স্কুলবাসে ঘাসফড়িং

0
7

সবুজ কলাপাতা রঙের ছোট্ট একটা প্রাণী। হঠাৎ লাফিয়ে পড়ে আদিয়ানের সামনের সিটের ব্যাক পার্টে। চিংড়িমাছের মতো ঝটকা লাফ দিয়ে মুহূর্তেই কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।
অন্যান্য দিনের মতো আদিয়ান আজও স্কুলবাসে স্কুলে যাচ্ছিল। সে দ্বিতীয় সারির বাম পাশের সিটে বসা। সামনের সারির সিটের পেছনটা কালো রঙের কাভারে ঢাকা। তাই কালোর মধ্যে খুব পরিষ্কার দেখা গেলো সবুজ রঙের প্রাণীটা। এলিয়েন টেলিয়েন নয়তো? আদিয়ান আবার সাইন্স ফিকশনের পোকা। দেশ বিদেশের অনেক লেখকের সায়েন্স ফিকশন পড়েছে। সে কারণে এলিয়েন, টাইম মেশিন, রোবট ইবো ইত্যাদি সায়েন্স ফিকশন চরিত্র সারাক্ষণই ঘুরঘুর করে ওর মাথায়। ডানে, বামে, নিচে কাত হয়ে, উপুড় হয়ে নানাভাবে খুঁজল আদিয়ান। কোথাও আর দেখা যাচ্ছে না প্রাণীটিকে। তাহলে কি চোখের ভুল ছিল ওটা? হবে হয়তো-বা। এই ভেবে আদিয়ান নিজ সিটে হেলান দিয়ে চোখ দুটি বন্ধ করল। কয়েক মুহূর্ত পর চোখ খুলেই দেখে একি কাণ্ড! সেই প্রাণীটা। একই জায়গায় সিটের চিপা থেকে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে ওপরের দিকে উঠছে। দুপাশে তিনটি করে মোট ছয়টি পা। পিছনের পা জোড়া বেশ বড়। মাথায় শিংয়ের মতো দুদিকে দুটি এ্যান্টেনা। এ এন্টেনা দিয়ে সে সেন্সরের কাজ করে। স্পর্শ, ঘ্রাণ ও শব্দ অনুভব করে শত্রুর ব্যাপারে মুহূর্তেই ধারণা করতে পারে। দেখতে কী সুন্দর প্রাণীটা। এটা একটা ঘাসফড়িং। আদিয়ান গত বছর ষষ্ঠ শ্রেণির বিজ্ঞান বইতে এটি সম্পর্কে জেনেছে। এরা খুবই নিরীহ প্রাণী। কারো কোনো ক্ষতি করে না। সবুজ ঘাসে এদের বসবাস। তাই এদের ঘাসফড়িং বলা হয়। কিন্তু এখানে আসলো কীভাবে এটি? আদিয়ান কোনো হিসাব মেলাতে পারে না। এই ঢাকা শহরে তাও আবার স্কুলবাসে এটি আসার কোনো লজিক খুঁজে পায় না।


