বন্ধুরা, প্রিন্ট করা বই তো কতোই দেখেছ। এই যেমন এই লেখাটাই তো পড়ছ প্রিন্ট করা একটা বইতে। কিন্তু তুমি কি কখনো প্রিন্ট করা বাড়ির কথা শুনেছ? না না, বইতে প্রিন্ট করা বাড়ির ছবি কথা বলছি না। বলছি আস্ত বাড়িটাই প্রিন্টেড হওয়ার কথা! হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছ। তোমরা অনেকেই এরইমধ্যে থ্রিডি প্রিন্টের কথা শুনেছ। আজ আমরা প্রিন্ট করা কাগজের উপরে কালো কালির অক্ষরে জানব থ্রিডি প্রিন্টের কথা। বর্তমানে শুধু বাড়ি নয়, এমন আরো অনেক কিছুই এভাবে প্রিন্ট করা হয়। চলো কথা না বাড়িয়ে তাহলে এবার ঢুকে যাওয়া যাক সেই জগতে।
প্রথমেই ভাবো একটা প্রিন্টার কীভাবে কাজ করে। প্রিন্টারে একটা মেশিন থাকে, যা কাজ করে একটা সফটওয়্যারের সাহায্যে। সেই সফটওয়্যারে যে ফাইল প্রিন্ট করা হয়, তা প্রিন্টারের ধরন আর কমান্ডের উপর নির্ভর করে সাদাকালো বা রঙিন প্রিন্ট করে থাকে। এই প্রিন্ট সাধারণত হয় কাগজে এবং এখানে সমতল কাগজের উপর ডানে বামে লেখা থাকে, যেভাবে তুমি বইতে এখন বাম দিক থেকে ডান দিকে করে এই লেখাগুলো পড়ে যাচ্ছ। এটি হলো টু ডি বা টু ডাইমেনশান বা দুই মাত্রা। এই দুই মাত্রা হলো দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ। কিন্তু আমরা আমাদের আশেপাশের যত জিনিস দেখি অধিকাংশের ক্ষেত্রে এই দৈর্ঘ্য প্রস্থের বাইরে আরেকটা ব্যাপার আছে। তা হলো উচ্চতা এবং একে বলা হচ্ছে থার্ড ডাইমেনশন। এই উচ্চতাকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে ডিজাইন করে হাজির করতেই ব্যবহার করা হয় থ্রিডি প্রিন্টার।
তোমার মনে হতে পারে, থ্রিডি প্রিন্টার নিয়ে এত আলোচনার কী আছে? থ্রিডি প্রিন্টার যেভাবে একটা জিনিস বানাতে পারে, এখন তো অনেক মেশিনই আছে, সেভাবে বানায়। যেমন ধরো খেলনার কথা, খেলনা এমনিতে বিভিন্ন মেশিন দিয়েও বানানো হয়, আবার থ্রিডি প্রিন্টার দিয়েও তৈরি করা যায়। তাহলে থ্রিডি প্রিন্টারের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা বা পার্থক্য কী? এটা বুঝা খুবই সহজ। তুমি এখন যে বইটা পড়ছ, বা ক্লাসে যে বইটা পড়ো, সেটা তো হাজার হাজার বা লাখ লাখ কপি ছাপা হয়। এই ছাপা হয় প্রেসে, যেখানে সবগুলো বই হয় একই রকম। কিন্তু যদি এমন ১০০টি বই করতে হয় যেখানে সবার মনের মতো আলাদা ডিজাইন থাকবে, বা আলাদা লেখা থাকবে, তখন কি প্রেসে এই ছাপা সম্ভব? সম্ভব নয়। তখন তোমার লাগবে সাধারণ প্রিন্টার, যেখানে তুমি প্রতি কাগজে আলাদা লেখা প্রিন্ট করতে পারবে এবং এর জন্য অতিরিক্ত খরচও করতে হবে না। থ্রিডি প্রিন্টারও সেই কাজই করে দেয়। কোনো প্রোডাক্ট লাখ লাখ বানাতে হলে তার জন্য থ্রিডি প্রিন্টার নয়। বরং কাস্টমাইজড এবং গ্রাহকের ইচ্ছামতো কোনো প্রোডাক্ট পেতে চাইলে, তার জন্যই থ্রিডি প্রিন্টার। যেমন ধরো, তোমার ব্যবহারের জন্য তোমার নিজের ডিজাইন করা একটা পানির বোতল পেতে চাও। এখন সেই বোতল কি পানির বোতল বানানোর কোম্পানির কাছে গেলে তারা বানিয়ে দিবে? দিবে না। এক্ষেত্রে তোমাকে খুঁজতে হবে সেই থ্রিডি প্রিন্টের কোম্পানি, যে তোমার পছন্দ মতো ডিজাইনে এই কাজ করে দিবে।
