বিনয় বিজয়কে করে মহিমান্বিত

0
1

ডিসেম্বর মাস আমাদের বিজয়ের মাস।
বিজয় শব্দটি শুনলেই মনে উদ্দীপনা, গর্ব আর সাফল্যের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু বিজয় কেবল শক্তির প্রদর্শন বা প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার নাম নয়; যথার্থ বিজয় হলো, সেই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে বিনয়ী হওয়ার মধ্যে। বিজয় মানুষকে যেমন উঁচুতে তোলে, তেমনই বিজয়ের সফলতা ভুল পথে ব্যবহার করলে তা তাকে ধ্বংসের দিকেও ঠেলে দেয়। সত্যিকার অর্থে বিজয়ী জাতি হলো সেই জাতি, যারা শক্তি অর্জনের পর অহংকারে অন্ধ না হয়ে বিনীত থাকে এবং সামনের পথ আরও উন্মুক্ত করে উচ্চতর উন্নতির দিকে অগ্রসর হয়।

বিজয়ের ভুল ব্যবহার :
পৃথিবীর ইতিহাসে বহু জাতি, শক্তি অর্জনের পর তা ভুলভাবে ব্যবহার করেছে। বিজয়ের পরে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে তারা বিজিতদের ওপর চালিয়েছে চরম নির্যাতন। চাপিয়ে দিয়েছে জুলুম নিপীড়ন আর দাসত্ব ।

এক. বিজিত জাতির প্রতি রোমানদের কঠোর নীতি
রোমান সাম্রাজ্য ছিলো পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং বিস্তৃত সাম্রাজ্যগুলোর একটি। ইউরোপ-এশিয়া-আফ্রিকার বিশাল ভূখণ্ড দখল করে শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল তারা। কিন্তু তাদের অনেক যুদ্ধ ছিল নির্মম। পরাজিতদের দাস বানানো, জোরপূর্বক কর আদায়, শাসনের নামে শোষণ, নিপীড়নের নিত্যনতুন কৌশল উদ্ভাবন এসবই রোমকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দেয়। শক্তি থাকা সত্ত্বেও বিনয় না থাকায় তাদের সাম্রাজ্য টিকে থাকতে পারেনি।

দুই. চেঙ্গিস খান ও হালাকু খানের নৃশংসতা
চেঙ্গিস খাঁ ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী একজন বিজেতা। তাঁর সেনাবাহিনী এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত একের পর এক অঞ্চল জয় করেছে। কিন্তু সেই বিজয়ের সঙ্গে ছিল আগুন-রক্ত ও ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস। বহু শহর পুড়িয়ে ফেলা, লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করা, পুরো জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার মতো ঘটনা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। ১২৫৮ সালে চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খান বাগদাদ আক্রমণ করেন। খলিফা আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করার পর, মঙ্গোলরা শহরটি অবরোধ করে এবং ১২ দিন পর এটি দখল করে নেয়। এরপর তারা শহরজুড়ে নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। পৃথিবীর বিখ্যাত গ্রন্থাগার বাইতুল হিকমা ধ্বংস করে জ্ঞান বিজ্ঞানের লক্ষ লক্ষ বই পুড়িয়ে ফেলে। খলিফাসহ অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে। বাগদাদ পরিণত হয় এক ধ্বংস নগরীতে। শক্তির অপব্যবহারই শেষ পর্যন্ত মঙ্গোল সাম্রাজ্যকে বিভক্ত ও দুর্বল করে দেয়।

তিন. বাংলাদেশের ইতিহাস
আমাদের বাংলাদেশেও এরকম ঘটনা অন্তত দুই দুইবার ঘটেছে। একটি ১৯৭২ থেকে ৭৫, অন্যটি ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল। এসময় জাতির মধ্যে তৈরি হয় দ্বিধা বিভক্তি। প্রতিশোধ স্পৃহা নিয়ে শত শত মানুষকে হত্যা করে এক কালো শক্তি। গুম করে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়, সম্পদ লুণ্ঠন করে এবং মানবাধিকার বিনষ্ট করে। দুইবারই এই শক্তিটি চরমভাবে ঘৃণিত এবং পতিত হয়।
তারমানে ইতিহাসের পাঠ হচ্ছে, বিজয় শক্তি দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই শক্তির ভুল ব্যবহার বিজয়ীদের পতনের দিকে নিয়ে যায়।

বিজয়ের সঠিক ব্যবহার : ক্ষমা, উদারতা ও মহত্ত্ব
ইতিহাসের সব বিজয়ীই যে এমন আচরণ করেছেন তেমনটা নয়। অনেক বিজয়ী নেতা ও জাতি পরাজিতদের প্রতি আশ্চর্য উদারতা ও করুণা দেখিয়েছেন। আর এ কারণেই তারা হাজার বছর পরেও সবার কাছে সম্মানিত, স্মরণীয় ও অনুকরণীয়। তেমন কিছু কাহিনী জানতে পারি।