ইস্ট পয়েন্ট স্কুলে পড়ে ওরা। যার আশপাশে ঘাস বা জঙ্গল কোনোটাই তো নেই। স্কুলের পাশে দু চারটা গাছ যা আছে তাও ধুলোর আস্তর পড়ে আছে। এ ধরনের গাছে ঘাসফড়িংরা থাকে না। তাহলে আসলো কোথা থেকে এটি? যেভাবে যেখান থেকেই আসুক। এখন যেখানে আছে তা যে মোটেই নিরাপদ জায়গা নয় তা নিশ্চিত বলা যায়। ঘাসফড়িংটি সে কথা বুঝতে পারুক বা না পারুক আদিয়ান খুব ভালো করেই জানে। ও বুঝে শুনেই উদ্বিগ্ন হয়েছে। একটু পরেই তনিম, আসিফ বা অরিদ্র যদি দেখে ফেলে! তাহলে এর বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। হয়তো খপ করে ধরে পিছনের লম্বা পায়ে সুতা বেঁধে ছেড়ে দিবে। সুতা ছাড়তে ছাড়তে ঘুড্ডি নাটাই খেলা শুরু করবে। কিংবা ধুলায় ভরা স্কুলের ন্যাড়া মাঠে ছেড়ে দিয়ে দৌড়ানি দিতে দিতে কেড্স এর তলায় চ্যাপ্টা করে দিবে। আদিয়ান আর ভাবতে পারে না। না এ হতে দেয়া যায় না। যে করেই হোক একে বাঁচাতে হবে। কিন্তু কীভাবে? আস্তে করে ধরে কোথাও রাখতে হবে। ফেরার সময় নিয়ে গিয়ে নিরাপদে কোনো ঘাসে ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু এখন তো কেবল স্কুল ওপেনিং টাইম। ছুটি হবে সেই বিকেল পাঁচটায়। সামনে বাংলা রচনার মতো লম্বা সারাটা দিন পড়ে আছে। এতক্ষণ কোথায় রাখা যায়। কী করা যায়? কিছুই মাথায় আসে না আদিয়ানের। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা বুদ্ধি উঁকি মারে মগজের এক কোনায়। মাথার ডান দিকটা চুলকাতে চুলকাতে একা একা বিড়বিড় করে বলতে থাকে, বুদ্ধিতো আসতেই হবে আদিয়ান সাহেব। তুমি না বুদ্ধির ঘট! মনে মনে নিজেই নিজের সাথে জোক করে আদিয়ান। আদিয়ানদের পরিবারে রেওয়াজ অনুসারে প্রতি সপ্তাহে ফ্যামিলি মিটিং হয়। মিটিংয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। ছোটদেরও রাখা হয় সেখানে। মতামতের সুযোগ দেওয়া হয়। যে কোনো বিষয়ে ছোটবেলা থেকেই বড়দের মতো সুন্দর সুন্দর মতামত দিত আদিয়ান। তাই বাবা আদর করে ডাকেন বুদ্ধির ঘট।
আদিয়ানের মাথায় আসে স্কুল ছুটি হওয়া পর্যন্ত ঘাসফড়িংটা রাখার জন্য একটা পাত্র দরকার। বুদ্ধি করে স্কুল ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে নেয়। জানালা দিয়ে পানি ফেলে বোতলটা খালি করে। এর মধ্যে ঘাসফড়িংটা লাফ দিয়ে চলে যায়নি তো? আড় চোখে খেয়াল করে দেখে- নাহ, কোথাও যায়নি। ওই তো একই জায়গায় বসে আছে। মাথার ওপরে থাকা এন্টেনা দুটি নাড়ছে। আদিয়ান কলমের চোখা মাথা দিয়ে বোতলের গায়ে বেশ কয়টা ফুটো করে। যাতে ঠিকভাবে এর ভেতরে অক্সিজেন ঢুকতে পারে। তারপর আস্তে করে দু আঙুলে ফড়িংটাকে ধরে বোতলে ভরে মুখ লাগিয়ে দেয়। যে করেই হোক স্কুল ছুটি পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখতে হবে একে। তারপর একটা উপায় বের করা যাবে। ততক্ষণ খুব সাবধানে রাখতে হবে বোতলটি। ভাবতে ভাবতে প্যাপ প্যাপ হর্ন বেজে ওঠে। গাড়ি স্কুল গেটে চলে আসছে। নামতে হবে। বোতলটি সতর্কতার সাথে ব্যাগে রেখে ব্যাগের চেইন খোলা রাখে। গাড়ি থেকে নেমে ব্যাগটি সাবধানে নিয়ে হাঁটা শুরু করলো ক্লাসের দিকে।
বাংলা ক্লাসে এতক্ষণ নির্মল স্যার সবার আমি ছাত্র কবিতাটি পড়াচ্ছিলেন। সেদিকে মোটেই মনোযোগ নেই আদিয়ানের। কী করে ঘাসফড়িংটাকে বাঁচানো যায় তা নিয়েই তার যত চিন্তা। ভাগ্যিস আজ স্যারের মুড ভালো। নইলে ওর অমনোযোগের বিষয়টি অবশ্যই স্যারের নজরে পড়তো। এতক্ষণ দু চার ঘা পিঠে পড়ার সম্ভাবনাও ছিল খুব। কবিতাটির লেখক সুনির্মল বসুর নামের সাথে স্যারের নামের মিল থাকায় এ কবিতাটি পড়ানোর সময় বরাবরই স্যারের দিল খোশ থাকে। ভাবনার রাজ্য থেকে হুঁশ ফিরেই আদিয়ান শোনে স্যার সুন্দর করে আবৃত্তি করছে—

“পাহাড় শিখায় তাহার সমান
হই যেন ভাই মৌন-মহান,
খোলা মাঠের উপদেশে-
দিল খোলা হই তাই রে।”

