নীলপুরে আজ উৎসবের সকাল। আকাশে রঙিন কাগজের ঝিলিক, মাঠে হাসির ঢেউ। বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে, কেউ সুতো গুটাচ্ছে, কেউ রঙ লাগাচ্ছে। আজ নীলপুরের বার্ষিক ঘুড়ি উৎসব। যে দিন সবাই মিলে আকাশ ভরিয়ে তোলে রঙে ও আনন্দে। সেই ভিড়ের মাঝেই হু-হু করে সাইকেল চালিয়ে ঢোকে ইয়ারা। চোখে উজ্জ্বল দুষ্টুমি, গলায় জোর আওয়াজ সবাই সাবধান! আজ আকাশে শুধু আমার নামই থাকবে! তার বন্ধু চিকু, নয়ন আর শীলা হাসতে হাসতে ওর দিকে তাকায়। চিকু বলে, তোমার ঘুড়িটা তো এখনও বানানোই হয়নি! নয়ন ঠোঁটে রঙ মেখে বলে, আকাশে তোমার নাম থাকার আগে ঘুড়িটা উড়ে কি না দেখো। ইয়ারা হেসে বলে, তোমরা দেখো, নীলপুরের ইতিহাসে আজ প্রথমবার কেউ চাঁদের কাছাকাছি যাবে আর সে হচ্ছে আমি!
স্কুলের ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে সবাই ক্লাসের দিকে যায়। ক্লাসে ঢোকার পর মিসেস লিলি বোর্ডে ঘুড়ির ছবি আঁকলেন আর বললেন, ‘বাচ্চারা, তোমরা কি জানো ঘুড়ি আকাশে কীভাবে ওড়ে? ঘুড়ি খুব হালকা কাগজ আর কাঠি দিয়ে বানানো। তাই হাওয়া তাকে সহজে তুলতে পারে। যখন তুমি দৌড়াও বা বাতাস আসে, তখন হাওয়া ঘুড়ির পেছনে চাপ দেয়। এই চাপেই ঘুড়ি ওপরে ওঠে! হাওয়া ঘুড়িটাকে ঠেলে উপরে তোলে, আর সুতো তাকে ধরে রাখে—তাই ঘুড়ি আকাশে ওড়ে। কিন্তু এটা মনে রেখো এর জন্য চাই একতা। একা টানলে, জোরে বাতাস আসলে সে আর ঘুড়ি দুজনেই ভেসে যাবে।’ ইয়ারা চুপচাপ ডায়েরির কোণে নিজের বিশাল এক ড্রাগন ঘুড়ির ছবি আঁকছে। সে বললো, ‘আমি একাই টানব, একাই উড়ব, একাই জিতব।’ মিসেস লিলির চোখে একটুখানি মৃদু হাসি ‘দেখা যাক, বাতাস কাকে বেশি ভালোবাসে, যে গর্ব করে তাকে, না যে মিলেমিশে কাজ করতে চায় তাকে।’
পরেরদিন বিকেলে সবাই হাজির হয় চিকুর ল্যাবে। সেখানে চারপাশে কাঠি, কাগজ, রঙ, গাম, আর গ্লিটার ছড়িয়ে আছে। চিকু হিসাব করছে, ঘুড়িটাকে হালকা রাখতে হবে। যত হালকা, তত উঁচুতে উঠবে। নয়ন বলছে, রঙ ছাড়া ঘুড়ি মানেই প্রাণহীন! শীলা খুশিতে ফিতা ঝুলিয়ে বলল, এতে অনেক সুন্দর লাগবে! ইয়ারা তাতে কান না দিয়ে উঁচু স্বরে বলে উঠল, আমার ঘুড়িটা হবে বিশাল! ড্রাগনের মতো লাল, আর চোখে আগুনের দ্যুতি! চিকু বলল, এটা যদি উড়তে না পারে? ইয়ারা হেসে বলল, চিকু, তুমি বিজ্ঞান নিয়ে চিন্তা করো, আকাশ নিয়ে আমাকে ভাবতে দাও। ঘণ্টা দুই পর সবাই হা করে তাকিয়ে রইল ইয়ারার ঘুড়ি এত বড় যে দরজা দিয়ে বের করা যাচ্ছে না! নয়নের আঁকা গলে পড়ছে, শীলার গ্লিটার আটকে আছে লেজে, আর চিকুর হিসাব উল্টে গেছে। নয়ন মৃদুস্বরে বলে, এটা উড়বে না, পড়ে যাবে। ইয়ারা গর্বভরে বলে, অবশ্যই উড়বে, আমি উড়াবো!
