঁপছিলেন তিনি। ইট ভেঙে বেশ কয়েক টুকরো হবার পর তিনি সকলের মুখের দিকে চেয়ে মৃদু হাসলেন।
এবার ওদের চারজনের সত্যিকারের অবাক হবার পালা। সবাই ভীষণ অবাক হয়। এই ভদ্রলোক এখানে বসে থেকে কী করে সবার বাড়ির খবর জানে। তাছাড়া মগজের শক্তি খাটিয়ে সে দুটো আস্ত ইট এতোটা দূর থেকে কী করে টুকরো টুকরো করলেন!
সাজিদা আবার কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলে ইসুমাসা হাত দিয়ে ইশারায় বললেন- আর না, আমার সময় আপাতত শেষ। এখন বাড়ি যাও।
– কিন্তু… বলতে শুরু করে ইতুল।
এসময় ঘটে অবাক কাণ্ড। ইসুমাসা ওদের সকলের চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে যায়। এটা কী করে সম্ভব? চারজনের চোখে মুখে বিস্ময়। কয়েক সেকেন্ড ওরা কোনো কথাই বলতে পারে না। তারপর ওরা নিজেদের বাড়ির দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি। যাবার আগে ইতুল বলে দেয়, আগামী সপ্তাহে যেন অবশ্যই ওদের ল্যাবে জড়ো হয়। এই লোকের পরিচয় ও ব্রেইনের পাওয়ারের রহস্যের একটা সমাধান না করা পর্যন্ত শান্তি নেই কারো। এই ঘটনা হতে পারে ওদের জন্য বিশাল কোনো আবিষ্কার বা রহস্য উন্মোচনের ক্ষেত্র।
চার কিশোর বিজ্ঞানী নিজেদের ল্যাবে পরবর্তীতে মিলিত হবার আগে এক সপ্তাহের সময় নেয়। নিজেদের মধ্যে ফোনে কয়েকবার আলোচনা হয়। ওরা যে যার মতো যেন সেই ভদ্রলোকের ব্রেইন পাওয়ারের রহস্য নিয়ে স্টাডি করতে থাকে।
পৃথিবীতে কত ঘটনাই তো ঘটে, যা আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক মনে হলেও অস্বাভাবিক না। অন্তত সেসব বিষয়ে একটা সঠিক ব্যাখ্যা যতক্ষণ পর্যন্ত বিজ্ঞানের হাতে প্রমাণসহ না আসে, সেই পর্যন্ত অস্বাভাবিক থাকে। রহস্য উন্মোচনের পর তা স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। এই রহস্য উন্মোচনের কাজটা বিজ্ঞানমনস্করাই করে আসছে। না হলে আজকের আধুনিক পৃথিবীর অনেক আবিষ্কারই আমরা দেখতে পেতাম না।
সাজিদা, ইতুল, সুমাইয়া ও মাহতাব সেই বিজ্ঞানমনস্কদের তালিকায় থাকতে চায়। চোখের সামনে জলজ্যান্ত একজন মানুষের অস্বাভাবিক ব্রেইনের শক্তি ও একইসাথে তার অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার বিষয়টা কোনোভাবেই হেলায় হারানো যাবে না। এর একটা যৌক্তিক সমাধান করতেই হবে। সেকারণেই ওরা দিন-রাত এক করে লেগেছে। নিজেদের পড়াশোনা ঠিকঠাক সম্পন্ন করেই সবাই অবসর সময়টা দরকারি বিষয়ে জানাশোনা করার চেষ্টা করে।
দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ কেটে যায়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ইতুলের বাড়িতে ল্যাবে উপস্থিত হয় চার কিশোর বিজ্ঞানী।
