
আট বছরের ছোট্ট ফাতেমা। তার দিনগুলো এখন আর রূপকথার গল্পের মতো সুন্দর নেই। গাজার ধুলোবালি মাখা এক জীর্ণ তাঁবুতে তার বসবাস। সেখানে ঘরের দেয়াল নেই, জানালা নেই; আছে শুধু লোনা বাতাস আর ধুলোর ওড়াউড়ি। আকাশে যখন মেঘের বদলে কালচে ধোঁয়া ওড়ে, ফাতেমার খুব ভয় করে। বারুদের কটু গন্ধে ওর দম আটকে আসে। কিন্তু এত কষ্টের মাঝেও ফাতেমা ছবি আঁকা আঁকতে ভোলে না। একদিন এক মিষ্টি রোদে ফাতেমা তার পুরোনো খাতাটা নিয়ে বসল। অনেক যত্ন করে সে একটা ধবধবে সাদা পাখি আঁকল। পাখিটার ডানাগুলো ছিল মেঘের মতো তুলতুলে। কাঁপা কাঁপা হাতে ফাতেমা ছবির নিচে লিখল: পাখিরা যুদ্ধ করে না।
সেদিন সকালে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় অনেক দিন পর ত্রাণের গাড়ি এল। গাড়িতে ছিল গরম পাউরুটি, লাল আপেল আর একটা নরম পশমি কম্বল। ফাতেমার খুব আনন্দ হলো। ও ভাবল, ‘এই কম্বলটা পেলে ছোট ভাই রায়েদের আর রাতে শীতে কাঁপতে হবে না।’ মা অসুস্থ, তাই ছোট্ট ফাতেমা নিজেই গেল ত্রাণের লাইনে। লাইনের সব শিশুর চোখে আজ খুশির ঝিলিক। কেউ আপেলটাকেই খেলনার মতো বুকের কাছে জড়িয়ে ধরেছে। কিন্তু হঠাৎ! বড্ড আচমকা আকাশের বুক চিরে এক দানবীয় গর্জন শোনা গেল। চারপাশটা যেন আগুনের ফুলকিতে ছেয়ে গেল। পরদিন খবরের কাগজে বড় করে লেখা হলো- ‘ত্রাণের সারিতে শিশুসহ ৭২ জন নিহত।’ সেই ৭২ জন তারার ভিড়ে আমাদের ছোট্ট ফাতেমাও ছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনের মাটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘ফাতেমা হারায়নি, ও আমার কোলে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।’ বাতাস ফাতেমার নিঃশ্বাসের ঘ্রাণ বুকে নিয়ে বলল, ‘ও এখন আমার ডানায় ভর করে মেঘেদের দেশে খেলে বেড়াবে।’
অনেক দিন পর, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক কিশোর শিল্পী ফাতেমার সেই পুরোনো খাতাটি খুঁজে পেল। ধুলো ঝাড়তেই বেরিয়ে এল সেই সাদা পাখিটা। শিল্পী মুগ্ধ হয়ে ফাতেমার সেই পাখির আদলে একটি বড় ছবি আঁকল আর নাম দিল- ‘ফাতেমার শান্তির পাখি’। সেই পাখিটি আজ আর গাজার খাঁচায় আটকে নেই। তা এখন ডানা মেলে উড়ে চলে নিউ ইয়র্কের রাজপথ থেকে প্যারিসের ক্যাফে, কিংবা তেহরানের ওয়ালি আসর স্ট্রিটের চিনার গাছের সারি থেকে সরাসরি ঢাকা শহরের হৃদপিণ্ডে। সেখানে নাজিরাবাজারের সরু গলি দিয়ে ডানা ঝাপটে উড়ে যেতে যেতে সেই সাদা পাখিটা প্রতিটি শিশুকে কানে কানে বলে- তোমরা যদি একে অপরকে ভালোবাসো, তবে পৃথিবীতে আর কোনোদিন যুদ্ধ হবে না।
প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৬



