এখন মাঝ রাত। আকাশে অস্পষ্ট আধোভাঙা চাঁদ। হু হু বাতাস বয়ে যাচ্ছে শহরতলীর দীঘল সুপারি আর শিরিষগাছ কাঁপিয়ে। শুকনো পাতা উড়ছে পাক খেয়ে। আকাশে উড়ে যাচ্ছে যাযাবর পাখির দল। তাদের ডানা বাতাস কেটে এগিয়ে চলেছে। শব্দ উঠছে শিসের মতো। হঠাৎ দল থেকে একটা পাখি ছিটকে গেল। পাখিটা ডাইভ দিয়ে বাঁ দিকে খানিক নেমে একটা ফ্ল্যাট বাড়ির উপর চক্কর মেরে উড়তে লাগল।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল রূহানের। তীব্র ব্যথায় তার সমস্ত শরীর চিনচিন করছে। মনে হচ্ছে শিরার ভেতর দিয়ে আগুনের ফুলকি ছুটে বেড়াচ্ছে।
গত মাসে অ্যাক&সিডেন্টের পর থেকে রূহান বিছানায় শোয়া। তার বাঁ পায়ের গোড়ালির হাড় ভেঙে গেছে। প্লাস্টার লাগানো। তীব্র ব্যথার নীল স্রোত ওখান থেকেই পাক খেয়ে উপরে উঠে মস্তিষ্কে সিগনাল দিচ্ছে।
অ্যাক&সিডেন্টটা এক দুঃস্বপ্ন রূহানের কাছে। বন্ধুর সঙ্গে মোটর সাইকেলে যাচ্ছিল মধুপুরের দিকে। সে ছিল পিছনে বসা। নিজেকে তখন মনে হচ্ছিল বুনো ঘোড়ায় চেপে পাহাড়ি পথ ধরে ছুটে যাওয়া কাউবয়দের মতো। হঠাৎ একটা বাচ্চা ছেলে এসে পড়ল রাস্তায়। ছেলেটিকে বাঁচাতে গিয়েই ঘটল দুর্ঘটনা। রূহান তীব্র এক ধাক্কায় ছিটকে পড়ল রাস্তার পাশের খাদে।
ডাক্তার জানিয়েছে তাকে এখন ক’মাস বিছানায় পড়ে থাকতে হবে। ক্লাস নাইনের ছাত্র দুরন্ত স্বভাবের রূহান কুঁকড়ে রয়েছে বিছানায়। সবুজ মাঠে পায়ে ফুটবল নিয়ে বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো ছুটে যেত সে। চঞ্চল আর দুরন্ত স্বভাবের রূহান এখন বিছানায় দিন কাটাচ্ছে।
রূহানরা থাকে ফ্লাট বাড়ির আঠারো তলায়। ঘরে জ্বলছে মৃদু সবুজ আলো। জানালার কাচের শার্সিতে কেমন যেন শব্দ হচ্ছে। রূহান ঘুমভাঙা চোখে দেখল একটা ধূসরবরণ পাখি জানালার শার্সিতে ডানা ঝাপটাচ্ছে। ডানার পালকে রক্তের দাগ। লাল পুঁথির মতো চোখদুটো জ্বলছে। পাখিটা কি অসহায়ের মতো আশ্রয় চাইছে তার কাছে? রূহান স্পষ্ট শুনতে পেল পাখিটা বলছে- এই খোকা, জানালাটা খুলে দাও! আমাকে বাঁচাও!
