দোয়েল হচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় পাখি। গ্রাম কিংবা শহর, সবখানেই এ পাখির দেখা পাওয়া যায়। দোয়েলের শিস শুনতে ভারি মিষ্টি। পাখিটি দেখতেও ভারি সুন্দর। পোকা-মাকড়, ফুলের মধু, ভাত হচ্ছে এদের খাবার। ইংরেজিতে এই পাখিকে বলে Magpie Robin। দালানকোঠার ফাঁকফোকর, গাছের খোঁড়ল, নদীর পাড়, ঝোপ কিংবা দেয়ালের গর্তে বাসা বাঁধে এরা। মানুষজনকে বিশেষ ভয় পায় না। বাসা বানানোর সময় হলো ফাল্গুন মাস থেকে আষাঢ় পর্যন্ত। মেয়ে পাখি বাসা মনের মত করে বানিয়ে নেয় দুই-পাঁচ দিনে। বাসা তৈরির উপকরণ হচ্ছে ঘাস, শুকনো সরু নরম শেকড়, পালক, লোম ইত্যাদি। বাসার আকার আয়তন চায়ের পেয়ালার মতো হয়। মেয়ে দোয়েল ডিম পাড়ে তিন থেকে পাঁচটি। নীলচে সবুজ হয় ডিমের রঙ। চৌদ্দ থেকে ষোল দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। বাচ্চা জন্মানোর ১৪/১৫ দিন পরে ওরা নিজে উড়তে শিখে যায়।
কবিতা ও গানে দোয়েলের কথা, বিবরণ, গুণকীর্তন আছে অনেক। বাংলাদেশের সবচেয়ে নামকরা গাইয়ে পাখি বলা যেতে পারে এদের। লম্বায় ইঞ্চি আটেক হয়। সাদা-কালো রঙের হয় পুরুষ দোয়েল। পুরুষ দোয়েলের মাথা, ঘাড়, বুক এবং উপরের পালক চকচকে কালো। নিচের পালকগুলো সাদা রঙের হয়। দোয়েলের ডানা কালো। তার মাঝে পিঠ ঘেঁষে থাকে সাদা ছোপ ও টানা দাগ। সরু থেকে মোটা হয় লেজ, কিছুটা লম্বাও বটে লেজের মাঝখানের দু’টি পালক কালো, বাকিগুলো সাদা। কনীনিকা পিঙ্গল রঙের। চঞ্চু কালো। গাঢ় সীসের মত পা।
কী খায় দোয়েল পাখিরা? কী আর, ঘাসফড়িং, ঝিঁঝি পোকা, আরশোলা, পিঁপড়ে, পিঁপড়ের ডিম, মাটিতে মেলে এমন রকমারি ছোটো বড় কীটপতঙ্গ। মাঝে-সাঝে অবশ্য কেঁচো, অল্পস্বল্প সবজি এবং ফুলের মধুও খেয়ে থাকে তারা। দোয়েল পাখির বৈজ্ঞানিক নাম হলো Copsychus saularis। হিন্দি ভাষায় বলে দৈয়ার, দৈয়াল। বাংলাদেশের অনেক গ্রামেও দৈয়াল বলা হয়।
দোয়েল পাখি রয়েছে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, নেপাল, ভুটান ইত্যাদি দেশে। ভারতে এদের চারটি প্রজাতি দেখা যায়। দোয়েল মানুষের বসতির ধারে কাছে থাকলেও পোষ মানে না সহজে। খাঁচায় এদের বাঁচিয়ে রাখা খুবই শক্ত কাজ।
দোয়েলের প্রজননের সময় হলো মার্চের শেষ থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত। এই পাখি অসামাজিক ও অমিশুক ধরনের। সাধারণত গান করে খুব ভোরে এবং সন্ধ্যার একটু আগে। উঁচু জায়গায় গাছের মগডালে কিংবা কোনো পোলের ওপর বসে গান গায়। গান করবার সময় লেজটা উপরে তুলে তালে তালে নাচতে থাকে। এই কৃতিত্ব অবশ্য পুরুষ পাখির। স্ত্রী পাখি কিন্তু অমন সুন্দর করে গান গাইতে পারে না।
