গ্রামের নাম ছিল ভোলা। অজপাড়া গাঁ, যেখানে আধুনিকতার ছোঁয়া খুব কমই পৌঁছেছিল। মাটির ঘর, কাঁচা রাস্তা, আর চারদিকে অভাব-অনটনের চাপা কষ্ট। সেই গ্রামেই জন্মেছিল শিলা। বাবা রহমত মিয়া প্রতিদিন ভোরে খেত-খামারে মজুরির কাজ করতে যেতেন। মা সারেহা অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন। সংসারের চাকা চলত খুবই কষ্টে।
শিলার শৈশবটা অন্যদের মতো ছিল না। যে বয়সে তার খেলাধুলা করার কথা ছিল সেই বয়সে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংসারের কাজে সাহায্য করতে হতো। কিন্তু এক জিনিস তাকে আলাদা করত—অদম্য শেখার ইচ্ছা। বাড়িতে বই ছিল না, স্কুলে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না, তবু স্কুলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাচ্চাদের হাতে খাতা-কলম দেখে শিলার মনে হাহাকার জাগত।
একদিন সাহস করে সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহানা ম্যাডামের কাছে গেল। কাঁপা গলায় বলল, ‘ম্যাডাম, আমি কি পড়তে পারব? বই নেই, খাতা নেই… তবু আমি শিখতে চাই।’
ম্যাডাম অবাক হলেন। মেয়েটির চোখে এমন এক তৃষ্ণা, যা অভাবকে হার মানায়। তিনি ভাবলেন, এই মেয়েটার দিকে একটু সহানুভূতি, একটু সাহায্য, একটু অনুপ্রেরণা দিলে হয়তো একটা বড় জায়গায় যেতে পারবে। তার যে অদম্য ইচ্ছা শক্তি, এটাকে হাতিয়ার করা যেতে পারে। তাই তিনি স্থির করলেন, শিলার লেখাপড়ার জন্য সমস্ত প্রকারের সাহায্য সহযোগিতা তিনি করবেন। এই জন্যই তিনি নিজের পুরনো বই আর খাতা দিয়ে শিলাকে পড়ানো শুরু করলেন। কিন্তু পড়াশোনার পথ সহজ ছিল না। দিনের বেলায় গৃহস্থালির কাজে সাহায্য করতে হতো, তাই শিলার পড়ার সময় হতো রাতে। ঘরে বিদ্যুৎ ছিল না। শাহানা ম্যাডাম শিলাকে প্রতিমাসে এক ডজন মোমবাতি দিতেন। মাঝে মাঝে শুকনো খাবার কিনে দিতেন শিলাকে। মোমবাতির ক্ষীণ আলোয় সে পড়তে বসত। সেও অনেক সময় খালি পেটে বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকত। গ্রামে অনেকে বিদ্রূপ করত।
“মেয়েরা এত পড়াশোনা করে কী হবে? রান্নাঘরই তো শেষ জায়গা।”
কেউ কেউ মাকে উপহাস করে বলত, তোমার মেয়ে তো বই নিয়ে পাগল হয়ে গেছে!”
কিন্তু শিলা থেমে যায়নি। ধৈর্য আর পরিশ্রম ছিল তার একমাত্র সম্বল। ধীরে ধীরে সে পড়াশোনায় ভালো করতে লাগল। পরীক্ষায় একের পর এক ভালো ফল আনল। গ্রামে যারা একসময় তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত, তারাই অবাক হয়ে তাকাতে শুরু করল।
মাধ্যমিক পরীক্ষায় শিলা প্রথম হলো। সংবাদটা তখন সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। তখন পুরো ভোলা গ্রামে উৎসবের আমেজ নেমে এলো। সেই মেয়ে, যে অভাবে-অন্ধকারে জন্ম নিয়েছিল, আজ গ্রামকে গর্বিত করল। বাবা-মায়ের চোখে জল এসে গেল, তবে সেটি ছিল আনন্দের অশ্রু।
কিন্তু শিলার পথ এখানেই শেষ হয়নি। উচ্চশিক্ষার জন্য শহরে গিয়ে ভর্তি হলো কলেজে। সেখানে থেকেও তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে। দিনরাত কষ্ট করেছে। আর সবসময় মনে রেখেছে—‘শুধু নিজেকে নয়, পুরো গ্রামকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিতে হবে।’
বছর কয়েক পর শিলা শিক্ষক হলো। শহরে চাকরি করার সুযোগ থাকলেও সে ফিরে এলো নিজের গ্রামে। ভাঙাচোরা স্কুলকে গড়ে তুলল। গ্রামের ছোট ছোট শিশুদের হাতে বই তুলে দিয়ে বলল, ‘তোমাদের জীবন আর অন্ধকারে আটকে থাকবে না। পড়াশোনাই তোমাদের আলো।’
ধীরে ধীরে ভোলা গ্রামটি বদলাতে শুরু করল। মেয়েরা স্কুলে যেতে শুরু করল, অভিভাবকরাও শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে লাগল। শিলা শুধু একজন শিক্ষক নয়, গ্রামের অনুপ্রেরণায় পরিণত হলো।
আজ ভোলা গ্রামের মানুষ গর্ব করে বলে— “শিলাই আমাদের গ্রামের আলো। সে প্রমাণ করেছে, অন্ধকার যত গভীরই হোক, শিক্ষা আর সাহস থাকলে আলোয় পৌঁছানো যায়।”গভীর তিমিরের মাঝেই লুকিয়ে থাকে উদীয়মান সূর্য।



