বছর ঘুরে আবার এসেছে জুলাই মাস। কী উত্তাল আর রক্তাক্ত ছিল মাসটি! মাথার ওপর চেপে থাকা ষোল বছরের স্বৈরশাসনের অবসানের কথা মনে হলে একদিকে যেমন সাহসে স্বপ্নে এবং আনন্দে ভরে ওঠে বুক, অন্যদিকে অসংখ্য মৃত্যু এবং রক্তাক্ত ঘটনা মনকে বিষাদের সাগরে নিমজ্জিত করে। দগদগে ঘটনাগুলো এখনো আমাদের স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছে। এত বড় একটি ঘটনা কীভাবে ঘটেছিলো?
আরব বসন্তও কিন্তু শুরু হয়েছিল একটি ছোট্ট ঘটনার মধ্য দিয়ে। বেকারত্বের কষাঘাতে জর্জরিত তিউনিশিয়ার এক যুবক নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে আগুন ছড়িয়ে পড়ে আরব বিশ্বে। ফলে শুরু হয়েছিল জাগরণ। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের জন্য বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করতে করতে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। একটি সাধারণ প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ানোর মতন সাহসও কারো ছিল না। হত্যা গুম বিচারবহির্ভূত এবং বিচারিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক দল তথা জনগণকে ভীষণভাবে কোণঠাসা করে ফেলেছিলো। প্রশাসন এবং মিডিয়াকে এমনভাবে করায়ত্ব করেছিল যে তাদের বিরুদ্ধে মাঠে নামা তো দূরের কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারবিরোধী একটা স্ট্যাটাস দিলেও দলীয় হামলা কিংবা পুলিশী মামলার শিকার হতে হতো। ছাত্র সমাজেরও পরপর দুটি বৃহৎ আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যায়। একটি সড়ক আন্দোলন, অন্যটি কোটা আন্দোলন। ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনটি ব্যর্থ হয় মূলত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মৌখিক কথার ভিত্তিতে। তিনি বলেছিলেন, কোটা নিয়ে যেহেতু এতো সমস্যা, কোনো কোটাই থাকবে না। পরবর্তীতে কেউ একজন আদালতে রিট করে কোটা বহালের দাবিতে। ২০২৪ এর জুন মাসে যখন আদালত কোটার পক্ষে রায় দেয় তখন ছাত্ররা আবারও আন্দোলন শুরু করে।
আন্দোলনের শুরুটা ছিল খুবই শান্তিপূর্ণ। ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতরে জমায়েত হয়। কিন্তু ঐ যে! স্বৈরাচার তার বিপক্ষে টু শব্দটি করার সুযোগও কাউকে দেবে না!
সরকার প্রথমে লেলিয়ে দেয় তার পোষা ছাত্র সংগঠনকে। ছাত্র সংগঠনটি ততদিনে তাদের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলেছে। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, সিট বাণিজ্য, সন্ত্রাস আর কুকর্ম অপকর্ম করতে করতে তাদের নামই পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। সম্পূর্ণ গণবিচ্ছিন্ন এই সংগঠনটি রীতিমতো সন্ত্রাসী ভূমিকায় ক্যাম্পাসে অবতীর্ণ হয়। তাদের নৃশংস হামলায় রক্তাক্ত হয় বহু ছাত্র-ছাত্রী। এই ঘটনা পুরো
ছাত্র সমাজকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। শুরু হয় ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে আন্দোলন।
যে ঘটনা পুরো বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেয় :
আর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও রাস্তায় নেমে আসে কোটা সংস্কারের দাবিতে। নেতৃত্বে ছিলেন আবু সাঈদ নামের এক অসম সাহসী ছাত্র সমন্বয়ক। আন্দোলনের ওপর মারমুখী পুলিশকে নিবৃত করার জন্য তিনি তার দু-বাহু বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন গুলির সামনে। কিন্তু হায়! পুলিশ এই ছাত্রটিকে নিজের সন্তান ভাবতে পারলো না। সরাসরি গুলি করে দিলো তার বুকে। মুহূর্তেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো সে। আবু সাঈদের শাহাদাত ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে আগুন ধরিয়ে দিলো। দ্রোহের আগুন জ্বললো ঘরে বসে থাকা প্রতিটি মানুষের অন্তরেও। হোক সে ধনী, মধ্যবিত্ত কিংবা খেটে খাওয়া রিক্সাওয়ালা শ্রমিক মজুর। সরকারি মিডিয়া যন্ত্রগুলো তখন আর কাজ করছিল না; কেননা মানুষের হাতে হাতে মোবাইল। যেকোনো ঘটনা মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যাচ্ছিলো। উত্তাল আন্দোলন, রক্তাক্ত রাজপথ আর কবি কাজী নজরুল ইসলামের জাগরণী গানগুলো তখন মানুষের অন্তরকে আন্দোলিত করছিল মুহুর্মুহু।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সাধারণত কোনো আন্দোলন সংগ্রামে সরাসরি অংশগ্রহণ করে না কিন্তু চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে তারা রাজপথে নেমে আসে। প্রতিদিনই বিভিন্ন ক্যাম্পাস থেকে হামলা এবং মৃত্যুর সংবাদ আসতে থাকে। রাজপথের যোদ্ধাদের পানি খাওয়াতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় মুগ্ধ। নিহত হয় কিশোর ফারহান ফাইয়াজ এবং আরও অনেকে। সাভারে পুলিশের সাঁজোয়া যান থেকে টেনে হিঁচড়ে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয় আহত এক ছাত্রকে। ছটফট করতে করতে মৃত্যুবরণ করে সে। এইসব ঘটনা দেশকে ভয়াবহ রকমের উত্তাল করে তোলে। সরকার শুরু করে নানান রকমের টালবাহানা।