চিকুর ল্যাব এখন যেন একটা ঘুড়ির জঙ্গল। মেঝে জুড়ে ছেঁড়া কাগজ, গাম ছড়ানো, বাঁশের কাঠি পড়ে আছে এলো-মেলোভাবে। চিকু ঘাম মুছে বলল, এই ঘুড়িটার ওজন অনেক বেশি, ইয়ারা! বাতাসের গতি ধরে রাখতে পারবে না। নয়ন পিঠে রঙের দাগ নিয়ে হেসে উঠল, এই ঘুড়ি যদি উড়েও, তার সাথে আমরা সবাই উড়ে যাব! শীলা রঙিন ফিতার ঝাঁপি থেকে তাকিয়ে বলল, আমি ওর লেজে সুন্দর ফিতা লাগিয়েছি, কিন্তু এটা এত ভারী হয়ে গেছে যে সব ফিতা নষ্ট হয়ে যাবে। ইয়ারা তবু গর্বভরে বলল, তোমরা দেখবে, আকাশে ওর গর্জন শুনে চাঁদ পর্যন্ত কেঁপে উঠবে! চিকু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক আছে, তাহলে আগে দরজা দিয়ে বের করো ওটাকে। সবাই মিলে, ঠেলা-ধাক্কা দিয়ে, ইয়ারার বিশাল ঘুড়িটাকে বাইরে আনতে পারল। চিকু দূর থেকে দেখল উত্তর দিকের বাতাস বেগে বইছে। সে ইয়ারাকে বলল, এটা একটু ঠিক না করলে ভেঙে যেতে পারে। ইয়ারা হেসে বলে, ভাঙবে না চিকু, আমি বানিয়েছি। নয়ন ধীরে বলল, কখনো কখনো খুব শক্ত জিনিসও হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না। ইয়ারা শোনে না। তার চোখে শুধু আকাশ। দূর থেকে নীলপুরের মাঠ দেখা যায়—ঝলমল করছে পতাকা, ড্রাম বাজছে, শিশুরা হেসে দৌড়াচ্ছে। ইয়ারা দড়িটা টানতে টানতে বলে, আজ সবাই দেখবে, কে আসল উড়ুক্কু! তার পেছনে চিকু, নয়ন, আর শীলা একে অপরের মুখের দিকে তাকায় এক চিমটি গর্ব, এক চিমটি উদ্বেগ, আর একটা বড় আসন্ন বিপদের গন্ধ বাতাসে ভেসে থাকে।
সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে, আকাশে নানারঙা ঘুড়ি উড়ছে। মাঠে এসেছে নীলপুরের রাজা, রাজকীয় টুপি পরে। তিনি ঘোষণা করলেন, আজ যার ঘুড়ি সবচেয়ে উঁচুতে উঠবে, সে হবে নীলপুর স্কুলের পরবর্তী ক্যাপ্টেন! ইয়ারা হাসল, তাহলে মুকুটটা এখনই আমার জন্য ঠিক করে রাখো। বন্ধুরা চিন্তিত। চিকু বলল, সুতোটা শক্ত করে ধরো। ইয়ারা জবাব দিল, আমি একাই সব সামলাতে পারবো!
তিন… দুই… এক… ধুম!
ইয়ারার ড্রাগন ঘুড়ি আকাশে উঠল। সবাই হাততালি দিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তীব্র বাতাসের ঝাপটায় সেটি কাঁপতে লাগল, তারপর ছিঁড়ে গেল! ঘুড়িটা হাওয়ায় পাক খেতে খেতে অন্য ঘুড়িগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে গেল। আমার ঘুড়ি! একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল বাচ্চারা। চিকু হতাশ হয়ে বলল, সর্বোনাশ! এটা তো পুরো উৎসবটাই নষ্ট করে দিলো! মাঠে হাসির বদলে গুমোট নীরবতা। ইয়ারা নিঃশব্দে নিচু হয়ে নিজের ছেঁড়া ড্রাগনের মাথাটা হাতে তুলে নিল।
পুকুরের ধারে বসে আছে ইয়ারা। বাতাসে ভেসে আসছে কাগজের টুকরো, ছেঁড়া ফিতার টান। তার চোখে পানি, ঠোঁটে নিঃশব্দ প্রশ্ন আমি ভুল করলাম? ঠিক তখনই বাতাসে ভেসে আসে এক কোমল কণ্ঠ ইয়ারার নানির মৃদু আওয়াজ, একটি ঘুড়ি যত বড়ই হোক, বন্ধুত্বের সুতো ছাড়া উড়তে পারে না। বাতাসও দলবদ্ধতাকে ভালোবাসে, একাকিত্বকে নয়। মনে রাখবে দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ। একটা জোনাকি উড়ে এসে ইয়ারার হাতে বসে। সে হাসি ছোট, কিন্তু আন্তরিক হাসি।
পরদিন সকালে ইয়ারা চলে যায় চিকুদের বাড়ি। সবাই এখনো হতাশ মুখে কাগজ গুছাচ্ছে। ইয়ারা নরম গলায় বলে, আমি দুঃখিত… আমার ড্রাগন তোমাদের ঘুড়ি খেয়ে ফেলেছে। চিকু হেসে বলে, ভালোই তো, ওটা ছিল সবচেয়ে ক্ষুধার্ত ঘুড়ি! নয়ন রঙ-তুলি তুলে বলে, চলো, এবার একটা ঘুড়ি একসাথে বানাই। শীলা খিলখিলিয়ে হেসে বলে, তাতে থাকবে রঙ, জাদু আর বন্ধুত্ব। চারজন আবার বসে পড়ল। চিকু হিসাব করছে, নয়ন রঙ দিচ্ছে, শীলা ফিতা লাগাচ্ছে, আর ইয়ারা মন দিয়ে সবার কথা শুনছে।
রাত নামছে। জোনাকির আলোয় নীলপুরের মাঠ ভরে উঠেছে। নতুন ঘুড়িটা ছোট্ট, কিন্তু ঝলমলে রঙের। ধীরে ধীরে আকাশে উঠছে। চিকু বলল, দেখো, কেমন ভারসাম্য! নয়ন বলল, রঙগুলো যেন গান গাইছে! শীলা উচ্ছ্বসিত, এই ঘুড়িটা আমাদের সবার! ইয়ারা সুতো শক্ত করে ধরে বলল, আমরা একসাথে উড়ছি, বন্ধুরা!
দূর থেকে মিসেস লিলি তাকিয়ে হাসছেন।
আকাশে ঝলমল করছে ঘুড়িটা। বাতাসে বাজছে সুর—
“উড়ো মন, উড়ো আজ,
বন্ধুত্বে লাগাও আওয়াজ!
নীলপুরের আকাশ হাসবে আজ!”
চাঁদের আলোয় চার বন্ধুর মুখে হাসি, আর সেই হাসি মিশে যায় নীলপুরের উজ্জ্বল রাতের আকাশে।
প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৬



