২০২৪ সালের ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের স্মৃতিবাহী আগস্ট মাস আবার এসেছে। ৫ আগস্ট তথা ৩৬ জুলাই এই বিপ্লবের প্রথম বার্ষিকী। এই আন্দোলনে কচি কিশোররাও শরিক হয়ে অকাতরে প্রাণ দিয়েছে, শহিদ হয়েছে। তাদের সেই অবদানের কথা স্মরণ করতেই হবে সবাইকে। যাদের নেতৃত্বে ১৬ বছর পর সাফল্যের এই গৌরব গাঁথা রচিত হলো সেই বীরদের কথাও মনে রাখতে হবে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বা জুলাই বিপ্লব কোটা সংস্কার আন্দোলন ২০২৪ ও অসহযোগ আন্দোলন ২০২৪-এর সমন্বিত আন্দোলন। জুলাই মাসে আন্দোলন তীব্র রূপ নেয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’ সহ অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ নামে একজন ভার্সিটি শিক্ষার্থী পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এই ঘটনাটি আন্দোলনকে আরও জোরালো করে। এরপর ঢাকাসহ সারাদেশে আন্দোলন আরো জোরাদার হয়ে ওঠে। এতে যোগ দিয়ে প্রাণ দেয় মুগ্ধ, আনাস, ওয়াসিমসহ অনেকে। প্রাণ দেয় অনেক শিশু কিশোর।
কী চেয়েছিল ছাত্ররা? তারা চেয়েছিল লেখাপড়া শেষে মেধার ভিত্তিতে চাকরির সুযোগ। সবাই বড় হয়ে বাবা মায়ের আর পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতে চায়। এ জন্য তাদের দরকার কাজের সুযোগ। তা যদি মেধার ভিত্তিতে না হয় তা তো দুঃখজনক। এভাবেই ছাত্রছাত্রীরা অধিকার আদায়ে মাঠে নামে। তারা তো বেশি কিছু চায়নি। তাদের এই দাবি ছিল যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু তাতে কান দেয়া হয়নি, তাদের কথা শোনা হয়নি। সরকারের টনক নড়েনি।
শেষে আসে এক দফার আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলন। তাতে ভয়ভীতি উপেক্ষা করে যোগ দেন সর্বস্তরের মানুষ। ৪ আগস্ট মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এ দিন প্রায় ১০০ জন নিহত হয়। অবশেষে ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাই মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি চলাকালে কারফিউ ও সকল বাধা নিষেধ উপেক্ষা করে ছাত্র জনতা রাজপথ দখলে রাখে। ছাত্ররা জুলাই আন্দোলনকে স্মরণীয় রাখতে ৫ আগস্টকে ৩৬ জুলাই অভিহিত করে। সে দিন দুপুরে আসে বিজয়ের লগ্ন। এভাবে বিজয় গাঁথা রচিত হয় রক্তের পথ বেয়ে।
সেই সময় ছাত্র, জনতা, খেটে খাওয়া মানুষ নিহত হয়। অনেক ছিল কোমলমতি ছাত্র ছাত্রী। শেষে সারা দেশে শহিদের সংখ্যা দাঁড়ায় দেড় হাজারের বেশি। এত মৃত্যু নিকট অতীতে আর দেখা যায়নি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত শিশুকিশোরের সংখ্যা প্রায় ১০০ জন। নিহত কিশোরদের বেশিরভাগই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল। তারা ছিল তোমাদের মতোই শিশুকিশোর। তারা অনেকে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে রাস্তায় নেমে আসে। তবে শিশু-কিশোরদের কেউ কেউ বাসায় ও বাসার ছাদে খেলতে থাকা অবস্থায়, বাসা থেকে বিক্ষোভ দেখার সময় এবং মা-বাবার সঙ্গে বিজয় মিছিলে যোগ দিতে গিয়ে নিহত হয়েছে।
পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র শাহারিয়ার খান আনাস (১৬) এর কথা বলা যায়। বাড়িতে চিঠি লিখে সে চলে যায় বিক্ষোভে। চিঠিতে সে লেখে,
‘মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলাম না। মৃত্যুর ভয়ে স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যু অধিক শ্রেষ্ঠ।’
৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুলে গুলিতে নিহত হয় আনাস।