থ্রিডি প্রিন্টিং আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম বিস্ময়কর আবিষ্কার। বর্তমানে হরেক রকম ক্ষেত্রে এই জিনিসের ব্যবহার হচ্ছে। যেমন খাবারের কথাই ধরা যাক। নাসা নভোচারীদের জন্য খাবার পাঠাতে গিয়ে এক ধরণের সমস্যায় ভুগছে। মহাকাশে খাবার পাঠানোর জন্য খরচ বেশ। আবার সেই খাবারের উচ্ছিষ্ট থাকা, সেগুলো ম্যানেজ করা, কিংবা সেই খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নভোচারীরা পাচ্ছে কি না, সব একসাথে মেলানো বেশ ঝামেলার। এজন্য তারা সমাধানের পথ খুঁজছে থ্রিডি প্রিন্টিং-এ। এর মাধ্যমে যথাযথ প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ উপাদান রেখে খাবারের উচ্ছিষ্ট বাদ দিয়ে কীভাবে খাবার তৈরি করা যায়, তারা তা ভাবছে। এছাড়া বর্তমানে চকলেট, পাস্তা, পিজ্জা ইত্যাদি থ্রিডি প্রিন্টের মাধ্যমে তৈরি করা শুরু হয়েছে।
ফ্যাশন দুনিয়াতেও এখন থ্রিডি প্রিন্টের আনাগোনা তৈরি হচ্ছে। নাইকি বিভিন্ন নতুন ডিজাইনের জুতার প্রোটোটাইপ বা স্যাম্পল কপি তৈরির ক্ষেত্রে থ্রিডি প্রিন্টিং ব্যবহার করছে। এছাড়া নিউ ব্যালেন্স নামে এক মার্কিন কোম্পানি পায়ের মাপ অনুযায়ী খাপে খাপ হওয়ার মতো করে জুতা তৈরিতেও এ প্রযুক্তি সহায়তা নিচ্ছে। এছাড়া গাড়ি, বিমান প্রভৃতির নতুন ডিজাইন পরিকল্পনা করতে ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরিতেও ব্যবহার হচ্ছে থ্রিডি প্রিন্টিং এর।
আধুনিক এই প্রযুক্তির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবহারের সেক্টর হলো চিকিৎসাখাত। এটি এক্ষেত্রে একেবারে জাদুর বাকসোর মতো কাজ করে। কারো শরীরের কোনো হাড়, বা দাঁত ভেঙে গেলে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে তার শরীরের জন্য একদম ফিট হয়, এভাবেই এসবের কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি করতে পারছেন। আগে যেখানে নির্দিষ্ট কিছু সাইজের মধ্যেই সবাইকে ফিট করার চেষ্টা করতে হতো, এখন সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী সাইজের তৈরি করে নেয়া যাচ্ছে। আবার ওষুধ কিছু নির্দিষ্ট মাত্রায় এখন দোকানে পাওয়া যায়, যেমন ১০/২০/১০০/৫০০ মিলিগ্রাম প্রভৃতি। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী মাত্রাতেই ওষুধ প্রিন্ট করে দেয়া সম্ভব হবে। কোনো জটিল অপারেশনের ক্ষেত্রে ডাক্তারগণ ঐ রোগীর শরীরের থ্রিডি প্রোটোটাইপ তৈরি করেও উচ্চতর গবেষণার সুযোগ পাচ্ছেন।
বর্তমান সময়ে থ্রিডি প্রিন্টিং এর মাধ্যমে বাড়ি বানানোটাও উন্নত বিশ্বে দৃশ্যমানভাবে বাড়ছে। থ্রিডি প্রিন্টিং পদ্ধতি বুঝার জন্য আমরা এ পর্যায়ে এ পদ্ধতিতে একটি বাড়ি তৈরির আদ্যোপান্ত বুঝার চেষ্টা করবো। আমরা তো এমনিতে ইট, সিমেন্ট, রড, বালু ইত্যাদি দিয়ে বাড়ি বানাতে দেখি। কিন্তু থ্রিডি বাড়ি বানানোর পদ্ধতিটা একটু ভিন্ন। সাধারণত বাড়ি বানাতে যেখানে কনক্রিট ব্যবহার করা হয়, তেমনই থ্রিডি বাড়ি বানাতে ব্যবহার হয় এক বিশেষ ধরনের মিক্সচার। এই বিশেষ মিক্সচার থাকে টুথপেস্টের মতো নরম। কিন্তু মেশিন থেকে খোলা আবহাওয়ায় ছাড়া হলে তখন শক্ত হয়ে যায়। এই মিক্সচার তৈরি হয় সিমেন্ট, বালি এবং আরো কিছু প্রয়োজনীয় ক্যামিকেল মিশ্রণে।
