স্বপ্ন দেখে আকাশ

0
1

বাহাদুরাবাদ ঘাটের পাশেই আকাশদের সুন্দর বাড়িটা। গ্রামের লোকজন ওদের বেশ সম্মান আর সমীহ করে। বাবা-মা’র আদরে বেড়ে ওঠা একমাত্র ছেলে আকাশ। এই পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত কখনও সামান্যতম কষ্টের মুখ দেখেনি। মা মাঝে মাঝে মজা করে জিজ্ঞেস করেন, আমি আর তোর আব্বু হঠাৎ মরে গেলে তুই কী করবি?
চোখের পানি ফেলে আকাশ বলে, মানুষের বাসায় কাজ করবো ।
আম্মু ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। বলেন, না বাবা। আল্লাহ যেন এমন নসিব তোর না করেন।

কিন্তু, হঠাৎ করেই কী যেন কী হয়ে যায়। আকাশ ওর দাদির সাথে একদিন ফুপুবাড়ি ময়মনসিংহে বেড়াতে যায়। এক দিনের জন্য। পরদিন বাড়ি ফিরে দেখে, কোথায় বাড়িঘর আর কোথায় কী? যমুনা নদীর পানি সেখানে থৈ থৈ করছে। বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে। বাড়িতে যারা রাতে ঘুমিয়ে ছিল, কেউই আর বেঁচে নেই। আকাশের মা-বাবা দু’জনের লাশ অনেক দূরে ভেসে উঠেছিল। নিয়ে এসে মাটির বুকে দাফন করা হলো। দাদির হাত ধরে আকাশ চলে এল সেই ফুপুর বাড়িতেই। প্রথমদিকে ক’দিন আদর-যত্ন করলেও আস্তে আস্তে ফুপুর ছেলে-মেয়ে, ফুপা- এদের ব্যবহারে আকাশ আর তার দাদির খুব কষ্ট হতে থাকল। দাদি একদিন তাই আকাশের হাত ধরে চলে এলেন সেই বাড়ি ছেড়ে। স্বামী বেঁচে নেই। দু’ছেলে-মেয়ের মধ্যে ছেলেটা তো বৌসহ নদীভাঙনেই মারা গেল। নিজের বাপ-দাদার ভিটেবাড়িও ভাইদের ছেলে-পুলেরা চষে খাচ্ছে। তাই আকাশের হাত ধরে দাদি একেবারে খোলা আকাশের নিচে এসে দাঁড়ালেন। মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ধরনা দিতে লাগলেন কাজের জন্য। এক সময় কাজ জুটে গেল। কিন্তু বাচ্চাসহ কেউ রাখতে চায় না। দাদি বললেন, ছোটখাটো ফরমায়েশ ও করতে পারবে। আমার নাতিটারে শুধু একটু খাইতে আর ঘুমাইতে দিয়েন।
অবশেষে একজন গৃহিণী আকাশ আর ওর দাদিকে রাখতে রাজি হয়। আকাশ সারাদিন বাসায় থাকে না। দাদি শিখিয়ে দিয়েছে টুকানো কাগজ বিক্রি করে কিছু আয় করতে। তাই ফুটপাত-ডাস্টবিনের আশেপাশে ঘুরে কাগজ টুকায়। ছোট্ট আকাশের পা চলতে চায় না । কখনো তো সে এত পরিশ্রম করেনি। মাঝে-মধ্যে বুক ভাসিয়ে কাঁদে। ‘আম্মু-আব্বু, তোমরা কেন আমাকে এভাবে ফেলে চলে গেলে? নদী কেন এমন করে সবকিছু ভেঙে দিয়ে যায়? নদীর কোনো মায়া-দয়া নেই?’