এক. নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর মক্কা বিজয় এবং ক্ষমা
মক্কা বিজয়ের দিন মানবজাতির ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা ঘটেছিল। যারা তাঁকে এবং তাঁর অনুসারীদের ১৩ বছর ধরে নির্যাতন করেছে, ঘরবাড়ি ছিনিয়ে নিয়েছে, হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে—তাদের প্রতিশোধ নেওয়ার পুরো ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নবী মুহাম্মদ (সাঃ) সর্বসাধারণের জন্য শর্তসাপেক্ষে ক্ষমার ঘোষণা দিলেন।
এ ছিল সত্যিকারের বিজয়ী নেতৃত্বের পরিচয়। শক্তি থাকার পরও প্রতিশোধ না নেওয়া, বরং ক্ষমা করা। এই উদারতা পরবর্তীতে বহু মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছে এবং আরবের আনাচে-কানাচে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিয়ে আরবকে পরিণত করেছে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তারা পৃথিবীর অর্ধেক এলাকার শাসকে পরিণত হয়।

দুই. সলাহউদ্দিন আইউবীর ক্ষমাশীলতা
ক্রুসেডের যুদ্ধের সময় মুসলমানদের অন্যতম বীর নেতা সলাহউদ্দিন আইউবী মুসলিম ভূমি দখলকারী ক্রুসেডারদের পরাজিত করেন এবং জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন। বিজয়ের পর তিনি প্রতিশোধ না নিয়ে উদারতা দেখান। খ্রিষ্টানদের নির্বিঘ্নে বের হতে দেন এবং সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। এই ঘটনায় খ্রিষ্টান ইতিহাসবিদরাও তাঁর চরিত্র ও মহানুভবতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন।

তিন. নেলসন ম্যান্ডেলার ক্ষমাশীলতা
গেল শতাব্দীর ইতিহাসে দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা স্মরণীয় হয়ে আছেন। ২৭ বছরের কারাজীবন এবং কৃষ্ণাঙ্গদের উপর শ্বেতাঙ্গদের নির্মম অত্যাচারের পর তিনি ক্ষমতা হাতে পান। তাঁর হাতে সুযোগ ছিল প্রতিশোধ নেওয়ার, কিন্তু তিনি জাতিকে এক করার পথ বেছে নেন। তিনি শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ উভয় জাতিকে সঙ্গে নিয়ে দেশে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেন। অগ্রগতির পথে যাত্রা শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকা। তাঁর এই মহানুভবতা তাঁকে শুধু বিজয়ী নেতা নয়, উদার শাসক হিসেবেও ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য স্থান করে দিয়েছে।

চার. ২৪ এর বিজয় ও বিনয়
২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পূর্বে যারা এদেশে ক্ষমতায় ছিলো তারা বিশ্বাস করতো, ক্ষমতাচ্যুত হলে তাদের অন্তত পাঁচ লক্ষ নেতা কর্মীর জীবন অবসান হবে প্রতিপক্ষের হাতে। তাদের এই হিসাব-নিকাশ নিতান্ত অনুমান নির্ভর ছিল না। তারা মানুষের ওপর যে নির্মম নিপীড়ন চালিয়েছিল তার রিএকশন হিসেবে এটা তারা কাম্য ভেবে রেখেছিলো। কিন্তু ঘটনা ঘটলো ঠিক তার উল্টো। এত বড় একটা অভ্যুত্থান হওয়ার পরে সারাদেশে ক্ষমতাচ্যুতদের একজন মানুষেরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। ষোল বছর ধরে চলা জুলুম এবং চরম নির্যাতনের শিকার জনগণ এক্ষেত্রে ভীষণ উদার ভূমিকা পালন করেছিলেন।

বিজয়ের মানে বিনীত হওয়া
বিজয়ের মুহূর্তে মানুষের ভেতরে অহংকার জন্ম নেওয়া খুব স্বাভাবিক। কিন্তু বিজয়ের সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন বিজয়ী পক্ষ শক্তিকে অহংকারে নয়, বিনয়ে রূপান্তর করতে পারে। ক্ষমা, সহনশীলতা, উদারতা—এগুলো দুর্বলতার নয়; বরং শক্তিমান মানুষের গুণ। পবিত্র কুরআনেও বিজয় লাভ করার পরে মহান স্রষ্টার প্রতি মস্তক অবনত করতে বলা হয়েছে।
বিনীত বিজয়ী জানে—
বিজয় কোনো সমাপ্তি নয়; এটি নতুন দায়িত্ব, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং নতুন এক পথচলার সূচনা।

একজন প্রকৃত বিজয়ী কখনো অর্জনে আটকে থাকে না। সে জানে সামনে আরো পথ আছে, আরো পরীক্ষা আছে, আরো উন্নতি আছে। যে বিজয় তাকে স্থির করে ফেলে, সেটি কখনো স্থায়ী বিজয় নয়।

যুগে যুগে দেখা গেছে—
যেসব জাতি বিজয় অর্জন করে আত্মতুষ্টিতে ডুবে গেছে, অহংকার করেছে, প্রতিশোধ নিয়েছে তারা দ্রুত পতনের মুখে পড়েছে।
আর যারা বিজয়ের পরও জ্ঞান, নীতি, ন্যায়বিচার, সহনশীলতা ও উন্নতির পথে এগিয়েছে— তাদের সাফল্যও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, বিজয় শক্তির নয়, চরিত্রের পরীক্ষা। যে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে, তার বিজয়ই সত্যিকার বিজয়।

প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৫