আকাশের বুকে আলোর নাচন

0
6

বন্ধুরা, আকাশে তো আমরা কত কিছুই দেখি। দিনে ঝকঝকে সূর্য, আর রাতে মিটিমিটি তারা আর চাঁদের আলো। বৃষ্টির পর আকাশে সাত রঙের রংধনুও নিশ্চয়ই দেখেছ। কিন্তু ভাবো তো, রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার আকাশে যদি হঠাৎ করে বিশাল এক সবুজ বা লাল রঙের আলোর ঢেউ খেলতে শুরু করে, কেমন লাগবে? মনে হবে না, কেউ বুঝি আকাশে জাদুর রং ছড়িয়ে দিয়েছে?
পৃথিবীর একেবারে উত্তর আর দক্ষিণ মেরুতে রাতের আকাশে ঠিক এমনই জাদুর মতো আলোর নাচ দেখা যায়। এই জাদুকরী আলোর বৈজ্ঞানিক নাম হলো ‘অরোরা’। চলো আজ আমরা এই জাদুকরী আলোর পেছনের আসল রহস্যটা জেনে নিই।
বিজ্ঞান আবিষ্কার হওয়ার আগে, পুরোনো দিনের মানুষ এই আলো দেখে অবাক হতো আর নিজেদের মতো করে মজার মজার গল্প বানাতো। ফিনল্যান্ডের মানুষ বিশ্বাস করত, বরফের পাহাড়ে এক বিশাল জাদুর শেয়াল (Fire Fox) দৌড়ে বেড়ায়। দৌড়ানোর সময় তার বিশাল লেজের ঝাপটায় বরফের কণা আকাশে উড়ে গিয়ে এমন আলোর তৈরি করে! আবার এস্কিমোরা ভাবত, তাদের মৃত পূর্বপুরুষেরা আকাশের বুকে সিন্ধুঘোটকের খুলি দিয়ে বল খেলছেন! অন্যদিকে, সাহসী ভাইকিং যোদ্ধাদের ধারণা ছিল, এই আলো হলো দেবতাদের রাজ্যে যাওয়ার এক বিশাল জাদুর সেতু।
এগুলো তো মানুষের নিজের মতো করে মনে করে নেয়া কল্পকাহিনি। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটে তা জানতে হবে না? আকাশে এই আলোর নাচের প্রধান জাদুকর হলো আমাদের সূর্য! সূর্য সবসময় আমাদের আলো আর তাপ দেয় ঠিকই, কিন্তু মাঝে মাঝে সে খুব রেগে যায়। তখন সূর্যের বুক থেকে প্রচণ্ড বেগে আগুনের কণা বা চার্জ যুক্ত কণা ছুটে আসে পৃথিবীর দিকে। একে বলা হয় সৌরঝড় বা সোলার উইন্ড। এই সৌরঝড় যদি সরাসরি পৃথিবীতে চলে আসত, তাহলে আমাদের অনেক ক্ষতি হতো। কিন্তু আমাদের পৃথিবীর আছে এক অদৃশ্য জাদুর ঢাল বা বর্ম! পৃথিবীর ভেতরে থাকা বিশাল চুম্বকের কারণে এর চারদিকে একটি ‘ম্যাগনেটিক ফিল্ড’ বা চুম্বকীয় বলয় তৈরি হয়ে আছে। সূর্যের কণাগুলো যখন প্রচণ্ড বেগে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে, তখন পৃথিবীর এই চুম্বকীয় ঢালে বাধা পায়। বাধা পেয়ে কণাগুলো পৃথিবীর উত্তর আর দক্ষিণ মেরুর দিকে ছিটকে যায়। আর তখনই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা গ্যাসগুলোর সাথে সূর্যের কণাগুলোর এক বিশাল মারামারি বা সংঘর্ষ বাধে। এই মারামারির ফলেই আকাশে জ্বলে ওঠে তীব্র রঙিন আলো!
অরোরা কিন্তু শুধু এক রঙের হয় না। কখনো সবুজ, কখনো লাল, আবার কখনো নীল বা বেগুনি রঙের আলো দেখা যায়। কিন্তু রঙগুলো বদলায় কীভাবে? এটা পুরোটাই নির্ভর করে সূর্যের কণাগুলো কোন গ্যাসের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে তার ওপর। আমাদের বায়ুমণ্ডলে থাকা অক্সিজেন গ্যাসের সাথে ধাক্কা লাগলে আকাশে সবুজ বা লাল রঙের আলো জ্বলে ওঠে। আর নাইট্রোজেন গ্যাসের সাথে ধাক্কা লাগলে তৈরি হয় নীল বা বেগুনি রঙের আলো।
এই ম্যাজিকাল লাইট শো কোথায় দেখা যায় জানো? এই জাদুকরী আলো পৃথিবীর একেবারে উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে সবচেয়ে ভালো দেখা যায়। উত্তর মেরু বা সুমেরুর কাছাকাছি দেশগুলো— যেমন নরওয়ে, আইসল্যান্ড বা কানাডা থেকে যে আলো দেখা যায়, তাকে বলা হয় ‘অরোরা বোরিয়ালিস’ (Aurora Borealis) বা নর্দার্ন লাইটস।
আর এর কিন্তু একটা যমজ ভাইও আছে! দক্ষিণ মেরু বা এন্টার্কটিকার আকাশে যে আলো দেখা যায়, তাকে বলা হয় ‘অরোরা অস্ট্রালিস’ (Aurora Australis) বা কুমেরু প্রভা। তবে ওখানে খুব বেশি মানুষ থাকে না বলে নর্দার্ন লাইটসের কথাই আমরা বেশি শুনি।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার কি জানো? এই আলোর নাচ শুধু আমাদের পৃথিবীতেই হয় না। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতি এবং শনি গ্রহেও এই আলোর নাচ হয়। আর সেখানকার অরোরাগুলো পৃথিবীর চেয়েও হাজার গুণ বড় আর শক্তিশালী!
তো বন্ধুরা, বিজ্ঞান আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে এই আলো কোনো শেয়ালের লেজের ঝাপটা নয়। তবু রাতের আকাশে যখন এই রঙিন আলো নেচে ওঠে, তখন একে জাদুর চেয়ে কোনো অংশে কম মনে হয় না। হয়তো বড় হয়ে তুমিও একদিন চলে যাবে উত্তর মেরুর কাছাকাছি কোনো দেশে, নিজের চোখে এই জাদুকরী আলোর নাচ দেখতে!

প্রকাশকাল- এপ্রিল ২০২৬