ইতুল প্রথমে বলে, মি. ইসুমাসার অদ্ভুত কর্মকাণ্ড ও তার ব্রেইন পাওয়ার নিয়ে কে কী সমাধান বের করতে পারলি জানা। আমি তার ব্রেইন ব্যবহার করে ইট ভাঙার যে পদ্ধতি দেখলাম সেই শক্তির একটা কাছাকাছি সমাধান যেটা পেলাম সেইটা হচ্ছে টেলিকাইনেসিস। টেলিকাইনেসিস বলতে কোনও দূরবর্তী বস্তুর উপর কোনও সরাসরি শক্তি প্রয়োগ না করেই দূর থেকে শুধুমাত্র সেটির উপর মনোযোগ নিবদ্ধ করে মানসিক ক্ষমতার সাহায্যে সেটির ভেতরে গতির সঞ্চার করা। টেলিকাইনেসিস যদিও বিজ্ঞানে এখনও পোক্তভাবে স্বীকৃত হয়নি, তবে এর ব্যবহার কেউ কেউ করে। ১৯১১ সালের ফরাসি ম্যাগাজিন লা ভি মিস্তেরিয়েজে একজন মনোবিজ্ঞানী টেলিকাইনেসিসের ধারণা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, টেলিকাইনেসিস বা মনোগতিসঞ্চারের সাহায্যে বস্তুকে শূন্যে উঠিয়ে ভাসানো সম্ভব কিংবা ধাতুর তৈরি বস্তুকে বাঁকানো সম্ভব। পরবর্তীতে প্রচণ্ড একাগ্রতা কাজে লাগিয়ে এই শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা অনেকেই করেছেন।
আমার ধারণা মি. ইসুমাসা সেই টেলিকাইনেসিস এর মাধ্যমেই আমাদের চোখের সামনে সরাসরি শক্তি প্রয়োগ ছাড়াই ইট ভেঙে টুকরো করেছেন। হতে পারে আমাদের অজানা কিন্তু তিনি সেই শক্তির সঠিক ও শক্তিশালী কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছেন। তবে এই বিষয়টাতে আমার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আমি টেলিকাইনেসিস এর প্রয়োগ বৈজ্ঞানিকভাবেই করার চেষ্টা করবো। এবার তোরা বল্।
সুমাইয়া বললো- হুম, বিষয়টা ইন্টারেস্টিং, এর ব্যবহার করতে পারলে মন্দ হয় না। আমরা টেলিকাইনেসিস এর একটা প্রজেক্ট করতেই পারি।
কিন্তু ইসুমাসা যে আমাদের সম্পর্কে হড়হড় করে সব বলে দিলেন, এ বিষয়ের ব্যাখ্যা কারো কাছে আছে?
আমি জানি কিছুটা, আগে তোরা শুরু কর।
সাজিদা এরপর মি. ইসুমাসার অদ্ভুত ব্রেইন পাওয়ারে তাদের সম্পর্কে না জেনেও বলার বিষয়টা নিয়ে মুখ খোলে।
– তোরা হয়তো শুনে থাকবি যে বিজ্ঞানে মাইন্ড রিডিং বলে একটা বিষয় আছে। মানে তুই যা ভাবছিস বা তোর মগজে যে বিষয় ধারণ করা আছে তা পড়ে নেয়া। এটা একটি জটিল ও অসাধারণ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিটা যদি আয়ত্ত করা যায় তবে যে কারো মুখ দেখে তার ভেতরের অনেক কথা বাইরে নিয়ে আসা যায়। ইতিহাসে এর প্রমাণ আছে।