নিহত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সী শিশুটির নাম আবদুল আহাদ (৪)। সে তখনো স্কুলে যাওয়া শুরু করেনি। ২০ জুলাই রাজধানীর রায়েরবাগে ৮ তলা ভবনের বারান্দা থেকে মা-বাবার সঙ্গে বিক্ষোভ দেখার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় সে। নিহত শিশু-কিশোরদের মধ্যে দুটি মেয়েশিশুও রয়েছে। তারা হলো নারায়ণগঞ্জের রিয়া গোপ (৬) ও উত্তরার নাঈমা সুলতানা (১৫)। রিয়া বাসার ছাদে ও নাঈমা বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। নাইমা ডাক্তার হতে চেয়েছিল। কিন্তু তার সাধ পূর্ণ হলো না।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে গত ১৬ জুলাই। ওই দিন আবু সাঈদসহ ছয়জন নিহত হন। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদের মৃত্যু পুরো আন্দোলনের ধারা বদলে দেয়, সে কথা আগেই বলেছি।
মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ উত্তরায় আন্দোলনরতদের পানি পান করাতো। পানি লাগবে পানি বলে বোতল নিয়ে হাঁটতো। সেও আন্দোলনে নিহত হয়। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিন ভাইয়ের মধ্যে মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ ও মুগ্ধ ছিলেন যমজ। মুগ্ধ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে এমবিএ করছিল। ১৮ জুলাই উত্তরার আজমপুরে সে শহিদ হয়।
আরেক শহিদ জাহিদুজ্জামান তানভীন। ছাত্র জনতার বিজয় হলেও রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের সুখকর সময়টা দেখে যেতে পারল না তানভীন। অত্যন্ত মেধাবী তানভীনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের ডিটি ভিশারা গ্রামে। তানভীন মা-বাবা আর এক বোনকে নিয়ে থাকতেন উত্তরা আজমপুর কাঁচাবাজার জামতলার ভাড়া বাড়িতে। ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্টের ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও রেখেছে প্রতিভার স্বাক্ষর। বুয়েট আয়োজিত ‘মডেল শিপ প্রোপালশন কম্পিটিশন’ ও ‘সকার বট কম্পিটিশন’-এ অংশ নিয়ে পায় পুরস্কার। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইনস্টিটিউশন অব মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আয়োজিত ইউএএস এয়ারক্রাফট সিস্টেম প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে ১৮ জুলাই উত্তরায় গুলিতে প্রাণ হারায় তানভীন। সে ফুলকুঁড়ি আসরের চৌকস ছিল।
আরেক শহিদ আলভী। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনে সে শহিদ হয়। তার পুরো নাম শাহরিয়ার হাসান আলভী। থাকতো মিরপুর ১২ নম্বর সেক্টরে। নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল আলভী ।
আন্দোলনে শিশু-কিশোর মৃত্যুর প্রথম ঘটনা ঘটে ১৮ জুলাই। শহীদ শিশু কিশোরদের মধ্যে আরো রয়েছে : ফারহান ফাইয়াজ (১৭) মোহাম্মদপুর, মো. আহাদুন ( ১৬) বাড্ডা, রাহাত হোসেন (১৭) টঙ্গী, আশিকুল ইসলাম (১৫) বনশ্রী, মাহফুজুর রহমান (১৫) মিরপুর, সামিরুর রহমান (১১) মিরপুর, রাকিব হাসান (১০) মোহাম্মদপুর, হৃদয় হাওলাদার (১৭) যাত্রাবাড়ী, নাঈম হাওলাদার (১৭) যাত্রাবাড়ী, তাহমিদ ভূঁইয়া (১৫) নরসিংদী, সায়মন (১৭) চট্টগ্রাম। এই তালিকায় আছে আরো অসংখ্য নাম। তাদের সবার আত্মত্যাগ আমাদের একটি সুন্দর আগামী উপহার দেয়ার জন্য। তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে না।
এই আগস্ট মাসে তাদের কথা, তাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করতে হবে আমাদের।
প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৫