এই গেলো কাঁচামালের আলাপ, এখন বলবো যন্ত্রপাতি নিয়ে। সাধারণত বাড়ি বানাতে আমরা রাজমিস্ত্রীদের কাজ করতে দেখি। কিন্তু থ্রিডি বাড়ির ক্ষেত্রে এই কাজ করে চার বা ততোধিক পায়ের উপর দাঁড়ানো ক্রেনসদৃশ প্লাটফর্মের সাথে সংযুক্ত একটি যন্ত্র। এই প্লাটফর্মের মাথায় এমনভাবে তিনটা বার বা দণ্ড ফিট করা থাকে, যাতে করে এর সাথে সংযুক্ত মূল প্রিন্টিং মেশিনটি চারপায়ের মাঝের সম্পূর্ণ এলাকাটায় ডানে বামে ও উপরে নিচে সবদিকে চলাফেরা করতে পারে। মূল প্রিন্টিং মেশিনের উপর দিকে থাকে মিক্সার। এখানে প্লাটফর্ম এরিয়ার বাইরে থেকে কাঁচামালগুলো আসতে থাকে এবং এখানে এগুলোর ফাইনাল ফিনিশিং চলে। সবশেষে তার নিচের থাকা কলমের মুখের মতো একটা অংশ, যাকে নজেল বলা হয়, তা দিয়ে এই নরম মিক্সচার বের হয়ে জায়গামতো বসে যায়।
উপরে যেটুকু বললাম, এটা থ্রিডি বাড়ি বানানোর বাইরের কাজ। শুধু বাড়ি নয়, থ্রিডি যে কোনো প্রোডাক্ট বানানোর প্রক্রিয়া মোটামুটি এরকমই। তবে এগুলো কেবল বাইরের কাজ। এর চাইতেও অনেক সূক্ষ্ম কাজ করতে হয় সফটওয়্যারে বসে। শুরুতে ডিজিটাল ডিজাইনের জন্য তৈরি স্মার্ট সফটওয়্যার ব্যবহার করে ডিজাইন ঠিকঠাক করতে হবে। এরপরে একে দিতে হবে কিছু নির্দিষ্ট সফটওয়্যারে, যেগুলো এই ডিজাইনকে থ্রিডি প্রিন্টারের উপযোগী করে তৈরি করে নিবে। এখানে একে লেয়ারে লেয়ারে ভাগ করে ডিজাইনিং রুট ঠিক করে নেয়া হবে। এরপর বাকি কাজ প্রিন্টারের! থ্রিডি প্রিন্টিং এ কোন দ্রব্য ব্যবহার করা হবে, তা নির্ভর করে কী বানানো হচ্ছে তার উপর। যেমন বাড়ি বানানোর ক্ষেত্রে বিশেষ মিক্সচার ব্যবহারের কথা এরমধ্যে বলেছি। কিন্তু চকলেট, ক্যান্ডি, ক্র্যাকার্স ইত্যাদি বানাতে কি আর একই জিনিস ব্যবহার করা হবে? অবশ্যই না। সেক্ষেত্রে যেমন প্রোডাক্ট, তেমন কাঁচামাল। আর প্রোটোটাইপ বা স্যাম্পল তৈরিতে সাধারণত প্লাস্টিকের ব্যবহার করা হয়। শুরুতে একেবারে উত্তপ্ত গলিত অবস্থায় একে থ্রিডি প্রিন্টারের মধ্যে দেয়া হয়, এরপরে নজেলের মধ্য দিয়ে বের হয়ে তা একেবারে শক্ত আকার ধারণ করে। কাঁচামালের ভিন্নতা ছাড়া কাজের ক্ষেত্র অনুযায়ী থ্রিডি প্রিন্টারের সাইজও যে বড়ছোট হয়, তা তো বলাই বাহুল্য।
তো বন্ধুরা, থ্রিডি প্রিন্টিং এর মজার মজার ভিডিও তোমরা ইউটিউবে দেখতে পারো। এছাড়া টিঙ্ক্যারক্যাড, থ্রিডি স্ল্যাশ, ব্লকবেঞ্চ সফটওয়্যার ব্যবহার করে নিজেরাও থ্রিডি ক্যারেক্টার বানানোর চেষ্টা করতে পারো। আজকের মতো তাহলে শেষ করা যাক। তোমাদের ঈদের অনেক শুভেচ্ছা, ঈদ মোবারক।
প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৬