কবিতাটি শুনতে শুনতে হঠাৎ ওর সবুজ খোলা মাঠের কথা মনে পড়ে যায়। ওদের বাসা মান্ডা। বাসার কাছেই গ্রিন মডেল টাউন। বিশাল আবাসন এলাকা। এখনো পুরোপুরি বসতি গড়ে ওঠেনি। তাই ভেতরের পুরো এলাকাটিকে বিরাট খোলা মাঠ মনে হয়। চারদিকে সবুজ ঘাস ও গাছে ভরা। আদিয়ান বেশ কিছুদিন আগে ওর বাবার সাথে সেখানে ঘুরতে গিয়েছিল।
ইয়েস! ওখানেই ছেড়ে দিতে হবে ফড়িংটিকে। তাহলে বেঁচে যাবে। ভাবে আর স্কুল ব্যাগের ভেতর রাখা ঘাসফড়িং এর বোতলটি চেক করে বার বার। কী ব্যাপার, নড়াচড়া করছে না কেন? মরে যায়নি তো! নাড়া দিয়ে দেখে। নাহ। ঠিক আছে। এইতো নড়ছে।
দপ্তরি চাচা ঢং ঢং ঘণ্টা বাজায়। অবশেষে স্কুল ছুটি। যাক কোনোমতে সময়টা পার হয়েছে তাহলে। মনে মনে প্ল্যান করে। বাসায় পৌঁছে স্কুল ব্যাগটা রেখেই চলে যাবে গ্রিন মডেল টাউনের ওখানটায়। ভেতরে ঢুকে দেখবে চারপাশ খোলা মেলা। সবুজ আর সবুজ। অনেক গাছ, ঘাস, লতা পাতা। নেপিয়ার, দূর্বা, পারা ইত্যাদি নানান জাতের ঘাস। বোতলের মুখটা আস্তে করে খুলে বলবে, যাহ! এবার তুই মুক্ত। নিরাপদ। যেখানে খুশি যা। তোর মা বাবা আত্নীয় স্বজন বন্ধু সবার কাছে যা। যেভাবে খুশি লাফা। যত খুশি লাফিয়ে লাফিয়ে এক পাতা থেকে অন্য পাতায় যা। এবার আমি চিন্তামুক্ত। এসব ভাবতে ভাবতে এক অন্য জগতে হারিয়ে যায় আদিয়ান। হঠাৎ তনিমের খোঁচায় সম্বিত ফিরে পায়।
কী ব্যাপার কী ভাবছিস? আর তোর বোতল এরকম ফুটা ফুটা কেন? দেখি।
একরকম জোর করে বোতলটি কেড়ে নিলো আদিয়ানের হাত থেকে।
অ্যা! এতো দেখছি ঘাসফড়িং। দারুণ জিনিস পাইছি একটা। গাড়ির মধ্যে ছাইড়া দিয়া ভয় দেখানো যাইব কয়েকটারে। আবিদ্যা তো ভয়ে লাফায়া পড়বো গাড়ি থাইক্কা।
বলতে বলতেই বোতলের মুখ খুলে ঘাসফড়িংটা গাড়িতে ছেড়ে দেয়। এক লাফে আসিফের কানের ওপর গিয়ে বসে। পরক্ষণেই আবিদের দিকে লাফ দেয়। আবিদও লাফালাফি ঝাপাঝাপি করতে থাকে। ওর আবার ইনসেক্ট এলার্জি আছে। যে কোনো পোকা মাকড় দেখলে ওর আর হুঁশ থাকে না। কোত্থেকে কোথায় লাফায় তার কোনো ব্যালেন্স থাকে না।
একজন বই দিয়ে আরেকজন ব্যাগ থেকে খাতা বের করে যে যার মতো বাড়ি মারতে থাকে। পরিস্থিতি আদিয়ানের নাগালের বাইরে চলে যায়। আর বুঝি বাঁচানো গেলো না! সবুজ শান্ত ছোট্ট নিরীহ প্রাণীটি বাঁচার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করতে থাকে। এক লাফে গাড়ির পাটাতনে গিয়ে পড়ে।
মুহূর্তেই আদিয়ানের পাশের সিটে বসা ছেলেটি সজোরে লাথি মারতে পা উঁচু করে। ওর মেদ বহুল শরীরের মোটা মোটা পায়ের এক কিকেই ভর্তা হয়ে যাবে ছোট্ট ঘাসফড়িংটা। না এ হতে পারে না! আদিয়ান ওর গলার সমস্ত শক্তি দিয়ে জোরে জোরে চিৎকার করে ওঠে।
না না ওকে মেরো না! তোমাদের দোহাই লাগে প্লিজ। ছেড়ে দাও। ছেড়ে দাও..

চিৎকার শুনে পাশের ঘর থেকে দৌড়ে আসে আদিয়ানের মা আর রামিসা আপু।
কি রে কী হয়েছে কী হয়েছে? কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস? শান্ত হ বাবা।
বলতে বলতে মা আদিয়ানকে বুকে জড়িয়ে ধরেন।
একেবারে ঘেমে গেছিস। নে পানি খা।
মা এক গ্লাস পানি দেয় আদিয়ানকে।

প্রকাশকাল:মার্চ ২০২৬