এপর্যন্ত বলে সাজিদা থেমে গেলে সুমাইয়া বলতে শুরু করে, হুম, আমিও মাইন্ড রিডিং নিয়ে যতটা জেনেছি তাতে বলা যায় এই বিষয়ে চর্চা করলে মানুষের মনের কথা জেনে নেয়া অসম্ভব না। কারণ প্রতিটা মানুষের মনে কী ঘটছে সেটা তার শারীরিক অবস্থান বা অঙ্গভঙ্গীতে প্রকাশ পায়। মাইন্ড রিডিং এর জন্য সময়জ্ঞান অনেক গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটা মানুষের ভেতরেই সময়ের একটা ছন্দ থাকে। যেমন ঘুম থেকে ওঠা, খাবার গ্রহণ করা, বাইরে বেরুনো সব কিছুই সময় দিয়ে গণনা এবং পরিচালনা করে মানুষ। সময়ের দিকে খেয়াল করে কমন সেন্স ব্যাবহার করলেই যে কারো সম্পর্কে ধারণার কাছাকাছি যাওয়া যায়। একটা উদাহরণ দেই, এই মুহুর্তে আমাদের সামনে বসে থাকা একজন বয়স্ক মানুষ কিছু করতে চাচ্ছে। সময় যদি বিকেল চারটা হয় তাহলে ভাবতে হবে এই মুহূর্তে এই বয়সের সাধারণ মানুষের কী কাজ থাকে? নিশ্চয়ই তিনি বিরিয়ানি খেতে চাইবে না। তার তখন এক কাপ কফি দরকার হতে পারে। আর সে কফি খেতে খেতে তার হারানো সোনালি অতীত নিয়ে ভাবতে পারে। এক্ষেত্রে পরিবেশের বিষয়টাও দেখতে হবে। বাসায় একটা মানুষ যেটা করতে চায় বাইরে কিংবা রাস্তায় নিশ্চয়ই তা করবে না। এজন্য পরিবেশ দেখে নিতে হবে। এরকম টুকিটাকি আনুষাঙ্গিক আরো বিষয় আছে সেসব প্র্যাক্টিস করলে একদিন এমন অবাক করা কথা তুমি বা আমিও বলতে পারবো অন্যের সম্পর্কে। এটাকে রিডার না বলে অনেকে মাইন্ড হ্যাকারও বলে থাকেন। যা অন্য যে কাউকে ভড়কে দেয়ার জন্য দুর্দান্ত একটা পদ্ধতি।
কী রে মাহতাব, কী ভাবছিস, মাইন্ড রিড চর্চা শুরু করবি নাকি?
সুমাইয়ার প্রশ্নে মাহতাব আলতো করে হাসে।
– না রে, এটা এতো সহজ পদ্ধতি না, তাই বলে অসম্ভবও না। কিন্তু ঝামেলাও আছে রে। এই মাইন্ড হ্যাকিং নিয়ে কিন্তু বিজ্ঞানীরা আশাবাদী হবার পাশাপাশি চিন্তিতও আছে। কারণ এর অপব্যবহারে হয়ে যেতে পারে বিশাল ক্ষতি।
ইতুল প্রশ্ন করে, কেমন ক্ষতি?
মাহতাব জানায়- ইন্টারনেট এ বিভিন্ন সাইট থেকে তথ্য চুরির ঘটনা তো আমরা অনেক জানি, কিন্তু মানুষের ব্রেইন থেকে তথ্য চুরির ঘটনাও নাকি ঘটছে। সাধারণত সার্ভার এর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ব্যাংক এর গোপন তথ্য, পিন নাম্বার, একাউন্টের আইডি এসব নিরাপদ রাখার জন্য বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিন্তু নেয়ায় থাকে। তবুও কোনো কোনো তথ্য কিন্তু হ্যাকিং এর মাধ্যমে চুরি হয়। সেখানে তখন আরো বেশি নিরাপত্তা জাল বিছিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু তোদের বা আমার মাইন্ডে সেট করা অসংখ্য তথ্যের মধ্যে কিন্তু আমাদের আইডি নেম, পাসওয়ার্ড, ল্যাবের বিভিন্ন গোপন পরিকল্পনা সবই আছে। সেসব নিরাপদ রাখতে কিন্তু আমরা কোনো নিরাপদ জাল ব্যবহার করি না। এখন মস্তিকে কোনো হ্যাকার হামলা করলে সহজেই সেসব নিয়ে নিতে পারবে।
এবং সাধারণদের কাছে এটা অবিশ্বাস্য মনে হলে বিষয়টি সত্যি যে এখন মানব মস্তিষ্কও হ্যাক করা সম্ভব ! শুধু তাই না, যে কোনো ব্যক্তির ব্রেইন হ্যাক করে তার ব্যক্তিগত গোপন সব তথ্য চুরি করা সম্ভব ।