অনেক কষ্টে বিছানায় উঠে বসে রূহান। মাথার কাছেই জানালায় তখনো ডানা ঝাপ্টানোর শব্দ হচ্ছে। সন্ধ্যায় ব্যথানাশক ট্যাবলেট খেয়েছে সে। এই দামি ট্যাবলেট ওর মেজমামা এনেছেন বিদেশ থেকে। রূহানের মেজমামা মালয়েশিয়া স্টেটস বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করছেন। তার গবেষণার বিষয় বেশ জটিল। প্রাণীদের জিন বৈশিষ্ট্যের রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করছেন তিনি।
সেদিন খাবার টেবিলে মেজমামা বলছিলেন, প্রাণীদের জীবকোষের রোমাঞ্চকর কিছু তথ্য পেয়েছেন। মালয়েশিয়ার সারওয়াকের গভীর অরণ্যে এক ধরনের লাজুক, ক্ষুদ্র আকারের বানরজাতীয় প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন। জ্বলজ্বল করে তাকায়। অসম্ভব বুদ্ধিমান প্রাণী। নিজেদের মধ্যে এরা সাঙ্কেতিক ভাষায় তথ্য সরবরাহ করে।
একটা প্রাণী এবার সঙ্গে করে এনেছেন তিনি। প্রাণীটাকে পাশের ঘরে খাঁচায় রাখা হয়েছে। অন্ধকার বেশি পছন্দ প্রাণীটার। আলো সহ্য করতে পারে না। আলোর প্রখরতায় প্রাণীটার শরীরে লোমগুলো কুঁকড়ে যায়।
২
রূহানের কাছে মেজমামা একজন রহস্যময় মানুষের প্রতিকৃতি। সারাক্ষণ চিন্তা করেন। রহস্যময়তায় ঘেরা তার আচরণ। তিনি একবার বললেন, ‘প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের ভাব বিনিময়ের যোগসূত্র বের করতে হবে। তাহলে প্রাণীদের কাছ থেকে বিচিত্র তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে মানুষ। তথ্য প্রবাহের জগতে তাহলে বিপ্লব ঘটে যাবে। প্রাণীদের স্বভাবজাত ক্ষমতায় যে বুদ্ধির ঝিলিক রয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে রহস্যময় ক্ষমতা রয়েছে তার সূত্র জানা যাবে। এই জানার ভেতর দিয়ে মানুষের সামনে খুলে যাবে দারুণ সম্ভাবনাময় পৃথিবীর অনাবিষ্কৃত দুয়ার। এতে প্রাণীরা কী ভাবছে তা বিস্ময়করভাবে জানতে পারবে মানুষ।’
কথাগুলো বলার সময় মেজমামার প্রখর চোখদুটো চকচক করে ওঠে। তিনি রূহানের মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘জানিস রূহান, এর ফলে কী ঘটবে? প্রাণীরা অনেক খবর প্রকৃতির কাছ থেকে আগেই জানতে পারে, কিন্তু প্রকাশ করতে পারে না। প্রাণীদের রয়েছে অদ্ভুত রকমের বুদ্ধি। সেই বুদ্ধির সূত্র দিয়ে তখন অনেক কিছুই আবিষ্কার করা সম্ভব হবে। মানুষ তখন প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রচুর সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে পারবে। ফলে জীবনযাত্রার ধারাটাই পাল্টে যাবে।’
রূহান অনেক দিন ভেবেছে তার মেজমামার কথা। লোকটা কি শেষ পর্যন্ত উন্মাদ হয়ে যাবে! অনেকের কাছেই মেজমামা একজন ক্ষ্যাপাটে মানুষ। কিন্তু রূহানের কাছে তিনি জিনিয়াস।
৩.
রূহান মেজমামার কথা ভাবছে আর ভাবছে। হঠাৎ জানালার শার্সিতে আবারও পাখিটার ডানা ঝাপ্টানোর শব্দ শুনতে পেল। পাখিটা আবার জানালার কাছে ফিরে এসেছে। কী চায় পাখিটা ওর কাছে? এত রাতেও সে এখানে কেন এসেছে? পাখিটা কি বিশেষ কিছু জানাতে চায়? যাযাবর পাখিটা কত দূরের পথ পেরিয়ে এসেছে, কে জানে। পাখিটা ওর ঘরে প্রবেশ করার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কেন ওর ঘরে আসতে চাইছে পাখিটা? পাশের ঘরের তারের খাঁচায় অদ্ভুত ধরনের শব্দ হয়। সেই ছোট, লাজুক বানরপ্রজাতীয় প্রাণীটা শব্দ করছে।
রূহান ক্রাচে ভর দিয়ে বিছানা থেকে নেমে জানালা খুলতেই পাখিটা কাঁপতে কাঁপতে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। যেন তুষারঝড়ে আক্রান্ত হয়ে ছুটে এসেছে একটা অসহায় পাখি।
রূহান কাঁপাহাতে পাখিটাকে স্পর্শ করতেই ওর শিরদাঁড়া বেয়ে তিরতির করে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। রূহানের চিন্তার জগতে তখন তীব্র ঝাঁকুনি। ওর মস্তিষ্কে আলোর ফুলকিরা দুলছে। মস্তিষ্কের নিউরনে বেশ কিছু ছবি ধারাবাহিকভাবে ফুটে উঠছে।
রূহানের ভেতরের অস্পষ্ট ভাবটা ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে আসছে। কেউ যেন টিউনিং করছে তাকে। পাখিটার সঙ্কেত প্রকাশের ক্ষমতার সঙ্গে তার চিন্তা-চেতনার একটা যোগসূত্র স্থাপন করছে। রূহান বেশ আশ্চর্য হয়ে অনুভব করে, সে ওই পাখিটার সঙ্কেত বুঝতে পারছে। দূরাগত পাখিটাকে সে চিনতে পেরেছে। এই পাখি এসেছে লাদাকের হিম সরোবর থেকে।
রূহানের দিকে তাকায় পাখিটা। লাল পুঁতির মতো চোখ মেলে জানতে চায়, ‘তোমার নাম কী?’