দোয়েল পাখির আয়ু কেমন? এরা বাঁচে ১৫ বছরের মতো। পুরুষ দোয়েলের শরীরের উপরিভাগ চকচকে নীলাভ-কালো রঙের হয় দেখতে। ডানায় স্পষ্ট সাদা লম্বা দাগ রয়েছে। ডানা কালচে-বাদামি রঙের। লেজ কালো। তবে লেজের প্রান্তের অংশ সাদা। স্থির হয়ে এই পাখি যখন বসে থাকে, তখন এর লেজকে দেখায় মোরগের লেজের মতো।
চাক-দোয়েল হচ্ছে বাগান, ঝোপঝাড় এবং অল্প জঙ্গলের পাখি। এদেরকে লোকালয়ে বসতির কাছেও দেখা যায়। এদের বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে Rhipidura albicollis। ইংরেজি নাম হোয়াইট থ্রোটেড ফ্যানটেইল ফ্লাইক্যাচার। এই পাখি পোষ মানে খুব সহজেই। বোলতা, মশা, মাছি এসব পতঙ্গ খেয়ে থাকে এরা। খুবই ছোটো মাছি জাতীয় পোকা ধরে খায়, সেই পোকা এতো ছোটো যে খালি চোখে সেটা মানুষের পক্ষে দেখা অসম্ভব। লম্বায় ইঞ্চি সাতেক হয় চাক-দোয়েল। স্ত্রী ও পুরুষ একই রকম হয় দেখতে। মাথা কালো। মাথার দুই পাশে কপাল থেকে চোখের ওপর দিয়ে ঘাড় পর্যন্ত সরু সাদা রঙের একটা লাইন থাকে। গলা ও ঘাড়ের দুই পাশ হয় সাদা, বাকি তলার পালকের রঙ ধূসর-পাটকিলে। পা এবং চঞ্চু কালো রঙের। কনীনিকা গাঢ় পাটকিলে, ধূসর হলো চোখের পাতা।
সাধারণত জোড়া বেঁধেই থাকে ওরা। এই গাছ থেকে ওই গাছ, এখানকার পাতার আড়াল থেকে ওখানকার পাতার আড়াল কিংবা কোনও দেয়ালের ওপর সব সময় অবিরাম নেচে চলে চাক-দোয়েল। দারুণ সুন্দর গলা এদের। সহজ সাবলীল ভঙ্গিতে উড়ন্ত পোকা অথবা পতঙ্গ ধরে ফেলতে ওস্তাদ। চক্রাকারে ডিগবাজি খায় বলেই হয়তো চাক-দোয়েল নাম হয়েছে। মানুষজনকে ভয় পায় না এরা। সাহস দারুণ। মানুষকে দেখলে তাই তাদের নাচ-গান বন্ধ হয় না। এক বাসাতেই দুই বার ডিম পাড়তে দেখা যায় এদের। ভারী সুন্দর বাসা এদের। যেন ছোট্ট সুন্দর কোনো একটা পেয়ালা সেটা।
চাক-দোয়েল পাখির আয়তনের তুলনায় বাসাটা ছোটো হয়। সরু সরু নরম ঘাস ও শেকড় দিয়ে বানানো হয় বাসা। দুটি সরু ডালের মাঝে বাসা তৈরি করে এরা। বাহিরটা মোড়া হয় মাকড়সার জাল দিয়ে। নিচ থেকে তাকিয়ে দেখলে কারও মনে হবে কোনো বোলতার বাসা বুঝি! বাসার মধ্যেও এই পাখি অস্থির থাকে। বিশেষ করে স্ত্রী পাখিটি। এক দফায় ডিম পাড়ে সাধারণত তিনটি। ডিম ঘিয়ে রঙের হয়। তাতে থাকে ধূসর ও পাটকিলে ছিট ও ছোপ। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে আগস্ট পর্যন্ত এদের প্রজননের সময়।
একটু আগে স্ত্রী পাখিটির চঞ্চলতার কথা বলছিলাম। এই ডিমে তা দিচ্ছে, আবার এই উড়ে যাচ্ছে ফুড়ুৎ করে। কখনো কখনো লেজ ছড়িয়ে দিচ্ছে পাখার মতো করে, শুরু করছে নাচ। ফের বসছে ডিমে তা দিতে। পুরুষ সঙ্গী কিন্তু বাসার কাছাকাছিই থাকে, বিশ্বস্তভাবে পাহারা দেয় তার সঙ্গিনীকে। বাসার কাছ দিয়ে কাক কিংবা শত্রুগোছের অন্য কোনও পাখি গেলে তাকে আক্রমণ করে ফেলবে ঠিকই। পুরুষ চাক-দোয়েল ছানা লালন-পালনের সব কাজ করে।
প্রকাশকাল: জুন ২০২৬