টালবাহানা এক : ডাটা সেন্টারে আগুন ধরিয়ে, শত শত গাড়ি পুড়িয়ে, বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনে হামলা করে এবং মেট্রোরেল স্টেশনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে এর দায় আন্দোলনকারীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। কিন্তু জনগণ সরকারের এই চালাকি ধরে ফেলে। ফলে মাঠে মারা যায় তাদের দায় চাপানোর প্রচেষ্টা।
টালবাহানা দুই : কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, সমস্ত অফিস আদালত ব্যাংক বীমা বন্ধ করে দেয় এবং কারফিউ জারি করে। উদ্দেশ্য ছিল রাস্তা থেকে আন্দোলনকারীদের ঘরে ঢুকিয়ে সেখান থেকে অ্যারেস্ট করা এবং হত্যা অথবা গুম করা। এবং সেই কাজ তারা শুরু করে দেয়। ছাত্র জনতা কারফিউ ভেঙে আবার রাস্তায় নেমে আসে।
টালবাহানা তিন : এবার তারা ছাত্রদের সংলাপে বসার আহ্বান জানায়। ছাত্ররা জবাব দেয়, যাদের সাথে সংলাপ হবে তারা কবরে শুয়ে আছে।
আর্মি নামিয়ে, জরুরি অবস্থা জারি করেও যখন সরকার কোনো কূল-কিনারা করতে পারে না তখন তারা ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় এবং মোবাইল যোগাযোগ সীমিত করে দেয়। যোগাযোগই হচ্ছে একটি আন্দোলনের প্রধান শক্তি। সেটি যখন বন্ধ হয়ে যায় তখন আন্দোলনকারীরা ভীষণ বিপাকে পড়ে যায়। এই সুযোগে ফ্যাসিস্ট সরকার চালায় ইতিহাসের ভয়াবহ এবং জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য, বাইরের শত্রুর সাথে যুদ্ধ করার জন্য যে অস্ত্র ব্যবহৃত হওয়ার কথা, সেই অস্ত্র তারা দেশের মানুষের ওপর প্রয়োগ শুরু করে। ব্যবহার করে স্নাইপার এবং গ্রেনেডের মতো ভয়াবহ মারণাস্ত্র। হেলিকপ্টার থেকে নিরীহ নিরস্ত্র জনগণের ওপর চালানো হয় হত্যাকাণ্ড। আকাশে হেলিকপ্টারের শব্দ শুনে বাবার কোলে বারান্দায় এসে প্রাণ হারায় রিয়া গোপের মতন আরও অনেক শিশু। পুলিশের গুলিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ছাত্র-জনতা রাজপথে ঠাঁই নেয়। রাষ্ট্র অনেকটা অচল এবং অকার্যকর হয়ে যায়।
জুলাই শেষ হয়ে যায়, ছাত্ররা ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টায় না। এই আন্দোলনে বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত জুলাই অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয় তারা। ফলে আগস্ট মাসের ১ তারিখ হয়ে যায় ৩২ শে জুলাই।
এ সময় আন্দোলনের একটা নান্দনিক রূপ প্রকাশ পায়। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের দেয়ালগুলো ভরে যায় অসংখ্য স্লোগান এবং গ্রাফিতিতে। ছাত্র-ছাত্রীদের এই মৌন অথচ শিল্পসমৃদ্ধ প্রতিবাদ সরকারের সকল কূট-কৌশলকে পরাভূত করে দেয়।
তিন আগস্ট ছাত্র জনতা মিলিত হয় শহিদ মিনারে। বিশাল সে গণজাগরণ। নয় দফা থেকে দাবি চলে আসে এক দফায়। ছয় আগস্ট ঢাকা ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। রাত্রিতে সে ঘোষণা সংশোধিত হয়। ছয় নয়। গণভবন ঘেরাও হবে ৫ তারিখে ।
৪ এবং ৫ আগস্টে সরকারের আচরণ ছিল জঘন্যতম। পুলিশ বিজিবি র্যাবের পাশাপাশি সরকারি গুণ্ডাবাহিনী অংশগ্রহণ করে হত্যাকাণ্ডে। ৫ আগস্ট সকাল থেকেই শাহবাগ এবং গণভবনের দিকে জনতার ঢল নামে। সেই জনস্রোত বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয় জেনে হেলিকপ্টারে চেপে পালিয়ে যায় ফ্যাসিবাদের জননী। দুপুর নাগাদ রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। সবার চোখে আনন্দের অশ্রু। যারা গণভবনে ঢুকতে পেরেছে, মহান আল্লাহর দরবারে সিজদায় পড়ে আকুল হয়ে কেঁদেছে অনেকে। কেবল ঢাকা নয়, প্রতিটি মহানগরীতে, মফস্বল শহরে, ইউনিয়নে এমনকি গ্রামের কোনো সড়কেও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। লোকে লোকারণ্য। ফ্যাসিবাদের বিদায়ে উচ্ছ্বসিত সবাই। হাঁফ ছেড়ে বেঁচে গেছে যেন অনেকদিন নিঃশ্বাস নিতে না পারা একদল অসুস্থ মানুষ।
৩৬শে জুলাই তারিখটি বাংলাদেশের মানুষের অন্তরে জ্বলজ্বল করে জ্বলবে অনন্তকাল; অথচ এ তারিখটি ক্যালেন্ডারের কোনো পাতায় কখনোই খুঁজে পাওয়া যাবে না।
প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৫