রূহান অবাক হয়। পাখিটা যে তাকেই জিজ্ঞেস করছে। বলে, ‘আমার নাম রূহান।’
‘তুমি এখন থেকে আমার বন্ধু।’
রূহান অবাক হয়। পাখিটা কী সুন্দরভাবে তাকে বন্ধু বানিয়ে ফেলল। একটুও ভয়ডর নেই তার। সে বলে, ‘তুমিও আমার বন্ধু হয়ে গেলে।’
পাখিটা বলে, ‘আমি তোমাদের এখানে এসেছি আমার আরেক বন্ধুর খোঁজে। সে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম আমাদের দলনেতা টাঙ্গুয়ার হাওড়ের পাশের জঙ্গলে আশ্রয় পেয়েছে। তাই আমাদের দলটি যাচ্ছিল টাঙ্গুয়ার হাওড়ের দিকে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। যার কাছে আমাদের যাত্রাপথের রুট সম্পর্কে নতুন তথ্য রয়েছে। কিন্তু আমাদের দলনেতা জানিয়েছে ওই শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছে এই শহরে। আরও জেনেছি সে এই বাড়িতেই আছে।’
‘কে তোমার বন্ধু?’
‘তাকে আনা হয়েছে সারওয়াকের অরণ্য থেকে।’
পাশের কক্ষে তখন শিসের মতো শব্দ হয়। রূহান বুঝতে পারে খুদে, লাজুক প্রাণীটি পাখিটার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে।
রুহান পাখিটাকে বলে, ‘চলো, তোমার বন্ধুর কাছে নিয়ে যাচ্ছি।’
রূহান ক্রাচে ভর দিয়ে পাখিটাকে নিয়ে পাশের ঘরে যায়। দরজা খুলতেই দেখে খাঁচার ভেতরে জ্বলজ্বল করছে দুটি চোখ। ছটফট করছে প্রাণীটা। পাখিটাকে দেখেই অস্থির হয়ে উঠেছে। রূহান বুঝতে পারে তাদের সঙ্কেত বিনিময়ের ভাষা। বানর প্রজাতির প্রাণীটা পাখিটাকে সতর্ক সংকেত দিচ্ছে—
‘তোমরা অবিলম্বে তোমাদের যাত্রাপথ পরিবর্তন করো। এখন তোমরা যে রুট ব্যবহার করছ তা তোমাদের জন্যে মোটেই নিরাপদ নয়। তোমাদের দলের ওপর ব্যাপক হামলা হবে। টাঙ্গুয়ার হাওড়ের ইকোসিস্টেম এখন বিপন্ন। তোমাদের ডিম থেকে আর ছানা হবে না। ডিমের খোলস হয়ে যাবে অসম্ভব পাতলা আর ফিনফিনে।’
‘তাহলে তো আমাদের ভীষণ বিপদ।’
‘তোমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের নির্মূল করার জন্যে পৃথিবীর মানুষ অজান্তেই তোমাদের আশ্রয়স্থল প্রতিকূল করে তুলেছে। আমি চেষ্টা করেছিলাম তোমাদের কাছে এই তথ্য পৌঁছে দিতে। কিন্তু এই প্রাণিগবেষক আমাকে এখানে এনে বন্দি করে রেখেছে।’
পাখিটা বলল, ‘আমাকে যেভাবেই হোক হাওড়ে গিয়ে এ খবর সবার কাছে জানাতে হবে। আরও কয়েকটি দল আসছে ওই হাওড়ে। তাদেরকেও সাবধান করে দিতে হবে।’
‘তোমাদের জন্যে এখন নিরাপদ জায়গা হচ্ছে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ।’
‘আমি তাহলে এক্ষুণি যাই। হয়তো পথে আমাদের দলটিকে ধরতে পারব।’
ধূসরবরণ পাখিটা জানালা দিয়ে উড়াল দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই ধূসর অন্ধকারে হারিয়ে যায় পাখিটা।
রূহান জানালার গ্রিল ধরে তাকিয়ে থাকে বাইরের ঘন অন্ধকারের দিকে।
প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৬