মানুষের মস্তিষ্ক হ্যাক করে গোপন তথ্য চুরি করা যে সম্ভব, সে বিষয়ে এর প্রমাণও দিয়েছে ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড এবং ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার বিজ্ঞানী ও গবেষকরা । এ কাজে বিজ্ঞানী ও গবেষকরা ব্যবহার করেছেন স্বল্পমূল্যের ইমোটিভ ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেস বা ইমোটিভ বিসিআই। স্বেচ্ছাসেবকদের কয়েকজনকে ইমোটিভ বিসিআই হেডসেট পরিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে দেন বিজ্ঞানীরা। এরপর মস্তিষ্কের পি৩০০ সিগন্যাল অনুসরণ করে সংগ্রহ করেন স্বেচ্ছাসেবকদের বিভিন্ন ব্যক্তিগত গোপন তথ্য ।
ইমোটিভ বিসিআই ব্যবহার করে স্বেচ্ছাসেবকদের মস্তিষ্ক থেকে সংগ্রহ করা ডেটা থেকে খুব সহজেই তাদের ঠিকানা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং কার্ড পিন নম্বর খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছে সেই বিজ্ঞানী গবেষক দল। তোরা বুঝতেছিস, বিষয়টা কতটা ভয়ানক!
ইতুল কপাল কুঁচকে বলে- তাইতো দেখছি।
তাহলে মিস্টার ইসুমাসা আমাদের ব্রেনের সব তথ্য চুরি করে নিয়ে যায়নি তো?
সুমাইয়া বললো- অস্বাভাবিক না, হতে পারে। তারচে বড় কথা হচ্ছে তার যদি সত্যি এই ক্ষমতা থাকে তবে সে এই শহরের যে কারো ব্রেন হ্যাক করে নিয়ে নিতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সকল তথ্য। এমনটা হলে তো মহাবিপদ। তাকে থামানো ভীষণভাবে দরকার।
মাহতাব বলে- হুম, কিন্তু তার পরিচয়, হঠাৎ উপস্থিতি, আবার হঠাৎ অদৃশ্য হওয়া, এসব না জানলে তো তাকে পাওয়া সহজ হবে না। এমনও হতে পারে যে ইসুমাসা অদৃশ্য হয়ে গেছেন আর আসবেন না। সেটা হলে টেনশন নাই। আর যদি সে ফিরে আসে তাহলে তার উপস্থিতি যে কতটা ভয়ানক হতে পারে তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।
সাজিদা বললো- এখনি এতো অস্থির হবার কিছু নাই। যদি সে আবার উপস্থিত হয়েই যায় তাহলে আমার ধারণা আমাদের মুখোমুখি হবে। তখন তাকে নিয়ে ভাবা যাবে, আর যদি না আসে তবে তো নেই। কিন্তু আমাদেরকে তিনি যে কটি সূত্র দিয়ে গেলেন, সেসব নিয়ে কাজ করার অনেক বাকি আছে।
মাইন্ড রিডিং, টেলিকাইনেসিস এবং তার সঠিক পরিচয় বের করা। আমাদের টিমের সবাই চল্ আপাতত এসব নিয়েই কাজ করি।
ইতুল মাহতাবকে সমর্থন জানিয়ে বললো- হুম।
সেটাই ভালো। চল্ আমাদের পরবর্তী প্রজেক্ট ঘোষণা করছি টেলিকাইনেসিস। চারজন কিশোর বিজ্ঞানী ওদের পরবর্তী প্রজেক্টের জন্য একসাথে হাতে হাত রেখে একাত্ম হয়।
প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৬