রাতে আকাশ দাদির সাথে ঘুমায়। ঘুমানোর আগে দাদি তাকে অনেক কথা বলেন। কাঁদেন, আবার আকাশকে সান্ত্বনাও দেন। ‘দাদু, তোকে আমি পড়াশোনা করাবো দেখিস। তোর ভবিষ্যত নষ্ট হতে দেবো না। আমি কি জানতাম, বুড়ো বয়সে আমাকে এভাবে অন্যের বাসায় খেটে খেতে হবে? তোর নানা-নানি বেঁচে থাকলে হয়তো তোর জন্য আমাকে এভাবে ভাবতে হতো না। ধৈর্য ধর ভাইয়া, সোনা আমার।

: জানো দাদি, সারাদিন হাঁটতে আমার খুব কষ্ট হয়।
দাদি কেঁদে ফেলেন তার কথা শুনে। কষ্ট তো হবেই রে দাদু। তুই যে আমাদের সবার আদরের ছিলি। কষ্ট করতে করতে দেখবি, একদিন সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে।
: কীভাবে দাদি?
: তোকে আমি স্কুলে ভর্তি করে দেবো। এই বাসার মালিকের স্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। তাকে আমাদের অবস্থার কথা খুলে বলেছি। উনি সাহায্য করতে রাজি হয়েছেন। সরকারি প্রাথমিক স্কুলে তোকে ভর্তি করে দেবো। ভালো করে পড়াশুনা করবি। আমার বেতনের টাকা জমিয়ে তোকে জামা কিনে দেবো। দেখবি, একদিন আবার আমাদের সব হবে ইনশাআল্লাহ।
: সত্যি দাদি? দেখো আমি খুব ভালো করে পড়াশুনা করবো। তোমার সব কথা শুনবো।
: তুইতো আমার সোনা দাদু।

আকাশের কপালে চুমু এঁকে দিয়ে চোখ মুছে দাদি ঘুমাতে চেষ্টা করেন। বুড়ো শরীর। তাতে আবার সারাদিনের পরিশ্রম। তাই ঘুম আসতে তার দেরি হয় না। আকাশও এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। ফ্লোরে শুধু ছেঁড়া কাঁথা দিয়ে পাতা শক্ত বিছানায় ঘুমাতে ওদের এখন আর তেমন কষ্ট হয় না। অভ্যাস হয়ে গেছে।

ক’দিন পর, সত্যিই আকাশ বই নিয়ে নতুন জামা পরে স্কুলে যায়। এই ক’দিন রাতে ঘুমানোর আগে দাদির কাছে বাংলা, ইংরেজি, অংকের প্রাথমিক পাঠগুলো শিখে নিল। কিছু তো আম্মু-আব্বুর কাছেই শিখেছিল। তাই খুব একটা সমস্যা হয়নি। আকাশের চোখে এখন নতুন দিনের স্বপ্ন। একদিন সে পড়াশুনা করে মস্তবড় মানুষ হবে। গরিব হলে কেমন কষ্ট, তা সে প্রতিটা মুহূর্তে নতুন করে বুঝতে শিখছে। তাই আকাশ ভাবে, বড় হয়ে সে এমন কিছু করবে, যাতে এদেশের গরিব মানুষদের কিছুটা হলেও উপকার হয়। পড়াশুনায় অনেক মনোযোগী হয় সে। শিক্ষকরাও তাই সবাই এখন ওকে আদর করে।

আকাশ এখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। বৃত্তি পরীক্ষার আগে হেডস্যার ওকে ডেকে বললেন, তুমি যদি বৃত্তি পাও, তোমার লেখাপড়ার সমস্ত দায় দায়িত্ব আমিই নেব।
শুনে আকাশের ভীষণ ভালো লাগলো। খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করে সে বৃত্তি পরীক্ষা দিল।
রেজাল্টের দিন। আকাশ ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। হেডস্যার ওকে আনন্দে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

হেডস্যার তাঁর কথা রেখেছেন। আকাশের পড়াশুনার সমস্ত খরচ এখন তিনিই দেন। আকাশ এখন ঢাকার আইডিয়াল স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। আকাশকে ঘিরে দাদির অনেক আশা। একদিন তার নাতিই তার মুখ উজ্জ্বল করবে। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে নাতিকে বুকে জড়িয়ে স্বপ্ন দেখেন আকাশের দাদি। আর আকাশ স্বপ্ন দেখে একদিন সে মস্তবড় মানুষ হবে। মানুষের মতো মানুষ।

প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৬